প্রিন্ট এর তারিখ : ২২ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে যাত্রী হত্যা, লাশ উদ্ধার ও তিন আসামি গ্রেপ্তারা
গণবার্তা প্রতিবেদনঃ ||
২০২৬ সালের ৪ সেপ্টেম্বর শুক্রবার সকাল পৌনে ৯টার দিকে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বনানী অংশে একটি অজ্ঞাত ব্যক্তির মরদেহ পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয় লোকজন পুলিশকে খবর দেন। বনানী থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করে। মৃত ব্যক্তির মুখ ও দুই হাতে স্কচটেপ (আঠালো টেপ) পেঁচানো ছিল এবং গলায় কালো দাগ দেখা যায়, যা শ্বাসরোধের ইঙ্গিত দেয়। প্রাথমিক সুরতহাল শেষে ময়নাতদন্তের জন্য লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।প্রথমে মৃতের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। তাঁর গায়ে ছিল সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকদের ইউনিফর্মের মতো নীল রঙের শার্ট ও পরনে লুঙ্গি। পরে পুলিশ তথ্যপ্রযুক্তি ও আঙুলের ছাপ (ফিঙ্গারপ্রিন্ট) ব্যবহার করে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করে। তিনি হলেন ইসমাইল হোসেন (৪৯/৫০) — জামালপুর সদর উপজেলার হবদেশ গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর ছেলে মো. হাসান ও পরিবারের সদস্যরা মরদেহের ছবি দেখে তাঁকে শনাক্ত করেন। এরপর ইসমাইলের ছেলে বাদী হয়ে বনানী থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন।ইসমাইল হোসেন আগে গাজীপুরের ডেল্টা স্পিনিং মিলে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। প্রায় ৯ মাস আগে অসুস্থতার কারণে চাকরি ছেড়ে দেন। পরে স্ত্রী, দুই সন্তান ও পুত্রবধূকে নিয়ে কিছুদিন কাশিমপুরে থাকলেও চার মাস আগে স্থায়ীভাবে জামালপুরের গ্রামের বাড়িতে ফিরে যান। তবে তাঁর স্ত্রী, মেয়ে শারমিন ও ছেলে হাসান তাঁর পরিবারসহ গাজীপুরে থাকতেন।ইসমাইলের ছেলে মো. হাসান সংবাদমাধ্যমকে জানান, তাঁর ছোট বোন শারমিনের বিয়ের তারিখ চূড়ান্ত করতেই বাবা জামালপুর থেকে গাজীপুরের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন। সম্প্রতি তিনি ১১ শতাংশ জমি প্রায় ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি করেন। সেই টাকা থেকে ২ লাখ টাকার পুরোনো ঋণ শোধ করেন এবং গ্রামের বাড়িতে কিছু টাকা দিয়ে ঘর তোলেন। সব খরচ বাদে তাঁর কাছে প্রায় ৫ লাখ টাকা ছিল — যা তিনি মেয়ের বিয়ের খরচের জন্য নিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁর কাছে একটি অ্যান্ড্রয়েড ও একটি বাটন (ফিচার) ফোনও ছিল।ঘটনার পূর্ববর্তী রাতে (বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর) রাত ১১টার দিকে পরিবারের সঙ্গে তাঁর শেষবার ফোনে কথা হয়। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত সাড়ে ৩টার দিকে তিনি জামালপুর থেকে গাজীপুরের জিরানীগামী বাসে ওঠেন। তাঁর সকালে পৌঁছানোর কথা ছিল। কিন্তু যখন তিনি না পৌঁছান, তখন তাঁর ছেলে বারবার মুঠোফোনে কল দিয়ে বন্ধ পান। এরই মধ্যে বনানী থানা থেকে গ্রামের পুলিশ ফাঁড়ির মাধ্যমে পরিবারকে মৃত্যুর খবর জানানো হয়।