প্রিন্ট এর তারিখ : ১২ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১২ জুন ২০২৬
বাজেট নিয়ে এনসিপির সমালোচনা: ‘উচ্চাভিলাষী ও বাস্তবতাবিবর্জিত’া
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জাতীয় বাজেট পেশ করছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তবে এই বাজেটকে উচ্চাভিলাষী ও বাস্তবতাবিবর্জিত বলে মন্তব্য করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে এ মন্তব্য করেন এনসিপির ছায়া বাজেট কমিটির প্রধান ড. আতিক মুজাহিদ।তিনি বলেন, সরকার প্রস্তাবিত বাজেটে প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকার ঘাটতির কথা উল্লেখ করলেও বাস্তবে এ ঘাটতি সাড়ে চার লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। তার দাবি, বাজেটে নির্ধারিত ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বাস্তবসম্মত নয়।ড. আতিক মুজাহিদ বলেন, তার ধারণা অনুযায়ী রাজস্ব আদায়ে ২ লাখ কোটি টাকারও বেশি ঘাটতি থেকে যেতে পারে। ফলে প্রকৃত হিসাব বিবেচনায় এবারের বাজেট দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ঘাটতির বাজেট হিসেবে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।‘চানাচুরের মতো খেতে ভালো, পুষ্টিগুণ নেই’বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপনের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, “এই বাজেটটাকে আমাদের মনে হয়েছে উচ্চাভিলাষী ও বাস্তবতা বিবর্জিত। এটা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ঘাটতি বাজেট হবে। ঋণগ্রস্ত বাজেট বলা যেতে পারে। এবারের বাজেট অনেকটা চানাচুরের মতো—খেতে ভালো, কিন্তু পুষ্টিগুণ নেই।”রাজস্ব আদায়ে ৪২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির অসম্ভব লক্ষ্যনাহিদ ইসলাম বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। অপরদিকে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যা বাস্তবতা বিবর্জিত। এই পরিমাণ রাজস্ব আদায় করা বর্তমান প্রশাসন ও কর কাঠামোর পক্ষে সম্ভব নয় বলে মনে করেন তিনি।তাঁর মতে, এই রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে রাজস্ব প্রবৃদ্ধির হার অন্তত ৪২ শতাংশ হতে হবে। অথচ দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বার্ষিক রাজস্ব প্রবৃদ্ধি হয়েছিল মাত্র ২৭ দশমিক ৩ শতাংশ। যদি আগামী অর্থবছরে সেই সর্বোচ্চ রেকর্ডও করা সম্ভব হয়, তবু লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৭০ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি থাকবে।ঋণ বাড়বে, মুদ্রাস্ফীতিও বাড়ার আশঙ্কাবিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেন, বাজেটে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি দেখানো হয়েছে। রাজস্ব আদায় না হতে পারলে এই ঘাটতি আরও বাড়বে। তখন সরকারকে ব্যাংক ও বিদেশ থেকে ঋণ নিতে হবে। তিনি বলেন, দেশের বৈদেশিক ঋণ ইতোমধ্যে ৮ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। আর অভ্যন্তরীণ ঋণ বেড়েছে প্রায় ১৬ গুণ।নাহিদ ইসলাম উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “ব্যাংক থেকে আরও ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে ঋণের চাপ বাড়বে। বিনিয়োগকারীরা ব্যাংক থেকে ঋণ পাবে না, কর্মসংস্থান সংকুচিত হবে।” একইসঙ্গে বাজেট বাস্তবায়নে ঋণ বাড়লে মুদ্রাস্ফীতিও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে সতর্ক করেন তিনি।ব্যাংকিং খাত সংস্কারের দিকনির্দেশনা নেইনাহিদ ইসলাম বলেন, অর্থমন্ত্রী তার বক্তব্যে ‘অর্থনৈতিক গণতন্ত্র’র কথা বললেও ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের সংস্কার নিয়ে কোনো সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেননি। ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, লুটপাট ও পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার পরিকল্পনাও তুলে ধরা হয়নি।তিনি আরও বলেন, “আমরা যেই নজিরবিহীনভাবে ব্যাংকিং খাত দলীয়করণ ও রাজনীতিকরণ দেখছি, ইসলামী ব্যাংক এটা আমাদের সামনে একটা বড় উদাহরণ। ইসলামী ব্যাংকে এখন আবারো এস আলমের হাতে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান। ব্যাংকিং খাতে যে নৈরাজ্য ও আমানতকারীদের অনাস্থা ছিল, তা নতুন করে শুরু হয়েছে।”রাজনৈতিক সংস্কার ছাড়া অর্থনৈতিক সংস্কার নয়বিরোধীদলীয় এই নেতা বলেন, বাজেট বক্তব্য শুনতে আকর্ষণীয় মনে হলেও এটি দেশের অর্থনীতিতে কোনো মৌলিক পরিবর্তন আনবে না। অর্থনৈতিক সংস্কার রাজনৈতিক সংস্কার থেকে আলাদা নয়, কিন্তু বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক সংস্কারের অগ্রগতি প্রায় নেই বললেই চলে।প্রসঙ্গত, বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এটি দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাজেট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে বিরোধীদল ও এনসিপি রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা, ঘাটতি ও ঋণের পরিমাণ নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছে।
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্ব সংরক্ষিত গণবার্তা