প্রিন্ট এর তারিখ : ০৬ জুলাই ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৬ জুলাই ২০২৬
যে মেকানিক শুধু মোবাইল নয়, এক বাবার ভাঙা হৃদয়ও জোড়া দিয়েছিলেনা
চিত্র বিচিত্র ডেস্ক ||
বসুন্ধরা সিটিতে আজ সকালে যে দৃশ্য দেখেছি, তা ভুলবো না কোনোদিন। ভদ্রলোক আসছেন মোবাইল মেরামত করতে। বাড়ি টাঙ্গাইল। বয়সী লোক। এদিকে আমিও আমার মোবাইল ঠিক করতে এসেছি। ভদ্রলোকের সিরিয়াল আমার পরে। পায়ে প্লাস্টিক দুই ফিতার স্যান্ডেল। পুরনো প্যান্ট। শার্টটার বয়স কত, তিনি আর মাবুদ জানেন। মুখে দাড়ি। শুভ্র চেহারা। কয়েক দোকান ঘুরে এসেছেন। দাঁড়িয়ে আছেন। হাতে অ্যান্ড্রয়েড ফোন। তার চোখে-মুখে দুশ্চিন্তা। বললেন, আমার মোবাইলটা একটু ঠিক করে দেবেন?মেকানিক বললেন, আগে ইনারের কাজ হোক। আপনি বসেন। তিনি চুপ করলেন। দুই মিনিট পর আবার বললেন, আমার এই ফোন ঠিক হবেতো!মেকানিক বললেন, অবশ্যই হবে। ডিসপ্লে আঠা দিয়ে লাগিয়ে দিতে হবে। আর ব্যাটারি পাল্টালেই হবে।লোকটা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। এদিকে আমাদের এই মেকানিক বসুন্ধরার ভাবসাবে কিনা জানি না। মেজাজ একটু কড়া। আমাকেই পারলে ধমক দেয়। আমি নিজেই মেপে মেপে কথা বলছি। ভাবছি স্যার বলবো নাকি হুজুর বলবো। জি হুজুর, জি। আপনার দয়ার হাত দিয়ে একটু মোবাইলটা স্পর্শ করুন। জি স্যার, জি। সবই আপনার মর্জি।এদিকে সে লোক আবার প্রশ্ন করলেন। মোবাইল যদি ঠিক না হয়, খুব ঝামেলা হবে। আমার ছেলের মোবাইল। দুদিন ধরে রাগ করে আছে। এটা ব্যবহার করতে চায় না। নতুন মোবাইল চায়। অনেক কষ্টে আসছি সেই টাঙ্গাইল থেকে। ওইখানে ঠিক করতে পারিনি। একটু ভালো করে দেখে দেন না!এবার মেকানিক ধমক দিতে গিয়েও দিলেন না। একবার বৃদ্ধের মুখের দিকে তাকালেন। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে বললেন, চাচা আপনি ওই টুলটায় বসেন। কোনো টেনশন নিবেন না। যা করার করছি। একটু পর সে লোক আবার বললেন, একটু কমে-সমে ঠিক করে দিয়েন কিন্তু বাজে না। নিজের লোক মনে করে। এইটা ঠিক না করলে আরেকটা কেনা লাগবে। আমার পক্ষে আর সম্ভব না। ছেলে বড় হইছে, অনেক রাগ তার।লোকটার সরল কথায় আমারও একটু কেমন যেন লাগলো। কিছু বললাম না। আমিতো সারা জীবন সুখ-দুঃখের দর্শকই থেকে গেলাম।কিছুক্ষণ পর মেকানিক তাকে বললেন, চাচা আপনার মোবাইলের ব্যাটারি পাল্টানো লাগবে। দাম একটু বেশি পড়বে। লোকটা এই কথা শুনে উঠে এলেন। মেকানিকের কানের কাছে মুখ নিয়ে বললেন, কোনো রকম কি ঠিক করা যায় না? আসলে ছেলেকে মোবাইল কিনতে না করছিলাম। কিন্তু পোলাপানতো বাপেরে বুঝতে চায় না। কিনে দিছিলাম। কোনোরকম কমের মধ্যে একটু যদি ঠিক করে দেন বাবাজি।মেকানিক বললেন, আমি নাহয় সার্ভিস চার্জ নিলাম না। কিন্তু বাকি খরচ?লোকটা দম ছেড়ে আস্তে করে বললেন, আচ্ছা তাইলে যেটা ভালো হয়, একটু করে দেন। আমিতো বুঝি না। ছেলের নাকি মোবাইল ছাড়া অসুবিধা হয়।