অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে চলমান সহিংসতা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে সরকারের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, নিরাপত্তা কর্মকর্তা, বিচারক ও বিশিষ্ট নাগরিকদের একটি প্রভাবশালী দল। সম্প্রতি ফাঁস হওয়া একটি চিঠিতে এসব তথ্য উঠে এসেছে। খবর দ্য গার্ডিয়ানের। চিঠিতে স্বাক্ষর করেন ইসরায়েলের সাবেক দুই প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্ট ও এহুদ বারাক, বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থার সাবেক প্রধান, সাবেক বিচারক, নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী এবং দেশটির খ্যাতিমান সাহিত্যিকসহ বহু প্রভাবশালী ব্যক্তি।তাঁরা সরকারের প্রতি ‘চূড়ান্ত সতর্কবার্তা’ দিয়ে বলেছেন, অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, হত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও অন্যান্য অপরাধ বন্ধে অবিলম্বে ব্যবস্থা নিতে হবে। তাঁদের অভিযোগ, এসব অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা প্রায় সম্পূর্ণ দায়মুক্তি ভোগ করছেন। চিঠিতে বলা হয়েছে, এই সহিংসতা শুধু ইসরায়েলি ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করছে না, দেশের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলকে আরও বিচ্ছিন্ন করছে এবং বিশ্বজুড়ে ইহুদিবিদ্বেষ উসকে দিচ্ছে।স্বাক্ষরকারীরা অভিযোগ করেন, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তাঁর অতি-ডানপন্থী জোটসঙ্গীরা ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে হামলাকে রাজনৈতিক উদ্দেশে ব্যবহার করছেন। তাঁদের মতে, পশ্চিম তীরে জাতিগত নির্মূল এবং ভবিষ্যতে ওই অঞ্চল যুক্ত করার লক্ষ্যেই এমন পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে। চিঠিতে আরও বলা হয়, এটি কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যর্থতা নয় বরং সরকারের নীতিরই প্রতিফলন। সামরিক বাহিনী, পুলিশ ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থাগুলো অনেক ক্ষেত্রে সহিংসতা প্রতিরোধে ব্যর্থ হয়েছে, এমনকি কোথাও কোথাও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত থাকার অভিযোগও তোলা হয়েছে। স্বাক্ষরকারীরা সতর্ক করে বলেছেন, সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা যদি দ্রুত ব্যবস্থা না নেন, তাহলে তাঁরা ইসরায়েলের উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হবেন।চিঠিটি প্রকাশ্যে প্রকাশ করা হয়নি। তবে এটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, প্রতিরক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়, সামরিক বাহিনী, পুলিশ এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে। চিঠিতে জাতিসংঘের তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, ২০২০ সাল থেকে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সেনা ও বসতি স্থাপনকারীদের হাতে অন্তত ১ হাজার ১০০ ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু রয়েছে। এসব ঘটনার কোনো ক্ষেত্রেই এখন পর্যন্ত কাউকে অভিযুক্ত করা হয়নি। এদিকে চিঠিতে সাম্প্রতিক সময়ে সহিংসতার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের দেওয়া বক্তব্যকে যথেষ্ট বলে মনে করেননি স্বাক্ষরকারীরা। তাঁদের মতে, কেবল বক্তব্য নয়, কার্যকর পদক্ষেপই পরিস্থিতি পরিবর্তন করতে পারে। তবে চিঠি সম্পর্কে মন্তব্যের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, প্রতিরক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়, পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।এই চিঠি ইসরায়েলি সমাজ ও রাজনীতিতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী, নিরাপত্তা প্রধান ও বিচারকদের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিরা একত্রিত হয়ে সরকারের সমালোচনা করেছেন, যা বিরল ঘটনা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই চিঠি নেতানিয়াহু সরকারের ওপর চাপ বাড়াবে। তবে সরকারের অতি-ডানপন্থী অংশ এই চিঠিকে ‘বামপন্থী ষড়যন্ত্র’ বলে উড়িয়ে দিতে পারে। আন্তর্জাতিক মহলও এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। জাতিসংঘের মুখপাত্র বলেছেন, তারা ইসরায়েলি নাগরিকদের এই অবস্থানকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন এবং আশা করছেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষও এই চিঠিকে ‘ইতিবাচক পদক্ষেপ’ হিসেবে দেখেছে। তারা বলেছে, আন্তর্জাতিক চাপের পাশাপাশি ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ নাগরিক সমাজের এই অবস্থান ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহিংসতা বন্ধে সহায়ক হতে পারে। তবে ফিলিস্তিনি অধিকার সংগঠনগুলো মনে করছে, শুধু চিঠি বা আইনি হুমকি যথেষ্ট নয়, বাস্তব পদক্ষেপ দরকার। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এই চিঠির কোনো প্রভাব পড়ে কিনা, সেদিকে নজর থাকবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের।
২০ ঘন্টা আগে