প্রিন্ট এর তারিখ : ১১ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১১ জুন ২০২৬
পাকিস্তানের সঙ্গে ‘অতি ঘনিষ্ঠতা’ নিয়ে সতর্ক করলেন শেখ হাসিনাা
নিউজ ডেস্ক ||
ভারতের গণমাধ্যম ‘এই সময়’-কে একটি দীর্ঘ একান্ত সাক্ষাৎকার দিয়েছেন বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গণভবন ছেড়ে আসা, ইস্তফা না-দেওয়ার কারণ থেকে বর্তমান সরকারের মূল্যায়ন, নিজের ও দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা—সব বিষয়েই খোলামেলা ও সবিস্তার কথা বলেছেন তিনি।মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েই নয়াদিল্লির সঙ্গে দূরত্ব বাড়িয়ে ঢাকা যে ইসলামাবাদের কাছাকাছি আসছে, তেমন অভিযোগ উঠেছিল। নির্বাচনের পরেও পাকিস্তানের সঙ্গে সখ্য বাড়িয়ে চলেছে সে দেশের বর্তমান বিএনপি সরকার, এমনই দাবি বিভিন্ন মহলের। সরকারের পক্ষ থেকে একে ‘নতুন কূটনীতি’ বা ‘ভারসাম্যের কূটনীতি’ বলে যুক্তিও দেওয়া হয়েছে।স্বাভাবিক সম্পর্ক আর পাকিস্তানি ভাবধারায় ফেরানো এক নয়বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পর্যবেক্ষণ, ‘রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক থাকতেই পারে। কিন্তু স্বাভাবিক সম্পর্ক রাখা আর পাকিস্তানি ভাবধারায় রাষ্ট্রকে ফিরিয়ে নেওয়া, দুটো এক বিষয় নয়।’‘এই সময়’–এর প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘পাকিস্তানের সঙ্গে যে কোনো সম্পর্ক হতে হবে ইতিহাসের সত্যকে স্বীকার করে, ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের মর্যাদা রক্ষা করে, বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও আত্মসম্মান অক্ষুণ্ণ রেখে। কিন্তু আজ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে দুর্বল করা, পাকিস্তানপন্থী শক্তিকে পুনর্বাসিত করা, সামরিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে পাকিস্তানের প্রভাব বাড়ানো এবং তরুণ প্রজন্মকে পাকিস্তানি প্রতিষ্ঠানের দিকে ঠেলে দেওয়ার যে চেষ্টা চলছে—তার মধ্যে একটি গভীর রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে।’‘যারা ১৯৭১ ভুলে যান, তারা বাংলাদেশকে বোঝেন না’শেখ হাসিনাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘প্রথমে ইউনূস ও পরে তারেক রহমানের আমলে কি পাকিস্তানের অতি ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ? মুক্তিযুদ্ধের ফসল বাংলাদেশের এই অবস্থান পরিবর্তনকে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?’আওয়ামী লীগ সভাপতির জবাব, ‘যারা আজ পাকিস্তানের সঙ্গে এই অতি ঘনিষ্ঠতাকে “নতুন কূটনীতি” বলে প্রচার করছেন, তাদের কাছে আমার প্রশ্ন—পাকিস্তান কি ১৯৭১-এর গণহত্যার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চেয়েছে? তারা কি যুদ্ধাপরাধের দায় স্বীকার করেছে? তারা কি বাংলাদেশের মানুষের ক্ষতকে সম্মান দিয়েছে? যদি না করে, তাহলে এত তাড়াহুড়ো করে সামরিক ও কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা কেন?’তিনি বলেন, ‘পাকিস্তানের সঙ্গে এই অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা শুধু কূটনৈতিক বিষয় নয়, এটি বাংলাদেশের আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন। যারা ১৯৭১–কে ভুলে যান, তারা বাংলাদেশকে বুঝতে পারেন না। যারা বাংলাদেশকে পাকিস্তানের ছায়ায় ফেরাতে চান, তারা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিপজ্জনক খেলা খেলছেন।’বিএনপি ও জামায়াত একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠফেব্রুয়ারির ১২ তারিখে নির্বাচনের পরে বহু মানুষ প্রকাশ্যে জানিয়েছিলেন, ‘পাকিস্তান-পন্থী মৌলবাদী শক্তি’ জামায়াতে ইসলামীকে ঠেকাতে তারা বাধ্য হয়ে বিএনপিকে ভোট দিয়েছেন। শেখ হাসিনাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার কি জামায়াত-বিরোধী সেই রায়ের মর্যাদা দিতে পারছে?’আওয়ামী লীগের সভানেত্রী উত্তরে বলেন, ‘যারা ভেবেছিলেন, বিএনপি ক্ষমতায় এলে জামায়াতের চেয়ে অপেক্ষাকৃত ভালো হবে, তারা ইতিহাস ভুলে গিয়েছিলেন। বিএনপি ও জামায়াত একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। বিএনপির হাত ধরেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াতে ইসলামীর পুনর্বাসন হয়েছে।’হাসিনা বলেন, ‘জামায়াত বিএনপির দীর্ঘদিনের জোটসঙ্গী, মুখে ভিন্ন নীতি-আদর্শের কথা বললেও তারা উভয়েই মুক্তিযুদ্ধ-বিরোধী রাজনৈতিক চেতনার অংশীদার। এদের ভিন্ন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।’পাল্টা প্রশ্ন শেখ হাসিনারহাসিনার পাল্টা প্রশ্ন, ‘যদি মানুষ জামায়াতকে ঠেকাতে বিএনপিকে ভোট দিয়ে থাকে, তাহলে বিএনপি কেন মৌলবাদী শক্তিকে প্রশ্রয় দিচ্ছে? কেন মাজারে হামলা হচ্ছে? কেন সুফিদের দরগা নিরাপদ নয়? কেন সংখ্যালঘুরা আতঙ্কে রয়েছেন? কেন হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আহমদিয়া, আদিবাসী—কেউই নিরাপদ বোধ করছেন না? কেন পাঠ্যপুস্তক, সংস্কৃতি, প্রশাসন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান—সব জায়গায় অসাম্প্রদায়িক চেতনার ওপর আঘাত আসছে?’ভারতের সঙ্গেও ‘নতুন ইনিংস’ দীর্ঘস্থায়ী হবে নাহাসিনার উদ্দেশে প্রশ্ন ছিল, ‘বিএনপি সরকারের সঙ্গে নয়াদিল্লি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের একটি “নতুন ইনিংস” শুরু করেছে। এর ফলে কি আপনার অবস্থান দুর্বল হচ্ছে? সম্পর্কের স্বার্থে ভারত যদি আপনাকে বিচারের জন্য ঢাকায় ফেরত পাঠাতে চায়, আপনার পদক্ষেপ কী হবে?’হাসিনা উত্তরে বলেন, ‘একটি সার্বভৌম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ভারত তাদের কূটনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করে। বাংলাদেশে যে সরকার ক্ষমতায় থাকুক, তাদের সঙ্গে ভারতের যে যোগাযোগ থাকবে, এটাই স্বাভাবিক।’হাসিনার কথায়, ‘এর সঙ্গে আমার অবস্থান দুর্বল হওয়ার প্রশ্ন জড়িত নয়। কারণ আমার অবস্থান নির্ভর করে বাংলাদেশের মানুষের ওপর। আমি ভারতের জনগণ ও সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞ, কারণ কঠিন সময়ে তারা আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু আমার অবস্থান অন্য কোনো রাষ্ট্র কিংবা সরকারের সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল নয়। সরকারে থাকতে আমি ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করেছি বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থে। কিন্তু বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব কখনও বিসর্জন দিইনি।’তারেক রহমান সরকারের সঙ্গে ভারতের সুসম্পর্ক স্থাপনের প্রয়াস ফলপ্রসূ হবে বলে মনে করেন না শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘দু’দেশের টেকসই সম্পর্কের প্রকৃত ভিত্তি হলো বাংলাদেশে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা। যারা এগুলো নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছেন, প্রতিনিয়ত হীন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ভারত-বিরোধী অপপ্রচারকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন এবং অতীতে ভারতের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, তাদের সঙ্গে ভারতের কোনো “নতুন ইনিংস”ই দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার কথা নয়।’
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্ব সংরক্ষিত গণবার্তা