প্রিন্ট এর তারিখ : ২৩ এপ্রিল ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২২ এপ্রিল ২০২৬
যুদ্ধবিরতি থাকলেও হরমুজে জাহাজে হামলা, তেলের দাম লাফিয়ে বেড়েছে ৭ শতাংশা
বিশ্ব ডেস্ক ||
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চললেও মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ওমান উপসাগর ও হরমুজ প্রণালীর মধ্যবর্তী এলাকায় বুধবার সকালে লাইবেরিয়া ও পানামার পতাকাবাহী অন্তত তিনটি কন্টেইনার জাহাজ লক্ষ্য করে গুলি ও রকেটচালিত গ্রেনেড ছুড়েছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। হামলার পরপরই দুটি জাহাজ নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার দাবি করেছে আইআরজিসি। এই হামলার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে ৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।ইরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, জব্দকৃত একটি জাহাজের সঙ্গে ইসরায়েলের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে এবং অন্যটি নিয়ম বহির্ভূতভাবে তাদের নেভিগেশন সিস্টেম ব্যবহার করছিল। আইআরজিসি এর আগে হুঁশিয়ারি দিয়েছিল যে, যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত তারা এই নৌপথ বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও জানিয়েছে, ওমানের উত্তর-পূর্বে একটি লাইবেরিয়ান জাহাজকে লক্ষ্য করে কোনো পূর্ব সতর্কবার্তা ছাড়াই গানবোট থেকে গুলিবর্ষণ করা হয়, যাতে জাহাজটির ব্রিজ অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর কিছুক্ষণ পরই আরেকটি পানামার পতাকাবাহী জাহাজে হামলার খবর পাওয়া যায়।এই ঘটনার পর মধ্যপ্রাচ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ রুট দিয়ে চলাচলকারী সকল জাহাজকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে ইউকেএমটিও। এই হামলার ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন করে অস্থিরতা তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।এদিকে আবার যুদ্ধ শুরু হলে শত্রুর বাকি সম্পদ চূর্ণবিচূর্ণ করে দেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী। দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ও বার্তা সংস্থাগুলোর খবরে এই তথ্য জানানো হয়েছে। ইরানের খাতাম আল-আম্বিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্সের মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাঘারি এক বিবৃতিতে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ধারাবাহিক হুমকি দেওয়া হচ্ছে, তবে ইরানের সামরিক বাহিনী পুরোপুরি প্রস্তুত। তিনি জানান, ইরানের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের আগ্রাসন হলে পূর্বনির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে তাৎক্ষণিক ও শক্তিশালী হামলা চালানো হবে। এই সতর্কবার্তায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিরতি থাকলেও প্রতিরক্ষা প্রস্তুতিতে কোনো শিথিলতা নেই।এই বক্তব্য এসেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ঘোষণার পর। ট্রাম্প জানিয়েছেন, পাকিস্তানের অনুরোধে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। তবে একই সঙ্গে ইরানের বন্দরগুলো ঘিরে মার্কিন নৌ অবরোধ বহাল রাখার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্র বলছে, তেহরান একটি একীভূত প্রস্তাব না দেওয়া পর্যন্ত এই অবস্থা চলবে।ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী তাদের অবস্থান আরও কঠোর করেছে বলে দেশটির মেহর নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে। সংঘাত আবার শুরু হলে শত্রুর অবশিষ্ট সব সম্পদে ধ্বংসাত্মক আঘাত হানা হবে বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। আইআরজিসি আরও বলেছে, যুদ্ধবিরতির সময়েও শত্রুপক্ষের তৎপরতা নজরদারিতে রাখা হচ্ছে এবং যেকোনো অস্বাভাবিক পদক্ষেপের দ্রুত জবাব দেওয়া হবে।বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতি বাড়ানো হলেও দুই দেশের মধ্যে আস্থার ঘাটতি এখনো রয়ে গেছে। একদিকে আলোচনা চলার ইঙ্গিত, অন্যদিকে সামরিক হুঁশিয়ারি ও হরমুজে হামলা—এই দ্বৈত পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ার সাথে সাথে ইরাককে আবারও এমন একটি সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করা হচ্ছে, যা দেশটির সার্বভৌমত্বের চেয়ে বাহ্যিক শক্তির দ্বারা বেশি প্রভাবিত। ওয়াশিংটন ক্রমবর্ধমানভাবে তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন বা হ্রাস করার জন্য বাগদাদের ওপর চাপ তৈরি করছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরাকের নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতা ও অর্থায়ন স্থগিত করেছে, যার মধ্যে ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে যৌথ সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি রয়েছে।স্টেট ডিপার্টমেন্টের ডেপুটি মুখপাত্র টমি পিগট বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তার স্বার্থের ওপর কোনো হামলা সহ্য করবে না এবং ইরাকি সরকারের কাছে আশা করে যে তারা ইরানে ইরান-সমর্থিত বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে নির্মূল করার জন্য অবিলম্বে সমস্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে শুরু হওয়া ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে হামলার পর এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়।ইরাকের ওপর সামরিক চাপের পাশাপাশি কূটনৈতিক চাপও বেড়েছে। ৯ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টোফার ল্যান্ডাউ ইরাকের রাষ্ট্রদূত নাজার আল খিরুল্লাহকে তলব করে বাগদাদে মার্কিন কূটনীতিকদের কাছে সংঘটিত হামলার নিন্দা জানান। এদিকে নতুন ইরাকি সরকার গঠিত না হওয়া পর্যন্ত মার্কিন সমর্থন স্থগিত রয়েছে। ইরাকের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ শিয়া আল-সুদানির উপদেষ্টা হুসেইন আল্লাওয়ি বলেন, নতুন সরকার কয়েক দিনের মধ্যে বা কয়েক সপ্তাহের মধ্যে গঠিত হতে পারে, তবে সময়সীমা এখনো অনিশ্চিত।মার্কিন চাপ বাড়ার সাথে সাথে ইরানও তার অবস্থান আরও শক্তিশালী করেছে। ইরাক সফর শেষে ইরানের কুদস বাহিনীর জেনারেল ইসমাইল ঘানি বলেন, প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন সম্পূর্ণভাবে ইরাকের নিজস্ব সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে হওয়া উচিত। বহিরাগতদের, বিশেষ করে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের, ইরাকের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়। সামগ্রিক চিত্রটি স্পষ্ট, অতীতের যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপে দুর্বল হয়ে পড়া একটি রাষ্ট্র এখন আবারও নিরাপত্তা নির্ভরতা ও রাজনৈতিক চাপের মাধ্যমে নতুন করে জবরদস্তির সম্মুখীন হচ্ছে, যা ইরাকের ক্ষতিগ্রস্ত সার্বভৌমত্বের ওপর আমেরিকান আধিপত্যের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবকে তুলে ধরে।
কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্ব সংরক্ষিত গণবার্তা