লাশ উদ্ধারের পর পুলিশ দ্রুত তদন্ত শুরু করে। তারা ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বিভিন্ন সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে পর্যালোচনা করে। ফুটেজ বিশ্লেষণে একটি যাত্রীবাহী বাসের গতিবিধি সন্দেহজনক মনে হয়। পুলিশ সেই বাস শনাক্ত করে এবং জামালপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালায়।অভিযানের একপর্যায়ে মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে ‘রাজ ক্লাসিক’ নামের বাসটি জব্দ করা হয়। একই সময় বাসের সুপারভাইজার সাজু ওরফে লিমন (২৬) ও সহকারী (হেলপার) মো. মনির হোসেন (১৯) -কে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে পৃথক অভিযানে গ্রেপ্তার হন বাসচালক সোহেল রানা (৪১)।আজ (রোববার) রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) মো. ফারুক হোসেন তদন্তের বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি বলেন, গ্রেপ্তার তিন আসামি জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তাদের দেওয়া ঘটনার বিবরণ নিম্নরূপ:৪ সেপ্টেম্বর ভোর সাড়ে ৪টার দিকে জামালপুর থেকে ইসমাইল ‘রাজ ক্লাসিক’ বাসে ওঠেন।একপর্যায়ে সুপারভাইজার সাজু ইসমাইলের কাছে বাসভাড়া চান। ইসমাইল তাঁর লুঙ্গির কোচর (ভাঁজ) থেকে টাকা বের করে ভাড়া দেন।তখন সাজুর ধারণা হয় যে ইসমাইলের কাছে আরও অনেক টাকা আছে। তিনি বিষয়টি বাসচালক সোহেলকে জানান। সোহেলও একই ধারণা পোষণ করেন।এরপর তারা ইসমাইলের কাছ থেকে টাকা কেড়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করে। তারা ইসমাইলকে গাজীপুরে নামাননি; বরং অন্য যাত্রীদের গাজীপুরের বিভিন্ন জায়গায় নামিয়ে দেন।পরে সাজু ও সহকারী মনির মিলে ইসমাইলের দুই হাত স্কচটেপ দিয়ে বেঁধে ফেলেন এবং তাঁর নাক-মুখও স্কচটেপ দিয়ে আটকে দেন। এরপর গামছা গলায় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত করেন।তারপর তারা ইসমাইলের মরদেহ ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বনানী অংশে ফেলে দিয়ে বাস নিয়ে মহাখালী বাস টার্মিনালে চলে যান।পুলিশ আসামিদের কাছ থেকে হত্যায় ব্যবহৃত দুটি গামছা, রক্তমাখা দুটি আসনের কভার ও একটি মুঠোফোন জব্দ করেছে। বাসটিও জব্দকৃত সম্পদের তালিকাভুক্ত।সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয় যে, গ্রেপ্তার তিন আসামির মধ্যে সাজু ওরফে লিমনের বিরুদ্ধে দুটি ডাকাতির মামলা রয়েছে। বাসচালক সোহেল রানার বিরুদ্ধে দুটি ডাকাতি ও দুটি মাদক মামলা রয়েছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে দুটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও রয়েছে। সহকারী মনিরের বিরুদ্ধে অন্য কোনো অপরাধের প্রাথমিক তথ্য উল্লেখ করা হয়নি।ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার ফারুক হোসেন বলেন, তদন্তে তারা এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করতে পেরেছেন এবং গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ইসমাইলের মোবাইল ফোন ও সঙ্গে থাকা ৫ লাখ টাকা উদ্ধারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।এ ঘটনায় নিহতের পরিবার সঠিক বিচার পাওয়ার আশা করছেন। পুলিশ বলছে, সিসিটিভি ফুটেজ, আঙুলের ছাপ ও আসামিদের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে মামলার প্রস্তুতি সম্পন্ন হচ্ছে।
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্ব সংরক্ষিত গণবার্তা