ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার ও দেশটির সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন। শুক্রবার ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, ফোনালাপে তারা আঞ্চলিক পরিস্থিতি ও যুদ্ধবিরতি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে আলোচনা করেছেন। পৃথক এক প্রতিবেদনে তাসনিম জানায়, ইরাকের আধা-স্বায়ত্তশাসিত কুর্দিস্তানের প্রেসিডেন্ট নেচিরভান বারজানির সঙ্গেও ফোনে কথা বলেছেন আরাঘচি। তারাও আঞ্চলিক নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের এই ফোনালাপের কয়েক ঘণ্টা পরেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিতীয় দফার আলোচনায় অংশ নিতে আজ শুক্রবার গভীর রাতে একটি ইরানি প্রতিনিধিদল ইসলামাবাদে পৌঁছাবে বলে জানিয়েছে পাকিস্তানি সূত্র। সূত্রের বরাতে পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম ডন জানিয়েছে, এবারের আলোচনার জন্য ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির নেতৃত্বে একটি ছোট প্রতিনিধি দল ইসলামাবাদে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে একটি নিরাপত্তা দল ইতিমধ্যেই ইসলামাবাদে পৌঁছেছে।
পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির মধ্যে ফোনালাপের পরই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি এবং ইসলামাবাদে সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফার আলোচনা নিয়ে ফোনালাপে মতবিনিময় করেছেন দুই মন্ত্রী। পোস্টে বলা হয়, উভয় পক্ষ আঞ্চলিক ঘটনাবলী, যুদ্ধবিরতি এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে ইসলামাবাদের চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টা নিয়ে মতবিনিময় করেছেন। ইসহাক দার তার পক্ষ থেকে যত দ্রুত সম্ভব আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার লক্ষ্যে অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিরসনে দ্বিতীয় দফার সংলাপের গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছেন। ফোনালাপে ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ ব্যাপারে পাকিস্তানের ধারাবাহিক ও গঠনমূলক সহায়ক ভূমিকার প্রশংসা করেন। দুই নেতা ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রাখতে সম্মত হয়েছেন।
অন্যদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের সঙ্গে আলাদাভাবে টেলিফোনে কথা বলেছেন আরাঘচি। ডনের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত কয়েকদিনে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে তার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করেছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এবং সেনাপ্রধান আসিম মুনির মার্কিন ও ইরানি নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনার কারণে, বিশেষ করে ইরানের হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়া এবং দেশটির বন্দরগুলোতে মার্কিন অবরোধের কারণে, ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিতব্য প্রত্যাশিত দ্বিতীয় দফার আলোচনা বিলম্বিত হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিভাজন থাকার দাবি নাকচ করেছে তেহরান। গত কয়েক ঘণ্টা ধরে ইরানের সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায় থেকে দেওয়া বার্তায় ছিল জাতীয় ঐক্যের সুর। তারা স্পষ্ট বলছেন, ইসলামাবাদের আসন্ন শান্তি আলোচনায় যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে পুরো দেশ একই অবস্থানে রয়েছে। বৃহস্পতিবার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এক্সে লিখেছেন, ইরানে কোনো কট্টরপন্থি বা মধ্যপন্থি নেই। তারা সবাই ইরানি এবং বিপ্লবী। রাষ্ট্র ও জনগণের ইস্পাতকঠিন ঐক্য এবং সর্বোচ্চ নেতার প্রতি আনুগত্যের মাধ্যমে তারা আক্রমণকারীকে অনুতপ্ত হতে বাধ্য করবেন। তিনি লেখেন, এক স্রষ্টা, এক জাতি, এক নেতা, এক পথ; প্রাণের চেয়েও প্রিয় ইরানের জন্য বিজয় নিশ্চিত। এর আগে ওভাল অফিসে এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ইরান বর্তমানে চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যে আছে এবং দেশটির নেতৃত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা কাজ করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই বিভাজন ও শাসন নীতির জবাবে ইরানের কূটনীতিক ও সামরিক কর্মকর্তারা অভিন্ন অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। তেহরান থেকে পাওয়া খবরে জানা গেছে, দেশটির সব শাখা এখন সর্বোচ্চ নেতার অধীনে ঐক্যবদ্ধ।
এর আগে বুধবার ট্রাম্প আশা প্রকাশ করেছিলেন, অব্যাহত অবিশ্বাস সত্ত্বেও ৩৬ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ইসলামাবাদে দ্বিতীয় দফা আলোচনা বসতে পারে। তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা পুনরায় শুরু করার বিষয়ে কোনো স্পষ্ট উত্তর দেননি। প্রসঙ্গত, টানা ৪০ দিন যুদ্ধের পর গত ৮ এপ্রিল ১৪ দিনের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। তারপর একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের লক্ষ্যে গত ১১ এপ্রিল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে বৈঠকে বসেন মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিরা, যা ১৯৭৯ সালের পর মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রথম সরাসরি সাক্ষাৎ এবং ইরানের ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ের বৈঠক। তবে ২১ ঘণ্টা ধরে আলোচনার পরও কোনো সমাধান ছাড়াই শেষ হয় এবং উভয় দেশের প্রতিনিধিরা নিজ নিজ দেশে ফিরে যান। তবে এখনো যুদ্ধবিরতি বজায় আছে। সূত্র: আল-জাজিরা, ডন।

শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৪ এপ্রিল ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন