ঢাকা    সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬
ঢাকা    সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬
গণবার্তা
সর্বশেষ

বিশ্বকাপে ২২ ফুটবলারের দ্বিতীয় শিরোপার লড়াই, পেলের রেকর্ডের পথে মেসি

বিশ্বকাপের প্রায় একশ বছরের ইতিহাসে আট দেশের ৪৭১ খেলোয়াড় ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ট্রফি ছুঁয়ে দেখতে পেরেছেন। তাদের মধ্যে কেবল ২১ জন এই সাফল্যের পুনরাবৃত্তি করেছেন, একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে তিনটি ট্রফি জিতে বিশেষ আসনে পেলে। চলতি বিশ্বকাপে দ্বিতীয়বার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন বেঁচে আছে নকআউটে ওঠা তিন দেশের ২২ খেলোয়াড়ের। বিশ্বকাপের একই আসরে এত বেশি সংখ্যক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণ টুর্নামেন্টের ইতিহাসে রেকর্ড। এর আগে সর্বশেষ ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে দ্বিতীয় শিরোপার জন্য সর্বোচ্চ ১৯ জন অংশ নিয়েছিল—২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকায় ১৬ জন স্প্যানিশ বিজয়ী ও ২০০৬ সালের জার্মানিতে তিনজন ইতালিয়ান চ্যাম্পিয়ন।এর মধ্যে আর্জেন্টিনা থেকেই ১৭ জন খেলোয়াড় এবারের আসরে অংশ নিচ্ছেন, যারা ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপ জিতেছিলেন, যার মধ্যে অন্যতম লিওনেল মেসি। আর কোচ লিওনেল স্কালোনিও শিরোপা ধরে রাখার লড়াইয়ে আছেন। ২০১৮ বিশ্বকাপ জেতা কোচ দিদিয়ের দেশম এবারও আছেন। আর ওই আসরে শিরোপা জেতা চারজন খেলোয়াড় কিলিয়ান এমবাপে, উসমান দেম্বেলে, এন’গোলো কাঁতে ও লুকাস হার্নান্দেজ দ্বিতীয় শিরোপায় চোখ রাখছেন। এবারের বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন্স টিমের আরেক সদস্য ম্যানুয়েল ন্যয়ার। ২০১৪ সালে জার্মানির হয়ে বিশ্বকাপ জিতেছিলেন তিনি।চলতি বিশ্বকাপে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন খেলোয়াড়রা হলেন—লিওনেল মেসি, লাউতারো মার্টিনেজ, জুলিয়ান আলভারেজ, থিয়াগো আলমাদা, এনজো ফার্নান্দেজ, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, রদ্রিগো দে পল, এজেকুয়েল পালাসিওস, লিয়ান্দ্রো পারেদেস, নিকোলাস ওতামেন্দি, লিসান্দ্রো মার্টিনেজ, ক্রিস্টিয়ান রোমেরো, নাহুয়েল মলিনা, গঞ্জালো মন্তিয়েল, নিকোলাস তাগলিয়াফিকো, এমিলিয়ানো মার্টিনেজ, জেরোনিমো রুলি, কিলিয়ান এমবাপে, উসমান দেম্বেলে, এন’গোলো কাঁতে, লুকাস হার্নান্দেজ ও ম্যানুয়েল ন্যয়ার। এই ২২ খেলোয়াড়ের মধ্যে মেসি ও এমবাপের মতো তারকারা রয়েছেন, যারা ইতিমধ্যেই ফুটবল ইতিহাসে নিজেদের নাম লিখিয়েছেন। তারা এবার দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জিততে মরিয়া। বিশেষ করে মেসি, যিনি ইতিমধ্যেই বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পেয়েছেন, তিনি যদি দ্বিতীয়বার শিরোপা জিততে পারেন, তাহলে তিনি পেলের রেকর্ডের কাছাকাছি পৌঁছে যাবেন। পেলে তিনটি বিশ্বকাপ জিতেছেন, যা এখনও অক্ষুণ্ণ। তবে মেসি যদি দ্বিতীয়বার জিতেন, তবে তিনি পেলের মতোই বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচিত হবেন। অন্যদিকে এমবাপেও তার দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখছেন। তিনি যদি জিততে পারেন, তাহলে তিনি ফ্রান্সের ইতিহাসে অন্যতম সফল খেলোয়াড় হয়ে উঠবেন। ফুটবল বিশ্ব এখন এই ২২ খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্সের দিকে তাকিয়ে আছে। তাদের মধ্যে কে দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জিততে পারেন, তা দেখার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে সমর্থকরা। আরও একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য যে, এবারের বিশ্বকাপে বেশ কয়েকজন খেলোয়াড় আছেন যারা আগে কখনো বিশ্বকাপ জেতেননি, কিন্তু তারা তাদের দলকে শিরোপা এনে দিতে চান। তাদের মধ্যে ব্রাজিল, ইংল্যান্ড ও অন্যান্য দলের তারকারা রয়েছেন। পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে থাকবে উত্তেজনা, আর শেষ পর্যন্ত কে এই মহাকাব্যের নায়ক হবেন, তা সময়ই বলে দেবে।
৬ ঘন্টা আগে

হাদিসশাস্ত্রের মহান ইমাম: ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল আল-বুখারি (রহ.)

