প্রিন্ট এর তারিখ : ২১ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২০ মে ২০২৬
খণ্ডিত শিক্ষাব্যবস্থায় উন্নত দেশ হবে না বাংলাদেশ’: জামায়াতের সংলাপে ৫-১০ বছরের রোডম্যাপের প্রস্তাবা
নিউজ ডেস্ক ||
‘খণ্ডিত শিক্ষাব্যবস্থা, দুর্বল শিখনফল, কম বেতনের শিক্ষক ও নাজুক অবকাঠামো নিয়ে বাংলাদেশ উচ্চমধ্যম আয় বা উন্নত দেশের আকাঙ্ক্ষা অর্জন করতে পারবে না’— জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত এক প্রাক্-বাজেট সংলাপে এমন অভিমত দিয়েছেন শিক্ষাবিদ ও রাজনীতিবিদেরা। এ জন্য শিক্ষাকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিয়ে ধাপে ধাপে পুরো ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে ৫ থেকে ১০ বছরের পর্যায়ক্রমিক রোডম্যাপ বা পথনকশা প্রণয়নের প্রস্তাব দেন তাঁরা।মূল প্রবন্ধের প্রস্তাবনামঙ্গলবার (১৯ মে) বিকেলে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের আবদুস সালাম মিলনায়তনে ‘শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ও জাতীয় উন্নয়ন’ শীর্ষক সংলাপের আয়োজন করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এ কে এম ওয়ারেসুল করিম। তিনি বলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন বড় কলেজগুলোর মানোন্নয়নে এক লাখ কোটি টাকা বিনিয়োগ প্রয়োজন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্মার্ট ক্লাসরুম, আধুনিক পাঠাগার ও ল্যাব সুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষকদের বেতনও বাড়াতে হবে। তবে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ বাড়ানো উচিত প্রাথমিক শিক্ষায়।শিক্ষাব্যবস্থার জটিলতামূল প্রবন্ধে বলা হয়, বর্তমানে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রাথমিক, নিম্নমাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ, মাদ্রাসা, কারিগরি প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্তর ও ধারা রয়েছে। এসব ব্যবস্থার মধ্যে অনেক ক্ষেত্রেই পারস্পরিক অমিল ও জটিলতা থাকায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা বিভ্রান্ত হন। একই সঙ্গে পুরো ব্যবস্থার জবাবদিহিও দুর্বল হয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতিতে শিক্ষাব্যবস্থাকে ধাপে ধাপে পুনর্গঠনের বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।৮ দফা সংস্কার নীতিসংস্কার কার্যক্রমে আটটি নীতির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয় প্রবন্ধে। সেগুলো হলো—১. পুনর্গঠনের কারণে কোনো শিশুর বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ বন্ধ না হওয়া২. মাদ্রাসা শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং তা কোনোভাবেই বিলুপ্ত না করা৩. সরকারি, বেসরকারি, ধর্মীয় ও কারিগরি সব প্রতিষ্ঠানকে ন্যূনতম জাতীয় মানের আওতায় আনা৪. শিক্ষাক্রম বা পাঠ্যক্রম সংস্কার করা৫. নতুন শিক্ষাক্রম চাপিয়ে দেওয়ার আগে শিক্ষকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া৬. প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠনের পাশাপাশি অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ নিশ্চিত করা৭. শিক্ষার্থীদের বদলি এবং এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার সুযোগ সুরক্ষিত রাখা৮. বিদ্যালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে স্থানীয় কমিউনিটির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাবিনিয়োগ হিসেবে শিক্ষাপ্রবন্ধে আরও বলা হয়, পাঠাগার, ল্যাবরেটরি, স্মার্ট ক্লাসরুম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও রোবোটিকসের সুবিধা, আবাসিক অবকাঠামো, কাউন্সেলিং সেবা এবং উন্নত শিক্ষক প্রশিক্ষণের কারণে শিক্ষাব্যয় বাড়বে। তাই শিক্ষাকে খরচের বোঝা নয়, দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে। এ ছাড়া শিক্ষক-কর্মকর্তা নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি ও বৃত্তি বরাদ্দের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনার পরিবর্তে মেধা, যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলা হয়।মিড ডে মিলে লুটপাটের অভিযোগজামায়াতের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মারদিয়া মমতাজ বলেন, ‘বাচ্চাদের পড়ালেখার উন্নতির কথা চিন্তা না করে পরেরবার ভোট নিশ্চিত করার জন্য আগামী বাজেটে কিছু অবকাঠামো এবং চকচকে জিনিস তৈরিতে বরাদ্দ দেওয়া হতে পারে। একটি বেসরকারি টেলিভিশনের প্রতিবেদনের তথ্য উল্লেখ করে তিনি জানান, মিড ডে মিলের পাইলট প্রকল্পে সপ্তাহে ১৭ কোটি টাকা লুট হচ্ছে। স্থানীয় বাজার থেকে ডিম-কলা কেনায় যদি এত টাকা লুটপাটের সুযোগ তৈরি হয়, তবে শিক্ষকদের হাতে একটি করে ট্যাব দেওয়ার প্রকল্পের পেছনে কত টাকা লুটপাট লুকিয়ে আছে, সেই প্রশ্ন উঠছে।’‘হারাম টাকা বরকত নয়’সভাপতির বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ও সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান বলেন, বাজেট আসে, বাজেট যায়, চরিত্রগত তেমন কোনো পার্থক্য থাকে না। বাজেটের পরিবর্তন হতে পারে, যদি টাকা উপার্জন হালাল উপায়ে হয়। হারাম টাকা দিয়ে বাজেট করলে কোনো বরকত হয় না।পাচার হওয়া টাকা ফিরিয়ে আনার দাবিইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি সিবগাতুল্লাহ বলেন, ব্রিটিশদের তৈরি ভঙ্গুর শিক্ষাব্যবস্থাকে জোড়াতালি দিয়ে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার যে ২৮ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে, সেগুলো ফিরিয়ে এনে তরুণদের প্রশিক্ষণে ব্যয় করতে হবে।অন্যান্য বক্তব্যমানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুর রব শিক্ষা খাতে অরাজকতার কথা বলেন। এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, সব জেলায় মেডিকেল কলেজ ও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় না বানিয়ে স্কুল-কলেজের সংখ্যা কমাতে হবে। সঞ্চালক সাবেক জ্যেষ্ঠ সচিব খ ম কবিরুল ইসলাম স্বাধীনতার পরেও শিক্ষাকাঠামোতে পরিবর্তন না হওয়ার কথা উল্লেখ করেন। সংলাপে আরও বক্তব্য দেন মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান, অধ্যাপক মুহম্মদ দিদারে আলম মুহসিন, অধ্যাপক তারেক মুহাম্মদ শামসুল আরেফীন ও অধ্যাপক মোশাররফ হোসেন প্রমুখ।জামায়াতে ইসলামীর প্রাক্-বাজেট সংলাপ শিক্ষাখাতের জটিলতা, নাজুক অবকাঠামো ও দুর্বল শিখনফল নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। শিক্ষাকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে বলেও মত দিয়েছেন বক্তারা। মিড ডে মিলসহ প্রকল্পে ব্যাপক লুটপাটের অভিযোগ এনে সরকারের জবাবদিহি কাঠামো প্রশ্নের মুখে পড়েছে। পাচার হওয়া টাকা ফিরিয়ে এনে তরুণ প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা খাতে সংস্কারের দাবি এই সংলাপকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করেছে। বাজেট বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কার এখন সময়ের দাবি।
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্ব সংরক্ষিত গণবার্তা