প্রিন্ট এর তারিখ : ১২ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১২ জুন ২০২৬
স্পোর্টস ডেস্ক ||
দীর্ঘ চার বছর পর আবারও উদ্বোধন হতে যাচ্ছে বিশ্বকাপের। উদ্বোধনী ম্যাচেই মাঠে নামছে স্বাগতিক মেক্সিকো, যাদের প্রতিপক্ষ দক্ষিণ আফ্রিকা। মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক আজতেকা স্টেডিয়ামে পর্দা উঠছে আজ বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় আসরের। ২৩তম এই বিশ্বকাপের খেলায় আবারো ফুটবল দুনিয়া মেতে উঠবে ৪০ দিনের উন্মাদনায়।নিজেদের প্রথম ম্যাচেই বেশ শক্তিশালী একাদশ নামিয়েছে দুই দলই। মেক্সিকোর কোচ আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন অভিজ্ঞ ওচোয়াকে মাঠের বাইরে রেখেই একাদশ সাজাবেন। ম্যাচের দিনও দেখা গেল সেটিরই বহিঃপ্রকাশ। অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকান কোচ চিরাচরিত ৪ ডিফেন্ডার বাদ দিয়ে ৩ ডিফেন্ডার এবং ২ জন ফুলব্যাক নিয়ে একাদশ সাজিয়েছেন।আজকের সম্ভাব্য একাদশমেক্সিকো (৪-৩-৩): রাঙ্গেল, রেয়েস, মোনতেস, ভাসকেজ, গালার্দো, গুতিরেজ, ফিদালগো, লিরা, আলভারাদো, জিমেনেজ, কুইনোনেস।দক্ষিণ আফ্রিকা (৩-৪-৩): উইলিয়ামস, মুদাউ, সিবিসি, এমবোকাজি, ওকোন, মোদিবা, এডামস, সিথোলে, মোকোয়েনা, ফোস্টার, রায়নেরস।১৬ বছরের অপেক্ষা শেষে দক্ষিণ আফ্রিকা ফিরেছে বিশ্বকাপেদীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা আবারও ফিরেছে ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চ ফিফা বিশ্বকাপে। ২০১০ সালে নিজেদের মাটিতে বিশ্বকাপ আয়োজনের পর টানা তিনটি আসরে জায়গা করে নিতে ব্যর্থ হয়েছিল বাফানা বাফানারা। অবশেষে ২০২৬ বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করে তারা নতুন স্বপ্ন বুনতে শুরু করেছে।দক্ষিণ আফ্রিকার ফুটবলপ্রেমীরা আশাবাদী, কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটির ফুটবল আবারও উন্নতির পথে। ২০২৫ সালে ক্লাব বিশ্বকাপে মামেলোদি সানডাউন্সের দারুণ পারফরম্যান্স যেমন বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়িয়েছে, তেমনি জাতীয় দলও এখন নিজেদের নতুন পরিচয় গড়ে তুলতে চায় বিশ্বমঞ্চে।হুগো ব্রুসের হাত ধরে নতুন যুগ২০২১ সালের মে মাসে বেলজিয়ান কোচ হুগো ব্রুস দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই দক্ষিণ আফ্রিকার ফুটবলে শুরু হয় পরিবর্তনের ধারা। আফ্রিকান ফুটবলে অভিজ্ঞ এই কোচ দায়িত্ব পেয়েছিলেন এমন সময়ে, যখন দলটি আফ্রিকা কাপ অব নেশনসেও জায়গা করে নিতে ব্যর্থ হয়েছিল।ব্রুস তরুণদের ওপর আস্থা রাখেন। থালেন্তে এমবাথা, ওসউইন আপোলিস এবং এভিডেন্স মাকগোপার মতো নতুন মুখদের সুযোগ দেন, যারা পরবর্তীতে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর অধীনে দক্ষিণ আফ্রিকা ২০২৩ আফ্রিকা কাপ অব নেশনসে তৃতীয় স্থান অর্জন করে এবং এখন ২০২৬ বিশ্বকাপকে সামনে রেখে আরও বড় সাফল্যের স্বপ্ন দেখছে।