যে নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর বাণীর নিরাপদ সংরক্ষণইসলামের ইতিহাসে এমন কিছু মনীষীর আবির্ভাব ঘটেছে, যাঁদের অবদান কোনো নির্দিষ্ট যুগ, ভূখণ্ড কিংবা জাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁদের কর্ম মানবসভ্যতার ইতিহাসে স্থায়ী প্রভাব রেখে গেছে। সেই বিরল ব্যক্তিত্বদের অন্যতম হলেন ইমাম আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল আল-বুখারি (রহ.)—যাঁর নাম উচ্চারিত হলেই মনে ভেসে ওঠে 'সহিহ বুখারি', হাদিসশাস্ত্রের সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য সংকলন।আজ পৃথিবীর যে প্রান্তেই মুসলমান বসবাস করুক না কেন, কুরআনুল কারিমের পর যে গ্রন্থটি সবচেয়ে বেশি সম্মান, গ্রহণযোগ্যতা ও নির্ভরযোগ্যতার মর্যাদা লাভ করেছে, সেটি হলো সহিহ আল-বুখারি। এটি শুধু একটি হাদিসগ্রন্থ নয়; বরং রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর জীবন, বাণী, কর্ম ও সুন্নাহকে বিশুদ্ধভাবে সংরক্ষণের এক অসাধারণ বৈজ্ঞানিক প্রচেষ্টা।কিন্তু এই বিস্ময়কর কীর্তির পেছনে ছিল এক শিশুর অশ্রুসিক্ত শৈশব, একজন মায়ের অবিচল ঈমান, সীমাহীন ত্যাগ, হাজার হাজার মাইল দীর্ঘ সফর, অক্লান্ত গবেষণা এবং সত্যের প্রতি আপসহীন নিষ্ঠা।বুখারা—জ্ঞান ও সভ্যতার এক উজ্জ্বল নগরীবর্তমান উজবেকিস্তানের অন্তর্গত প্রাচীন নগরী বুখারা একসময় ছিল মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্ঞানকেন্দ্র। মধ্য এশিয়ার এই শহরটি ছিল সিল্ক রোডের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। এখানে যেমন বণিকদের আনাগোনা ছিল, তেমনি ছিল কুরআন, হাদিস, ফিকহ, ভাষাতত্ত্ব, দর্শন ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের খ্যাতিমান পণ্ডিতদের সমাবেশ।অষ্টম ও নবম শতাব্দীতে বুখারা শুধু রাজনৈতিকভাবেই নয়, জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রেও খ্যাতির শীর্ষে অবস্থান করছিল। দূর-দূরান্ত থেকে ছাত্ররা এখানে আসতেন ইসলামী জ্ঞান অর্জনের জন্য।এই জ্ঞানময় পরিবেশেই জন্ম নেন সেই মহান ব্যক্তিত্ব, যিনি পরবর্তীকালে মানবজাতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ গবেষক হিসেবে ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবেন।জন্ম ও বংশপরিচয়ইমাম বুখারির পূর্ণ নাম—আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল ইবনে ইবরাহিম ইবনে আল-মুগিরাহ ইবনে বারদিযবাহ আল-জুফি আল-বুখারি (রহ.)।তিনি ১৩ শাওয়াল, ১৯৪ হিজরি (৮১০ খ্রিস্টাব্দ) বুখারা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন।তাঁর পরিবার মূলত পারস্য বংশোদ্ভূত ছিল। তাঁর প্রপিতামহ আল-মুগিরাহ ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করেন এবং জুফি গোত্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেন। সেই সূত্রেই তাঁদের বংশের সঙ্গে "আল-জুফি" উপাধি যুক্ত হয়।যদিও বংশগতভাবে তিনি আরব ছিলেন না, কিন্তু ইসলামী জ্ঞান, চরিত্র, গবেষণা ও অবদানের কারণে তিনি মুসলিম বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইমাম হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন।এক ধার্মিক পিতার উত্তরাধিকারইমাম বুখারির পিতা ইসমাইল ইবনে ইবরাহিম ছিলেন একজন সম্মানিত মুহাদ্দিস ও অত্যন্ত পরহেজগার ব্যক্তি।তিনি বিখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম মালিক ইবনে আনাস (রহ.), হাম্মাদ ইবনে যায়েদ (রহ.) প্রমুখ আলেমের নিকট হাদিস অধ্যয়ন করেছিলেন।তাঁর সম্পর্কে জীবনীকাররা উল্লেখ করেছেন, মৃত্যুর আগে তিনি বলেছিলেন—"আমার সম্পদের মধ্যে এমন একটি দিরহামও নেই, যা হারাম উপার্জন থেকে এসেছে কিংবা যার মধ্যে সন্দেহ রয়েছে।"এই বক্তব্য শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সততার পরিচয় দেয় না; বরং বোঝায়, ইমাম বুখারির জীবনের ভিত্তি নির্মিত হয়েছিল হালাল রিজিক, তাকওয়া ও সততার ওপর।দুঃখজনকভাবে ইমাম বুখারি খুব অল্প বয়সেই তাঁর পিতাকে হারান। ফলে তাঁর লালন-পালনের সম্পূর্ণ দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর মায়ের ওপর।একজন মায়ের দোয়া বদলে দিয়েছিল ইতিহাসইমাম বুখারির শৈশবের সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী ঘটনাগুলোর একটি হলো তাঁর দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলা।শৈশবে এক দুরারোগ্য ব্যাধির কারণে তিনি সম্পূর্ণ অন্ধ হয়ে যান। চিকিৎসকরা আশাহত হয়ে পড়েন। পরিবারের লোকজনও প্রায় আশা ছেড়ে দেন।কিন্তু একজন মানুষ আশা হারাননি।তিনি ছিলেন তাঁর মা।দিনের পর দিন, রাতের পর রাত তিনি আল্লাহর দরবারে কেঁদে কেঁদে দোয়া করতে থাকেন।ইতিহাসবিদদের একটি প্রসিদ্ধ বর্ণনায় এসেছে, এক রাতে তিনি স্বপ্নে আল্লাহর নবী ইবরাহিম (আ.)-কে দেখেন। তিনি বলেন—"তোমার অধিক দোয়া ও কান্নার কারণে আল্লাহ তোমার সন্তানের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন।"পরদিন ঘুম থেকে উঠে তিনি বিস্ময়ের সঙ্গে দেখলেন—ছেলের চোখে আবার আলো ফিরে এসেছে।ঐতিহাসিক মন্তব্যএই ঘটনাটি প্রাচীন জীবনীগ্রন্থে উল্লেখিত একটি প্রসিদ্ধ ঐতিহ্যগত বর্ণনা। ইতিহাসবিদরা এটি উদ্ধৃত করলেও এর সনদ হাদিসের মানদণ্ডে সহিহ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত নয়। তবে মুসলিম ঐতিহাসিক সাহিত্যে ঘটনাটি ব্যাপকভাবে বর্ণিত হয়েছে এবং একজন মায়ের দোয়ার শক্তির অনন্য উদাহরণ হিসেবে আলোচিত।দৃষ্টি ফিরে পাওয়ার পর শুরু হয় আরেক অলৌকিক যাত্রাচোখের আলো ফিরে পাওয়ার পর যেন তাঁর মেধারও নতুন দ্বার উন্মুক্ত হয়ে গেল।অন্য শিশুরা যখন খেলাধুলায় ব্যস্ত থাকত, তখন ছোট্ট মুহাম্মদের সবচেয়ে প্রিয় কাজ ছিল আলেমদের দরসে বসা।তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনতেন।বারবার শুনতেন।একবার শুনলেই মনে গেঁথে যেত।তাঁর স্মৃতিশক্তি এতটাই প্রখর ছিল যে, শৈশবেই শিক্ষকরা তাঁর অসাধারণ মেধায় বিস্মিত হয়ে পড়েন।মাত্র দশ বছর বয়সে শুরু হাদিস সংশোধনইমাম বুখারির জীবনীকারদের বর্ণনা অনুযায়ী, মাত্র দশ বছর বয়সেই তিনি হাদিস অধ্যয়নে এমন দক্ষতা অর্জন করেন যে, কোনো শিক্ষক হাদিস বর্ণনার সময় ভুল করলে তিনি বিনয়ের সঙ্গে তা সংশোধন করে দিতেন।প্রথম দিকে শিক্ষকরা তাঁর আপত্তি গ্রহণ করতেন না।কিন্তু যখন মূল গ্রন্থ বের করে মিলিয়ে দেখা হতো, তখন দেখা যেত—ছোট্ট মুহাম্মদই সঠিক ছিলেন।এই ঘটনাগুলো খুব দ্রুত পুরো বুখারায় ছড়িয়ে পড়ে।এগারো বছর বয়সে বিস্ময়কর ঘটনাএকদিন তাঁর শিক্ষক একটি সনদ (ইসনাদ) পাঠ করছিলেন।তিনি ভুলবশত একজন রাবির নাম অন্যজনের সঙ্গে পরিবর্তন করে ফেলেন।ইমাম বুখারি বিনয়ের সঙ্গে বলেন—"হে উস্তাদ, এখানে সম্ভবত নামটি ভিন্ন হবে।"শিক্ষক প্রথমে বিষয়টি গুরুত্ব দেননি।কিন্তু পরে মূল কপি বের করে দেখেন, কিশোর ছাত্রটির বক্তব্যই সঠিক।সেদিন থেকেই আলেমরা বুঝতে পারেন—এই শিশুর স্মৃতি ও বিশ্লেষণক্ষমতা সাধারণ মানুষের মতো নয়।কৈশোরেই সম্পূর্ণ হাদিসবিদমাত্র ষোলো বছর বয়সে তিনি হাদিসশাস্ত্রের বহু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ অধ্যয়ন শেষ করেন।এর মধ্যে ছিল—আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক (রহ.)-এর সংকলনওয়াকী ইবনে জাররাহ (রহ.)-এর রেওয়ায়েততৎকালীন বহু মুহাদ্দিসের মৌলিক হাদিসগ্রন্থএই সময়েই তাঁর মা ও ভাই আহমদের সঙ্গে তিনি হজ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কায় যান।হজ শেষে তাঁর মা ও ভাই বুখারায় ফিরে এলেও মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল থেকে যান।কারণ তাঁর সামনে তখন আরেকটি স্বপ্ন।রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতিটি সহিহ হাদিস খুঁজে বের করা।সংগ্রহ করা।যাচাই করা।সংরক্ষণ করা।তিনি তখনও জানতেন না—এই স্বপ্নই একদিন তাঁকে ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিসে পরিণত করবে।জ্ঞানার্জনের দীর্ঘ সফর, বিস্ময়কর স্মৃতিশক্তি ও বিশ্বসেরা মুহাদ্দিসে পরিণত হওয়ার গল্পমাত্র ষোলো বছর বয়সে হজ পালন শেষে ইমাম বুখারি (রহ.) একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর মা ও বড় ভাই আহমদ বুখারায় ফিরে গেলেও তিনি মক্কায় থেকে যান। কারণ তাঁর হৃদয়ে তখন একটি মাত্র স্বপ্ন—রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সহিহ হাদিসগুলোকে পৃথিবীর জন্য সংরক্ষণ করা।এই সিদ্ধান্তই তাঁর পুরো জীবনকে বদলে দেয়।মক্কা ও মদিনায় ইলমের নতুন অধ্যায়হজের পর ইমাম বুখারি (রহ.) দীর্ঘ সময় মক্কায় অবস্থান করেন। তিনি মসজিদুল হারামে বসে হাদিস, ফিকহ, আরবি ভাষা ও রিজালশাস্ত্র অধ্যয়ন করতে থাকেন। পরে তিনি মদিনায় চলে যান। রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর রওজা মোবারকের সান্নিধ্যে কাটানো সময় তাঁর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে ওঠে।ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে, মদিনায় অবস্থানকালে রাতের নির্জনে, অনেক সময় চাঁদের আলোয় কিংবা মসজিদে নববীর নিকট বসেই তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আত-তারীখুল কাবীর’-এর রচনা শুরু করেন। তখন তাঁর বয়স মাত্র আঠারো বছর।এই গ্রন্থটি পরবর্তীকালে রাবিদের জীবনীসংক্রান্ত (ইলমুর রিজাল) অন্যতম মৌলিক গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।ইলমের জন্য চল্লিশ বছরের অবিশ্রান্ত সফরইমাম বুখারি (রহ.) বিশ্বাস করতেন—ইলম ঘরে বসে অর্জন করা যায় না; এর জন্য ত্যাগ, ধৈর্য ও দীর্ঘ সফর প্রয়োজন।তিনি জীবনের প্রায় চার দশক ধরে মুসলিম বিশ্বের প্রধান প্রধান জ্ঞানকেন্দ্র সফর করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—মক্কামদিনাবসরাকুফাবাগদাদওয়াসিতমিশরদামেস্কহিমসনিশাপুরমারভবালখরায়সমরখন্দসহ বহু নগরী।জীবনীকারদের মতে, তিনি কিছু শহরে একাধিকবার সফর করেছিলেন। উদাহরণস্বরূপ, বসরায় তিনি চারবার, বাগদাদে বহুবার এবং কুফায়ও একাধিকবার গিয়েছিলেন, যাতে কোনো নির্ভরযোগ্য মুহাদ্দিসের কাছ থেকে হাদিস গ্রহণ বাদ না পড়ে।এক হাজারেরও বেশি শায়খের নিকট শিক্ষাইমাম বুখারি (রহ.) নিজেই বলেছেন—"আমি এক হাজারেরও বেশি শায়খের নিকট থেকে হাদিস লিখেছি।"প্রত্যেক শায়খের কাছ থেকে তিনি শুধু হাদিস শুনেই সন্তুষ্ট হতেন না। তিনি তাদের ব্যক্তিগত চরিত্র, তাকওয়া, স্মৃতিশক্তি এবং নির্ভরযোগ্যতা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন।তাঁর শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন—ইমাম আলী ইবনে আল-মাদিনী (রহ.)ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ (রহ.)ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন (রহ.)আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)মাক্কী ইবনে ইবরাহিম (রহ.)আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর আল-হুমায়দী (রহ.)কুতাইবা ইবনে সাঈদ (রহ.)-সহ বহু প্রখ্যাত মুহাদ্দিস।বিশেষত ইমাম আলী ইবনে আল-মাদিনী (রহ.)-কে তিনি নিজের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে উল্লেখ করেছেন।অসাধারণ স্মৃতিশক্তির বিস্ময়কর দৃষ্টান্তইমাম বুখারির (রহ.) স্মৃতিশক্তি নিয়ে মুসলিম বিশ্বের ইতিহাসে অসংখ্য ঘটনা সংরক্ষিত রয়েছে।তিনি একবার বলেছিলেন—"আমার এক লাখ সহিহ হাদিস এবং দুই লাখ অ-সহিহ হাদিস মুখস্থ রয়েছে।"এটি কেবল হাদিসের মূল বক্তব্য নয়; বরং প্রতিটি হাদিসের পূর্ণ সনদ, বর্ণনাকারীদের নাম, তাদের শিক্ষক, ছাত্র এবং বর্ণনার পার্থক্যসহ মুখস্থ থাকার ইঙ্গিত বহন করে।ছাত্রজীবনের ১৫ হাজার হাদিসের ঘটনাশিক্ষাজীবনের একটি ঘটনা তাঁর অসাধারণ স্মৃতিশক্তির প্রমাণ হিসেবে যুগে যুগে আলোচিত হয়েছে।সহপাঠীরা প্রতিদিন শিক্ষকদের বক্তব্য লিখে রাখতেন। কিন্তু ইমাম বুখারি (রহ.) শুধু মনোযোগ দিয়ে শুনতেন, কিছুই লিখতেন না।একদিন সহপাঠীরা প্রশ্ন করলেন—"তুমি কিছুই লেখ না। তাহলে এতদিন এখানে এসে কী শিখলে?"তিনি শান্তভাবে বললেন—"তোমাদের লিখে রাখা খাতাগুলো নিয়ে এসো।"তারা প্রায় ১৬ দিনের নোট নিয়ে এলো, যাতে ১৫ হাজারেরও বেশি হাদিস লেখা ছিল।ইমাম বুখারি (রহ.) খাতা না দেখেই একের পর এক সব হাদিস মুখস্থ শুনিয়ে দিলেন। শুধু তাই নয়, কোথায় কোথায় ভুল লেখা হয়েছে তাও সংশোধন করে দিলেন।সহপাঠীরা বিস্মিত হয়ে নিজেদের নোট তাঁর মুখস্থ পাঠ থেকে সংশোধন করতে লাগলেন।বাগদাদের ১০০ হাদিস পরীক্ষার ঐতিহাসিক ঘটনাইমাম বুখারির জীবনের সবচেয়ে বিখ্যাত ঘটনাগুলোর একটি ঘটেছিল বাগদাদে।তাঁর অসাধারণ খ্যাতির কথা শুনে বাগদাদের একদল মুহাদ্দিস তাঁর স্মৃতিশক্তি পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন।তারা ১০০টি হাদিস নির্বাচন করেন।প্রতিটি হাদিসের সনদ (ইসনাদ) অন্য হাদিসের সঙ্গে ইচ্ছাকৃতভাবে অদলবদল করে দেওয়া হয়।এরপর দশজন আলেমকে দশটি করে ভুল সনদযুক্ত হাদিস মুখস্থ করিয়ে জনসম্মুখে ইমাম বুখারির সামনে উপস্থাপন করা হয়।প্রথম ব্যক্তি একটি হাদিস পড়ে শোনালে ইমাম বুখারি (রহ.) বললেন—"আমি এভাবে জানি না।"একই উত্তর দিলেন দ্বিতীয়, তৃতীয়—এভাবে একশোটি হাদিসের ক্ষেত্রেই।অনেক সাধারণ মানুষ ভাবলেন, হয়তো তিনি উত্তর জানেন না।কিন্তু সবশেষে তিনি প্রথম ব্যক্তি থেকে শুরু করে একে একে সব ১০০টি হাদিস পুনরায় পাঠ করেন।প্রথমে ভুল সনদটি উল্লেখ করেন, তারপর সঙ্গে সঙ্গে সঠিক সনদ ও সঠিক হাদিস বলে দেন।এভাবে একশোটির একটিতেও তিনি ভুল করেননি।সভায় উপস্থিত সকল মুহাদ্দিস তাঁর অসাধারণ হিফজ, স্মৃতিশক্তি ও গবেষণার সামনে অভিভূত হয়ে যান।এই ঘটনার পর তাঁর খ্যাতি সমগ্র মুসলিম বিশ্বে আরও ছড়িয়ে পড়ে।'আমীরুল মুমিনীন ফিল হাদিস' উপাধিতাঁর সমসাময়িক অনেক মহান আলেম তাঁকে "আমীরুল মুমিনীন ফিল হাদিস"—অর্থাৎ হাদিসশাস্ত্রের মুমিনদের নেতা—উপাধিতে ভূষিত করেন।এটি ছিল হাদিসশাস্ত্রে সর্বোচ্চ সম্মানজনক উপাধিগুলোর একটি।প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ (রহ.) একদিন তাঁর ছাত্রদের বলেছিলেন—"ইশ! যদি এমন একজন মানুষ থাকতেন, যিনি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর শুধু সহিহ হাদিসগুলো একত্রিত করে একটি গ্রন্থ সংকলন করতেন।"এই কথাটি তরুণ ইমাম বুখারির হৃদয়ে গভীরভাবে দাগ কাটে।পরে তিনি নিজেই বলেছেন—"শায়খ ইসহাকের এই কথাই আমাকে সহিহ হাদিস সংকলনের কাজে উদ্বুদ্ধ করেছিল।"এই একটি বাক্যই ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেয়। কারণ এর ফলশ্রুতিতেই রচিত হয় বিশ্বের সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য হাদিসগ্রন্থ সহিহ আল-বুখারি।এক নতুন যুগের সূচনাতখনও কেউ কল্পনা করতে পারেনি—এই তরুণ মুহাদ্দিস এমন একটি গ্রন্থ রচনা করবেন, যা এক হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে মুসলিম বিশ্বের সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্যতা লাভ করবে।তাঁর সামনে তখন অপেক্ষা করছিল আরও কঠিন পরীক্ষা—ছয় লাখ হাদিসের মধ্য থেকে সহিহ হাদিস নির্বাচন, বর্ণনাকারীদের যাচাই, বছরের পর বছর গবেষণা এবং মানব ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জ্ঞানভান্ডার সংকলনের বিশাল দায়িত্ব।এই অধ্যায়ই তাঁকে চিরদিনের জন্য ইতিহাসে অমর করে রাখবে।‘সহিহ বুখারি’ সংকলনের ইতিহাস, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ও বিশ্বসভ্যতার এক অনন্য জ্ঞানভান্ডারের জন্মপৃথিবীর ইতিহাসে বহু গ্রন্থ রচিত হয়েছে। কোনোটি দর্শনের, কোনোটি বিজ্ঞানের, কোনোটি আইন বা সাহিত্যের। কিন্তু এমন একটি গ্রন্থ, যার প্রতিটি বাক্য লেখার আগে একজন গবেষক বছরের পর বছর ভ্রমণ করেছেন, হাজারো মানুষের চরিত্র যাচাই করেছেন, অসংখ্য বর্ণনা তুলনা করেছেন এবং সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে সত্য-মিথ্যা পৃথক করেছেন—এমন উদাহরণ ইতিহাসে খুব কমই রয়েছে।ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল আল-বুখারি (রহ.)-এর ‘আল-জামি‘ আস-সহিহ’, যা আজ ‘সহিহ বুখারি’ নামে সমগ্র মুসলিম বিশ্বের কাছে পরিচিত, ঠিক এমনই এক বিস্ময়কর গবেষণার ফসল।একটি বাক্য, যা ইতিহাস বদলে দিয়েছিলইমাম বুখারি (রহ.)-এর শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ (রহ.) একদিন তাঁর ছাত্রদের উদ্দেশে বলেছিলেন—"যদি এমন কেউ থাকত, যে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কেবল বিশুদ্ধ (সহিহ) হাদিসগুলো একত্র করে একটি সংকলন তৈরি করত!"এই কথাটি তরুণ ইমাম বুখারির হৃদয়ে গভীরভাবে দাগ কাটে। পরে তিনি নিজেই বলেন, এই আহ্বানই তাঁকে এমন একটি গ্রন্থ রচনায় উদ্বুদ্ধ করেছিল, যেখানে কেবল সর্বোচ্চ মানদণ্ডে যাচাইকৃত হাদিস স্থান পাবে।