প্রিন্ট এর তারিখ : ০৯ জুলাই ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৯ জুলাই ২০২৬
আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত, নিষিদ্ধ হতে পারে দলটিা
নিউজ ডেস্ক ||
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের আওতায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ, নিবন্ধন বাতিল এবং সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার সুযোগ রয়েছে—যে বিধান আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ই আইনে যুক্ত হয়েছিল। ফলে নিজেদের প্রণীত আইনের আওতায়ই দলটির বিচার ও সম্ভাব্য নিষিদ্ধ হওয়ার প্রশ্ন সামনে এসেছে।ট্রাইব্যুনালসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ১৯৭৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারই প্রণয়ন করে। ২০১৩ সালে ২ নম্বর ধারা সংশোধন করে 'অরগানাইজেশন' বা 'সংগঠন' শব্দটি যুক্ত করে আওয়ামী লীগই। এখন এই আইনেই রাজনৈতিক দল হিসাবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের লক্ষ্যে এগোচ্ছে বর্তমান সরকার। অর্থাৎ আওয়ামী লীগের করা আইনেই ফেঁসে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ।আইনজ্ঞরা বলেছেন, জার্মানিসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন নাৎসি বাহিনী নৃশংস অত্যাচার চালিয়েছিল। ১৯৪৫-৪৬ সালে নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালে নাৎসি নেতৃত্ব ও বাহিনীর বিচার করা হয়, যা আন্তর্জাতিক আইনের ইতিহাসে একটি মাইলফলক। তারা বলেন, বিদ্যমান ট্রাইব্যুনাল আইনেই আওয়ামী লীগের বিচার করা সম্ভব। বিচারে অপরাধ প্রমাণিত হলে নিষিদ্ধ হতে পারে দলটি।আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ক আনসার উদ্দিন খান পাঠান বলেন, 'অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রাজনৈতিক দল হিসাবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনে ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেছিল জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম)। আবেদনটি তদন্ত সংস্থায় আসার পর সংস্থার একটি টিম তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছে।' তিনি জানান, স্বাধীন বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের দ্বারা যত অপরাধ কর্মকাণ্ড হয়েছে তার তদন্ত হচ্ছে। বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর, আমরা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছি।২০২৫ সালের ১০ মে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন সংশোধন করে অধ্যাদেশ জারি করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এতে কোনো রাজনৈতিক দল, তার অঙ্গসংগঠন বা সমর্থক গোষ্ঠীকে শাস্তি দিতে পারবেন ট্রাইব্যুনাল। আইনে সংগঠন শব্দটির সংজ্ঞায়নও করা হয়েছে—সংগঠন বলতে যে কোনো রাজনৈতিক দলকেও বোঝাবে। পাশাপাশি দলের অধীন, সম্পর্কিত বা সংশ্লিষ্ট কোনো সংগঠন অথবা গোষ্ঠীকে বোঝাবে।স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, 'রাজনৈতিক দল হিসাবে আওয়ামী লীগের বিচার দাবি করেছি আমরা, অন্যরাও দাবি করেছেন। তদন্ত হচ্ছে। ইনশাআল্লাহ, খুব শিগগির রাজনৈতিক দল হিসাবে তাদের বিচারের কাঠগড়ায় নিয়ে যাওয়া হবে।'ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, 'আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে প্রাথমিক অভিযোগ পাওয়া গেলে দলটির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার সুযোগ আছে।' তিনি আরও বলেন, 'আওয়ামী লীগ সরকার প্রথম আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন ১৯৭৩ প্রণয়ন করে। ২০১৩ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধ আইন সংশোধন করে সেখানে "অরগানাইজেশন" শব্দটি যোগ করা হয়।'সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, 'আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিদ্যমান আইনেই আওয়ামী লীগের বিচার করা সম্ভব। দলকে তো আর সাজা দেওয়া যাবে না। কিন্তু দলকে কী ধরনের সাজা দেওয়া যাবে তা ট্রাইব্যুনালের সংশোধিত আইনে বলা আছে। যেমন, দলকে নিষিদ্ধ করা, নিবন্ধন বা লাইসেন্স স্থগিত করা; অথবা সম্পত্তি জব্দ করার নির্দেশনা ইস্যু করা।'সুপ্রিমকোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, 'এই বিচারের পেছনে অন্য উদ্দেশ্য থাকতে পারে। আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে চাপে রাখতে অথবা নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে বিচারের আওতায় আনা হতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত বিচারে নিষিদ্ধ হলেও আওয়ামী লীগ অন্য নামে আসতে পারে, এতে কোনো বাধা দেখছি না।'উল্লেখ্য, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে 'বন্দুকযুদ্ধ' বা 'ক্রসফায়ার'-এর নামে অন্তত ১ হাজার ৯২৬ জন বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন। এছাড়া জাতিসংঘের প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে এক হাজার ৪০০ জন নিহত হয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে দেড় হাজার মানুষকে হত্যা এবং ২৫ হাজার মানুষকে আহত করার নির্দেশদাতা হিসাবে পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্ব সংরক্ষিত গণবার্তা