বিশ্বকাপে ওঠার নাটকীয় গল্পআফ্রিকান বাছাইপর্বের গ্রুপ ‘সি’-তে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল আফ্রিকার অন্যতম শক্তিশালী দল নাইজেরিয়া এবং উদীয়মান শক্তি বেনিন। দক্ষিণ আফ্রিকা শেষ পর্যন্ত ১০ ম্যাচে ৫ জয়, ৩ ড্র ও ২ হারে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়।শেষ ম্যাচের আগে তারা ছিল দ্বিতীয় স্থানে। নিজেদের মাঠে রুয়ান্ডাকে ৩-০ গোলে হারিয়ে কাজের বড় অংশটা সেরে ফেলেছিল। এরপর তাদের তাকিয়ে থাকতে হয় নাইজেরিয়া ও বেনিন ম্যাচের দিকে। নাইজেরিয়ার ৪-০ গোলের বড় জয় গ্রুপের সমীকরণ বদলে দেয় এবং দক্ষিণ আফ্রিকা উঠে যায় শীর্ষে। সেই সঙ্গে নিশ্চিত হয় বিশ্বকাপের টিকিট।গ্রুপ ‘এ’-তে কঠিন চ্যালেঞ্জবিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে দক্ষিণ আফ্রিকার সামনে অপেক্ষা করছে কঠিন চ্যালেঞ্জ। ‘এ’ গ্রুপে তাদের প্রতিপক্ষ মেক্সিকো, দক্ষিণ কোরিয়া ও চেক প্রজাতন্ত্র।দক্ষিণ আফ্রিকার গ্রুপ পর্বের সূচি:১১ জুন: মেক্সিকো বনাম দক্ষিণ আফ্রিকা (আজতেকা স্টেডিয়াম, মেক্সিকো সিটি)১৮ জুন: চেকিয়া বনাম দক্ষিণ আফ্রিকা (আটলান্টা স্টেডিয়াম)২৪ জুন: দক্ষিণ আফ্রিকা বনাম দক্ষিণ কোরিয়া (এস্তাদিও মনতেরে)তারকাসমৃদ্ধ স্কোয়াডহুগো ব্রুসের ২৬ সদস্যের দলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নাম অধিনায়ক ও গোলরক্ষক রনওয়েন উইলিয়ামস। এছাড়া মিডফিল্ডের প্রাণভোমরা তেবোহো মোকোয়েনা এবং বার্নলির ফরোয়ার্ড লাইল ফস্টার দলের বড় ভরসা।মামেলোদি সানডাউন্স থেকে রয়েছেন আটজন ফুটবলার। একই সংখ্যক খেলোয়াড় এসেছে অরল্যান্ডো পাইরেটস থেকেও। বিশেষ করে তরুণ ফরোয়ার্ড ওসউইন আপোলিসকে ঘিরে রয়েছে বাড়তি প্রত্যাশা।দক্ষিণ আফ্রিকার বিশ্বকাপ ইতিহাসকনফেডারেশন: সিএএফ (আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশন)প্রথম বিশ্বকাপ: ফ্রান্স ১৯৯৮সর্বশেষ বিশ্বকাপ: দক্ষিণ আফ্রিকা ২০১০বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ: ৪ বার (১৯৯৮, ২০০২, ২০১০, ২০২৬)সেরা ফল: গ্রুপ পর্ব (১৯৯৮, ২০০২, ২০১০)বিশ্বকাপ আয়োজক: ২০১০সামগ্রিক রেকর্ড: ৯ ম্যাচে ২ জয়, ৪ ড্র, ৩ হার। ১১ গোল করেছে, হজম করেছে ১৬টি।২০০২: সবচেয়ে সফল বিশ্বকাপদক্ষিণ আফ্রিকার বিশ্বকাপ ইতিহাসের সেরা আসর ছিল ২০০২ সালের কোরিয়া-জাপান বিশ্বকাপ। প্রথম ম্যাচে তারা প্যারাগুয়ের সঙ্গে ২-২ গোলে ড্র করে। দ্বিতীয় ম্যাচে স্লোভেনিয়াকে ১-০ গোলে হারিয়ে অর্জন করে বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম জয়। সেই ম্যাচে চতুর্থ মিনিটেই গোল করেন সিয়াবোঙ্গা নোমভেথে।শেষ ম্যাচে স্পেনের কাছে ৩-২ গোলে হেরে গেলেও দক্ষিণ আফ্রিকা নকআউট পর্বের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত গোল ব্যবধানে পিছিয়ে থাকায় তারা বিদায় নেয়। বিশ্বকাপ শেষে তারা ১৭তম স্থানে ছিল, যা এখন পর্যন্ত তাদের সেরা অর্জন।২০১০: নিজেদের মাটিতে বিশ্বকাপআফ্রিকার মাটিতে প্রথম বিশ্বকাপ আয়োজনের গৌরব অর্জন করে দক্ষিণ আফ্রিকা। উদ্বোধনী ম্যাচে মেক্সিকোর সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করে স্বাগতিকরা। যদিও দ্বিতীয় ম্যাচে উরুগুয়ের কাছে ৩-০ গোলে হারে। তবে শেষ ম্যাচে তারা চমক দেখায়। ১৯৯৮ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে ২-১ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপ শেষ করে। যদিও গ্রুপ পর্ব পার হতে পারেনি, তবু সেই জয় এখনও দক্ষিণ আফ্রিকার ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম গর্বের মুহূর্ত।বিশ্বকাপের স্মরণীয় মুহূর্ত ও পরিসংখ্যানসর্বোচ্চ গোলদাতা: শন বার্টলেট ও বেনি ম্যাকার্থি (২টি করে গোল)সর্বাধিক ম্যাচ খেলা ফুটবলার: কুইন্টন ফরচুন, বেনি ম্যাকার্থি, লুকাস রাদেবে ও অ্যারন মোকোয়েনা (৬ ম্যাচ করে)যে গোল কাঁপিয়েছিল পুরো আফ্রিকাকে: ২০১০ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে মেক্সিকোর বিপক্ষে সিফিওয়ে ছাবালালার গোলটি শুধু দক্ষিণ আফ্রিকার নয়, পুরো আফ্রিকার ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত। দ্বিতীয়ার্ধে বাম পায়ের দুর্দান্ত শটে তিনি জাল খুঁজে নেন। এরপর তাঁর বিখ্যাত উদযাপন বিশ্বকাপ ইতিহাসে স্থায়ী জায়গা করে নেয়।সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ জয়: ২০১০ সালে ব্লুমফন্টেইনে ফ্রান্সকে ২-১ গোলে হারানো। বঙ্গানি খুমালো এবং কাটলেগো ম্ফেলার গোলেই নিশ্চিত হয় ঐতিহাসিক জয়টি।আজতেকা স্টেডিয়াম: বিশ্বকাপের পবিত্র স্থানমেক্সিকো সিটির আজতেকা স্টেডিয়াম। যেখানে বিশ্বকাপ উঁচু করে তুলে ধরেছিলেন ফুটবল বিশ্বের সর্বকালের দুই সেরা ফুটবলার পেলে এবং ম্যারাডোনা। ১৯৭০ সালে পেলে এবং ১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনা।এবার তৃতীয়বারের মতো এই স্টেডিয়ামে আয়োজন হচ্ছে বিশ্বকাপের আসর। ফাইনাল এখানে অনুষ্ঠিত হবে না। তবে হচ্ছে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও উদ্বোধনী ম্যাচ। উদ্বোধনী ম্যাচে মুখোমুখি স্বাগতিক মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকা।বিশ্বকাপের উন্মাদনা শুরুবিশ্বকাপ মানেই আনন্দ, বিশ্বকাপ মানেই উত্তেজনা। বিশ্বকাপ মানেই ভরপুর আনন্দ আর উৎসব। প্রতি চার বছর পর এই উৎসবে শামিল হতে মুখিয়ে থাকে সারা বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী মানুষ।