আরেকটি প্রসিদ্ধ বর্ণনায় এসেছে, তিনি স্বপ্নে দেখেন—তিনি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সামনে দাঁড়িয়ে একটি পাখা দিয়ে তাঁকে রক্ষা করছেন। স্বপ্নের ব্যাখ্যাকারীরা বলেন, তিনি মিথ্যা বর্ণনা থেকে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর হাদিসকে রক্ষা করবেন। এই স্বপ্নও তাঁর মনোবল আরও দৃঢ় করে। (এটি জীবনীগ্রন্থে বর্ণিত একটি ঐতিহ্যগত ঘটনা; সহিহ হাদিস নয়।)ছয় লাখ হাদিস—কিন্তু সব নয়অনেকেই মনে করেন, ইমাম বুখারি (রহ.) ছয় লাখ হাদিস সংগ্রহ করেছিলেন। এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি।জীবনীকারদের ভাষ্যমতে, তিনি প্রায় ছয় লাখ রেওয়ায়েত (বর্ণনা) অধ্যয়ন করেছিলেন। এর মধ্যে একই হাদিসের বহু ভিন্ন সনদ ও বর্ণনা অন্তর্ভুক্ত ছিল। অর্থাৎ এটি ছয় লাখ সম্পূর্ণ ভিন্ন বক্তব্য নয়, বরং বিভিন্ন সূত্রে প্রচলিত হাদিসের বিপুল ভাণ্ডার।এই বিশাল সংগ্রহ থেকে তিনি কঠোর যাচাই-বাছাই করে তাঁর গ্রন্থে স্থান দেন মাত্র ৭,২৭৫টি রেওয়ায়েত (পুনরাবৃত্তিসহ)। পুনরাবৃত্তি বাদ দিলে সংখ্যা প্রায় ২,৬০০-এর কিছু বেশি।এই পরিসংখ্যানই তাঁর গবেষণার গভীরতা ও সতর্কতার পরিচয় বহন করে।হাদিস গ্রহণে ছিল কঠোর বৈজ্ঞানিক নীতিমালাইমাম বুখারির (রহ.) আগে অনেক মুহাদ্দিস হাদিস সংকলন করেছেন। কিন্তু তিনি যাচাইয়ের ক্ষেত্রে এমন কঠোর মানদণ্ড গ্রহণ করেন, যা তাঁকে অন্যদের থেকে স্বতন্ত্র মর্যাদা দেয়।তিনি সাধারণভাবে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো নিশ্চিত না হলে কোনো হাদিস গ্রহণ করতেন না—১. সনদ (ইসনাদ) অবিচ্ছিন্ন হতে হবেপ্রত্যেক বর্ণনাকারী তাঁর পূর্ববর্তী বর্ণনাকারীর কাছ থেকে সরাসরি হাদিস শুনেছেন—এ বিষয়ে শক্ত প্রমাণ থাকতে হবে।শুধু একই যুগে জীবিত থাকাই যথেষ্ট নয়; তাঁদের সাক্ষাৎ বা সাক্ষাতের বাস্তব সম্ভাবনাও প্রতিষ্ঠিত হতে হবে।২. প্রত্যেক রাবি হতে হবে ন্যায়পরায়ণহাদিস বর্ণনাকারীকে হতে হবে—সৎদ্বীনদারতাকওয়াবানবড় গুনাহ থেকে বিরতচরিত্রবান৩. স্মৃতিশক্তি হতে হবে অসাধারণরাবির মুখস্থশক্তি দুর্বল হলে অথবা বয়সের কারণে স্মৃতি নষ্ট হয়ে গেলে তাঁর বর্ণনা গ্রহণে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করা হতো।৪. গোপন ত্রুটি (ইল্লত) মুক্ত হতে হবেকখনো কখনো একটি হাদিস বাহ্যিকভাবে সহিহ মনে হলেও গভীর গবেষণায় সূক্ষ্ম ত্রুটি ধরা পড়ত। ইমাম বুখারি (রহ.) এই ধরনের গোপন ত্রুটি শনাক্ত করার ক্ষেত্রে ছিলেন অসাধারণ পারদর্শী।৫. অন্য নির্ভরযোগ্য বর্ণনার বিরোধী হওয়া যাবে নাযদি কোনো বর্ণনা অধিক নির্ভরযোগ্য রাবিদের বর্ণনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতো, তবে তিনি তা গ্রহণ করতেন না।রাবিদের জীবন নিয়ে বিস্ময়কর গবেষণাইমাম বুখারি (রহ.) শুধু হাদিস শুনেই সন্তুষ্ট থাকতেন না। তিনি বর্ণনাকারীদের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কেও গভীর অনুসন্ধান করতেন।একজন রাবির সম্পর্কে জানার জন্য তিনি কখনো শত শত কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছেন।ঐতিহাসিক সূত্রে একটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে—এক ব্যক্তি ঘোড়াকে খালি থলি দেখিয়ে কাছে ডাকছিলেন, যেন থলিতে খাবার আছে। ঘোড়া কাছে এলে কিছুই পেল না।ইমাম বুখারি (রহ.) এ দৃশ্য দেখে বলেন, যে ব্যক্তি একটি প্রাণীকেও প্রতারণা করতে পারে, তার কাছ থেকে আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর হাদিস গ্রহণ করব না।যদিও এই ঘটনার বিভিন্ন বর্ণনা রয়েছে, তবুও এটি তাঁর সতর্কতার প্রতীক হিসেবে জীবনীগ্রন্থে সুপরিচিত।সহিহ বুখারি রচনায় ষোলো বছরের সাধনাইমাম বুখারি (রহ.) প্রায় ষোলো বছর ধরে সহিহ বুখারি সংকলনের কাজ করেন।তিনি বিভিন্ন শহরে অবস্থান করে হাদিস যাচাই করেন, সনদ মিলিয়ে দেখেন, রাবিদের জীবন অনুসন্ধান করেন এবং প্রতিটি অধ্যায় সুচিন্তিতভাবে সাজান।এই দীর্ঘ সময়ে তিনি অসংখ্য আলেমের সঙ্গে আলোচনা করেছেন এবং প্রাপ্ত তথ্য বারবার যাচাই করেছেন।প্রতিটি হাদিস লেখার আগে ইবাদতজীবনীকারদের মধ্যে প্রসিদ্ধ একটি বর্ণনায় এসেছে—ইমাম বুখারি (রহ.) সহিহ বুখারিতে কোনো হাদিস অন্তর্ভুক্ত করার আগে অজু করতেন, দুই রাকাত নফল সালাত আদায় করতেন এবং আল্লাহর কাছে ইস্তিখারা ও দোয়া করতেন।এ বিষয়টি হাদিসের অংশ নয়; বরং জীবনীগ্রন্থে উল্লেখিত একটি ঐতিহ্যগত বর্ণনা। তবে এটি তাঁর গভীর খোদাভীতি ও দায়িত্ববোধের পরিচয় বহন করে।সহিহ বুখারির অনন্য বৈশিষ্ট্যসহিহ বুখারি শুধু হাদিসের সংকলন নয়; এটি একাধারে—হাদিসগ্রন্থফিকহের উৎসআকিদার দলিলনৈতিক শিক্ষার ভাণ্ডারইসলামী সভ্যতার গবেষণাগ্রন্থএর অধ্যায়গুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে একটি অধ্যায়ের শিরোনাম থেকেই অনেক সময় ইমাম বুখারির ফিকহি মতামত বোঝা যায়।এই বিশেষ পদ্ধতিকে আলেমরা "ফিকহুল বুখারি ফি তারাজিমিহি" নামে উল্লেখ করেছেন—অর্থাৎ, অধ্যায়ের শিরোনামেই ইমাম বুখারির ফিকহ ফুটে ওঠে।কেন এত পুনরাবৃত্তি?অনেক পাঠকের প্রশ্ন—সহিহ বুখারিতে একই হাদিস বারবার কেন এসেছে?এর উত্তর হলো, ইমাম বুখারি (রহ.) একই হাদিসকে বিভিন্ন অধ্যায়ে ভিন্ন ভিন্ন ফিকহি শিক্ষা প্রমাণের জন্য ব্যবহার করেছেন।একটি হাদিস থেকে যদি পাঁচটি ভিন্ন মাসআলার দলিল পাওয়া যায়, তবে তিনি প্রয়োজন অনুযায়ী সেটিকে বিভিন্ন অধ্যায়ে উল্লেখ করেছেন।এটি তাঁর সংকলনশৈলীর একটি বৈজ্ঞানিক বৈশিষ্ট্য।সমসাময়িক আলেমদের মূল্যায়নইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.), আলী ইবনে আল-মাদিনী (রহ.), ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন (রহ.) এবং ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ (রহ.)-এর মতো শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিসরা তাঁর মেধা ও গবেষণার উচ্চ প্রশংসা করেছেন।বিশেষভাবে ইমাম মুসলিম (রহ.), যিনি পরবর্তীতে সহিহ মুসলিম সংকলন করেন, তিনি ইমাম বুখারিকে গভীর শ্রদ্ধা করতেন। ঐতিহাসিক সূত্রে বর্ণিত আছে, তিনি একবার ইমাম বুখারির কপালে চুম্বন করে বলেন—"হে উস্তাদদের উস্তাদ! আমাকে অনুমতি দিন, আমি আপনার পা চুম্বন করি।"এই উক্তির সনদ নিয়ে গবেষকদের মধ্যে আলোচনা থাকলেও এটি তাঁদের পারস্পরিক শ্রদ্ধার একটি প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক বর্ণনা হিসেবে উল্লেখিত।বিশ্বের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য হাদিসগ্রন্থমুসলিম উম্মাহর সংখ্যাগরিষ্ঠ মুহাদ্দিস, ফকিহ ও আলেমের ঐকমত্য হলো—আল্লাহর কিতাব আল-কুরআনের পর সবচেয়ে বিশুদ্ধ গ্রন্থ হলো ‘সহিহ আল-বুখারি’।এই মর্যাদা কোনো আবেগের কারণে নয়; বরং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে হাদিসবিশারদদের নিরবচ্ছিন্ন গবেষণা, সমালোচনা ও পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।জনপ্রিয়তার মূল্য, নির্বাসনের বেদনা, শেষ জীবন ও চিরন্তন উত্তরাধিকার"জ্ঞানকে আমি কখনো শাসকের দরজায় নিয়ে যাব না; যে ইলম চায়, সে ইলমের মজলিসে আসবে।"— ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল আল-বুখারি (রহ.)যেখানে যেতেন, সেখানেই ভিড় জমাতো জ্ঞানপিপাসুরাসহিহ বুখারির সংকলন শেষ হওয়ার আগেই ইমাম বুখারি (রহ.)-এর খ্যাতি সমগ্র মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল। তাঁর দরসে অংশ নেওয়ার জন্য মক্কা, মদিনা, বসরা, কুফা, বাগদাদ, নিশাপুর, মারভ ও সমরখন্দসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ছাত্ররা ছুটে আসতেন।ইতিহাসবিদদের বর্ণনায় জানা যায়, তাঁর কোনো কোনো হাদিসের মজলিসে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী উপস্থিত থাকতেন। তাঁদের মধ্যে অনেকে সরাসরি তাঁর কাছ থেকে হাদিস লিখতেন, আবার কেউ কেউ প্রথম সারির ছাত্রদের কাছ থেকে শুনে লিপিবদ্ধ করতেন।প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম মুসলিম (রহ.), ইমাম তিরমিজি (রহ.), ইমাম নাসায়ি (রহ.)-সহ অসংখ্য আলেম তাঁর জ্ঞান, গবেষণা ও হাদিস বিশ্লেষণ থেকে উপকৃত হয়েছেন। যদিও ইমাম নাসায়ি (রহ.)-এর সঙ্গে প্রত্যক্ষ সাক্ষাৎ নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে, তবে তাঁর প্রজন্ম ইমাম বুখারির গবেষণার দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিল।নিশাপুরে অভূতপূর্ব অভ্যর্থনাহিজরি তৃতীয় শতাব্দীতে নিশাপুর ছিল ইসলামী জ্ঞানচর্চার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। ইমাম বুখারি (রহ.) যখন সেখানে পৌঁছান, তখন পুরো শহরে উৎসবের আবহ তৈরি হয়।ঐতিহাসিক সূত্রে বর্ণিত আছে, হাজার হাজার মানুষ শহরের বাইরে গিয়ে তাঁকে অভ্যর্থনা জানায়। অনেক আলেম তাঁর আগমনকে ইসলামী জ্ঞানচর্চার জন্য এক মহাসৌভাগ্য বলে আখ্যায়িত করেন।অল্পদিনের মধ্যেই তাঁর দরসে মানুষের ঢল নামে। জ্ঞান, স্মৃতিশক্তি ও হাদিস বিশ্লেষণের অসাধারণ দক্ষতা তাঁকে নিশাপুরের সবচেয়ে জনপ্রিয় মুহাদ্দিসে পরিণত করে।'লাফয বিল-কুরআন' বিতর্ক: একটি ভুল বোঝাবুঝির ইতিহাসইমাম বুখারির জীবনের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ছিল তথাকথিত 'লাফয বিল-কুরআন' বিতর্ক।তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন—মানুষের কণ্ঠস্বর, উচ্চারণ ও কর্ম সৃষ্ট; কিন্তু আল্লাহর কালাম—আল-কুরআন—অসৃষ্ট (গায়রে মাখলুক)।এই সূক্ষ্ম বিষয়টি অনেকেই সঠিকভাবে বুঝতে পারেননি, আবার কেউ কেউ ইচ্ছাকৃতভাবেও ভুলভাবে প্রচার করেন।নিশাপুরের প্রখ্যাত আলেম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াহইয়া আয-যুহলি (রহ.)-এর সঙ্গে এই বিষয়কে কেন্দ্র করে মতভেদ সৃষ্টি হয়। ঐতিহাসিক সূত্রে দেখা যায়, এই মতভেদ শুধু আকিদাগত আলোচনার ফল ছিল না; বরং তৎকালীন সামাজিক, রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত প্রভাবও এতে ভূমিকা রেখেছিল।পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, আয-যুহলি ঘোষণা দেন—যারা ইমাম বুখারির কাছে যাবে, তারা তাঁর মজলিসে উপস্থিত হতে পারবে না।এই ঘটনায় অনেক ছাত্র ভীত হয়ে সরে গেলেও কিছু বিশ্বস্ত ছাত্র শেষ পর্যন্ত তাঁর সঙ্গ ত্যাগ করেননি। তাঁদের অন্যতম ছিলেন ইমাম মুসলিম (রহ.)। ইতিহাসে উল্লেখ আছে, তিনি প্রকাশ্যেই তাঁর শিক্ষক ইমাম বুখারির প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন।বুখারায় প্রত্যাবর্তন এবং নতুন পরীক্ষানিশাপুর ত্যাগ করে ইমাম বুখারি (রহ.) নিজ জন্মভূমি বুখারায় ফিরে আসেন। কিন্তু সেখানেও তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল আরেক কঠিন পরীক্ষা।বুখারার গভর্নর খালিদ ইবনে আহমদ আয-যুহলি (কিছু ঐতিহাসিক সূত্রে নামের সামান্য ভিন্নতা পাওয়া যায়) তাঁর কাছে অনুরোধ পাঠান যে, তিনি যেন রাজপ্রাসাদে এসে গভর্নর ও তাঁর সন্তানদের ব্যক্তিগতভাবে সহিহ বুখারি ও অন্যান্য হাদিস পাঠ করান।ইলমের মর্যাদায় আপসহীন এক ইমামইমাম বুখারি (রহ.) গভর্নরের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন—"আমি জ্ঞানকে অপমান করতে পারি না। ইলমকে মানুষের ঘরে ঘরে নিয়ে বেড়ানো আমার কাজ নয়। যে ইলম চায়, সে সাধারণ মানুষের মতো মজলিসে এসে বসবে।"আরও একটি বর্ণনায় তাঁর বক্তব্য এভাবে এসেছে—"আমি ইলমকে সুলতানদের দরজায় নিয়ে যাব না। যদি আপনার সন্তানদের ইলমের প্রয়োজন হয়, তারা অন্য সবার মতো মজলিসে আসুক।"এই বক্তব্য ইসলামী জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে স্বাধীন আলেমদের মর্যাদার এক অনন্য দলিল হয়ে আছে।নির্বাসনের বেদনাময় অধ্যায়গভর্নর তাঁর এই অবস্থান ভালোভাবে নেননি। পরিণতিতে ইমাম বুখারিকে বুখারা ত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়।নিজ জন্মভূমি, প্রিয় শহর, ছাত্র, বন্ধু—সবকিছু ছেড়ে তাঁকে চলে যেতে হয় সমরখন্দের নিকটবর্তী ছোট্ট গ্রাম খরতঙ্ক-এ।জীবনের শেষ অধ্যায়টি তিনি সেখানেই কাটিয়েছেন।শেষ রাতের দোয়ানির্বাসিত জীবনে শারীরিক ক্লান্তি, মানসিক বেদনা এবং দীর্ঘ সফরের পরিশ্রম তাঁর শরীরকে দুর্বল করে দেয়।জীবনীকারদের বর্ণনায় এসেছে, এক রাতে তাহাজ্জুদের সালাত শেষে তিনি অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে আল্লাহর কাছে দোয়া করেন—"হে আল্লাহ! এই বিশাল পৃথিবী আজ আমার জন্য সংকীর্ণ হয়ে গেছে। আপনি আমাকে আপনার সান্নিধ্যে নিয়ে নিন।"অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর সেই দোয়া কবুল হয়।ইন্তিকাল২৫৬ হিজরির ৩০ রমজান (অনেক সূত্রে ঈদুল ফিতরের রাত) তিনি ইন্তিকাল করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় ৬২ বছর।তাঁর মৃত্যুর সংবাদ দ্রুত সমগ্র মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। অসংখ্য আলেম, ছাত্র ও সাধারণ মানুষ গভীর শোক প্রকাশ করেন।দাফন ও ঐতিহ্যগত বর্ণনাখরতঙ্ক গ্রামেই তাঁকে দাফন করা হয়।প্রাচীন জীবনীগ্রন্থে কয়েকটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে, যেমন—তাঁর কবর থেকে দীর্ঘ সময় সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়া।অনেক মানুষ সেই সুগন্ধ অনুভব করেছেন বলে বর্ণনা করা।তাঁর বিরোধীদের কেউ কেউ পরে অনুতপ্ত হওয়ার কথা উল্লেখ করা।তবে গবেষণাগত সততার স্বার্থে উল্লেখ করা প্রয়োজন, এসব ঘটনা ঐতিহাসিক জীবনীগ্রন্থে বর্ণিত ঐতিহ্যগত বিবরণ। এগুলো সহিহ হাদিস নয় এবং সবগুলোর সনদ সমান শক্তিশালী নয়। তাই এগুলোকে অলৌকিক ঘটনা হিসেবে নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত না করে ঐতিহাসিক বর্ণনা হিসেবেই দেখা অধিক সতর্কতার পরিচায়ক।সহিহ বুখারি: এক হাজার বছরেরও বেশি সময়ের আস্থার প্রতীকইমাম বুখারি (রহ.) শুধু একটি গ্রন্থ রচনা করেননি; তিনি হাদিস যাচাইয়ের এমন এক বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করেছেন, যা আজও ইসলামী গবেষণার অন্যতম ভিত্তি।তাঁর গ্রন্থের ওপর শত শত ব্যাখ্যাগ্রন্থ রচিত হয়েছে। এর মধ্যে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ—ফাতহুল বারি — হাফিজ ইবনে হাজার আল-আসকালানি (রহ.)উমদাতুল কারি — বদরুদ্দীন আইনি (রহ.)ইরশাদুস সারি — কাস্তাল্লানি (রহ.)আজ বিশ্বের অসংখ্য বিশ্ববিদ্যালয়, মাদরাসা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে সহিহ বুখারি পাঠ্য হিসেবে অধ্যয়ন করা হয়।ইমাম বুখারির অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থঅনেকেই মনে করেন, তিনি শুধু সহিহ বুখারিই লিখেছেন। বাস্তবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত বহুমুখী গবেষক। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে—আত-তারীখুল কাবীরআত-তারীখুল আওসাতআত-তারীখুস সাগীরআল-আদাবুল মুফরাদখালকু আফ'আলিল ইবাদজুযউ রাফইল ইয়াদাইনআত-তাফসীরুল কাবীর (অসম্পূর্ণ)আদ-দু'আফাউস সাগীরএসব গ্রন্থ প্রমাণ করে, তিনি কেবল একজন মুহাদ্দিসই নন; বরং ইতিহাসবিদ, জীবনীকার, আকিদা-বিশারদ এবং গবেষণাপদ্ধতিরও এক অগ্রদূত ছিলেন।আজকের মুসলিম সমাজের জন্য শিক্ষাইমাম বুখারি (রহ.)-এর জীবন আমাদের শেখায়—সত্যের জন্য জনপ্রিয়তা বিসর্জন দেওয়া যায়।জ্ঞান কখনো ক্ষমতার কাছে নতজানু হয় না।গবেষণায় সততা আপসহীন হতে হবে।একজন মায়ের দোয়া সন্তানের ভাগ্য বদলে দিতে পারে।খ্যাতি নয়, আল্লাহর সন্তুষ্টিই একজন আলেমের প্রকৃত লক্ষ্য।উপসংহারসম্রাটদের প্রাসাদ ধ্বংস হয়েছে, সাম্রাজ্য বিলীন হয়েছে, কিন্তু একজন মুহাদ্দিসের কলমে সংরক্ষিত রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর বাণী আজও কোটি কোটি মানুষের ঈমান, ইবাদত ও জীবন পরিচালনার পথপ্রদর্শক।ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল আল-বুখারি (রহ.)-এর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানুষের প্রকৃত মর্যাদা সম্পদে নয়, ক্ষমতায় নয়; বরং সত্যের প্রতি নিষ্ঠা, জ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার সন্তুষ্টির জন্য নিবেদিত জীবনে।যতদিন পৃথিবীতে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ অধ্যয়ন করা হবে, যতদিন সহিহ বুখারির পৃষ্ঠা উল্টে মানুষ সত্যের সন্ধান করবে, ততদিন ইতিহাসের আকাশে ইমাম বুখারি (রহ.)-এর নাম এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বল করতে থাকবে।তথ্যসূত্র (নির্বাচিত):সিয়ার আ'লাম আন-নুবালা — ইমাম শামসুদ্দীন আয-যাহাবিহাদিউস সারি ও ফাতহুল বারি — হাফিজ ইবনে হাজার আল-আসকালানিতারীখ বাগদাদ — আল-খতীব আল-বাগদাদিতাযকিরাতুল হুফফায — ইমাম আয-যাহাবিআত-তারীখুল কাবীর — ইমাম আল-বুখারিমুকাদ্দিমা — ইবন খালদুন
১০ ঘন্টা আগে

