প্রিন্ট এর তারিখ : ০৬ জুলাই ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৬ জুলাই ২০২৬
মেয়েকে জোর করে বিয়ে ও ২০ লাখ টাকা দাবি, সহ্য করতে না পেরে বাবার আত্মহত্যাা
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গীতে অষ্টম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রীকে জোর করে তুলে নিয়ে বিয়ে এবং পরে তার বাবার কাছে ২০ লাখ টাকা চাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিকভাবে হেয়, মারধর ও লাগাতার হুমকি-ধমকি সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন মেয়েটির বাবা আবুল কাসেম (৪২)। রোববার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে উপজেলার দুওসুও ইউনিয়নের নিজ বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠায়। নিহত আবুল কাসেম পেশায় একজন মুদি দোকানি ছিলেন।পরিবারের অভিযোগ, একই এলাকার রফিজুল ইসলামের ছেলে সাইফুল ইসলাম গত ২৫ জুন স্কুলে যাওয়ার পথে আবুল কাসেমের অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়েকে একটি অটোরিকশায় তুলে নিয়ে যান। পরে ঠাকুরগাঁও শহরে নিয়ে গিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে বিভিন্ন কাগজে সই করিয়ে জোরপূর্বক বিয়ে করেন। এতে রাজি না হলে তার বাবা ও ছোট ভাইকে হত্যা করার হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছে ওই স্কুলছাত্রী। স্কুলছাত্রীর ভাষ্য, ঘটনার পর বিষয়টি কাউকে না জানাতে তাকে চাপ দেওয়া হয়। কিন্তু ১ জুলাই বিষয়টি জানাজানি হলে সাইফুল ইসলাম মেয়েকে তার বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া এবং সঙ্গে ২০ লাখ টাকা দাবি করেন। এ দাবিতে রাজি না হওয়ায় আবুল কাসেমকে বাড়ির সামনে মারধর এবং পরিবারকে এলাকাছাড়া করা হয় বলেও অভিযোগ স্বজনদের।নিহতের স্ত্রী লাবণী আক্তার বলেন, ‘সাইফুল ও তার লোকজনের ভয়ে আমরা চার দিন ধরে ভগ্নিপতির বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলাম। তারা বারবার ফোন করে মেয়ে ও ২০ লাখ টাকা চাইছিল। রোববার সকালে আমার স্বামী বাড়িতে আসেন। পরে দেখি ঘরের দরজা বন্ধ। দরজা ভেঙে দেখি তিনি গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন।’ আবুল কাসেমের ভাই আবুল কালাম বলেন, ‘ভয়, অপমান ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরেই আমার ভাই আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। আমরা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত সাইফুল ইসলামকে বাড়িতে পাওয়া যায়নি। তার স্ত্রী রুবা আক্তার বলেন, ‘আমার স্বামী বাড়িতে নেই। যতদূর জানি, তিনি ওই স্কুলছাত্রীকে বিয়েও করেননি।’ এ বিষয়ে বালিয়াডাঙ্গী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বুলবুল ইসলাম বলেন, ‘মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, মেয়েকে কেন্দ্র করে প্রতিবেশীদের সঙ্গে সৃষ্ট একটি ঘটনার জেরে ওই ব্যবসায়ী আত্মহত্যা করেছেন। পরিবার আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’এ ঘটনার পর এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। নিহতের পরিবার ও স্থানীয়রা দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, আবুল কাসেম অত্যন্ত শান্তশিষ্ট মানুষ ছিলেন। তার এমন মৃত্যু মেনে নেওয়া কঠিন। পুলিশ জানিয়েছে, তারা অভিযোগের সত্যতা যাচাই করছে এবং সাইফুল ইসলামের সন্ধানে অভিযান চলছে। ভুক্তভোগী স্কুলছাত্রী এখন পরিবারের সঙ্গে আছেন। তার শারীরিক ও মানসিক অবস্থা খারাপ বলে জানিয়েছে পরিবার। তিনি এখনও ঘটনার আঘাত কাটিয়ে উঠতে পারেননি। পরিবার সদস্যরা জানিয়েছেন, তারা সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেবেন। তারা চান, এ ধরনের ঘটনা যাতে আর কখনো না ঘটে। পুলিশ আশ্বস্ত করেছে, তারা এই ঘটনার তদন্ত করবে এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনবে। ইতিমধ্যে, এলাকায় পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে যাতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ঘটনা ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে। অনেকেই নিহতের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন এবং দোষীদের শাস্তি দাবি করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন, সমাজে নারী নির্যাতন ও জোরপূর্বক বিয়ের ঘটনা বাড়ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের ঘটনা রোধে আইনি পদক্ষেপ জোরদার করতে হবে এবং সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে হবে। অভিভাবকদের তাদের সন্তানদের নিরাপত্তার বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের অন্যান্য সংগঠনগুলোকেও এ বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। ঠাকুরগাঁওয়ের এই ঘটনা সবার জন্য একটি শিক্ষণীয় বিষয়। আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে সবাইকে চলতে হবে এবং কোনো অন্যায় দেখলে কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। তবেই সমাজে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় থাকবে। পুলিশ জানিয়েছে, তারা এই ঘটনার রহস্য উদঘাটনে কাজ করছে এবং দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করবে। এলাকাবাসীও তাদের সহযোগিতা করবে বলে জানিয়েছে। সব মিলিয়ে, ঠাকুরগাঁওয়ের এই ঘটনা একটি মর্মান্তিক অধ্যায়। তবে আশা করা যায়, পুলিশের তদন্তে অপরাধীদের শনাক্ত করে শাস্তি দেওয়া হবে এবং এলাকায় শান্তি ফিরে আসবে। এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে সবাই যেন আইন মেনে চলে এবং কাউকে অন্যায়ভাবে শাস্তি না দেয়, সেটাই প্রত্যাশা। অন্যথায় আইনের শাসন খর্ব হবে এবং সমাজে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়বে। তাই সবাইকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে এবং আইনি প্রক্রিয়ায় বিশ্বাস রাখতে হবে। তবেই একটি সুশৃঙ্খল সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। ঠাকুরগাঁওয়ের এই ঘটনা সবার জন্য একটি সতর্কবার্তা। এখন সময় এসেছে, সবাই মিলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় কাজ করার। তাহলেই এ ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা এড়ানো সম্ভব হবে। সাধারণ মানুষও যদি আইন হাতে তুলে নেয়, তাহলে সমাজে অরাজকতা তৈরি হবে। তাই সবার উচিত আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া এবং প্রশাসনের ওপর আস্থা রাখা। শুধু তখনই ন্যায়বিচার সম্ভব। সেজন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং সমাজে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সহায়তা করতে হবে। আইন নিজের হাতে তুলে নিলে তার পরিণতি মারাত্মক হতে পারে, যা এই ঘটনায় প্রমাণিত হয়েছে। তাই সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে এবং আইনি পথে সমস্যার সমাধান করতে হবে। তা না হলে আরও বেশি মানুষ এ ধরনের ঘটনার শিকার হবেন। এটাই বাস্তবতা। এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে সবাই যেন সচেতন হয় এবং আইন মেনে চলে, সেটাই প্রত্যাশা।
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্ব সংরক্ষিত গণবার্তা