প্রিন্ট এর তারিখ : ২২ এপ্রিল ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২২ এপ্রিল ২০২৬
ঘণ্টাখানেকের মাথায় ট্রাম্পের ঘোষণায় অনির্দিষ্টকালের যুদ্ধবিরতি, পাকিস্তানের কূটনৈতিক সাফল্য, ভারত পড়ল চিন্তায়া
বিশ্ব ডেস্ক ||
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হতে মাত্র কিছু সময় বাকি থাকতে হুট করে পুরো কৌশল বদলে ফেলেন। শেষ মুহূর্তে তিনি এই যুদ্ধবিরতি অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়ানোর ঘোষণা দেন। ট্রাম্প জানান, পাকিস্তানের অনুরোধেই তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তার ভাষ্য, ইরানি নেতৃত্ব এখন ‘গুরুতরভাবে বিভক্ত’, তাই তাদের একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তির জন্য ‘স্বতন্ত্র প্রস্তাব’ তৈরি করতে সময় দেওয়া প্রয়োজন। ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার শান্তি আলোচনা যখন ভেস্তে যাওয়ার অবস্থায় পৌঁছায়, তখন ট্রাম্প এ মন্তব্য করেন।ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ অব্যাহত থাকায় শেষ মুহূর্তে আলোচনায় অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানায় তেহরান। এর ফলে শুরু হয় তীব্র কূটনৈতিক টানাপড়েন। অনলাইন এনডিটিভির খবর অনুযায়ী, এটাই প্রথমবার, যখন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেয়নি। ট্রাম্পের ভাষ্য, পাকিস্তানের নেতৃত্বের সঙ্গেই পরামর্শ করে তিনি এই কৌশল পরিবর্তন করেছেন। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, ইরান সরকারের ভেতরে গভীর বিভাজন স্পষ্ট, যা মোটেও বিস্ময়কর নয়। পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল অসিম মুনির ও প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের অনুরোধের ভিত্তিতেই ইরানের ওপর হামলা স্থগিত রাখতে রাজি হয়েছেন তিনি। তবে শর্ত পরিষ্কার করে দিয়ে ট্রাম্প বলেন, হরমুজ প্রণালির ইরানি উপকূলীয় বন্দরগুলোর অবরোধ আগের মতোই বহাল থাকবে এবং মার্কিন সামরিক বাহিনী সব সময় প্রস্তুত অবস্থায় রাখা হবে। তিনি আরও জানান, ইরানের পক্ষ থেকে প্রস্তাব জমা না দেওয়া এবং আলোচনা চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকবে, সেটা যে ফলাফলই হোক না কেন।পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানিয়ে এক্সে এক পোস্টে লেখেন, ফিল্ড মার্শাল সৈয়দ অসিম মুনির ও তার পক্ষ থেকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছেন। তিনি বলেন, ট্রাম্প তাদের অনুরোধ রেখেছেন এবং যুদ্ধবিরতি বাড়িয়ে দিয়েছেন, যাতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকতে পারে। পাকিস্তান এই আস্থার মর্যাদা রাখতে সর্বাত্মক চেষ্টা করবে। শেহবাজ শরিফ আশা প্রকাশ করেন, দুই পক্ষই যুদ্ধবিরতি মেনে চলবে এবং ইসলামাবাদে দ্বিতীয় দফার আলোচনা পূর্ণাঙ্গ শান্তি চুক্তিতে পৌঁছাতে সক্ষম হবে। প্রকৃতপক্ষে, যদি পাকিস্তান সত্যিই ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে হামলা স্থগিত রাখতে রাজি করাতে সক্ষম হয়, তাহলে তা ইসলামাবাদের কূটনৈতিক মর্যাদা বহুগুণে বাড়িয়ে দেবে। এর আগেও ইরানের শীর্ষ নেতারা বিভিন্ন সময় পাকিস্তানের কূটনৈতিক ভূমিকার প্রশংসা করেছেন।যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সেতুবন্ধন রচনায় পাকিস্তানের এত আগ্রহের পেছনে রয়েছে নিজেদের কূটনৈতিক ভাবমূর্তি পুনর্গঠন ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের গভীর কৌশল। মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা অর্থনৈতিক দুর্বলতায় ভোগা পাকিস্তানের জন্য সরাসরি হুমকি। কারণ, আঞ্চলিক অশান্তি সৌদি আরবের সঙ্গে নিরাপত্তা চুক্তি ও উপসাগরীয় জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরশীল পাকিস্তানকে বড় সংঘাতে টেনে নিয়ে যেতে পারে। পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিকসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেলের দাম বৃদ্ধি পেলে পাকিস্তানের আমদানি ব্যয় বাড়ে, মূল্যস্ফীতি চরম আকার ধারণ করে এবং বিনিময় হার অস্থির হয়ে পড়ে, যার