সৌদি আরব ও ফ্রান্সে বিমান দুর্ঘটনা: নিহত ২৭

সৌদি আরবের রাস তানুরা শহরে হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে ১৪ জন নিহত হয়েছেন। স্থানীয় সময় রোববার সকালে তেল উৎপাদন সংস্থা আরামকোর এই হেলিকপ্টারটি বিধ্বস্ত হয়। সৌদি আরবের বার্তাসংস্থা সৌদি প্রেস এজেন্সি জানিয়েছে, হেলিকপ্টারে ১৪ আরোহী ছিলেন। তাদের সবাই প্রাণ হারিয়েছেন। যারমধ্যে সৌদির নাগরিকও আছেন। কী কারণে হেলিকপ্টারটি বিধ্বস্ত হলো সেটি নিরূপণে তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছেন সৌদির জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা। জ্বালানি মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, "নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর শোক ও আন্তরিক সমবেদনা জানাচ্ছে জ্বালানি মন্ত্রণালয়। সেই সঙ্গে নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে তারা যেন শহীদি মর্যাদা পান, আল্লাহর কাছে সেই প্রার্থনা করছি আমরা।" উল্লেখ্য, রাস তানুরা সৌদি আরামকোর একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল শোধনাগার ও বন্দর এলাকা। এই দুর্ঘটনার পর সৌদি কর্তৃপক্ষ তদন্ত শুরু করেছে। নিহতদের মধ্যে কয়েকজন আরামকোর কর্মচারী ছিলেন বলে জানা গেছে।অন্যদিকে ফ্রান্সের পূর্বাঞ্চলীয় তোম্বলেইন শহরের কাছে বেসামরিক একটি বিমান বিধ্বস্ত হয়েছে বলে দেশটির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। এই দুর্ঘটনায় বিমানের অন্তত ১৩ আরোহী নিহত হয়েছেন। রোববার স্থানীয় সময় সকালের দিকে বিমান বিধ্বস্তের এই ঘটনা ঘটেছে বলে ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। স্থানীয় পুলিশ বলেছে, বিমান বিধ্বস্তের খবর পাওয়ার পর উদ্ধারকারী বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেছে। বিমান দুর্ঘটনার পর তোম্বলেইন বিমানবন্দরের আশপাশের এলাকা কঠোরভাবে এড়িয়ে চলতে বেসামরিক নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে স্থানীয় পুলিশ। স্থানীয় একাধিক গণমাধ্যম বলছে, বিমানটি আকাশ থেকে প্যারাসুট নিয়ে লাফিয়ে পড়তে যাওয়া একদল মানুষকে বহন করছিল। তবে বিমানটি উড্ডয়নের পরপরই বিধ্বস্ত হয়েছে। কী কারণে বিমান বিধ্বস্তের এই ঘটনা ঘটেছে, তাৎক্ষণিকভাবে তা জানা যায়নি বলে জানিয়েছে তোম্বলেইন পুলিশ। এই ঘটনার বিস্তারিত জানতে ইতোমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এই দুর্ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এবং নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, "আমি সকল উদ্ধারকর্মীকে ধন্যবাদ জানাই যারা ঘটনাস্থলে কাজ করছেন।"দুটি বিমান দুর্ঘটনায় মোট ২৭ জন নিহত হয়েছেন। সৌদি আরবের হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় প্রাথমিকভাবে প্রযুক্তিগত ত্রুটির কথা বলা হলেও চূড়ান্ত কারণ তদন্ত সাপেক্ষে। অন্যদিকে ফ্রান্সের বিমান দুর্ঘটনায় আবহাওয়া বা যান্ত্রিক ত্রুটি—দুটির যেকোনো একটি কারণ হতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে উভয় দেশের কর্তৃপক্ষই দ্রুত তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন প্রকাশের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সৌদি আরবের জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা দুর্ঘটনার জন্য আরামকোকে তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছে। অন্যদিকে ফ্রান্সের পরিবহন মন্ত্রণালয় বিমান দুর্ঘটনা তদন্ত সংস্থাকে ঘটনাস্থলে পাঠিয়েছে। নিহতদের মধ্যে ফরাসি নাগরিক ছাড়াও বিদেশি পর্যটক থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে নিহতদের পরিচয় এখনো নিশ্চিত করেনি কর্তৃপক্ষ। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই দুটি দুর্ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছে। জাতিসংঘের মহাসচিব নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন এবং আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করেছেন। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে দুটি দুর্ঘটনারই তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হতে পারে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা নিহতদের পরিবারকে সব ধরনের সহায়তা করবে।
২৮ জুন ২০২৬
সৌদি আরবে ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা

সৌদি আরবে ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা

সৌদি আরবে বসবাসরত প্রবাসী কর্মীদের ওয়ার্ক পারমিট (কাজের অনুমতি) নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছে দেশটির প্রশাসন। দেশটির মানবসম্পদ ও সামাজিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ‘কিওয়া’ প্ল্যাটফর্ম জানিয়েছে, আগামী ৩০ জুন (মঙ্গলবার) পর্যন্ত নিয়োগকর্তারা কর্মীদের ওয়ার্ক পারমিট নবায়ন অথবা তাদের সেবা অন্য প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তরের সুযোগ পাবেন। সৌদি গেজেটের বরাত দিয়ে এই তথ্য জানা গেছে। কিওয়া প্ল্যাটফর্মের পক্ষ থেকে সতর্ক করে বলা হয়েছে, আগামী ১ জুলাই থেকে যেসব কর্মীর ওয়ার্ক পারমিট তিন মাসের বেশি সময় ধরে মেয়াদোত্তীর্ণ রয়েছে, তাদের নিয়োগকর্তার প্রতিষ্ঠানের রেকর্ড থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অপসারণের প্রক্রিয়া শুরু হবে। সহজ কথায়, কোনও কর্মীর ওয়ার্ক পারমিট তিন মাসের বেশি সময় ধরে নবায়ন করা না হলে তাকে প্রতিষ্ঠানের তালিকা থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাদ দেওয়া হবে। তবে কর্মীকে বৈধ ওয়ার্ক পারমিট ছাড়া যে সময় পর্যন্ত কাজ করানো হয়েছে, সেই সময় পর্যন্ত অর্জিত সব বকেয়া আর্থিক দায় ও ফি নিয়োগকর্তাকেই বহন করতে হবে।নির্ধারিত সময়সীমার আগেই সংশ্লিষ্ট কর্মীদের কাগজপত্র বৈধ করার আহ্বান জানিয়ে কিওয়া একটি ব্যতিক্রমী নিয়মের কথা উল্লেখ করেছে। এতে বলা হয়েছে, নিয়মটি হলো, যদি কোনও কর্মীর ওয়ার্ক পারমিটের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়, কিন্তু তার ইকামার (বাসস্থান অনুমতি) মেয়াদ এখনও কমপক্ষে ১৮০ দিন বৈধ থাকে, তবে ওয়ার্ক পারমিট নবায়ন সম্ভব না হলেও তাকে প্রতিষ্ঠানের রেকর্ড থেকে তাৎক্ষণিক অপসারণ করা হবে না। কিন্তু ইকামার অবশিষ্ট মেয়াদ যদি ১৮০ দিনের কম হয়, তবে পরবর্তী প্রশাসনিক জটিলতা ও জরিমানা এড়াতে নিয়োগকর্তাকে একসঙ্গে ইকামা ও ওয়ার্ক পারমিট দুটিই নবায়ন করতে হবে। কিওয়া আরও জানিয়েছে, যেসব প্রবাসী কর্মী তিন মাসের বেশি সময় ধরে মেয়াদোত্তীর্ণ বা বৈধ ওয়ার্ক পারমিট ছাড়া কাজ করছেন, তাদের নাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। বকেয়া ওয়ার্ক পারমিট ফি দ্রুত পরিশোধ করে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের পারমিট নবায়ন অথবা তাদের সেবা অন্য প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তরের মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা ও অতিরিক্ত আর্থিক জরিমানা এড়াতে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সৌদির নিয়োগকর্তাদের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানিয়েছে প্ল্যাটফর্মটি।সৌদি প্রবাসী কর্মীদের জন্য এই নির্দেশনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ওয়ার্ক পারমিট নবায়ন না করলে কর্মীদের চাকরি ও বসবাসের অনুমতিসহ নানা সমস্যা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যাদের ইকামার মেয়াদ ১৮০ দিনের কম, তাদের দ্রুত নবায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। অন্যথায় তারা অবৈধ কর্মী হিসেবে চিহ্নিত হতে পারেন এবং জরিমানা বা নির্বাসনের শিকার হতে পারেন। সৌদি সরকার সম্প্রতি বিভিন্ন খাতে প্রবাসী কর্মীদের বৈধতা নিশ্চিত করতে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। কিওয়া প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অনলাইনে নবায়ন প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে। নিয়োগকর্তারা অনলাইনে আবেদন করে ওয়ার্ক পারমিট ও ইকামা নবায়ন করতে পারবেন। তবে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করলে জরিমানা বাড়তে পারে। সৌদি আরবে অবস্থানরত বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য এই নির্দেশনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা যেন সময়মতো তাদের ওয়ার্ক পারমিট নবায়ন করেন, সেদিকে নজর রাখতে হবে। সৌদি প্রবাসী কল্যাণ সংস্থাগুলোও কর্মীদের এ বিষয়ে সচেতন করছে। তারা বলছে, কোনো কর্মী যদি সময়মতো নবায়ন না করতে পারেন, তবে তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাহায্য নিতে পারেন। সৌদি সরকারের এই পদক্ষেপ প্রবাসী কর্মীদের বৈধতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কর্মীদের উচিত তাদের নিয়োগকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্রুত এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা। অন্যথায় জটিলতা ও আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হতে পারেন তারা। ইতিমধ্যে সৌদি কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন গণমাধ্যম ও প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এই বিষয়ে সচেতনতা বাড়াচ্ছে। প্রবাসীদেরও নিজেদের দায়িত্ব পালন করে সময়মতো কাগজপত্র বৈধ করা উচিত। এতে তাদের কর্মজীবন ও বসবাস নির্বিঘ্ন থাকবে। সৌদি সরকার জানিয়েছে, তারা নিয়মিতভাবে এই প্রক্রিয়া মনিটর করছে এবং কোনো অনিয়ম দেখা গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাই সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
৬ ঘন্টা আগে
সৌদি আরবে ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা

সৌদি আরবে ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা

সৌদি আরবে বসবাসরত প্রবাসী কর্মীদের ওয়ার্ক পারমিট (কাজের অনুমতি) নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছে দেশটির প্রশাসন। দেশটির মানবসম্পদ ও সামাজিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ‘কিওয়া’ প্ল্যাটফর্ম জানিয়েছে, আগামী ৩০ জুন (মঙ্গলবার) পর্যন্ত নিয়োগকর্তারা কর্মীদের ওয়ার্ক পারমিট নবায়ন অথবা তাদের সেবা অন্য প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তরের সুযোগ পাবেন। সৌদি গেজেটের বরাত দিয়ে এই তথ্য জানা গেছে। কিওয়া প্ল্যাটফর্মের পক্ষ থেকে সতর্ক করে বলা হয়েছে, আগামী ১ জুলাই থেকে যেসব কর্মীর ওয়ার্ক পারমিট তিন মাসের বেশি সময় ধরে মেয়াদোত্তীর্ণ রয়েছে, তাদের নিয়োগকর্তার প্রতিষ্ঠানের রেকর্ড থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অপসারণের প্রক্রিয়া শুরু হবে। সহজ কথায়, কোনও কর্মীর ওয়ার্ক পারমিট তিন মাসের বেশি সময় ধরে নবায়ন করা না হলে তাকে প্রতিষ্ঠানের তালিকা থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাদ দেওয়া হবে। তবে কর্মীকে বৈধ ওয়ার্ক পারমিট ছাড়া যে সময় পর্যন্ত কাজ করানো হয়েছে, সেই সময় পর্যন্ত অর্জিত সব বকেয়া আর্থিক দায় ও ফি নিয়োগকর্তাকেই বহন করতে হবে।নির্ধারিত সময়সীমার আগেই সংশ্লিষ্ট কর্মীদের কাগজপত্র বৈধ করার আহ্বান জানিয়ে কিওয়া একটি ব্যতিক্রমী নিয়মের কথা উল্লেখ করেছে। এতে বলা হয়েছে, নিয়মটি হলো, যদি কোনও কর্মীর ওয়ার্ক পারমিটের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়, কিন্তু তার ইকামার (বাসস্থান অনুমতি) মেয়াদ এখনও কমপক্ষে ১৮০ দিন বৈধ থাকে, তবে ওয়ার্ক পারমিট নবায়ন সম্ভব না হলেও তাকে প্রতিষ্ঠানের রেকর্ড থেকে তাৎক্ষণিক অপসারণ করা হবে না। কিন্তু ইকামার অবশিষ্ট মেয়াদ যদি ১৮০ দিনের কম হয়, তবে পরবর্তী প্রশাসনিক জটিলতা ও জরিমানা এড়াতে নিয়োগকর্তাকে একসঙ্গে ইকামা ও ওয়ার্ক পারমিট দুটিই নবায়ন করতে হবে। কিওয়া আরও জানিয়েছে, যেসব প্রবাসী কর্মী তিন মাসের বেশি সময় ধরে মেয়াদোত্তীর্ণ বা বৈধ ওয়ার্ক পারমিট ছাড়া কাজ করছেন, তাদের নাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। বকেয়া ওয়ার্ক পারমিট ফি দ্রুত পরিশোধ করে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের পারমিট নবায়ন অথবা তাদের সেবা অন্য প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তরের মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা ও অতিরিক্ত আর্থিক জরিমানা এড়াতে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সৌদির নিয়োগকর্তাদের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানিয়েছে প্ল্যাটফর্মটি।সৌদি প্রবাসী কর্মীদের জন্য এই নির্দেশনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ওয়ার্ক পারমিট নবায়ন না করলে কর্মীদের চাকরি ও বসবাসের অনুমতিসহ নানা সমস্যা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যাদের ইকামার মেয়াদ ১৮০ দিনের কম, তাদের দ্রুত নবায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। অন্যথায় তারা অবৈধ কর্মী হিসেবে চিহ্নিত হতে পারেন এবং জরিমানা বা নির্বাসনের শিকার হতে পারেন। সৌদি সরকার সম্প্রতি বিভিন্ন খাতে প্রবাসী কর্মীদের বৈধতা নিশ্চিত করতে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। কিওয়া প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অনলাইনে নবায়ন প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে। নিয়োগকর্তারা অনলাইনে আবেদন করে ওয়ার্ক পারমিট ও ইকামা নবায়ন করতে পারবেন। তবে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করলে জরিমানা বাড়তে পারে। সৌদি আরবে অবস্থানরত বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য এই নির্দেশনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা যেন সময়মতো তাদের ওয়ার্ক পারমিট নবায়ন করেন, সেদিকে নজর রাখতে হবে। সৌদি প্রবাসী কল্যাণ সংস্থাগুলোও কর্মীদের এ বিষয়ে সচেতন করছে। তারা বলছে, কোনো কর্মী যদি সময়মতো নবায়ন না করতে পারেন, তবে তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাহায্য নিতে পারেন। সৌদি সরকারের এই পদক্ষেপ প্রবাসী কর্মীদের বৈধতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কর্মীদের উচিত তাদের নিয়োগকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্রুত এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা। অন্যথায় জটিলতা ও আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হতে পারেন তারা। ইতিমধ্যে সৌদি কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন গণমাধ্যম ও প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এই বিষয়ে সচেতনতা বাড়াচ্ছে। প্রবাসীদেরও নিজেদের দায়িত্ব পালন করে সময়মতো কাগজপত্র বৈধ করা উচিত। এতে তাদের কর্মজীবন ও বসবাস নির্বিঘ্ন থাকবে। সৌদি সরকার জানিয়েছে, তারা নিয়মিতভাবে এই প্রক্রিয়া মনিটর করছে এবং কোনো অনিয়ম দেখা গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাই সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
৬ ঘন্টা আগে
লেবানন-ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি চুক্তি নিয়ে গৃহযুদ্ধের শঙ্কা

লেবানন-ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি চুক্তি নিয়ে গৃহযুদ্ধের শঙ্কা

দখলদার ইসরায়েলের সঙ্গে আলাদাভাবে যুদ্ধবিরতির চুক্তি করেছে লেবাননের সরকার। তবে এ চুক্তির কারণে লেবাননে গৃহযুদ্ধ বাধতে পারে বলে সতর্কতা দিয়েছেন দেশটির আইনপ্রণেতা হাসান ফাদাল্লাহ। হাসান ফাদাল্লাহ সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ সংশ্লিষ্ট আইনপ্রণেতা। তিনি লেবানন সরকার ও ইসরায়েলের চুক্তির তীব্র নিন্দাও জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গত সপ্তাহে চুক্তিটি হওয়ার পরপরই হিজবুল্লাহ এটি প্রত্যাখ্যান করে। সশস্ত্র গোষ্ঠীটি বলেছে, তাদের বিশ্বাস এ যুদ্ধবিরতি চুক্তি কখনো কার্যকরই হবে না। গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে ১৪ দফার চুক্তিটি হয়। এতে হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধ এবং হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার কথা বলা হয়েছে। যার অর্থ লেবাননের সেনাবাহিনী হিজবুল্লাহকে অস্ত্র সমর্পণে বাধ্য করার চেষ্টা করবে।লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ অউন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে এক ফোনকলে বলেছেন, চুক্তি কার্যকরে লেবানন তার দায়িত্ব পালন করবে। এরপরই হিজবুল্লাহ সংশ্লিষ্ট আইনপ্রণেতা গৃহযুদ্ধের সতর্কতা দিয়েছেন। এর আগে গতকাল শনিবার হিজবুল্লাহ প্রধান নাঈম কাসেম এক বিবৃতিতে বলেন, লেবানন ও ইসরায়েলি সরকারের মধ্যে হওয়া চুক্তিকে তারা বাতিল ও অকার্যকর হিসেবে গণ্য করবেন। এছাড়া ইসরায়েলের সঙ্গে চুক্তিকে লেবাননের ভৌগলিক অখণ্ডতার আত্মসমর্পণ হিসেবেও অভিহিত করেন তিনি।হিজবুল্লাহর এই অবস্থানের ফলে লেবাননের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন করে সংকট তৈরি হয়েছে। দেশটির বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠী এই চুক্তি নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করছে। কেউ কেউ চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন, আবার কেউ কেউ এর তীব্র সমালোচনা করেছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, হিজবুল্লাহ যদি তাদের অস্ত্র সমর্পণে রাজি না হয়, তাহলে লেবাননে আবারও গৃহযুদ্ধ শুরু হতে পারে। লেবাননে ইতিমধ্যে অর্থনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। এই চুক্তি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র লেবাননের সব পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে। তারা চুক্তি বাস্তবায়নে লেবানন সরকারের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। কিন্তু হিজবুল্লাহ তাদের অবস্থানে অনড়। তারা বলেছে, তারা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিরোধ অব্যাহত রাখবে। লেবাননের সেনাবাহিনী হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করতে পারবে কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। হিজবুল্লাহ লেবাননের সবচেয়ে শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং তাদের বিরাট সমর্থক রয়েছে। তাই তাদের নিরস্ত্রীকরণ সহজ হবে না। এই পরিস্থিতিতে লেবাননে গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা ক্রমশ বাস্তব রূপ নিচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন লেবাননকে নিয়ে উদ্বিগ্ন। তারা চায় যাতে লেবাননে কোনো সহিংসতা না ছড়ায় এবং দেশটির স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। তবে হিজবুল্লাহ ও লেবানন সরকারের মধ্যে এই দ্বন্দ্ব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে বলে ধারণা করছেন অনেকেই। লেবাননের জনগণ এই পরিস্থিতি নিয়ে আতঙ্কিত। তারা চায় যাতে তাদের দেশ আবারও যুদ্ধের ময়দানে পরিণত না হয়। এমতাবস্থায় সবাই উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে লেবাননের দিকে তাকিয়ে আছে। আগামী কয়েকদিন এই পরিস্থিতির দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করবে।
৬ ঘন্টা আগে
১৫ এপ্রিল ২০২৬, ১২:১১ এএম
আপনি কি মনে করেন বিএনপি জুলাই সনদের প্রতিটি অক্ষর ও শব্দ বাস্তবায়ন করবে?

আপনি কি মনে করেন বিএনপি জুলাই সনদের প্রতিটি অক্ষর ও শব্দ বাস্তবায়ন করবে?

  হ্যাঁ
  না
  মন্তব্য নেই
মোট ভোটদাতাঃ জন
১৪ মাস পর দেশজুড়ে শুরু হচ্ছে ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন, ২ কোটি ৩৫ লাখ শিশু পাবে ক্যাপসুল

১৪ মাস পর দেশজুড়ে শুরু হচ্ছে ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন, ২ কোটি ৩৫ লাখ শিশু পাবে ক্যাপসুল

প্রায় ১৪ মাস পর দেশব্যাপী ভিটামিন এ ক্যাপসুল ক্যাম্পেইন শুরু হতে যাচ্ছে। অন্ধত্ব প্রতিরোধসহ শিশুদের পুষ্টিহীনতা দূরীকরণের লক্ষ্যে আয়োজিত এই বিশেষ ক্যাম্পেইন ২৮ জুন সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলবে। এদিন ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী ২ কোটি ৩৫ লাখের বেশি শিশুকে ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানো হবে। তবে ১২টি জেলার ৫৮টি উপজেলার ২৯০টি ইউনিয়নের ৭১৪টি ওয়ার্ডের দুর্গম অঞ্চলে ক্যাম্পেইন-পরবর্তী চার দিন ‘চাইল্ড টু চাইল্ড সার্চিং’ কার্যক্রম চালানো হবে। জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক মোহাম্মদ ইউনুস আলী বাসসকে এ তথ্য জানিয়েছেন।ক্যাম্পেইন বাস্তবায়নের দায়িত্বে আছে জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এবারের ক্যাম্পেইনে ২ কোটি ৩৫ লাখ ১৪ হাজার ৯৭২টি শিশুকে অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬ মাস থেকে ১১ মাস বয়সী শিশুদের সংখ্যা (যাদের নীল রঙের ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানো হবে) ২৮ লাখ ৩৮ হাজার ৭৯৪ জন। ১২ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের সংখ্যা (যাদের লাল রঙের ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানো হবে) ২ কোটি ৫ লাখ ৭৬ হাজার ১৭৮ জন। এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক মোহাম্মদ ইউনুস আলী বলেন, ২৮ জুন দেশব্যাপী ভিটামিন এ ক্যাপসুল ক্যাম্পেইন আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। বাস্তবায়নের জন্য ইতিমধ্যে ১ লাখ ২০ হাজার কেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়েছে। এগুলো ইপিআইয়ের নিয়মিত কেন্দ্র। এ ছাড়া আরও ৫০০টি মোবাইলকেন্দ্র (লঞ্চঘাট, ফেরিঘাট, রেলস্টেশন, বাসস্টেশন ইত্যাদি) স্থাপন করা হয়েছে। ভিটামিন এ ক্যাপসুল ইতিমধ্যে হাতে এসে পৌঁছেছে বলে জানান মোহাম্মদ ইউনুস আলী। তিনি বলেন, ‘ক্যাম্পেইন বাস্তবায়নের জন্য আমরা সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিচ্ছি। আশা করছি, ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের অভিভাবকেরা কাছাকাছি কেন্দ্রগুলোয় গিয়ে তাঁদের সন্তানদের ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানোর ব্যবস্থা করবেন।’স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, ২৮ জুন সকালে রাজধানীর শাহবাগের আবু সাঈদ কনভেশন সেন্টারে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন ভিটামিন এ ক্যাপসুল ক্যাম্পেইনের উদ্বোধন করবেন। অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত, প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক উপদেষ্টা এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার উপস্থিত থাকবেন। এ ছাড়া জেলা-উপজেলা পর্যায়ে স্থানীয় সংসদ সদস্যরা স্থানীয় প্রশাসনকে সঙ্গে নিয়ে ভিটামিন এ ক্যাম্পেইনের উদ্বোধন করবেন। মাঠকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে ক্যাম্পেইন বাস্তবায়ন করা হবে। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সিভিল সার্জন এবং উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তারা (নিজেদের টিমের মাধ্যমে) স্থানীয় পর্যায়ে মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে কর্মকর্তাদের মাঠপর্যায়ে তদারকির কাজ সম্পন্ন করতে মন্ত্রণালয় নির্দেশ দিয়েছে।জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিয়ম অনুসারে বছরে দুবার ভিটামিন এ ক্যাপসুলের ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা। তবে ক্যাপসুলসংকটে গত বছরের মার্চ মাসের পর থেকে তা আর হয়নি। দীর্ঘ ১৪ মাস পর ২৮ জুন এই ক্যাম্পেইন হচ্ছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, ‘দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা ভিটামিন এ ক্যাপসুল ক্যাম্পেইন আমরা আবার হাতে নিয়েছি। ক্যাম্পেইনটি সফল করতে সবাইকে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানাচ্ছি।’ ক্যাম্পেইনের দিন পরিবারের ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী সব শিশুকে কাছের কেন্দ্রে সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যে নিয়ে গিয়ে ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানো নিশ্চিত করতে অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের প্রচারপত্রে বলা হয়েছে, ভিটামিন এ শিশুর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ভিটামিন এ শুধু অপুষ্টিজনিত অন্ধত্ব থেকে শিশুদের রক্ষা করে না; বরং তা রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায়। দীর্ঘমেয়াদি ডায়রিয়া থেকে শিশুকে সুরক্ষা দেয়। শিশুর মৃত্যুঝুঁকি কমায়। শিশুদের অন্ধত্ব ও পুষ্টিহীনতা দূর করতে বাংলাদেশে ১৯৭৩ সাল থেকে ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানো শুরু হয়। তখন এটি ‘জাতীয় রাতকানা রোগপ্রতিরোধ কার্যক্রম’ নামে পরিচিত ছিল। ১৯৯৫ সালে কার্যক্রমটি আরও শক্তিশালী করতে জাতীয় টিকাদান দিবসের সঙ্গে ভিটামিন এ কর্মসূচি যুক্ত করা হয়। ২০০৩ সাল থেকে এর নাম দেওয়া হয় ‘জাতীয় ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইন’। ২০১১ সালে এটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় পুষ্টিসেবা (এনএনএস) কার্যক্রমের আওতাভুক্ত করা হয়। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘ ১৪ মাস বিরতির পর এই ক্যাম্পেইন শিশুদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিভাবকদের উদ্দেশে তারা বলেছেন, নির্ধারিত দিনে শিশুদের ক্যাপসুল খাওয়ানোর জন্য কেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে। কেন্দ্রে যেসব শিশুর উপস্থিতি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না, তাদের জন্য ‘চাইল্ড টু চাইল্ড সার্চিং’ কার্যক্রমের মাধ্যমে ক্যাপসুল পৌঁছে দেওয়া হবে। এই কর্মসূচি সফল করতে মাঠ পর্যায়ে স্বাস্থ্য কর্মীদের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবকরাও কাজ করবেন বলে জানিয়েছে জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান।
২৪ জুন ২০২৬
সুদমুক্ত অর্থনীতি চালুর প্রস্তাব ও জুডিশিয়াল কিলিং-এর বিচার দাবি জামায়াত এমপির

