প্রিন্ট এর তারিখ : ১৭ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৭ অক্টোবর ২০২৬
নেত্রকোনায় সাংবাদিক আলিফকে ছয়টি গুলি, হত্যা মামলা দায়েরা
গণবার্তা প্রতিবেদনঃ ||
নেত্রকোনা: নেত্রকোনার দুর্গাপুরে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান ফকির আলিফের (৪৪) লাশের ময়নাতদন্তে শরীরে ছয়টি গুলির আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এর মধ্যে পাঁচটি গুলি শরীর ভেদ করে বেরিয়ে গেলেও একটি গুলি পিঠের ভেতরে আটকে ছিল। এ ঘটনায় দুর্গাপুর থানায় হত্যা মামলা করা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার রাতে আলিফের স্ত্রী আনন্দিতা সাংমার করা মামলায় সাত থেকে আটজনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।গতকাল শুক্রবার বিকেলে নেত্রকোনা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট আধুনিক সদর হাসপাতালের মর্গে আলিফের লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। এরপর নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের সুনই গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে লুৎফুজ্জামানের মরদেহ দাফন করা হয়। মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমেদ খান। তিনি বলেন, আসামিদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক শ্রদ্ধ্যানন্দ নাথ সাংবাদিকদের জানান, লুৎফুজ্জামানের বুকে তিনটি গুলির আঘাত রয়েছে। এর মধ্যে দুটি গুলি শরীর ভেদ করে বেরিয়ে গেছে। অন্যটি পিঠের ভেতরে আটকে ছিল। এ ছাড়া কপালের ডান পাশ দিয়ে ঢুকে একটি গুলি মাথার পেছন দিক দিয়ে বেরিয়ে যায়। বাকি দুটি গুলির একটি মাথার ওপরের অংশের চামড়া এবং অন্যটি ডান কাঁধের পাশের চামড়া ভেদ করে বেরিয়ে গেছে। ক্ষতের ধরন বিশ্লেষণ করে ওই চিকিৎসক প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন, আলিফকে সামনের দিক থেকে পিস্তল দিয়ে গুলি করা হয়েছিল।বেসরকারি আইপি টেলিভিশন চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোনা প্রতিনিধি ছিলেন লুৎফুজ্জামান। পাশাপাশি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন তিনি। সেখানে বিভিন্ন অনিয়ম ও অপরাধের বিষয়ে লেখালেখির পাশাপাশি ভিডিও প্রকাশ করতেন। তিনি কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের সুনই গ্রামের মহব্বত আলী ফকিরের ছেলে। থাকতেন তেলনজিয়ায় শ্বশুরবাড়িতে।স্ত্রীর সঙ্গে শেষ কথাগতকাল বৃহস্পতিবার রাত পৌনে আটটার দিকে দেড় বছর বয়সী ছেলে আইয়ান সাফয়ানকে স্ত্রীর কোলে দিয়ে বাড়ি থেকে বের হন লুৎফুজ্জামান। বের হওয়ার আগে স্ত্রী আনন্দিতা সাংমাকে বলেছিলেন, “বাচ্চাদের ভাত খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দাও। আমার আসতে একটু দেরি হবে, একটা নিউজ নিয়ে ব্যস্ত আছি।” কে জানত, সেটিই হবে স্ত্রীর সঙ্গে তার শেষ কথা। রাতের খাবার খেয়ে দুই সন্তানকে নিয়ে অপেক্ষায় ছিলেন স্ত্রী। এর মধ্যে শুনলেন স্বামীর মৃত্যুসংবাদ।স্বামীকে হারিয়ে ভেঙে পড়েছেন আনন্দিতা। ছেলেকে কোলে নিয়ে স্বামীর মরদেহের পাশে বসে কেঁদে কেঁদে তিনি বলেন, “এভাবে যে একজন মানুষকে কিছুক্ষণের মধ্যেই গুলি করে মেরে ফেলবে, তা আমি কখনো ভাবতে পারিনি। বাচ্চাদের যখন ভাত খাওয়াচ্ছিলাম, তখন গুলির শব্দ পেয়ে প্রথমে ভাবছিলাম কেউ হয়তো ফটকা ফুটাচ্ছে। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই মানুষ বলাবলি করল, তাকে মেরে ফেলছে।”