প্রিন্ট এর তারিখ : ২১ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২১ জুন ২০২৬
শিশুকে বালতির পানিতে ডুবিয়ে হত্যার পর থানায় গিয়ে কিশোরীর স্বীকারোক্তিা
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
গাজীপুরের কালীগঞ্জে আড়াই বছরের এক শিশুকে পানিভর্তি বালতিতে চুবিয়ে হত্যার অভিযোগে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার পর অভিযুক্ত এক কিশোরী নিজেই থানায় গিয়ে হত্যার দায় স্বীকার করেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। শনিবার দুপুরে কালীগঞ্জ থানায় এসে ইসরাত জাহান শীম (১৪) নামের এক কিশোরী ডিউটি অফিসারের কাছে দাবি করে, ‘আমি শিশু আরিশাকে বালতির পানিতে চুবিয়ে মেরেছি, আমাকে হাজতে ভরেন।’পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ইসরাত জাহান শীম কালীগঞ্জ পৌরসভার দেওপাড়া এলাকার রাজপাড়া গ্রামের আবু কালামের মেয়ে এবং স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। থানার ডিউটি অফিসার জোনাকি তাকে ঘটনার কারণ জানতে চাইলে শীম জানায়, তার মা ছোট্ট আরিশাকে বেশি আদর করতেন। এছাড়া শিশুটি বারবার তার কাছে বিস্কুট চাইছিল। এর বাইরে নিহত শিশু কিংবা তার পরিবারের সঙ্গে তার কোনো শত্রুতা ছিল না বলেও দাবি করে সে। শীমের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘আমি ঘরের ভেতরে ছিলাম। বাইরে এসে দেখি আরিশা টিউবওয়েলের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। সেখানে একটি খালি বালতি ছিল। পরে আমি বালতিটি পানি দিয়ে ভরে তাকে পা ধরে উল্টো করে প্রায় পাঁচ মিনিট পানিতে চুবিয়ে রাখি।’খবর পেয়ে কালীগঞ্জ থানা পুলিশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে। নিহত আরিশা আক্তার (২) রাজবাড়ী জেলার সদর উপজেলার বাসিন্দা আকাশ শেখের মেয়ে। তার বাবা-মা গাজীপুরের কালীগঞ্জ পৌর এলাকায় একটি শিল্প প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন এবং ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। আরিশার মা জানান, ঘটনার সময় তিনি ও তার স্বামী ঘরে বসে স্বামীর চাকরি নিয়ে সমস্যা হওয়া একটি বিষয় নিয়ে কথা বলছিলেন। কিছুক্ষণ পর মেয়েকে দেখতে না পেয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একপর্যায়ে টিউবওয়েলের পাশে থাকা একটি বালতির মধ্যে শিশুটিকে দেখতে পান। দ্রুত উদ্ধার করে কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম মেয়েটি হয়তো গোসল করতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। পরে পুলিশ এসে জানায়, বাড়িওয়ালার মেয়ে থানায় গিয়ে হত্যার কথা স্বীকার করেছে।’শিশুটির বাবা আকাশ শেখ বলেন, ‘আমি কিছু সময়ের জন্য কারখানায় গিয়েছিলাম। ফিরে এসে দেখি আমার মেয়ে ও বাড়িওয়ালার মেয়ে একসঙ্গে খেলছে। এমনকি সে আমার মেয়েকে টোস্ট বিস্কুটও খেতে দিয়েছিল। পরে ঘরে চলে যাই। প্রায় আধাঘণ্টা পর মেয়েকে আনতে বললে খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে বালতির ভেতরে তাকে পাওয়া যায়।’কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. মো. ইমরান হোসেন জানান, দুপুর ১টার দিকে শিশুটিকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়। পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি পুলিশকে অবহিত করে। এ বিষয়ে কালীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. জাকির হোসেন বলেন, ‘ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। অভিযুক্ত কিশোরীর বক্তব্যসহ সব বিষয় যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।’এলাকাবাসী এই ঘটনায় শোক ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। অনেকেই কিশোরীটির এমন নৃশংস কাজে হতবাক হয়েছেন। শিশুটির পরিবার বর্তমানে চরম বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, শিশুটির মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে এবং ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে। অভিযুক্ত কিশোরীকে সংশ্লিষ্ট আইনে আদালতে পাঠানো হবে। আইনজীবীরা বলছেন, কিশোর অপরাধীদের ক্ষেত্রে আলাদা আইন ও বিচার প্রক্রিয়া রয়েছে। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, শিশুদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা ও পারিবারিক অবহেলা কতটা ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। পরিবার ও সমাজের উচিত শিশুদের প্রতি আরও সচেতন ও দায়িত্বশীল হওয়া।
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্ব সংরক্ষিত গণবার্তা