সুদমুক্ত অর্থনীতি চালুর প্রস্তাব ও জুডিশিয়াল কিলিং-এর বিচার দাবি জামায়াত এমপির

দেশের অর্থনীতিকে সুদের জাঁতাকল থেকে মুক্ত করতে সুদমুক্ত আর্থিক ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব করেছেন রংপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা এটিএম আজহারুল ইসলাম। একইসঙ্গে তিনি বিগত সরকারের আমলে দলের শীর্ষ নেতাদের ফাঁসিকে ‘জুডিশিয়াল কিলিং’ আখ্যা দিয়ে এর বিচার দাবি করেছেন। রোববার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।বাজেট বক্তৃতার শুরুতে তিনি জুলাইয়ের গণ–অভ্যুত্থানে শহীদদের স্মরণ করেন এবং বিগত ১৭ বছরের ‘ফ্যাসিস্ট’ সরকারের শাসনামলে নির্যাতিতদের পাশে দাঁড়াতে বর্তমান সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। জামায়াত নেতা বলেন, আমি অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদসহ আমাদের শীর্ষ নেতাদের, যাদের অন্যায়ভাবে মিথ্যা মামলায় সাজিয়ে জুডিশিয়াল কিলিংয়ের মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছে। মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীসহ ১১ জন নেতাকে হত্যা করা হয়েছে। আমি দাবি জানাই, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে বিচার করা হোক। প্রস্তাবিত নয় লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে তিনি বলেন, এই বিশাল বাজেটের ঘাটতি দুই লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষ্যমাত্রা এনবিআরকে দেওয়া হয়েছে তা উচ্চাভিলাষী। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও ডিজিটাল সংস্কার ছাড়া এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।সুদকে ‘বড় পাপ’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাজেটে সুদ পরিশোধেই ব্যয় হবে এক লাখ ২৭ হাজার পাঁচশ কোটি টাকা। ৯২ ভাগ মুসলিমের দেশে সুদের এই বোঝা মেনে নেওয়া যায় না। সুদমুক্ত অর্থনীতি চালু করতে সরকার সুকুক (ইসলামী বন্ড) ইস্যুর মাধ্যমে জনগণের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের বিকল্প পথ বেছে নিতে পারে। ২০২০ সাল থেকে চালু হওয়া সুকুক বন্ডকে আরও জনপ্রিয় করলে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে সুদমুক্ত হওয়ার পথে এগিয়ে যাবে। ব্যাংকিং খাতের বিশৃঙ্খলা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এমপি আজহার বলেন, খেলাপি ঋণের পরিমাণ এক লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বেসিক ব্যাংক, হলমার্ক ও পিকে হালদারের লুটপাটে সাধারণ মানুষের আস্থা নষ্ট হয়েছে। এর ওপর আবার ১৫ শতাংশ কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যা সৎ করদাতাদের জন্য অপমানজনক এবং সংবিধানের ২০(২) অনুচ্ছেদের পরিপন্থি। আমরা এই সুযোগ বাতিলের দাবি জানাই।অর্থপাচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি’র রিপোর্ট অনুযায়ী বছরে সাত বিলিয়ন ডলার পাচার হচ্ছে। পাচার অর্থ দেশে বিনিয়োগ হলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পেত। পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। নিজ নির্বাচনী এলাকা রংপুর-২ (বদরগঞ্জ ও তারাগঞ্জ) এর সমস্যার কথা তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, আমার এলাকা অত্যন্ত অবহেলিত। রাস্তাঘাটের বেহাল দশা এবং কৃষকরা পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে না। গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে বিশেষ বরাদ্দ প্রয়োজন। এছাড়া কেবল পুঁথিগত বিদ্যা নয়, নৈতিক মূল্যবোধ ও সততার বীজ বপনে শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের ওপরও জোর দেন তিনি।এটিএম আজহারুল ইসলাম তার বক্তব্যে আরও বলেন, সুদমুক্ত অর্থনীতি বাস্তবায়নে ইসলামী ব্যাংকিং খাতের বিকল্প পথ খোলা জরুরি। তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মুক্তির পথে সুদই প্রধান বাধা। সরকার যদি সত্যিই গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় বিশ্বাসী হয়, তাহলে সুদমুক্ত অর্থনীতি চালু করতে হবে। তিনি সংসদে উপস্থিত সকল সদস্যের কাছে এই প্রস্তাবের পক্ষে সমর্থন চান। বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি আরও বলেন, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে বাজেটে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। কৃষি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি জানান তিনি। এটিএম আজহারুল ইসলামের এই বক্তব্য সংসদে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে। আগামী দিনে বাজেট বাস্তবায়নে সরকার কী পদক্ষেপ নেয়, তা দেখার বিষয়।
০৮ মে ২০২৬
পেনশন ব্যবস্থায় বড় সংস্কার: চাকরিকাল কমল ৫ বছর, বাড়ল পেনশনের হার

পেনশন ব্যবস্থায় বড় সংস্কার: চাকরিকাল কমল ৫ বছর, বাড়ল পেনশনের হার

০৮ মে ২০২৬
নতুন নকিয়া ১১০ পাওয়ার: এক চার্জে ১৫ দিন, দাম ২৮৯৯ টাকা

নতুন নকিয়া ১১০ পাওয়ার: এক চার্জে ১৫ দিন, দাম ২৮৯৯ টাকা

নকিয়ার চিরচেনা ফিচার ফোনের ঐতিহ্যকে আধুনিক রূপে ফিরিয়ে এনে বাংলাদেশে উৎপাদিত নতুন ‘নকিয়া ১১০ পাওয়ার’ উন্মোচন করা হয়েছে। ফোনটি একবার চার্জে ১৫ দিন চলবে, দাম ২ হাজার ৮৯৯ টাকা। মুঠোফোনের ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সর্বাধিক বিক্রিত মডেলগুলোর একটি নকিয়া ১১০। সেই পরিচিত ফোনটিই এবার নতুন রূপে ফিরেছে বাংলাদেশের বাজারে। দীর্ঘস্থায়ী ব্যাটারি, বড় পর্দা ও পরিচিত নকশার সমন্বয়ে উন্মোচন করা হয়েছে নতুন নকিয়া ১১০ পাওয়ার।সম্প্রতি রাজধানীর গুলশান শুটিং ক্লাবে আয়োজিত দিনব্যাপী বিক্রয় প্রতিনিধি সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে ফোনটি উন্মোচন করা হয়। এর আয়োজন করে বাংলাদেশে নকিয়া ফোনের একমাত্র উৎপাদনকারী ও পরিবেশক প্রতিষ্ঠান সেলেক্সট্রা লিমিটেড। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন এইচএমডি বাংলাদেশের বিজনেস ম্যানেজার কাজী আল আমিন, সেলেক্সট্রার ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিয়াজুল ইসলাম, হেড অব সেলস মামুন খান, চিফ বিজনেস অফিসার মোহাম্মদ আসিফ আলমগীর প্রমুখ। অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, দেশে উৎপাদিত এই নতুন মডেলটি নকিয়ার ঐতিহ্যকে ধরে রেখে আধুনিক ব্যবহারকারীদের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি করা হয়েছে। নতুন নকিয়া ১১০ পাওয়ারের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর শক্তিশালী ১৭৫০ মিলিঅ্যাম্পিয়ার ব্যাটারি। নির্মাতাদের দাবি, একবার পূর্ণ চার্জে ফোনটি টানা ১৫ দিন পর্যন্ত সচল থাকতে পারবে। ফলে নিয়মিত চার্জ দেওয়ার ঝামেলা ছাড়াই দীর্ঘ সময় ব্যবহার করা যাবে ফোনটি।ফিচার ফোন হলেও এতে রয়েছে দুই ইঞ্চি পর্দা, যা আগের অনেক মডেলের তুলনায় বড় ও ব্যবহারবান্ধব। ফোনটির পেছনে থাকা ক্যামেরার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে এলইডি ফ্ল্যাশ, যা অল্প আলো বা অন্ধকার পরিবেশেও ছবি তুলতে সহায়তা করবে। নকিয়ার পুরোনো ব্যবহারকারীদের জন্য সুখবর হলো নতুন এই ফোনেও রাখা হয়েছে একসময়ের জনপ্রিয় স্নেক গেম। ফলে প্রযুক্তির আধুনিকতার পাশাপাশি নস্টালজিয়ার ছোঁয়াও মিলবে ডিভাইসটিতে। নকিয়া ১১০ পাওয়ার বাজারে আনা হয়েছে নীল, ধূসর ও বেগুনি—এই তিন রঙে।প্রসঙ্গত, নকিয়ার আসল ফোন দেখে কিনতে জানিয়েছেন নির্মাতারা। আপনার কেনা ফোনটি আসল কি না, তা যাচাই করতে মুঠোফোনের আইএমইআই নম্বর লিখে ‘KYD <স্পেস> ১৫ সংখ্যার আইএমইআই নম্বর’ টাইপ করে ১৬০০২ নম্বরে এসএমএস পাঠাতে হবে। ফিরতি এসএমএস ডিভাইসটির বৈধ বা নকলের তথ্য পাওয়া যাবে। নকিয়া ১১০ পাওয়ারকে বাংলাদেশের বাজারে ফিচার ফোনের মধ্যে অন্যতম সেরা বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটির দাম ২ হাজার ৮৯৯ টাকা হওয়ায় এটি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে যারা শুধু কল, এসএমএস এবং কিছু মৌলিক কাজের জন্য ফোন ব্যবহার করেন, তাদের জন্য এটি একটি চমৎকার পছন্দ। এর শক্তিশালী ব্যাটারি, বড় পর্দা, স্নেক গেমের নস্টালজিয়া এবং এলইডি ফ্ল্যাশ সহ ক্যামেরা ফোনটিকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। সেলেক্সট্রা লিমিটেড জানিয়েছে, তারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই ফোনের বিক্রি বাড়াতে কাজ করছে। তারা গ্রাহকদের সন্তুষ্টি এবং আফটার-সেলস সার্ভিস নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। নকিয়া ১১০ পাওয়ার উন্মোচনের পর থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফোনটির ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। অনেকে তাদের পুরোনো দিনের কথা স্মরণ করে এই ফোন কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। আগামী কয়েক সপ্তাহে ফোনটির বিক্রি ভালো হতে পারে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। নকিয়া বাংলাদেশে তাদের ফিচার ফোনের বাজার ধরে রাখতে আরও নতুন মডেল আনতে পারে বলে গুঞ্জন রয়েছে। ফোনটির বিষয়ে বিস্তারিত জানতে গ্রাহকরা সেলেক্সট্রার অফিসিয়াল ওয়েবসাইট বা নিকটস্থ মোবাইল ফোনের দোকানে যোগাযোগ করতে পারেন। নকিয়ার এই নতুন যাত্রা বাংলাদেশের মোবাইল বাজারে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
৫ ঘন্টা আগে
কোন ছবি নেই !
কোন ছবি নেই !
নাগরিকত্বের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সন্তান জন্ম দেওয়া ভিসা শর্তের পরিপন্থি: মার্কিন দূতাবাস

নাগরিকত্বের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সন্তান জন্ম দেওয়া ভিসা শর্তের পরিপন্থি: মার্কিন দূতাবাস

ক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পাওয়ার উদ্দেশ্যে দেশটিতে গিয়ে সন্তান জন্ম দেওয়া এখন থেকে ভিসার শর্তের পরিপন্থি হিসেবে গণ্য হবে। এমন উদ্দেশ্যে কেউ ভিসা আবেদন করলে তা সরাসরি বাতিল করা হবে বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে মার্কিন দূতাবাস।বুধবার সকালে দূতাবাসের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক বিশেষ সতর্কবার্তায় এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়।কী বলছে দূতাবাসের সতর্কবার্তাদূতাবাসের পোস্টে উল্লেখ করা হয়, কোনো ব্যক্তি যদি মূলত সন্তানের মার্কিন নাগরিকত্ব নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণের পরিকল্পনা করেন, তবে তা দেশটির বর্তমান ভিসা নীতিমালার পরিপন্থি।কনস্যুলার কর্মকর্তারা যদি সাক্ষাৎকার বা তদন্তের মাধ্যমে বুঝতে পারেন যে আবেদনকারীর মূল লক্ষ্য সন্তান জন্ম দিয়ে নাগরিকত্ব অর্জন, তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ট্যুরিস্ট ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হবে।সতর্কবার্তায় আরও বলা হয়, এ ধরনের কার্যক্রম মার্কিন ভিসা নীতিমালার গুরুতর লঙ্ঘন। তাই আবেদনকারীদের শুধু প্রকৃত এবং সঠিক উদ্দেশ্য উল্লেখ করে আবেদন করার আহ্বান জানিয়েছে দূতাবাস।কঠোর সতর্কতাভিসা পাওয়ার জন্য ভুল তথ্য প্রদান বা ভিসার শর্ত ভঙ্গ করলে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণের ক্ষেত্রে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা বা নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলেও সতর্কবার্তায় উল্লেখ করা হয়েছে।অর্থাৎ, কেউ যদি এ উদ্দেশ্যে ভিসা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সন্তান জন্ম দেন এবং তা প্রমাণিত হয়, তাহলে পরবর্তীতে তার যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে জন্ম নিলে সন্তান স্বয়ংক্রিয়ভাবে সে দেশের নাগরিক হয় – এই সুযোগ কাজে লাগাতে অনেকেই আগে ট্যুরিস্ট ভিসায় গিয়ে সন্তান প্রসব করতেন। এখন থেকে সেই পথ কার্যকরীভাবে বন্ধ করে দিলো মার্কিন দূতাবাস। শুধু ভিসা বাতিল নয়, ভবিষ্যতেও যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞার হুঁশিয়ারি দেওয়ায় এই সিদ্ধান্তকে ‘চরম কঠোর’ বলছেন অভিবাসন বিশ্লেষকরা। ফলে আবেদনকারীদের এখন ভিসা আবেদনের আগে তিনবার ভাবতে হবে।
০৮ মে ২০২৬
হাদিসশাস্ত্রের মহান ইমাম: ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল আল-বুখারি (রহ.)

হাদিসশাস্ত্রের মহান ইমাম: ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল আল-বুখারি (রহ.)

