প্রিন্ট এর তারিখ : ১৮ এপ্রিল ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০১ এপ্রিল ২০২৬
কবর থেকে উঠে ঋণ নিলেন মৃত ব্যক্তিরা!া
নিউজ ডেস্ক ||
জয়পুরহাটের কালাইয়ে অগ্রণী ব্যাংকের এক শাখায় যেন ভূতুড়ে ঋণের মহোৎসব চলছিল। মাঠে একশতক জমি নেই, ব্যাংকের ধার-ধারও নেই। অথচ চিঠি এসেছে ঋণখেলাপির লাল নোটিশ। আর শুধু জীবিত ব্যক্তিরাই নন, পনেরো-বিশ বছর আগে মারা যাওয়া মানুষের নামেও তোলা হয়েছে কৃষিঋণ।আঁওড়া মহল্লার নূর আলম মণ্ডল এখন হতভম্ব। তিনি বলেন, ‘ব্যাংক কোথায় আছে সেটাও জানি না। নাম-ঠিকানা নিয়ে ভুয়া কাগজ বানিয়ে আমার নামে ৯-১০ বছর আগে ঋণ তোলা হয়েছে। এখন তার জেরে ব্যাংক থেকে নোটিশ এসেছে।’২০১৬-১৭ সালে তৈরি হয়েছে এসব ভুয়া ঋণ। বেশিরভাগ ভুক্তভোগীই কালাই পৌরসভার আঁওড়া মহল্লা এবং আহম্মেদাবাদ ইউনিয়নের হারুঞ্জা ও ঝামুটপুর গ্রামের। ব্যাংকের খেলাপি ঋণের তালিকা বলছে, আঁওড়া মহল্লার ১৬ জন, ঝামুটপুরের ৩৮ জন, হারুঞ্জার ৩৩ জনের নামে ঋণ দেখানো হয়েছে।জালিয়াতির মাত্রা এতটাই ভয়াবহ যে পনেরো-বিশ বছর আগে মারা যাওয়া মানুষের নামও বাদ যায়নি। আঁওড়া মহল্লার আব্দুর রাজ্জাক মোল্লা মারা গেছেন পনেরো বছর আগে। অথচ ২০১৬ সালে তার নামে ৫০ হাজার টাকা ঋণ তোলা হয়েছে। সুদে-আসলে এখন তা প্রায় এক লাখ টাকায় ঠেকেছে। তার ছেলে সোহেল মোল্লার ভাষায়, ‘বাবা জীবিত অবস্থায় ঋণ নিয়ে পরিশোধ করেই মারা গেছেন। হঠাৎ দেখি ২০১৭ সালে নাকি তিনি আবারও ঋণ নিয়েছেন! বাবা কি কবর থেকে উঠে এসে ঋণ নিয়েছেন?’ একই চিত্র হারুঞ্জা গ্রামের খলিলুর রহমানের ক্ষেত্রেও। তিনি মারা গেছেন ১৮ বছর আগে, অথচ তার নামেও পঞ্চাশ হাজার টাকার ঋণ নেওয়া হয়েছে।এলাকাবাসীর অভিযোগ, তৎকালীন শাখা ব্যবস্থাপক নূরুল ইসলাম দালালদের মাধ্যমে মানুষের এনআইডি ও ছবি সংগ্রহ করেন। আঁওড়া গ্রামের ভ্যানচালক পুতুল চন্দ্র জানান, ভ্যান কেনার জন্য স্থানীয় দালাল আব্দুস সামাদকে দুই হাজার টাকা দিয়ে ছবি ও এনআইডি দিয়েছিলেন। ঋন না পেলেও এখন তার নামে প্রায় এক লাখ টাকার নোটিশ এসেছে। ঢাকায় বুয়া কাজ করা জাহানারা বেগমের নামেও তোলা হয়েছে ৩৫ হাজার টাকা। ব্যাংকের ফাইলে ছবি ও এনআইডি তার হলেও স্বাক্ষর ভুয়া বলে দাবি তার।দালাল আব্দুস সামাদ জানান, মানুষের কাগজ দিলে ব্যবস্থাপক তাকে দুই হাজার টাকা করে দিতেন। তিনি ৬০-৭০ জনের কাগজ দিয়েছেন। কিন্তু তাঁরা এসব দিয়ে ঋণ তুলবেন তা জানতেন না বলে জানান তিনি। তৎকালীন ফিল্ড সুপারভাইজার আব্দুস ছালামের বক্তব্য, চাকরি খাওয়ার ভয় দেখিয়ে ব্যবস্থাপক জোরপূর্বক তাদের এসব ভুয়া ফাইলে স্বাক্ষর করিয়েছিলেন।অগ্রণী ব্যাংক কালাই শাখার বর্তমান ব্যবস্থাপক জানান, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তদন্ত করছে। বেশ কিছু জালিয়াতি শনাক্ত হয়েছে। অভিযুক্ত সাবেক ব্যবস্থাপকের অবসরকালীন সব সুযোগ-সুবিধা বন্ধ রাখা হয়েছে। আঞ্চলিক মহাব্যবস্থাপক জানান, তদন্ত শেষে অভিযুক্তের পেনশন থেকে জালিয়াতির টাকা সমন্বয় করা হবে।অভিযুক্ত সাবেক ব্যবস্থাপক নূরুল ইসলাম অবশ্য কোনো অনুশোচনায় মাথা নত করেননি। মুঠোফোনে তিনি বলেন, ‘চাকরি থেকে অবসরে এসেছি, বয়স অনেক। এত আগের বিষয় আর মনে নেই। এসব কথা বাদ দেন, নিউজটি বন্ধ রাখতে কী করতে হবে তাই বলেন।’
কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্ব সংরক্ষিত গণবার্তা