প্রিন্ট এর তারিখ : ২৩ এপ্রিল ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৩ এপ্রিল ২০২৬
জ্বালানি সংকটে যৌথ কমিটি গঠনের প্রস্তাব বিরোধী দলের, প্রধানমন্ত্রীর ইতিবাচক সাড়াা
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
দেশের চলমান জ্বালানি সমস্যাসহ বিভিন্ন জাতীয় সংকট নিরসনে সরকারি ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে একটি যৌথ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। এই প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান জানিয়েছেন, দেশের স্বার্থে বিরোধী দলের যেকোনো বাস্তবসম্মত প্রস্তাব গ্রহণ করতে সরকার প্রস্তুত রয়েছে। বুধবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি এই ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করেন।প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অধিবেশনে বলেন, রাজনৈতিক আদর্শে মতপার্থক্য থাকলেও দেশ ও মানুষের স্বার্থ রক্ষায় সব দলই এখন একমত। তিনি সংসদকে আশ্বস্ত করেন যে, জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করতে বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনায় বসতে বা তাদের পরামর্শ গ্রহণ করতে সরকার সবসময় উন্মুক্ত। প্রধানমন্ত্রী আরও যোগ করেন, তারা অবশ্যই বিরোধী দলকে আমন্ত্রণ জানাবেন, তাদের প্রস্তাবগুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে এবং বাস্তবায়নের সুযোগ থাকলে সরকার তা অবশ্যই করবে।সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটের চিত্র তুলে ধরে জানান, তেলের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে হিটস্ট্রোকে ইতিমধ্যে তিনজন কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাম্পে অপেক্ষা করায় সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের আয় কমে যাচ্ছে। এই মানবিক ও জাতীয় সংকট মোকাবিলায় একটি স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রণয়নের লক্ষ্যে বিশেষজ্ঞ সমন্বয়ে যৌথ কমিটি গঠনের ওপর জোর দেন তিনি। বিরোধী দল তাদের পক্ষ থেকে কিছু সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনাও সরকারের হাতে তুলে দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে।এর আগে অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বক্তব্য দেওয়ার সময় জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি সংসদকে সব আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব তুলে ধরেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতে সংসদের ভেতরেই সমাধান খোঁজা উচিত এবং বর্তমান সরকার গণতন্ত্রের সেই ধারা অব্যাহত রাখতে চায়। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের ঐক্যকে ধারণ করে জাতীয় ইস্যুতে সবাইকে এক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। বিগত স্বৈরাচারী শাসনামলে যেভাবে সবাই ঐক্যবদ্ধ ছিল, সেই একই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে জাতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে হবে বলে মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।সংসদকে সব আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার গণতন্ত্রের ধারাকে অব্যাহত রাখতে বদ্ধপরিকর। আগে সংসদের বাইরে থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রিত হওয়ার যে সংস্কৃতি ছিল, তা থেকে বেরিয়ে এসে সংসদকেই কার্যকর কেন্দ্রবিন্দুতে রূপান্তর করতে চায় সরকার। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, আলোচনার মূল জায়গা হবে সংসদ এবং এর বাইরে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া সরকারের কাম্য নয়।দেশের চলমান জ্বালানি পরিস্থিতি ও কৃষি খাতের উন্নয়ন প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জ্বালানি সংকট নিয়ে নানা আলোচনা থাকলেও বোরো চাষে তার কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। তিনি উল্লেখ করেন যে, গত ১৪ এপ্রিলের পর প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশনায় জ্বালানি তেলের দাম একটি সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে দেশের অর্থনীতির সক্ষমতা অনুযায়ী এই মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে সাধারণ মানুষের কষ্ট লাঘব হয়।দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময়কার পরিস্থিতির তুলনায় বর্তমান অবস্থা অনেক বেশি স্থিতিশীল। পুলিশ বাহিনীকে জনবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান প্রশাসন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নৈতিকভাবে উদ্বুদ্ধ করার মাধ্যমে কাজ করছে। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিটি পর্যায়ে সচেষ্ট রয়েছে বলেও তিনি সংসদকে আশ্বস্ত করেন।অধিবেশনের প্রশ্নোত্তর পর্বে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ শাসনামলে সংঘটিত ব্যাপক অর্থ পাচার ও দুর্নীতির স্বরূপ উন্মোচনে একটি পূর্ণাঙ্গ শ্বেতপত্র প্রকাশ করার ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে তৎকালীন সরকারের আমলে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধার ও জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণকে সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে বলে জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রী সংসদে জানান, অর্থ পাচারের গন্তব্য হিসেবে প্রাথমিকভাবে ১০টি দেশকে চিহ্নিত করা হয়েছে, যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও হংকং-চায়না রয়েছে। এর মধ্যে মালয়েশিয়া, হংকং ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ে সম্মতি পাওয়া গেছে এবং বাকি দেশগুলোর সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া চলমান।প্রধানমন্ত্রী সংসদে ১১টি অগ্রাধিকারভুক্ত মামলার তালিকা তুলে ধরেন, যেগুলো বর্তমানে সরকারের আইনি প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। এই তালিকায় রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবার, সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ, বসুন্ধরা গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, ওরিয়ন গ্রুপ, নাবিল গ্রুপ, এইচ বি এম ইকবাল ও তার পরিবার এবং সামিট গ্রুপসহ তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পাচার হয়েছে, যা বছরে গড়ে প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার বা ১ দশমিক ৮ লাখ কোটি টাকার সমান।এদিন নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল আজিজের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী ফ্রিল্যান্সিং খাত নিয়ে সরকারের নতুন পরিকল্পনার কথা জানান। তিনি বলেন, আগামী পাঁচ বছরে এক হাজার জনকে বিশেষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ ফ্রিল্যান্সার হিসেবে গড়ে তোলা হবে এবং এই সময়ে প্রায় ২০ লাখ মানুষকে ফ্রিল্যান্সার কার্ড প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে সাত হাজার ৫০০ জনকে এই কার্ড দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি সংসদকে অবহিত করেন। ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম রাজধানীর পানি সরবরাহ নিয়ে গুরুতর অভিযোগ তুলে বলেন, ঢাকা ওয়াসার পানিতে দুর্গন্ধ ও পোকা থাকায় তা পানযোগ্য নয়। তিনি জলাবদ্ধতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও গ্যাস সংকট নিয়েও সংসদে আলোচনা করেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে এসব বিষয় আলোচিত হয়।
কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্ব সংরক্ষিত গণবার্তা