যে নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর বাণীর নিরাপদ সংরক্ষণইসলামের ইতিহাসে এমন কিছু মনীষীর আবির্ভাব ঘটেছে, যাঁদের অবদান কোনো নির্দিষ্ট যুগ, ভূখণ্ড কিংবা জাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁদের কর্ম মানবসভ্যতার ইতিহাসে স্থায়ী প্রভাব রেখে গেছে। সেই বিরল ব্যক্তিত্বদের অন্যতম হলেন ইমাম আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল আল-বুখারি (রহ.)—যাঁর নাম উচ্চারিত হলেই মনে ভেসে ওঠে 'সহিহ বুখারি', হাদিসশাস্ত্রের সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য সংকলন।আজ পৃথিবীর যে প্রান্তেই মুসলমান বসবাস করুক না কেন, কুরআনুল কারিমের পর যে গ্রন্থটি সবচেয়ে বেশি সম্মান, গ্রহণযোগ্যতা ও নির্ভরযোগ্যতার মর্যাদা লাভ করেছে, সেটি হলো সহিহ আল-বুখারি। এটি শুধু একটি হাদিসগ্রন্থ নয়; বরং রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর জীবন, বাণী, কর্ম ও সুন্নাহকে বিশুদ্ধভাবে সংরক্ষণের এক অসাধারণ বৈজ্ঞানিক প্রচেষ্টা।কিন্তু এই বিস্ময়কর কীর্তির পেছনে ছিল এক শিশুর অশ্রুসিক্ত শৈশব, একজন মায়ের অবিচল ঈমান, সীমাহীন ত্যাগ, হাজার হাজার মাইল দীর্ঘ সফর, অক্লান্ত গবেষণা এবং সত্যের প্রতি আপসহীন নিষ্ঠা।বুখারা—জ্ঞান ও সভ্যতার এক উজ্জ্বল নগরীবর্তমান উজবেকিস্তানের অন্তর্গত প্রাচীন নগরী বুখারা একসময় ছিল মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্ঞানকেন্দ্র। মধ্য এশিয়ার এই শহরটি ছিল সিল্ক রোডের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। এখানে যেমন বণিকদের আনাগোনা ছিল, তেমনি ছিল কুরআন, হাদিস, ফিকহ, ভাষাতত্ত্ব, দর্শন ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের খ্যাতিমান পণ্ডিতদের সমাবেশ।অষ্টম ও নবম শতাব্দীতে বুখারা শুধু রাজনৈতিকভাবেই নয়, জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রেও খ্যাতির শীর্ষে অবস্থান করছিল। দূর-দূরান্ত থেকে ছাত্ররা এখানে আসতেন ইসলামী জ্ঞান অর্জনের জন্য।এই জ্ঞানময় পরিবেশেই জন্ম নেন সেই মহান ব্যক্তিত্ব, যিনি পরবর্তীকালে মানবজাতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ গবেষক হিসেবে ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবেন।জন্ম ও বংশপরিচয়ইমাম বুখারির পূর্ণ নাম—আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল ইবনে ইবরাহিম ইবনে আল-মুগিরাহ ইবনে বারদিযবাহ আল-জুফি আল-বুখারি (রহ.)।তিনি ১৩ শাওয়াল, ১৯৪ হিজরি (৮১০ খ্রিস্টাব্দ) বুখারা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন।তাঁর পরিবার মূলত পারস্য বংশোদ্ভূত ছিল। তাঁর প্রপিতামহ আল-মুগিরাহ ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করেন এবং জুফি গোত্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেন। সেই সূত্রেই তাঁদের বংশের সঙ্গে "আল-জুফি" উপাধি যুক্ত হয়।যদিও বংশগতভাবে তিনি আরব ছিলেন না, কিন্তু ইসলামী জ্ঞান, চরিত্র, গবেষণা ও অবদানের কারণে তিনি মুসলিম বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইমাম হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন।এক ধার্মিক পিতার উত্তরাধিকারইমাম বুখারির পিতা ইসমাইল ইবনে ইবরাহিম ছিলেন একজন সম্মানিত মুহাদ্দিস ও অত্যন্ত পরহেজগার ব্যক্তি।তিনি বিখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম মালিক ইবনে আনাস (রহ.), হাম্মাদ ইবনে যায়েদ (রহ.) প্রমুখ আলেমের নিকট হাদিস অধ্যয়ন করেছিলেন।তাঁর সম্পর্কে জীবনীকাররা উল্লেখ করেছেন, মৃত্যুর আগে তিনি বলেছিলেন—"আমার সম্পদের মধ্যে এমন একটি দিরহামও নেই, যা হারাম উপার্জন থেকে এসেছে কিংবা যার মধ্যে সন্দেহ রয়েছে।"এই বক্তব্য শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সততার পরিচয় দেয় না; বরং বোঝায়, ইমাম বুখারির জীবনের ভিত্তি নির্মিত হয়েছিল হালাল রিজিক, তাকওয়া ও সততার ওপর।দুঃখজনকভাবে ইমাম বুখারি খুব অল্প বয়সেই তাঁর পিতাকে হারান। ফলে তাঁর লালন-পালনের সম্পূর্ণ দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর মায়ের ওপর।একজন মায়ের দোয়া বদলে দিয়েছিল ইতিহাসইমাম বুখারির শৈশবের সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী ঘটনাগুলোর একটি হলো তাঁর দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলা।শৈশবে এক দুরারোগ্য ব্যাধির কারণে তিনি সম্পূর্ণ অন্ধ হয়ে যান। চিকিৎসকরা আশাহত হয়ে পড়েন। পরিবারের লোকজনও প্রায় আশা ছেড়ে দেন।কিন্তু একজন মানুষ আশা হারাননি।তিনি ছিলেন তাঁর মা।দিনের পর দিন, রাতের পর রাত তিনি আল্লাহর দরবারে কেঁদে কেঁদে দোয়া করতে থাকেন।ইতিহাসবিদদের একটি প্রসিদ্ধ বর্ণনায় এসেছে, এক রাতে তিনি স্বপ্নে আল্লাহর নবী ইবরাহিম (আ.)-কে দেখেন। তিনি বলেন—"তোমার অধিক দোয়া ও কান্নার কারণে আল্লাহ তোমার সন্তানের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন।"পরদিন ঘুম থেকে উঠে তিনি বিস্ময়ের সঙ্গে দেখলেন—ছেলের চোখে আবার আলো ফিরে এসেছে।ঐতিহাসিক মন্তব্যএই ঘটনাটি প্রাচীন জীবনীগ্রন্থে উল্লেখিত একটি প্রসিদ্ধ ঐতিহ্যগত বর্ণনা। ইতিহাসবিদরা এটি উদ্ধৃত করলেও এর সনদ হাদিসের মানদণ্ডে সহিহ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত নয়। তবে মুসলিম ঐতিহাসিক সাহিত্যে ঘটনাটি ব্যাপকভাবে বর্ণিত হয়েছে এবং একজন মায়ের দোয়ার শক্তির অনন্য উদাহরণ হিসেবে আলোচিত।দৃষ্টি ফিরে পাওয়ার পর শুরু হয় আরেক অলৌকিক যাত্রাচোখের আলো ফিরে পাওয়ার পর যেন তাঁর মেধারও নতুন দ্বার উন্মুক্ত হয়ে গেল।অন্য শিশুরা যখন খেলাধুলায় ব্যস্ত থাকত, তখন ছোট্ট মুহাম্মদের সবচেয়ে প্রিয় কাজ ছিল আলেমদের দরসে বসা।তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনতেন।বারবার শুনতেন।একবার শুনলেই মনে গেঁথে যেত।তাঁর স্মৃতিশক্তি এতটাই প্রখর ছিল যে, শৈশবেই শিক্ষকরা তাঁর অসাধারণ মেধায় বিস্মিত হয়ে পড়েন।মাত্র দশ বছর বয়সে শুরু হাদিস সংশোধনইমাম বুখারির জীবনীকারদের বর্ণনা অনুযায়ী, মাত্র দশ বছর বয়সেই তিনি হাদিস অধ্যয়নে এমন দক্ষতা অর্জন করেন যে, কোনো শিক্ষক হাদিস বর্ণনার সময় ভুল করলে তিনি বিনয়ের সঙ্গে তা সংশোধন করে দিতেন।প্রথম দিকে শিক্ষকরা তাঁর আপত্তি গ্রহণ করতেন না।কিন্তু যখন মূল গ্রন্থ বের করে মিলিয়ে দেখা হতো, তখন দেখা যেত—ছোট্ট মুহাম্মদই সঠিক ছিলেন।এই ঘটনাগুলো খুব দ্রুত পুরো বুখারায় ছড়িয়ে পড়ে।এগারো বছর বয়সে বিস্ময়কর ঘটনাএকদিন তাঁর শিক্ষক একটি সনদ (ইসনাদ) পাঠ করছিলেন।তিনি ভুলবশত একজন রাবির নাম অন্যজনের সঙ্গে পরিবর্তন করে ফেলেন।ইমাম বুখারি বিনয়ের সঙ্গে বলেন—"হে উস্তাদ, এখানে সম্ভবত নামটি ভিন্ন হবে।"শিক্ষক প্রথমে বিষয়টি গুরুত্ব দেননি।কিন্তু পরে মূল কপি বের করে দেখেন, কিশোর ছাত্রটির বক্তব্যই সঠিক।সেদিন থেকেই আলেমরা বুঝতে পারেন—এই শিশুর স্মৃতি ও বিশ্লেষণক্ষমতা সাধারণ মানুষের মতো নয়।কৈশোরেই সম্পূর্ণ হাদিসবিদমাত্র ষোলো বছর বয়সে তিনি হাদিসশাস্ত্রের বহু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ অধ্যয়ন শেষ করেন।এর মধ্যে ছিল—আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক (রহ.)-এর সংকলনওয়াকী ইবনে জাররাহ (রহ.)-এর রেওয়ায়েততৎকালীন বহু মুহাদ্দিসের মৌলিক হাদিসগ্রন্থএই সময়েই তাঁর মা ও ভাই আহমদের সঙ্গে তিনি হজ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কায় যান।হজ শেষে তাঁর মা ও ভাই বুখারায় ফিরে এলেও মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল থেকে যান।কারণ তাঁর সামনে তখন আরেকটি স্বপ্ন।রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতিটি সহিহ হাদিস খুঁজে বের করা।সংগ্রহ করা।যাচাই করা।সংরক্ষণ করা।তিনি তখনও জানতেন না—এই স্বপ্নই একদিন তাঁকে ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিসে পরিণত করবে।জ্ঞানার্জনের দীর্ঘ সফর, বিস্ময়কর স্মৃতিশক্তি ও বিশ্বসেরা মুহাদ্দিসে পরিণত হওয়ার গল্পমাত্র ষোলো বছর বয়সে হজ পালন শেষে ইমাম বুখারি (রহ.) একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর মা ও বড় ভাই আহমদ বুখারায় ফিরে গেলেও তিনি মক্কায় থেকে যান। কারণ তাঁর হৃদয়ে তখন একটি মাত্র স্বপ্ন—রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সহিহ হাদিসগুলোকে পৃথিবীর জন্য সংরক্ষণ করা।এই সিদ্ধান্তই তাঁর পুরো জীবনকে বদলে দেয়।মক্কা ও মদিনায় ইলমের নতুন অধ্যায়হজের পর ইমাম বুখারি (রহ.) দীর্ঘ সময় মক্কায় অবস্থান করেন। তিনি মসজিদুল হারামে বসে হাদিস, ফিকহ, আরবি ভাষা ও রিজালশাস্ত্র অধ্যয়ন করতে থাকেন। পরে তিনি মদিনায় চলে যান। রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর রওজা মোবারকের সান্নিধ্যে কাটানো সময় তাঁর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে ওঠে।ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে, মদিনায় অবস্থানকালে রাতের নির্জনে, অনেক সময় চাঁদের আলোয় কিংবা মসজিদে নববীর নিকট বসেই তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আত-তারীখুল কাবীর’-এর রচনা শুরু করেন। তখন তাঁর বয়স মাত্র আঠারো বছর।এই গ্রন্থটি পরবর্তীকালে রাবিদের জীবনীসংক্রান্ত (ইলমুর রিজাল) অন্যতম মৌলিক গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।ইলমের জন্য চল্লিশ বছরের অবিশ্রান্ত সফরইমাম বুখারি (রহ.) বিশ্বাস করতেন—ইলম ঘরে বসে অর্জন করা যায় না; এর জন্য ত্যাগ, ধৈর্য ও দীর্ঘ সফর প্রয়োজন।তিনি জীবনের প্রায় চার দশক ধরে মুসলিম বিশ্বের প্রধান প্রধান জ্ঞানকেন্দ্র সফর করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—মক্কামদিনাবসরাকুফাবাগদাদওয়াসিতমিশরদামেস্কহিমসনিশাপুরমারভবালখরায়সমরখন্দসহ বহু নগরী।জীবনীকারদের মতে, তিনি কিছু শহরে একাধিকবার সফর করেছিলেন। উদাহরণস্বরূপ, বসরায় তিনি চারবার, বাগদাদে বহুবার এবং কুফায়ও একাধিকবার গিয়েছিলেন, যাতে কোনো নির্ভরযোগ্য মুহাদ্দিসের কাছ থেকে হাদিস গ্রহণ বাদ না পড়ে।এক হাজারেরও বেশি শায়খের নিকট শিক্ষাইমাম বুখারি (রহ.) নিজেই বলেছেন—"আমি এক হাজারেরও বেশি শায়খের নিকট থেকে হাদিস লিখেছি।"প্রত্যেক শায়খের কাছ থেকে তিনি শুধু হাদিস শুনেই সন্তুষ্ট হতেন না। তিনি তাদের ব্যক্তিগত চরিত্র, তাকওয়া, স্মৃতিশক্তি এবং নির্ভরযোগ্যতা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন।তাঁর শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন—ইমাম আলী ইবনে আল-মাদিনী (রহ.)ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ (রহ.)ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন (রহ.)আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)মাক্কী ইবনে ইবরাহিম (রহ.)আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর আল-হুমায়দী (রহ.)কুতাইবা ইবনে সাঈদ (রহ.)-সহ বহু প্রখ্যাত মুহাদ্দিস।বিশেষত ইমাম আলী ইবনে আল-মাদিনী (রহ.)-কে তিনি নিজের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে উল্লেখ করেছেন।অসাধারণ স্মৃতিশক্তির বিস্ময়কর দৃষ্টান্তইমাম বুখারির (রহ.) স্মৃতিশক্তি নিয়ে মুসলিম বিশ্বের ইতিহাসে অসংখ্য ঘটনা সংরক্ষিত রয়েছে।তিনি একবার বলেছিলেন—"আমার এক লাখ সহিহ হাদিস এবং দুই লাখ অ-সহিহ হাদিস মুখস্থ রয়েছে।"এটি কেবল হাদিসের মূল বক্তব্য নয়; বরং প্রতিটি হাদিসের পূর্ণ সনদ, বর্ণনাকারীদের নাম, তাদের শিক্ষক, ছাত্র এবং বর্ণনার পার্থক্যসহ মুখস্থ থাকার ইঙ্গিত বহন করে।ছাত্রজীবনের ১৫ হাজার হাদিসের ঘটনাশিক্ষাজীবনের একটি ঘটনা তাঁর অসাধারণ স্মৃতিশক্তির প্রমাণ হিসেবে যুগে যুগে আলোচিত হয়েছে।সহপাঠীরা প্রতিদিন শিক্ষকদের বক্তব্য লিখে রাখতেন। কিন্তু ইমাম বুখারি (রহ.) শুধু মনোযোগ দিয়ে শুনতেন, কিছুই লিখতেন না।একদিন সহপাঠীরা প্রশ্ন করলেন—"তুমি কিছুই লেখ না। তাহলে এতদিন এখানে এসে কী শিখলে?"