প্রিন্ট এর তারিখ : ১৩ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১২ জুন ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গে ভরাডুবির পর তৃণমূলে নতুন সংকট, এনডিএতে যাওয়ার আগ্রহ ১৯ সাংসদেরা
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর নতুন সংকটে পড়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। দলীয় প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে অন্তত ১৯ জন সাংসদ এনডিএ জোটের সঙ্গে থাকার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন বলে দাবি করেছে ভারতের সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি।শুক্রবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এনডিটিভি জানিয়েছে, তাদের হাতে আসা একটি চিঠিতে তৃণমূল কংগ্রেসের ১৯ জন সাংসদের স্বাক্ষর রয়েছে। চিঠিতে তারা নিজেদের দল থেকে আলাদা হওয়ার ইচ্ছা এবং বিজেপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় গণতান্ত্রিক জোটের (এনডিএ) সঙ্গে থাকার আগ্রহের কথা জানিয়েছেন।কারা আছেন চিঠিতেস্বাক্ষরকারীদের মধ্যে তৃণমূলের পরিচিত মুখ কাকলি ঘোষ দস্তিদার, শতাব্দী রায়, সায়নী ঘোষ ও ইউসুফ পাঠানের নাম রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দলীয় সূত্রের বরাত দিয়ে এনডিটিভি জানিয়েছে, শিগগিরই আরও একজন প্রভাবশালী নেতা বিদ্রোহী শিবিরে যোগ দিতে পারেন।প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৮ মে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার কাছে পাঠানো চিঠিতে বিদ্রোহী সাংসদরা তৃণমূল থেকে পৃথক অবস্থান নেওয়ার কথা জানান। এর দুই দিন পর তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে স্পিকারের কাছে আরেকটি চিঠি পাঠিয়ে কাকলি ঘোষ দস্তিদারের পরিবর্তে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে দলের প্রধান হুইপ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার অনুরোধ করা হয়।আগেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন বিদ্রোহীরাএর আগে কাকলি ঘোষ দস্তিদার নিজেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, তৃণমূলের একটি অংশ দল ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তিনি তখন নাম প্রকাশ না করলেও সংসদে আলাদা বসার ব্যবস্থা চাওয়া এবং বিজেপির প্রতি সমর্থনের বিষয়টি উল্লেখ করেছিলেন। তার সেই ইঙ্গিত বাস্তব রূপ নিতে চলেছে বলে ধারণা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।তিন সাংসদ ইতোমধ্যে পদত্যাগ করেছেনএদিকে দলটির তিনজন সাংসদ ইতোমধ্যে পদত্যাগ করেছেন। বৃহস্পতিবার রাজ্যসভার সদস্যপদ ছাড়েন প্রকাশ বারাইক। এর আগে ১০ জুন পদত্যাগ করেন সুশ্মিতা দেব এবং ৮ জুন পদ ছাড়েন সুখেন্দু রায়। তবে তারা বিদ্রোহী সাংসদদের চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন কিনা, তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।বর্তমানে লোকসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের ২৮ জন সাংসদ রয়েছেন। ভারতের দলত্যাগবিরোধী আইন অনুযায়ী, আলাদা গোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি পেতে কমপক্ষে ১৯ জন সাংসদের সমর্থন প্রয়োজন। বিদ্রোহী শিবিরের দাবি, তাদের কাছে সেই সংখ্যাটি রয়েছে।মমতা ঘনিষ্ঠ নেতার পাল্টা অভিযোগঅন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ নেতা কীর্তি আজাদ অভিযোগ করেছেন, বিজেপির চাপ ও প্রলোভনের মাধ্যমে কয়েকজন সাংসদের কাছ থেকে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। বিজেপির কথিত ‘অপারেশন লোটাস’-এর সমালোচনা করে তিনি বলেন, “যারা দল ছাড়তে চান তারা যেতে পারেন, কিন্তু তারা প্রকৃত তৃণমূলের প্রতিনিধিত্ব করবেন না।”অভ্যন্তরীণ অসন্তোষের কারণ কী?দলটির অভ্যন্তরীণ অসন্তোষের পেছনে নেতৃত্বের ধরন, দুর্নীতির অভিযোগ এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার বিষয়গুলোকে দায়ী করা হচ্ছে। চারবারের সাংসদ শতাব্দী রায় অভিযোগ করেছেন, দলের সাধারণ নেতাকর্মীদের মতামতের কোনো মূল্যায়ন করা হতো না এবং সীমিত কয়েকজন নেতারই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে যাওয়ার সুযোগ ছিল।পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের ভরাডুবির পর দলের নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থা ক্রমশ বাড়ছে। নির্বাচনে পরাজয়কে ঘিরে হতাশা এবং বিজেপির উত্থানের মধ্যে দলত্যাগের এ ঘটনা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য বড় ধাক্কা হতে চলেছে।কাঁটা হচ্ছে ‘অপারেশন লোটাস’ভারতের রাজনীতিতে ‘অপারেশন লোটাস’ শব্দটি বিজেপির দলত্যাগ করানোর কৌশল বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদরা এনডিএ জোটে যোগ দিলে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সমীকরণ পুরোদমে বদলে যেতে পারে। ফলে লোকসভায় বিজেপির শক্তি আরও বাড়বে এবং তৃণমূল গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি আসন হারাবে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।এখন দেখার বিষয়, বিদ্রোহী সাংসদদের এই দাবি সত্যি হয় কিনা এবং বিধানসভা নির্বাচনের ফল কত দ্রুত তৃণমূলের ভাঙন ত্বরান্বিত করে। উত্তরপ্রদেশের মতো পশ্চিমবঙ্গেও যদি একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটে, তাহলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য চ্যালেঞ্জ আরও বাড়বে।
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্ব সংরক্ষিত গণবার্তা