প্রিন্ট এর তারিখ : ০৩ জুলাই ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৩ জুলাই ২০২৬
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ, অধ্যাপকের স্ত্রীর নিয়োগ স্থগিতা
নিউজ ডেস্ক ||
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) আইসিটি বিভাগে একই বিভাগের অধ্যাপকের স্ত্রীকে প্রভাষক পদে নিয়োগ দেওয়াকে কেন্দ্র করে স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। নিয়োগ পাওয়া ফিরোজা নাজনীন বিভাগটির অধ্যাপক ও জিয়া পরিষদের নেতা ড. জাহিদুল ইসলামের স্ত্রী। ফিরোজা প্রথম বর্ষে অকৃতকার্য এবং ২য় ও ৩য় বর্ষে মানোন্নয়ন দিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। এছাড়া তিনি ছাত্রী থাকাকালীন দুটি বর্ষের পরীক্ষা কমিটির সভাপতি ছিলেন ড. জাহিদ। অভিযোগ রয়েছে, ফিরোজা ১ম বর্ষে অকৃতকার্য হলেও ড. জাহিদ পরীক্ষা কমিটির সভাপতি হওয়ার পর অস্বাভাবিকভাবে তার ফলাফল বেড়ে যায়। এদিকে নিয়োগ বোর্ডের আগের দিন বোর্ড বিশেষজ্ঞ সদস্যের সঙ্গেও ড. জাহিদ সাক্ষাৎ করেন বলে জানা গেছে। এতে নিয়োগ প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অন্য প্রার্থীরা। এসব অভিযোগ ও সিন্ডিকেট সভায় সদস্যের আপত্তির কারণে নিয়োগপত্র প্রদান স্থগিত রাখা হয়েছে।জানা গেছে, আইসিটি বিভাগের ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন ফিরোজা নাজনীন। তিনি ১ম বর্ষের একটি কোর্সে অকৃতকার্য হয়ে রিটেক ও দুটি কোর্সে মানোন্নয়ন দিয়ে ৩.৩৮ সিজিপিএ নিয়ে উত্তীর্ণ হন। অথচ ১ম বর্ষে মানোন্নয়ন ছাড়া তার সিজিপিএ ছিল ২.৯৩। ২য় বর্ষের একটি কোর্সে মানোন্নয়নসহ ৩.৪২ সিজিপিএ পান নাজনীন। পরে ড. জাহিদ ৩য় ও ৪র্থ বর্ষের পরীক্ষা কমিটির সভাপতি হলে তার রেজাল্টে ব্যাপক পরিবর্তন হয়। ৩য় বর্ষে একটি মানোন্নয়নসহ ৩.৬৪ ও ৪র্থ বর্ষে সিজিপিএ দাড়ায় ৩.৮৪ এ। তার মাস্টার্সে ফলাফল ছিল ৩.৬৪। অন্যদিকে অন্য প্রার্থীদের তুলনায় একাডেমিক রেজাল্টে অনেক পিছিয়ে ছিলেন ফিরোজা নাজনীন। মাস্টার্সে তিনি নন-থিসিস গ্রুপের ছাত্রী ছিলেন, অথচ আরেক প্রার্থী রাকিবুল ইসলাম বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করেন। অনার্সে তার রেজাল্ট ৩.৯৫ এবং মাস্টার্সে থিসিসসহ ৩.৮৮। আরেক প্রার্থী চাঁদপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আবু রুম্মান রিফাত অনার্সে ৩.৭৮ ও থিসিসসহ মাস্টার্সে ৩.৯১ রেজাল্ট করলেও তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়নি।এছাড়া নিয়োগ বোর্ডের আগের দিন ফিরোজার স্বামী ড. জাহিদ বোর্ডের বিশেষজ্ঞ সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক চৌধুরী ফারহান আহমেদের সঙ্গে কুষ্টিয়ার দিশা টাওয়ারে সাক্ষাৎ করেন। পরে এসব ঘটনা সামনে এলে ক্যাম্পাসে তুমুল সমালোচনা শুরু হয়। পরে সংশ্লিষ্ট বিভাগে এ বিষয়ে সাংবাদিকরা তথ্য নিতে গেলে তথ্য দিতে গড়িমসি করেন বিভাগের সভাপতি। এ বিষয়ে অধ্যাপক ড. জাহিদুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, বিশেষজ্ঞ সদস্যের সঙ্গে আমি সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছি। নিয়োগের বিষয়ে আমি বিস্তারিত জানি না। ফিরোজা ছাত্রী থাকাকালে পরীক্ষা কমিটির সদস্য ছিলাম, তবে বিয়ের পরে কোনো কমিটিতে ছিলাম না। বোর্ডের বিশেষজ্ঞ সদস্য অধ্যাপক চৌধুরী ফারহান আহমেদের সঙ্গে মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল ধরেননি। তবে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ড. জাহিদের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে, তবে নিয়োগসংক্রান্ত বিষয়ে কোনো কথা হয়নি।উপাচার্য অধ্যাপক ড. একেএম মতিনুর রহমান বলেন, যে নিয়োগটির বিষয়ে অভিযোগ উঠেছে সেটি আমি যাচাই-বাছাই করে দেখব। তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো ধরনের অনিয়ম বরদাস্ত করা হবে না। অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এদিকে, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, এ ধরনের স্বজনপ্রীতি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার গুণগত মান ও স্বচ্ছতা নষ্ট করে। তারা প্রশাসনের কাছে দ্রুত তদন্ত ও দোষীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনার জন্য দীর্ঘদিন ধরেই দাবি জানিয়ে আসছেন শিক্ষার্থীরা। তারা আশা করেন, এই ঘটনার মাধ্যমে প্রশাসন কঠোর অবস্থান নেবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম রোধ করবে। ইতিমধ্যে, এই নিয়োগ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকে সরাসরি ড. জাহিদুল ইসলাম ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সমালোচনা করেছেন। তারা বলেছেন, এমন ঘটনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে বলে আশা করা যায়। ততদিন পর্যন্ত নিয়োগ স্থগিত থাকবে এবং তদন্ত চলবে। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এই ঘটনার সুষ্ঠু সমাধান দাবি করছেন। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনা না ঘটে, সেজন্য নিয়োগ নীতিমালা কঠোর করার দাবিও জানিয়েছেন তারা। উপাচার্য জানিয়েছেন, তিনি ঘটনাটি গুরুত্ব সহকারে দেখছেন এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেবেন। শিক্ষার্থীরা প্রশাসনের এই আশ্বাসকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন। এখন সবাই অপেক্ষা করছে, এই স্বজনপ্রীতির অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে প্রশাসন কী পদক্ষেপ নেয় এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম রক্ষায় এই ঘটনার সুষ্ঠু সমাধান অত্যন্ত জরুরি। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই ঘটনা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি কতটা গভীরভাবে প্রোথিত, তারই একটি উদাহরণ। এই ধরনের ঘটনা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, অন্যথায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা বাড়বে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে। এখন সময় এসেছে কঠোর হওয়ার এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার। আশা করা যায়, উপাচার্যের আশ্বাস ও তদন্তের মাধ্যমে এই ঘটনার সুষ্ঠু সমাধান হবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। সাধারণ মানুষও এই ঘটনার সুষ্ঠু সমাধান প্রত্যাশা করছেন এবং তারা বিশ্বাস করেন যে, প্রশাসন সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আশা করা যায়। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মচারীরা একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন চান। এই ঘটনা তাদের সেই দাবিকে আরও জোরালো করেছে। তারা চান, ভবিষ্যতে যেন কোনো অনিয়ম না হয় এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও ন্যায়সঙ্গত হয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত শিক্ষার্থীদের এই দাবি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার আনা। অন্যথায় ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের প্রতিবাদের সম্মুখীন হতে হতে পারে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এই ঘটনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। এটি প্রমাণ করে যে, স্বজনপ্রীতি ও অনিয়ম কোনো প্রতিষ্ঠানেই কাম্য নয়। সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া গেলে এ ধরনের ঘটনা এড়ানো সম্ভব। এখন সবাই অপেক্ষা করছে, উপাচার্যের দেওয়া আশ্বাস বাস্তবায়িত হয় কিনা এবং দোষীদের শাস্তি দেওয়া হয় কিনা। শুধু তাই নয়, ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা না ঘটে, সেজন্য কী ধরনের সংস্কার আনা হয়, সেদিকেও নজর দিতে হবে। সব মিলিয়ে, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঘটনা শিক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। এখন সময় এসেছে এই বিষয়গুলোতে গুরুত্ব দেওয়ার এবং কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার। তা না হলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাবে এবং সমাজে অসন্তোষ বাড়বে। সুতরাং, এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে সবার উচিত সতর্ক হওয়া এবং আইন মেনে চলা। এটাই ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মচারীদের প্রত্যাশা। তারা চান, একটি সুন্দর, স্বচ্ছ ও ন্যায়বিচারপূর্ণ শিক্ষা পরিবেশ তৈরি হোক। এই প্রত্যাশা পূরণে প্রশাসনকে আরও সক্রিয় ও দায়িত্বশীল হতে হবে। আশা করা যায়, তারা সফল হবে এবং ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় আবারও তার ঐতিহ্য ও মর্যাদা ফিরে পাবে। অন্যথায়, এই ধরনের ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তিকে দাগ দিতে থাকবে। এখন সময় কাজ করার, শুধু কথা বলার নয়। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব। অন্তত এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে সবাই যেন এগিয়ে আসে, সেটাই প্রত্যাশা।
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্ব সংরক্ষিত গণবার্তা