আহারে কী অসহায়ের মতো উত্তর! ধারণা করলাম ছেলের কারণে তিনি এই কষ্টটা করছেন। ছেলে সম্ভবত জেদি। নইলে এই বয়সে একজন বাবা এভাবে এতদূর আসেন, এভাবে কাকুতি-মিনতি করেন?তার বাটন ফোনে কল এলো। সম্ভবত তার স্ত্রী। ধরেই একটু দূরে গিয়ে বলতে লাগলেন, পোলাটারে একটু বুঝাও। এত রাগ ভালো না। আমাগো কি এতো সামর্থ্য আছে? বাড়ি থেকে বাসে দাঁড়ায়ে আসছি ঢাকা পর্যন্ত। শরীরে কুলায় না। যাক, মোবাইল ঠিক করতে দিছি। অসুবিধা নাই। তোমরা খাওয়া-দাওয়া করে নিও।লোকটা ভেতরে এলেন কথা শেষে। আরও অনেক কিছুই ফোনে বললেন।মেকানিক তাকে ডাকলেন। চাচা এদিকে আসেন। বলেই তিনি দোকানের কর্মচারীকে বললেন, এই চাচাকে বসতে দাও। আর একটা কফি এনে দাও। লোকটা লজ্জা পেলেন। বললেন, না না বাবা কিছু লাগবেনা। আপনি একটু ভালো করে ঠিক করে দেন তাইলেই হবে।মেকানিক বললেন, চাচা অস্থির হবেন না। আমি আপনার ছেলের বয়সী। আপনি কফি খান। একটু জিরায় নেন। টেনশন করেন না।যে মেকানিককে খুব ভাবওয়ালা ভেবেছিলাম, তার এই ব্যবহার আমাকে মুগ্ধ করে দিল।মোবাইল ঠিক হলো।আমার মুগ্ধতার পালা শুরু নতুন করে।মেকানিক কোনো টাকা নিলেন না। বৃদ্ধকে বললেন, চাচা এই নেন মোবাইল। সব ঠিক আছে।বৃদ্ধ ব্যাপক খুশি। পকেট থেকে টাকা বের করছেন। মেকানিক বললেন, না টাকা লাগবেনা। আপনি যান চাচা, বাড়ি যান।মুরব্বি ভেবাচেকা খেলেন বুঝি! বললেন, না না। কী বলেন, বিল নেন।মেকানিক বললেন, আহা চাচা, বললাম তো লাগবে না। আপনি ধীরে-সুস্থে বাসায় যান। দুপুরে খেয়েছেন কিছু?ভদ্রলোক বললেন, আমি অনেক খুশি বাপজান। আমার খাওয়া লাগবে না। ঠিক আছে, ভালো থাকেন। অনেক দোয়া করি আপনার জন্য। মেকানিক ঝিম মেরে বসে রইলেন।লোকটা মনের আনন্দে চলে গেলেন। বার বার পেছন ফিরতে চান। হয়তো মেকানিকের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে চান। তার ছেলে না বুঝুক, এই মেকানিক যুবকটা এক বাবার দুঃখ বুঝেছে।ব্যাপক কৌতূহল নিয়ে মেকানিককে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি কোনো চার্জ, এমনকি ব্যাটারির দামও নিলেন না কেন?যুবকটা চোখ টিস্যু দিয়ে মুছে বললেন, লোকটাকে দেখেই বুঝছেন কী যন্ত্রণায় আছেন। তার ছেলে তার সাথে খারাপ ব্যবহার করে, বুঝায় যায়। আর্থিক অবস্থাও ভালো না।বললাম, আমিও তাই বুঝেছি।মেকানিক বললেন, আমারতো বাবা নেই। আমি বুঝি বাপ থাকার কী মর্ম। আমার কয়েকশ টাকা গেছে যাক। তার মনে আনন্দ এনে দিতে পারছি, এটাই আমার শান্তি। কত টাকা আসবে-যাবে রে ভাই...মেকানিক তার কাজে মন দিলেন। আমি তাকিয়ে আছি। আমার এই তাকানোয় একই সঙ্গে বিস্ময় যেমন আছে, মুগ্ধতা ও ভালোলাগাও আছে।মোবাইলের হার্ডওয়্যারই জোড়া দিলেন না শুধু এই মেকানিক, জোড়া দিলেন কোনো এক বাবার হৃদয়ে হারাতে বসা সুখও।
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্ব সংরক্ষিত গণবার্তা