ফলে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে যায়। একই প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে দেশের শিল্পখাতের উৎপাদন খরচ আকাশচুম্বী হবে, ব্যবসায়িক বিনিয়োগ কমবে এবং বাণিজ্য ঘাটতি বাড়বে। ধর্মীয় উগ্রবাদ ও অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত পাকিস্তান তাই এই কূটনৈতিক সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নিজেকে ‘দায়িত্বশীল মধ্যস্থতাকারী’ হিসেবে বিশ্বদরবারে তুলে ধরতে চায়। গত সপ্তাহে ফিল্ড মার্শাল অসিম মুনির তেহরান সফরে ইসরাইল ও লেবাননের মধ্যে যুদ্ধবিরতি এবং হরমুজ প্রণালি চালুর বিষয়ে কিছু অগ্রগতি এনেছিলেন, যদিও তা স্থায়ী হয়নি।পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল অর্থনীতি ও সন্ত্রাসবাদে পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগে আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচিত। কিন্তু মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে ইসলামাবাদ মনে করে, তাদের প্রকৃত শক্তি ও প্রভাবের মধ্যে বড় ফারাক রয়েছে। বিশ্ব যখন বহুমুখী শক্তির দিকে ধাবিত, তখন পাকিস্তানের সামরিক নেতারা দেশটির কৌশলগত অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে বৈশ্বিক প্রভাব বাড়াতে চাইছেন। সম্প্রতি বিদ্যুৎ সংকট, অর্থনৈতিক চাপ এবং সৌদি আরব থেকে ৩০০ কোটি ডলারের জরুরি ঋণ পাওয়ার মতো সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশটি। তাই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেদের গুরুত্ব বাড়িয়ে বিদেশি বিনিয়োগ টানার আশা করছে ইসলামাবাদ। অসিম মুনিরের নেতৃত্বে ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বেশ কিছু অর্থনৈতিক চুক্তি করেছে পাকিস্তান। আলোচনার মাধ্যমে যদি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংকটের সমাধান হয়, তাহলে পাকিস্তানের বিশ্বাসযোগ্যতা আরও বাড়বে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, আলোচনা ব্যর্থ হলে এর দায়ের কিছু অংশ পাকিস্তানকেও বহন করতে হবে। ইতিমধ্যে অভিযোগ উঠেছে, নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী না হয়ে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ এগিয়ে নিচ্ছে, যা দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।ট্রাম্প যখন ইরানের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য একজন মধ্যস্থতাকারী খুঁজছিলেন, তখনই এই সুযোগ তৈরি হয়। ২০২৫ সালের জুনে হোয়াইট হাউসে আকস্মিক সফরের পর অসিম মুনির এই ভূমিকা পান বলে জানা যায়। এদিকে, গত বছরের ১২ দিনের ইসরাইল যুদ্ধে পাকিস্তানের সমর্থন ইরানের সঙ্গে ইসলামাবাদের সম্পর্ক আরও মজবুত করে। সাবেক কূটনীতিক আলী সারওয়ার নাকভি মনে করেন, ইরান কখনো জেনেভা বা ভিয়েনার মতো ইউরোপীয় শহরে আলোচনায় আস্থা রাখে না, বরং পাকিস্তানের ওপর তাদের আস্থা অনেক বেশি। আরেক সাবেক রাষ্ট্রদূত জামির আকরম জানান, ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের পর ওয়াশিংটনে তেহরানের স্বার্থ রক্ষায় পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছে।স্বল্পমেয়াদে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বন্ধ হওয়া ভারতের জন্যও ইতিবাচক, যিনি মধ্যস্থতাই করুক না কেন। তবে দীর্ঘ মেয়াদে নয়াদিল্লির জন্য কিছু উদ্বেগ রয়েই গেছে। কারণ, কূটনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন পাকিস্তান ভারতের স্বার্থের পরিপন্থী নয়। পাকিস্তানের এই কূটনৈতিক সাফল্য দেশটির সেনাবাহিনীর প্রভাব আরও শক্তিশালী করতে পারে, যা ভারতের জন্য মাথাব্যথার কারণ হতে পারে। ঐতিহাসিকভাবে পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্ব নয়াদিল্লির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এ ছাড়া শান্তির দালাল হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেলে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী আরও শক্তিশালী হতে পারে, বিশেষ করে অস্ত্র বিক্রির সুযোগ তৈরি হলে।
কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্ব সংরক্ষিত গণবার্তা