প্রিন্ট এর তারিখ : ০৩ জুলাই ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০২ জুলাই ২০২৬
স্বামীকে হত্যা করে ছয় টুকরো করার ঘটনায় স্ত্রীর মৃত্যুদণ্ডা
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
রাজধানীর মহাখালী এলাকায় পাঁচ বছর আগে স্বামীকে হত্যার পর ছয় টুকরা করেছিলেন স্ত্রী ফাতেমা বেগম ওরফে শিল্পী। এ ঘটনার দায়ে শিল্পীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত। বৃহস্পতিবার ঢাকার ষোড়শ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ নাজমুন নাহার নিপু এ রায় ঘোষণা করেন। এ বিষয়ে অতিরিক্ত পিপি খন্দকার শফি নেওয়াজ নাসির বলেন, হত্যার দায়ে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়া মরদেহ গুমের দায়ে সাত বছরের কারাদণ্ড, ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে তাকে তিন মাস বিনাশ্রম কারাভোগ করতে হবে। রায় ঘোষণার সময় আসামিকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয় জানিয়ে বেঞ্চ সহকারী রাহিমুল করিম আকন্দ বলেন, রায় শেষে সাজা পরোয়ানা দিয়ে তাকে আবার কারাগারে পাঠানো হয়েছে।মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০২১ সালের ৩০ মে রাত সাড়ে ১০টার দিকে মহাখালীর আমতলী এলাকায় একটি ড্রাম থেকে এক ব্যক্তির মাথাবিহীন দেহ উদ্ধার করে বনানী থানা পুলিশ। একইদিন রাত ১১টার পর মহাখালী বাস টার্মিনালের এনা কাউন্টারের কাছ থেকে একটি ব্যাগের মধ্যে উরু থেকে খণ্ডিত দুইটি পা এবং কাঁধ থেকে খণ্ডিত দুটি হাতের অংশ উদ্ধার করে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা পুলিশ। দুই দিনে লাশের ৬ টুকরা উদ্ধার করা হয়। রহস্য উদঘাটনে মাঠে নামে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) গুলশান বিভাগ। এরপর ১২ ঘণ্টার মধ্যেই ফাতেমাকে গ্রেপ্তার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে ফাতেমা পুলিশকে জানায়, পারিবারিক কলহ, টাকা-পয়সা বণ্টন ও একাধিক বিয়েকে কেন্দ্র করে স্বামী ময়না মিয়া ওরফে শাকিলের সঙ্গে তার মনোমালিন্য হয়। একপর্যায়ে পরিকল্পনা করে তার অটোরিকশা চালক স্বামীকে ঘুমের ট্যাবলেট খাইয়ে নিস্তেজ করেন, এরপর গলাকেটে হত্যা করে মরদেহ ৬ টুকরা করেন ফাতেমা।একটি লাল রঙের কাপড়ের ব্যাগে মাথা, শরীরের মূল অংশকে একটি নীল রঙের পানির ড্রামে এবং খণ্ডিত দুই পা ও দুই হাতকে একটি বড় কাপড়ের ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখেন ফাতেমা। এরপর ১৩০০ টাকায় রিকশা ভাড়া করে প্রথমে আমতলী এলাকায় শরীরের মূল অংশ ফেলে দেন, পরবর্তীতে মহাখালী এনা বাস কাউন্টারের সামনে খণ্ডিত দুই হাত, দুই পা ভর্তি ব্যাগ রেখে দিয়ে চলে আসেন বাসায়। এরপর খণ্ডিত মাথা রাখা ব্যাগ নিয়ে গুলশান লেকে ফেলে দিয়ে বাসায় আসেন তিনি। গত ১ জুন এ ঘটনায় ময়না মিয়ার দ্বিতীয় স্ত্রী নাসরিন তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় মামলা দায়ের করেন। গ্রেপ্তারের পর ফাতেমা হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেন। ২০২২ সালের ২৪ অক্টোবর মামলাটি তদন্ত করে ফাতেমার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেন ক্যান্টনমেন্ট জোনাল টিমের পরিদর্শক কাজী শরীফুল ইসলাম। পরে ২০২৩ সালের ১২ মার্চ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু করে আদালত।মামলার বিচার চলাকালে ২৬ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৭ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করে আদালত। আত্মপক্ষ শুনানিতে আসামি নিজেকে নির্দোষ দাবি করে ন্যায়বিচার চান। এরপর নিজের পক্ষে নিজেই সাফাই সাক্ষ্য দেন তিনি। মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে আজ রায় ঘোষণা করলেন আদালত। রায় ঘোষণার পর আসামি ফাতেমা বেগম কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, ‘আমি যা করেছি তার জন্য আমি অনুতপ্ত। তবে আমি চাই না আমার সন্তানেরা আমার কারণে কলঙ্কিত হোক।’ মামলার প্রসিকিউটর বলেন, ‘এই রায় সমাজে বার্তা পাঠাবে যে, নৃশংস অপরাধের শাস্তি অবশ্যম্ভাবী।’ আইনজীবীরা বলছেন, এই মামলায় দ্রুত বিচার এবং কঠোর শাস্তি অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার পাশাপাশি সমাজে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। আসামির পক্ষের আইনজীবী জানিয়েছেন, তারা উচ্চ আদালতে আপিল করবেন। আপিল প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত রায় কার্যকর থাকবে না। তবে এই রায়ের ফলে নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও নৃশংস অপরাধের বিচারে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলো। আদালতের এই রায় নিয়ে সাধারণ মানুষ ও সমাজমাধ্যমে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন, আবার কেউ কেউ বলেছেন, এ ধরনের অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডই যথাযথ শাস্তি। অন্যদিকে, কেউ কেউ দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির মানসিক অবস্থা ও পারিবারিক প্রেক্ষাপটও বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন। এই মামলার রায় দেশের বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা বাড়াবে বলে মনে করছেন অনেকে। এখন দেখার বিষয়, উচ্চ আদালতে আপিলের পর কী সিদ্ধান্ত আসে। ততদিন পর্যন্ত ফাতেমা বেগম কারাগারেই থাকবেন।
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্ব সংরক্ষিত গণবার্তা