প্রিন্ট এর তারিখ : ২৮ এপ্রিল ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৭ এপ্রিল ২০২৬
লিমন-বৃষ্টি নিখোঁজের বিকেল থেকে রাত, সন্দেহভাজন খুনির গোপন কার্যক্রমা
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় নিখোঁজ দুই শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির সন্ধানে নেমে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য পেয়েছে স্থানীয় পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগ। দক্ষিণ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই দুই শিক্ষার্থীর নিখোঁজ হওয়ার নেপথ্যে তাদেরই এক রুমমেট হিশাম সালেহ আবুঘরবেহর সংশ্লিষ্টতার জোরালো প্রমাণ মিলেছে। সিসিটিভি ফুটেজ, ডিজিটাল ট্র্যাকিং এবং বাসায় পরিচালিত ফরেনসিক পরীক্ষায় উঠে এসেছে এক বীভৎস হত্যাকাণ্ডের ইঙ্গিত। বিশেষ করে নিখোঁজের আগে ও পরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চ্যাটজিপিটির কাছে অভিযুক্তের করা বিভিন্ন অদ্ভুত প্রশ্ন এবং ফ্ল্যাটে পাওয়া রক্তের দাগ এই রহস্যের জট খুলতে শুরু করেছে।গত ১৭ এপ্রিল বিকেলে ইউএসএফ শিক্ষার্থী ওমর হোসাইন বিশ্ববিদ্যালয়ের পুলিশ বিভাগে গিয়ে তার দুই বন্ধু লিমন ও বৃষ্টির নিখোঁজ হওয়ার সংবাদ জানান। তিনি জানান, ১৬ এপ্রিল সকাল ১০টার পর থেকে বৃষ্টির কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। বৃষ্টির ফোন বন্ধ পেয়ে ওমর তাদের আরেক বন্ধু লিমনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন, কিন্তু লিমনের ফোনটিও বন্ধ ছিল। এরপর তিনি লিমনের ফ্ল্যাটে গিয়ে জানতে পারেন, লিমনের রুমমেট ঋষিত রাজ মাথুরও তাকে অনেকক্ষণ ধরে দেখেননি। লিমনের শোবার ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ থাকলেও কোনো সাড়া মেলেনি। আরেক বন্ধু নিশাত তাসনিম জানান, ১৬ এপ্রিল বিকেলে বৃষ্টির সঙ্গে তার দেখা করার কথা থাকলেও তিনি আসেননি।তদন্তে নেমে পুলিশ ইউএসএফ ক্যাম্পাসের ন্যাচারাল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স ভবনে বৃষ্টির কার্যালয় থেকে তার আইপ্যাড ও টিফিন বক্স উদ্ধার করে। ক্যাম্পাসের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ১৬ এপ্রিল দুপুরে বৃষ্টি ভবন থেকে বেরিয়ে উত্তর দিকে হেঁটে যাচ্ছেন এবং রোদের কারণে তার মাথায় একটি ছাতা ছিল। অন্যদিকে, লিমনের ফোনের সিগন্যাল ট্র্যাক করে দেখা যায়, সেদিন বিকেলে ফোনটি ক্যাম্পাসেই ছিল, তবে দিনের শেষ ভাগে সেটি কোর্টনি ক্যাম্পবেল কজওয়ের কাছাকাছি এবং পরবর্তীতে ক্লিয়ারওয়াটার বিচের উত্তরে স্যান্ড কি পার্ক এলাকায় অবস্থান করছিল।তদন্তের ভার হিলসবরো কাউন্টি শেরিফের গোয়েন্দা দলের হাতে যাওয়ার পর তারা লিমনের আরেক রুমমেট হিশাম আবুঘরবেহকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। গোয়েন্দারা লক্ষ্য করেন, আবুঘরবেহর বাঁ হাতের কনিষ্ঠ আঙুলে ব্যান্ডেজ ও কাটার দাগ রয়েছে। তিনি দাবি করেন পেঁয়াজ কাটতে গিয়ে এমনটি হয়েছে। আদালতের নথিতে বলা হয়েছে, গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন যে ১৬ এপ্রিল গভীর রাতে আবুঘরবেহর হুন্দাই জেনেসিস জি৮০ গাড়িটি কোর্টনি ক্যাম্পবেল কজওয়েতে একটি লাইসেন্স প্লেট রিডারে ধরা পড়েছে, ঠিক যখন লিমনের ফোনটিও ওই ব্রিজে থাকার সংকেত দিয়েছিল। নথিতে আরও বলা হয়েছে, গোয়েন্দারা আরও কিছু রেকর্ড ও ভিডিও ফুটেজ পেয়েছেন, যেখানে দেখা যায় হুন্দাই গাড়িটি ইউএসএফ এলাকা থেকে রওনা দিয়ে কজওয়ে, ক্লিয়ারওয়াটার এবং স্যান্ড কি এলাকা ঘুরে গভীর রাতে টাম্পায় ফিরে এসেছে।প্রথমে আবুঘরবেহ নিখোঁজ শিক্ষার্থীরা তার গাড়িতে ছিলেন না বলে দাবি করেন। তবে গোয়েন্দারা যখন তাকে লিমনের ফোনের রেকর্ডের কথা জানান, তখন তিনি বয়ান পাল্টে ফেলেন এবং বলেন যে লিমন তাকে সেখানে নিয়ে যেতে বলেছিলেন এবং তিনি তাদের নামিয়ে দিয়ে চলে আসেন। আদালতের নথি অনুযায়ী, গোয়েন্দারা যখন হুন্দাই গাড়িটি পরীক্ষা করেন, তখন গাড়িটি সদ্য পরিষ্কার করা হয়েছে বলে তাদের মনে হয়। আবুঘরবেহ ও লিমনের ফ্ল্যাটের ডাস্টবিন থেকে আবর্জনা সংগ্রহ করেন তদন্তকারীরা। সেখানে তারা ট্র্যাশ ব্যাগ, লাইজল ওয়াইপস, ফিব্রিজ, ফানিয়ানস এবং আইরিশ স্প্রিং বডি ওয়াশ কেনার একটি সিভিএস রসিদ পান। রসিদে সময় লেখা ছিল ১৬ এপ্রিল রাত ১০টা ৪৭ মিনিট, অর্থাৎ আবুঘরবেহ ক্লিয়ারওয়াটার থেকে ফেরার ঠিক পরপরই এসব জিনিস কেনা হয়। সিভিএসের ভিডিওতে দেখা যায় একজন ডেলিভারি ড্রাইভার এসব জিনিস কিনেছিলেন। ওই বাসায় থাকা আরেক রুমমেট মাথুর গোয়েন্দাদের জানান, আবুঘরবেহই এসব জিনিস ডেলিভারির মাধ্যমে অর্ডার করেছিলেন।তদন্তকারীরা আবর্জনার ভেতরে এক টুকরা রুপালি রঙের ডাক্ট টেপও পান, যাতে একটি লাল দাগ ছিল যা পরীক্ষায় রক্ত বলে প্রমাণিত হয়। লিমনের শোবার ঘরে গোয়েন্দারা বৃষ্টির কয়েন পার্স, ইউএসএফ পরিচয়পত্র, জুতা এবং একটি ছাতা পান, যা ক্যাম্পাসের সিসিটিভি ভিডিওতে বৃষ্টির হাতে দেখা গিয়েছিল। মাথুর জানান, ফ্ল্যাট থেকে বেশ কিছু জিনিস গায়েব হয়ে গেছে, যার মধ্যে ছিল রান্নাঘরের মেঝেতে বিছানো ম্যাট, একটি সাদা তোয়ালে এবং লিমনের একটি হাঁড়ি ও কড়াই। ট্র্যাশ কম্প্যাক্টরের ভেতরে গোয়েন্দারা হাঁড়ি-পাতিল, লিমনের মানিব্যাগ ও চশমা এবং বৃষ্টির গোলাপি রঙের আইফোন কেস পান। এ ছাড়া তারা রক্তমাখা একটি ধূসর শার্ট, ধূসর হাফপ্যান্ট ও তিন জোড়া মোজা পান।ফরেনসিক পরীক্ষায় ফ্ল্যাটের রান্নাঘর থেকে আবুঘরবেহর শোবার ঘর পর্যন্ত ছোট ছোট রক্তের ফোঁটার দাগ পাওয়া যায়। টেকনিশিয়ানরা রান্নাঘর, বসার ঘর ও বারান্দায় বড় পরিসরে রক্তের দাগ দেখতে পান। রাসায়নিক পরীক্ষায় আবুঘরবেহর শোবার ঘরের মেঝেতে দুটি আলাদা ছাপ ধরা পড়ে, যা তদন্তকারীদের মতে ‘মোটামুটি মানুষের আকারের’। পরীক্ষায় কার্পেটেও রক্তের উপস্থিতি পাওয়া যায়। বিছানার নিচে ট্র্যাশ ব্যাগ ও ডাক্ট টেপ লুকানো ছিল। আবুঘরবেহর ফোনের রেকর্ডে দেখা যায়, ১৭ এপ্রিল মধ্যরাতের পর তিনি দ্বিতীয়বারের মতো হাওয়ার্ড ফ্রাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ পেরিয়ে উত্তর সেন্ট পিটার্সবার্গ পর্যন্ত যান।সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য বেরিয়ে আসে চ্যাটজিপিটির ব্যবহারের ইতিহাস থেকে। আদালতের নথি অনুযায়ী, লিমন ও বৃষ্টি নিখোঁজ হওয়ার তিন দিন আগে ১৩ এপ্রিল আবুঘরবেহ চ্যাটজিপিটিকে প্রথম প্রশ্ন করেন: কীভাবে একজন মানুষকে ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া যায়। ১৬ এপ্রিল তিনি আরও জানতে চান, ‘যদি কেউ মারা যায়, কীভাবে তার হাতের ছাপ ভেসে যায়?’ এবং ‘দুটি ফোন কীভাবে অদৃশ্য করা যায়?’ পরবর্তী অনুসন্ধানে তিনি জানতে চান ‘নিখোঁজ বিপন্ন প্রাপ্তবয়স্ক বলতে কী বোঝায়?’ এবং ‘একটি মৃতদেহ পচতে কত সময় লাগে?’ বর্তমানে এই লোমহর্ষক ঘটনার তদন্ত এবং অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। নিহত দুই শিক্ষার্থীর পরিবার ও প্রবাসী কমিউনিটি দ্রুত ন্যায়বিচার দাবি জানিয়েছেন।
কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্ব সংরক্ষিত গণবার্তা