প্রিন্ট এর তারিখ : ২০ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২০ মে ২০২৬
ওমানে চার সহোদরের মর্মান্তিক মৃত্যু, দাফনের জন্য মরদেহ দেশে এসেছো
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
ওমানে রহস্যজনকভাবে মারা যাওয়া চার প্রবাসী ভাইয়ের মরদেহ দেশে পৌঁছেছে। মঙ্গলবার (১৯ মে) রাত ৮টা ১৫ মিনিটে বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে তাদের মরদেহ ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আনা হয়। এ ঘটনায় প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, গাড়ি চালু থাকা অবস্থায় এসির এগজস্ট থেকে কার্বন মনোক্সাইড গ্যাস শ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করায় তাদের মৃত্যু হয়েছে।মৃত্যুর ঘটনা ও উদ্ধারওমানের দক্ষিণ আল বাতিনাহ অঞ্চলের মুলাদ্দা এলাকায় একটি গাড়ির ভেতর থেকে চার ভাইয়ের মরদেহ উদ্ধার করে স্থানীয় পুলিশ। গত বুধবার (১৩ মে) সকাল ৮টার দিকে স্থানীয়রা একটি গাড়ির ভেতরে চার জনকে অচেতন অবস্থায় দেখতে পান। পরে তারা পুলিশে খবর দিলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের মৃত অবস্থায় উদ্ধার করে। ঘটনার তিন দিন পর রয়্যাল ওমান পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, গাড়ি চালু থাকা অবস্থায় এসির এগজস্ট থেকে নির্গত কার্বন মনোক্সাইড গ্যাস শ্বাসের সাথে শরীরে প্রবেশ করায় তাদের মৃত্যু হয়েছে।নিহতদের পরিচয়নিহতরা হলেন— চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার লালানগর ইউনিয়নের বান্দারাজার পাড়া এলাকার একই পরিবারের চার সহোদর। তারা হলেন রাসেদুল ইসলাম, শাহেদুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম ও শহিদুল ইসলাম। তাদের সবার বয়স ২৫ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে।শেষবার্তা: ‘মা দোয়া করো’পরিবার সূত্রে জানা গেছে, গত বুধবার সন্ধ্যায় চার ভাই ওমানের বারকা এলাকা থেকে মুলাদ্দাহর উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন। রাত ৮টার পর তাঁদের একজন বাংলাদেশে এক আত্মীয়ের কাছে ভয়েস মেসেজ পাঠিয়ে নিজেদের অসুস্থতার কথা জানান। তারা নিজেদের লোকেশন শেয়ার করে বলেন, গাড়ি থেকে বের হওয়ার মতো শারীরিক শক্তিও তাদের অবশিষ্ট নেই; নাকে-মুখে ফেনা চলে আসছে এবং নিশ্বাস নিতে তীব্র কষ্ট হচ্ছে। এক পর্যায়ে তারা ওমানে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দেশে মায়ের ফোনে কল করে দোয়া চান।মাকে এখনো জানানো হয়নিঘটনার তিন দিন পার হলেও চার ভাইয়ের বৃদ্ধ মা খাদিজা বেগমকে এখনো জানানো হয়নি যে তাঁর চার ছেলেই আর বেঁচে নেই। তিনি এখনো জানেন, তাঁর ছেলেরা ওমানে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছেন। ছেলেদের অসুস্থতার খবর শোনার পর থেকেই তিনি নিজে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। এমন পরিস্থিতিতে ছেলেদের মৃত্যুর খবর কোনোভাবেই সহ্য করতে পারবেন না বিধায় পরিবারের পক্ষ থেকে বিষয়টি সম্পূর্ণ গোপন রাখা হয়েছে। আত্মীয়স্বজন বা প্রতিবেশীরা কেউ যেন অসাবধানতাবশত এই খবর মায়ের কানে তুলতে না পারেন, সেজন্য ঘরের ফটকে তালা দিয়ে রেখেছেন তার দেশে থাকা একমাত্র ছেলে মোহাম্মদ এনাম (৩২)।মরদেহ দেশে আনা ও সহায়তাবিমানবন্দরে স্বজনদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করেন সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী। অনাকাঙ্ক্ষিত এমন ঘটনায় শোক প্রকাশসহ দ্রুত সময়ে মরদেহ দেশে আনার ব্যবস্থা করায় প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও দূতাবাসের প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন তিনি। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে মরদেহ পরিবহন ও দাফনের জন্য প্রত্যেক পরিবারের হাতে ৩৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে।দাফন ও চার কবরবুধবার (২০ মে) সকালে নামাজের জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাদের দাফন করা হবে। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গ্রামের কবরস্থানে চার ভাইয়ের দাফনের জন্য পাশাপাশি চারটি স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে।হুম্মাম কাদেরের উদ্যোগগত শুক্রবার বিকেলে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার লালানগর বন্দরাজপাড়া গ্রামে নিহতদের বাড়িতে যান স্থানীয় সংসদ সদস্য ও বিএনপি নেতা হুম্মাম কাদের চৌধুরী। তিনি রাঙ্গুনিয়া লালানগর বন্দরাজপাড়া মসজিদে নামাজ আদায় শেষে নিহতের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেন এবং মরদেহ দ্রুত দেশে আনার যাবতীয় উদ্যোগের পাশাপাশি অসহায় এই পরিবারটির পাশে থাকার দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দেন।দরিদ্র পরিবারের দুর্দশানিহতদের খালাতো ভাই এমরান হোসেন জানান, অত্যন্ত দরিদ্র এই পরিবারটি প্রবাসী ভাইদের পাঠানো টাকায় কেবলই সচ্ছলতার মুখ দেখতে শুরু করেছিল। চার ভাইয়ের এমন আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবারটি আজ পুরোপুরি নিস্ব।খরচ বহন ও সতর্কতাচট্টগ্রাম সমিতি ওমানের সভাপতি মোহাম্মদ ইয়াসিন চৌধুরী জানান, গাড়ি দুর্ঘটনা না হওয়ায় এই ঘটনার ব্যয়ভার ওমান সরকার বহন করবে না। ফলে লাশ দেশে পাঠানোর যাবতীয় প্রক্রিয়া ও খরচ নিহতদের স্বজন এবং চট্টগ্রাম সমিতি ওমান যৌথভাবে বহন করেছে। এই ঘটনার পর বিষাক্ত গ্যাসের কারণে শ্বাসরোধের ঝুঁকি বিবেচনা করে রয়্যাল ওমান পুলিশ আবদ্ধ অবস্থায় যানবাহনের ভেতরে না ঘুমাতে সবার প্রতি বিশেষ সতর্কতা জারি করেছে।ওমানে এসির গ্যাস লিকেজে চার ভাইয়ের করুণ মৃত্যু সারা দেশকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে। তাদের শেষবার্তা— ‘মা, আমাদের জন্য দোয়া করো’— হৃদয়বিদারক। বাড়ির ফটকে তালা দিয়ে মাকে খবর গোপন রাখা পরিবারের আরেক বেদনাদায়ক দিক। দরিদ্র পরিবারটি প্রবাসী সন্তানদের পাঠানো টাকায় স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল; আজ তারা চারটি খালি চেয়ার আর পাশাপাশি চারটি কবর নিয়ে অসহায়। কার্বন মনোক্সাইড সচেতনতা ও নিরাপদ গাড়ি ব্যবহারের বার্তা এবার জরুরি হয়ে উঠল। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে এগিয়ে আসা না হলে এই পরিবারের পতন থামানো কঠিন।
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্ব সংরক্ষিত গণবার্তা