কাতার বিশ্বকাপের পর চার বছর ঘুরে চলে এলো ২৩তম বিশ্বকাপের জমজমাট আসর। উদ্বোধনী ম্যাচ ও উদ্বোধনী অনুষ্ঠান দেখার জন্য সারা বিশ্বের মানুষ বুঁদ হয়ে আছে টিভির সামনে। আর যারা সরাসরি উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও ম্যাচ দেখার জন্য মেক্সিকো শহরে হাজির হয়েছেন, তাদের স্রোত নেমেছে আজতেকা স্টেডিয়ামের দিকে। নানা রঙের জার্সি, ব্যানার-ফেস্টুন, মাথার ক্যাপ—নানা ভাবে সমর্থকরা হাজির হচ্ছে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী স্টেডিয়ামে।২০২৬ বিশ্বকাপ: নতুন রেকর্ডের বিশ্বকাপ৪৮ দলের বিশ্বকাপ, তিন দলের যৌথ আয়োজন, সর্বোচ্চ ১০৪টি ম্যাচ, সবচেয়ে বেশি স্টেডিয়াম—সহ বহু প্রথমের এই বিশ্বকাপে দ্বিতীয়বারের মতো দক্ষিণ আফ্রিকার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে মেক্সিকো।১৬ বছর আগে ২০১০ বিশ্বকাপের আয়োজক ছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। সেবার উদ্বোধনী ম্যাচে মেক্সিকোর বিপক্ষে নেমেছিল বাফানা বাফানারা। আর আজ স্বাগতিক মেক্সিকো উদ্বোধনী ম্যাচে খেলবে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে। ইতিহাসের কী মধুর মেলবন্ধন!ম্যাচের ফলাফল অতীতে ১-১ গোলের ড্র হলেও এবারের ফলাফল ভিন্ন হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। গোল করে সাবালালার সেই ঐতিহাসিক নাচ হয়তো আর দেখা যাবে না; কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকা দলে রয়েছে একঝাঁক তরুণ ফুটবলার যারা ম্যাচ জিততে প্রস্তুত।মেক্সিকোর ফর্মটাও বেশ ভালো যাচ্ছে। ২০২৬ সালে এখনো কোনো ম্যাচে তারা হারেনি। অন্যদিকে, দক্ষিণ আফ্রিকা নিকারাগুয়া ও জ্যামাইকার বিপক্ষে ড্র করার পাশাপাশি পানামার বিপক্ষে ২-১ গোলের পরাজয় নিয়ে মাঠে নামছে।আজতেকা স্টেডিয়ামে সর্বশেষ মেক্সিকো কোনো প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ হেরেছিল ২০১৩ সালে। এছাড়া বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে ১৯৯৪ সালের পর আর কখনো হারেনি মেক্সিকো। পরবর্তীতে সাতটি উদ্বোধনী ম্যাচের মধ্যে পাঁচটিতেই তারা জয় পেয়েছে।লক্ষ্য নকআউট পর্বে যাওয়া২০২৬ বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকা নতুন ইতিহাস লেখার লক্ষ্য নিয়েই মাঠে নামবে। অতীতে তারা কখনও গ্রুপ পর্ব পেরোতে পারেনি। হুগো ব্রুসের নেতৃত্বে এবার সেই সীমাবদ্ধতা ভেঙে প্রথমবারের মতো নকআউট পর্বে জায়গা করে নেওয়াই বাফানা বাফানার প্রধান লক্ষ্য।দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হতে না হতেই গোল শোধ করে মেক্সিকো, রাউল জিমেনেজের গোলে ১-১ সমতা ফেরে। দক্ষিণ আফ্রিকার ফুটবল ইতিহাসের সেরা ফাইনালের অপেক্ষায় আছে বিশ্ব ফুটবল। ২৩তম বিশ্বকাপের ১ম পর্বের এই লড়াইয়ে শেষ হাসি কে হাসে সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা।