প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬
বেনজীরের সেসব অপকর্ম সবার আলোচনায় া
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
ইন্টারপোলের রেড নোটিশের ভিত্তিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হয়েছেন সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ। দুবাই পুলিশ ইন্টারপোলের সহযোগিতায় তাকে গ্রেপ্তার করে। রোববার (১৪ জুন) এ তথ্য নিশ্চিত করেন পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (এআইজি) শাহাদাত হোসেন।গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় ‘বেনজীরনামা’। ফেসবুক ওয়ালে ভাসতে থাকে সাবেক এই পুলিশ কর্তার দুর্নীতি, ক্রসফায়ার ও গুমের লোমহর্ষক কাহিনি। এর মধ্যে পরবর্তী করণীয় জানাতে গণমাধ্যমের সামনে আসে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।২০২৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তারের জন্য ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারির আদেশ দেন আদালত। ঢাকা মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের বিচারক মো. জাকির হোসেন এ আদেশ দেন।পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, ইন্টারপোল জারিকৃত রেড নোটিশের ভিত্তিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে গ্রেপ্তারের অনুরোধ করা হয়। গত ১২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডিরেক্টরিয়েট জেনারেল অফ ফেডারেল ক্রিমিনাল পুলিশ (এনসিবি আবুধাবি) থেকে প্রেরিত ইমেইলের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানানো হয়।সরকারের এক সূত্র জানিয়েছে, এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে বেনজীরকে দেশে ফিরিয়ে আনা। আমিরাত কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গ্রেপ্তারের ৩০ দিনের মধ্যে বাংলাদেশকে কূটনৈতিক মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক এক্সট্রাডিশন (প্রত্যর্পণ) আবেদন পাঠাতে হবে। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় মামলা, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, তদন্ত প্রতিবেদন ও আইনি নথিপত্র প্রস্তুতের কাজ চলছে।দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম জানান, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে বর্তমানে দুদকের ছয়টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে ১৪ কোটি ৬২ লাখ টাকার জ্ঞাতায়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলায় ইতোমধ্যে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে এবং সেই মামলার বিচার চলছে। বাকি পাঁচটি মামলার তদন্ত চলমান। এসব মামলায় তার বিরুদ্ধে প্রায় ৭৬ কোটি টাকার জ্ঞাতায়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে।২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর পৃথক চারটি মামলা করে দুদক। ৭৪ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপন করার অভিযোগে বেনজীর আহমেদ এবং তার স্ত্রী ও দুই মেয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। পরবর্তীতে পাসপোর্ট জালিয়াতি ও আরেকটি মামলা করে দুদক।২০২৪ সালের এপ্রিলে বেনজীর ও তার পরিবারের সদস্যদের সম্পদের অনুসন্ধানে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেওয়া হয়। অনুসন্ধান শুরুর কিছুদিনের মধ্যেই পরিবার নিয়ে দেশ ছাড়েন তিনি।আদালতের আদেশে তার ও পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা শত শত বিঘা জমি, ফ্ল্যাট, ব্যাংক হিসাব, শেয়ার এবং অন্যান্য সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে।৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র, ৩৩টি ব্যাংক হিসাব এবং ৩টি বিও হিসাব (শেয়ার ব্যবসার বেনিফিশিয়ারি ওনার্স অ্যাকাউন্ট) অবরুদ্ধের আদেশ।২০২৪ সালের ১২ জুন: বেনজীর আহমেদ, তার স্ত্রী ও সন্তানদের নামে থাকা ৮টি ফ্ল্যাট (ঢাকার বাড্ডা ও আদাবরে) এবং ২৫ একর ২৭ কাঠা জমি (নারায়ণগঞ্জ, বান্দরবান ও উত্তরায়) জব্দের আদেশ।দুই দফায়: গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুরে ৬২১ বিঘা জমি, ১৯টি কোম্পানির শেয়ার, গুলশানে ৪টি ফ্ল্যাট ক্রোকের আদেশ।৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র, ৩৩টি ব্যাংক হিসাব এবং ৩টি বিও হিসাব (শেয়ার ব্যবসার বেনিফিশিয়ারি ওনার্স অ্যাকাউন্ট) অবরুদ্ধের আদেশ।বেনজীর আহমেদ র্যাবের মহাপরিচালক থাকাকালে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে দেশ-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনা হয়। ২০২১ সালে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় তার নাম অন্তর্ভুক্ত হয়।দুদকের অনুসন্ধান শুরুর দুই সপ্তাহের মাথায় ২০২৪ সালের ৪ মে দেশ ছাড়েন বেনজীর আহমেদ। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, কয়েকজন পুলিশ সদস্যের সহায়তায় তিনি বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন।ফুটেজে দেখা যায়, শেষ নিরাপত্তা তল্লাশি চৌকিতে দায়িত্বরত আনসার সদস্যের শারীরিক তল্লাশি ছাড়াই তিনি চেকপয়েন্ট অতিক্রম করেন। অথচ সাধারণ যাত্রীদের ক্ষেত্রে এই তল্লাশি বাধ্যতামূলক। দেশ ছাড়ার আগে বিমানবন্দরে উপস্থিত কয়েকজন পুলিশ সদস্যের দিকে হাত নেড়ে বিদায় জানাতেও দেখা যায় তাকে।ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, “বেনজীর আহমেদের গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে বেনজীরের ‘দম্ভ চূর্ণ হয়েছে’—এখনই বলা যাচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। এটি একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ মাত্র। গ্রেফতারই চূড়ান্ত কিছু নয়। তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জবাবদিহি আওতায় আনা গেলে তবেই বলা যাবে যে একটি পূর্ণাঙ্গ দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে।”তিনি আরও বলেন, “তার গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে যে বার্তার কথা বলা হচ্ছে, সেটি এখনো পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বার্তাটি তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন প্রভাব-প্রতিপত্তি, রাজনৈতিক সংযোগ কিংবা ক্ষমতার অবস্থান নির্বিশেষে একজন অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আইনের মুখোমুখি করা সম্ভব হবে এবং বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।”সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, এই গ্রেফতার প্রমাণ করেছে অপরাধী যত শক্তিশালীই হোক, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ পদে থাকা একজন সাবেক কর্মকর্তার বিদেশে গ্রেফতার এবং তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ এখন দেশের বিচার ও জবাবদিহির ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে।সংশ্লিষ্টরা জানান, গ্রেফতার হওয়া যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনা। কারণ প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইন, দ্বিপক্ষীয় সমন্বয় এবং আদালতসংশ্লিষ্ট নানা ধাপ রয়েছে। তবে সরকার এটিকে একটি বড় সাফল্য হিসাবে দেখছে।
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্ব সংরক্ষিত গণবার্তা