স্বামী হত্যার বিচার চেয়ে আনন্দিতা বলেন, “আমি তো আমার স্বামীকে আর ফিরে পাব না। তবে যারা তাকে হত্যা করেছে, আমার অবুঝ দুটি শিশুকে পিতৃহারা করেছে, পুলিশ তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনুক। তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।” তাদের দুই সন্তান—চার বছর বয়সী মেয়ে প্রান্তি ও দেড় বছর বয়সী ছেলে আইয়ান সাফয়ান।যেভাবে হত্যা করা হয়প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, রাত আটটার দিকে তেলনজিয়া এলাকায় একটি চায়ের দোকানে চা পান করেন আলিফ। চা খেয়ে বিরিশিরি উতরাইল বাজারের উদ্দেশে বের হন। নিজের মুঠোফোন দোকানে ফেলে যাওয়ার বিষয়টি বুঝতে পেরে মিনিট তিনেকের মধ্যে আবার ফিরে আসেন। মুঠোফোন নিয়ে বের হওয়ার সময় দুই যুবক ওই দোকানে এসে দোকানদারের কাছে সিগারেট চান। এরপর আলিফকে লক্ষ্য করে পরপর কয়েকটি গুলি ছোড়েন তারা। গুলির শব্দ শুনে স্থানীয় লোকজন ছুটে এলে ওই দুই যুবক দৌড়ে পালিয়ে যান। পরে তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।তেলনজিয়ার ওই দোকানি রবিন রাংসা বলেন, “আমি তখন চায়ের কাপ ধুচ্ছিলাম। লুৎফুজ্জামান চা খেয়ে যাওয়ার সময় মুঠোফোন ফেলে যাওয়ায় আবার ফিরে আসেন। তিনি ফোন নিয়ে বের হওয়ার সময় দুই যুবক এসে আমার কাছে সিগারেট চায়। এরপর লুৎফুজ্জামানকে গুলি করে। আমি পরপর চারটি গুলির শব্দ শুনেছি। ভয়ে বাসায় গিয়ে ঢুকে পড়ি।” তার ভাষ্য, দুই যুবকের বয়স ৩০ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে হবে। একজনের পরনে লুঙ্গি, অন্যজনের পরনে থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট ছিল। কাছ থেকেই গুলি করা হয়েছে।লুৎফুজ্জামানের ফুফুশাশুড়ি নিরালা রেমা ও রুলি রেমা জানান, তারা তখন ঘরের বারান্দায় বসে গল্প করছিলেন। হঠাৎ বিকট আওয়াজ শুনে দোকানের কাছে গিয়ে দেখেন লুৎফুজ্জামানের নিথর দেহ মাটিতে পড়ে রয়েছে। তার মাথা, গলা ও বুক থেকে রক্ত ঝরছে।পুলিশের তৎপরতাঘটনার পর পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে জানিয়েছিলেন, প্রাথমিকভাবে এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে ধারণা করা হচ্ছে। হত্যায় জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক ইউনিট কাজ করছে। ঘটনাস্থল থেকে পিস্তলের গুলির খোসা ও একটি অবিস্ফোরিত গুলি উদ্ধার করা হয়েছে।ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মাহফুজা খাতুন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) হাফিজুল ইসলাম, দুর্গাপুর থানার ওসি খন্দকার শাকের আহমদ খান এবং দুর্গাপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আহমেদ সাদাতসহ পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা।পুলিশ জানায়, হত্যাকাণ্ডের পর জেলার সব থানাকে সতর্ক করা হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে বসানো হয়েছে চেকপোস্ট। আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।আগেও হামলার শিকারএর আগে গত বছরের ১০ নভেম্বর দুপুরে দুর্গাপুর উপজেলার সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাট এলাকায় দুর্বৃত্তরা লুৎফুজ্জামানকে কুপিয়ে জখম করেছিল। ওই সময় তার সঙ্গে থাকা এক সহকর্মী বাধা দিতে গেলে তাকেও অস্ত্র দেখিয়ে ধাওয়া করা হয়। ঘটনা আলিফ বাদী হয়ে মামলা করলে পুলিশ নাম উল্লেখ করা দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করে। বর্তমানে তারা জামিনে মুক্ত রয়েছে।আলিফের বড় ভাই শহীদ ইসলাম ফকির বলেন, সাংবাদিকতা করার কারণে তার ভাইয়ের অনেক শত্রু হয়েছিল। তার ভাইকে নির্মমভাবে হত্যার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন তিনি।
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্ব সংরক্ষিত গণবার্তা