তিনি শান্তভাবে বললেন—"তোমাদের লিখে রাখা খাতাগুলো নিয়ে এসো।"তারা প্রায় ১৬ দিনের নোট নিয়ে এলো, যাতে ১৫ হাজারেরও বেশি হাদিস লেখা ছিল।ইমাম বুখারি (রহ.) খাতা না দেখেই একের পর এক সব হাদিস মুখস্থ শুনিয়ে দিলেন। শুধু তাই নয়, কোথায় কোথায় ভুল লেখা হয়েছে তাও সংশোধন করে দিলেন।সহপাঠীরা বিস্মিত হয়ে নিজেদের নোট তাঁর মুখস্থ পাঠ থেকে সংশোধন করতে লাগলেন।বাগদাদের ১০০ হাদিস পরীক্ষার ঐতিহাসিক ঘটনাইমাম বুখারির জীবনের সবচেয়ে বিখ্যাত ঘটনাগুলোর একটি ঘটেছিল বাগদাদে।তাঁর অসাধারণ খ্যাতির কথা শুনে বাগদাদের একদল মুহাদ্দিস তাঁর স্মৃতিশক্তি পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন।তারা ১০০টি হাদিস নির্বাচন করেন।প্রতিটি হাদিসের সনদ (ইসনাদ) অন্য হাদিসের সঙ্গে ইচ্ছাকৃতভাবে অদলবদল করে দেওয়া হয়।এরপর দশজন আলেমকে দশটি করে ভুল সনদযুক্ত হাদিস মুখস্থ করিয়ে জনসম্মুখে ইমাম বুখারির সামনে উপস্থাপন করা হয়।প্রথম ব্যক্তি একটি হাদিস পড়ে শোনালে ইমাম বুখারি (রহ.) বললেন—"আমি এভাবে জানি না।"একই উত্তর দিলেন দ্বিতীয়, তৃতীয়—এভাবে একশোটি হাদিসের ক্ষেত্রেই।অনেক সাধারণ মানুষ ভাবলেন, হয়তো তিনি উত্তর জানেন না।কিন্তু সবশেষে তিনি প্রথম ব্যক্তি থেকে শুরু করে একে একে সব ১০০টি হাদিস পুনরায় পাঠ করেন।প্রথমে ভুল সনদটি উল্লেখ করেন, তারপর সঙ্গে সঙ্গে সঠিক সনদ ও সঠিক হাদিস বলে দেন।এভাবে একশোটির একটিতেও তিনি ভুল করেননি।সভায় উপস্থিত সকল মুহাদ্দিস তাঁর অসাধারণ হিফজ, স্মৃতিশক্তি ও গবেষণার সামনে অভিভূত হয়ে যান।এই ঘটনার পর তাঁর খ্যাতি সমগ্র মুসলিম বিশ্বে আরও ছড়িয়ে পড়ে।'আমীরুল মুমিনীন ফিল হাদিস' উপাধিতাঁর সমসাময়িক অনেক মহান আলেম তাঁকে "আমীরুল মুমিনীন ফিল হাদিস"—অর্থাৎ হাদিসশাস্ত্রের মুমিনদের নেতা—উপাধিতে ভূষিত করেন।এটি ছিল হাদিসশাস্ত্রে সর্বোচ্চ সম্মানজনক উপাধিগুলোর একটি।প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ (রহ.) একদিন তাঁর ছাত্রদের বলেছিলেন—"ইশ! যদি এমন একজন মানুষ থাকতেন, যিনি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর শুধু সহিহ হাদিসগুলো একত্রিত করে একটি গ্রন্থ সংকলন করতেন।"এই কথাটি তরুণ ইমাম বুখারির হৃদয়ে গভীরভাবে দাগ কাটে।পরে তিনি নিজেই বলেছেন—"শায়খ ইসহাকের এই কথাই আমাকে সহিহ হাদিস সংকলনের কাজে উদ্বুদ্ধ করেছিল।"এই একটি বাক্যই ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেয়। কারণ এর ফলশ্রুতিতেই রচিত হয় বিশ্বের সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য হাদিসগ্রন্থ সহিহ আল-বুখারি।এক নতুন যুগের সূচনাতখনও কেউ কল্পনা করতে পারেনি—এই তরুণ মুহাদ্দিস এমন একটি গ্রন্থ রচনা করবেন, যা এক হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে মুসলিম বিশ্বের সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্যতা লাভ করবে।তাঁর সামনে তখন অপেক্ষা করছিল আরও কঠিন পরীক্ষা—ছয় লাখ হাদিসের মধ্য থেকে সহিহ হাদিস নির্বাচন, বর্ণনাকারীদের যাচাই, বছরের পর বছর গবেষণা এবং মানব ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জ্ঞানভান্ডার সংকলনের বিশাল দায়িত্ব।এই অধ্যায়ই তাঁকে চিরদিনের জন্য ইতিহাসে অমর করে রাখবে।‘সহিহ বুখারি’ সংকলনের ইতিহাস, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ও বিশ্বসভ্যতার এক অনন্য জ্ঞানভান্ডারের জন্মপৃথিবীর ইতিহাসে বহু গ্রন্থ রচিত হয়েছে। কোনোটি দর্শনের, কোনোটি বিজ্ঞানের, কোনোটি আইন বা সাহিত্যের। কিন্তু এমন একটি গ্রন্থ, যার প্রতিটি বাক্য লেখার আগে একজন গবেষক বছরের পর বছর ভ্রমণ করেছেন, হাজারো মানুষের চরিত্র যাচাই করেছেন, অসংখ্য বর্ণনা তুলনা করেছেন এবং সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে সত্য-মিথ্যা পৃথক করেছেন—এমন উদাহরণ ইতিহাসে খুব কমই রয়েছে।ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল আল-বুখারি (রহ.)-এর ‘আল-জামি‘ আস-সহিহ’, যা আজ ‘সহিহ বুখারি’ নামে সমগ্র মুসলিম বিশ্বের কাছে পরিচিত, ঠিক এমনই এক বিস্ময়কর গবেষণার ফসল।একটি বাক্য, যা ইতিহাস বদলে দিয়েছিলইমাম বুখারি (রহ.)-এর শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ (রহ.) একদিন তাঁর ছাত্রদের উদ্দেশে বলেছিলেন—"যদি এমন কেউ থাকত, যে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কেবল বিশুদ্ধ (সহিহ) হাদিসগুলো একত্র করে একটি সংকলন তৈরি করত!"এই কথাটি তরুণ ইমাম বুখারির হৃদয়ে গভীরভাবে দাগ কাটে। পরে তিনি নিজেই বলেন, এই আহ্বানই তাঁকে এমন একটি গ্রন্থ রচনায় উদ্বুদ্ধ করেছিল, যেখানে কেবল সর্বোচ্চ মানদণ্ডে যাচাইকৃত হাদিস স্থান পাবে।আরেকটি প্রসিদ্ধ বর্ণনায় এসেছে, তিনি স্বপ্নে দেখেন—তিনি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সামনে দাঁড়িয়ে একটি পাখা দিয়ে তাঁকে রক্ষা করছেন। স্বপ্নের ব্যাখ্যাকারীরা বলেন, তিনি মিথ্যা বর্ণনা থেকে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর হাদিসকে রক্ষা করবেন। এই স্বপ্নও তাঁর মনোবল আরও দৃঢ় করে। (এটি জীবনীগ্রন্থে বর্ণিত একটি ঐতিহ্যগত ঘটনা; সহিহ হাদিস নয়।)ছয় লাখ হাদিস—কিন্তু সব নয়অনেকেই মনে করেন, ইমাম বুখারি (রহ.) ছয় লাখ হাদিস সংগ্রহ করেছিলেন। এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি।জীবনীকারদের ভাষ্যমতে, তিনি প্রায় ছয় লাখ রেওয়ায়েত (বর্ণনা) অধ্যয়ন করেছিলেন। এর মধ্যে একই হাদিসের বহু ভিন্ন সনদ ও বর্ণনা অন্তর্ভুক্ত ছিল। অর্থাৎ এটি ছয় লাখ সম্পূর্ণ ভিন্ন বক্তব্য নয়, বরং বিভিন্ন সূত্রে প্রচলিত হাদিসের বিপুল ভাণ্ডার।এই বিশাল সংগ্রহ থেকে তিনি কঠোর যাচাই-বাছাই করে তাঁর গ্রন্থে স্থান দেন মাত্র ৭,২৭৫টি রেওয়ায়েত (পুনরাবৃত্তিসহ)। পুনরাবৃত্তি বাদ দিলে সংখ্যা প্রায় ২,৬০০-এর কিছু বেশি।এই পরিসংখ্যানই তাঁর গবেষণার গভীরতা ও সতর্কতার পরিচয় বহন করে।হাদিস গ্রহণে ছিল কঠোর বৈজ্ঞানিক নীতিমালাইমাম বুখারির (রহ.) আগে অনেক মুহাদ্দিস হাদিস সংকলন করেছেন। কিন্তু তিনি যাচাইয়ের ক্ষেত্রে এমন কঠোর মানদণ্ড গ্রহণ করেন, যা তাঁকে অন্যদের থেকে স্বতন্ত্র মর্যাদা দেয়।তিনি সাধারণভাবে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো নিশ্চিত না হলে কোনো হাদিস গ্রহণ করতেন না—১. সনদ (ইসনাদ) অবিচ্ছিন্ন হতে হবেপ্রত্যেক বর্ণনাকারী তাঁর পূর্ববর্তী বর্ণনাকারীর কাছ থেকে সরাসরি হাদিস শুনেছেন—এ বিষয়ে শক্ত প্রমাণ থাকতে হবে।শুধু একই যুগে জীবিত থাকাই যথেষ্ট নয়; তাঁদের সাক্ষাৎ বা সাক্ষাতের বাস্তব সম্ভাবনাও প্রতিষ্ঠিত হতে হবে।২. প্রত্যেক রাবি হতে হবে ন্যায়পরায়ণহাদিস বর্ণনাকারীকে হতে হবে—সৎদ্বীনদারতাকওয়াবানবড় গুনাহ থেকে বিরতচরিত্রবান৩. স্মৃতিশক্তি হতে হবে অসাধারণরাবির মুখস্থশক্তি দুর্বল হলে অথবা বয়সের কারণে স্মৃতি নষ্ট হয়ে গেলে তাঁর বর্ণনা গ্রহণে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করা হতো।৪. গোপন ত্রুটি (ইল্লত) মুক্ত হতে হবেকখনো কখনো একটি হাদিস বাহ্যিকভাবে সহিহ মনে হলেও গভীর গবেষণায় সূক্ষ্ম ত্রুটি ধরা পড়ত। ইমাম বুখারি (রহ.) এই ধরনের গোপন ত্রুটি শনাক্ত করার ক্ষেত্রে ছিলেন অসাধারণ পারদর্শী।৫. অন্য নির্ভরযোগ্য বর্ণনার বিরোধী হওয়া যাবে নাযদি কোনো বর্ণনা অধিক নির্ভরযোগ্য রাবিদের বর্ণনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতো, তবে তিনি তা গ্রহণ করতেন না।রাবিদের জীবন নিয়ে বিস্ময়কর গবেষণাইমাম বুখারি (রহ.) শুধু হাদিস শুনেই সন্তুষ্ট থাকতেন না। তিনি বর্ণনাকারীদের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কেও গভীর অনুসন্ধান করতেন।একজন রাবির সম্পর্কে জানার জন্য তিনি কখনো শত শত কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছেন।ঐতিহাসিক সূত্রে একটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে—এক ব্যক্তি ঘোড়াকে খালি থলি দেখিয়ে কাছে ডাকছিলেন, যেন থলিতে খাবার আছে। ঘোড়া কাছে এলে কিছুই পেল না।ইমাম বুখারি (রহ.) এ দৃশ্য দেখে বলেন, যে ব্যক্তি একটি প্রাণীকেও প্রতারণা করতে পারে, তার কাছ থেকে আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর হাদিস গ্রহণ করব না।যদিও এই ঘটনার বিভিন্ন বর্ণনা রয়েছে, তবুও এটি তাঁর সতর্কতার প্রতীক হিসেবে জীবনীগ্রন্থে সুপরিচিত।সহিহ বুখারি রচনায় ষোলো বছরের সাধনাইমাম বুখারি (রহ.) প্রায় ষোলো বছর ধরে সহিহ বুখারি সংকলনের কাজ করেন।তিনি বিভিন্ন শহরে অবস্থান করে হাদিস যাচাই করেন, সনদ মিলিয়ে দেখেন, রাবিদের জীবন অনুসন্ধান করেন এবং প্রতিটি অধ্যায় সুচিন্তিতভাবে সাজান।এই দীর্ঘ সময়ে তিনি অসংখ্য আলেমের সঙ্গে আলোচনা করেছেন এবং প্রাপ্ত তথ্য বারবার যাচাই করেছেন।প্রতিটি হাদিস লেখার আগে ইবাদতজীবনীকারদের মধ্যে প্রসিদ্ধ একটি বর্ণনায় এসেছে—ইমাম বুখারি (রহ.) সহিহ বুখারিতে কোনো হাদিস অন্তর্ভুক্ত করার আগে অজু করতেন, দুই রাকাত নফল সালাত আদায় করতেন এবং আল্লাহর কাছে ইস্তিখারা ও দোয়া করতেন।এ বিষয়টি হাদিসের অংশ নয়; বরং জীবনীগ্রন্থে উল্লেখিত একটি ঐতিহ্যগত বর্ণনা। তবে এটি তাঁর গভীর খোদাভীতি ও দায়িত্ববোধের পরিচয় বহন করে।সহিহ বুখারির অনন্য বৈশিষ্ট্যসহিহ বুখারি শুধু হাদিসের সংকলন নয়; এটি একাধারে—হাদিসগ্রন্থফিকহের উৎসআকিদার দলিলনৈতিক শিক্ষার ভাণ্ডারইসলামী সভ্যতার গবেষণাগ্রন্থএর অধ্যায়গুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে একটি অধ্যায়ের শিরোনাম থেকেই অনেক সময় ইমাম বুখারির ফিকহি মতামত বোঝা যায়।এই বিশেষ পদ্ধতিকে আলেমরা "ফিকহুল বুখারি ফি তারাজিমিহি" নামে উল্লেখ করেছেন—অর্থাৎ, অধ্যায়ের শিরোনামেই ইমাম বুখারির ফিকহ ফুটে ওঠে।কেন এত পুনরাবৃত্তি?অনেক পাঠকের প্রশ্ন—সহিহ বুখারিতে একই হাদিস বারবার কেন এসেছে?এর উত্তর হলো, ইমাম বুখারি (রহ.) একই হাদিসকে বিভিন্ন অধ্যায়ে ভিন্ন ভিন্ন ফিকহি শিক্ষা প্রমাণের জন্য ব্যবহার করেছেন।একটি হাদিস থেকে যদি পাঁচটি ভিন্ন মাসআলার দলিল পাওয়া যায়, তবে তিনি প্রয়োজন অনুযায়ী সেটিকে বিভিন্ন অধ্যায়ে উল্লেখ করেছেন।এটি তাঁর সংকলনশৈলীর একটি বৈজ্ঞানিক বৈশিষ্ট্য।সমসাময়িক আলেমদের মূল্যায়নইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.), আলী ইবনে আল-মাদিনী (রহ.), ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন (রহ.) এবং ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ (রহ.)-এর মতো শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিসরা তাঁর মেধা ও গবেষণার উচ্চ প্রশংসা করেছেন।বিশেষভাবে ইমাম মুসলিম (রহ.), যিনি পরবর্তীতে সহিহ মুসলিম সংকলন করেন, তিনি ইমাম বুখারিকে গভীর শ্রদ্ধা করতেন। ঐতিহাসিক সূত্রে বর্ণিত আছে, তিনি একবার ইমাম বুখারির কপালে চুম্বন করে বলেন—"হে উস্তাদদের উস্তাদ! আমাকে অনুমতি দিন, আমি আপনার পা চুম্বন করি।"এই উক্তির সনদ নিয়ে গবেষকদের মধ্যে আলোচনা থাকলেও এটি তাঁদের পারস্পরিক শ্রদ্ধার একটি প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক বর্ণনা হিসেবে উল্লেখিত।বিশ্বের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য হাদিসগ্রন্থমুসলিম উম্মাহর সংখ্যাগরিষ্ঠ মুহাদ্দিস, ফকিহ ও আলেমের ঐকমত্য হলো—আল্লাহর কিতাব আল-কুরআনের পর সবচেয়ে বিশুদ্ধ গ্রন্থ হলো ‘সহিহ আল-বুখারি’।এই মর্যাদা কোনো আবেগের কারণে নয়; বরং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে হাদিসবিশারদদের নিরবচ্ছিন্ন গবেষণা, সমালোচনা ও পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।জনপ্রিয়তার মূল্য, নির্বাসনের বেদনা, শেষ জীবন ও চিরন্তন উত্তরাধিকার"জ্ঞানকে আমি কখনো শাসকের দরজায় নিয়ে যাব না; যে ইলম চায়, সে ইলমের মজলিসে আসবে।"— ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল আল-বুখারি (রহ.)যেখানে যেতেন, সেখানেই ভিড় জমাতো জ্ঞানপিপাসুরাসহিহ বুখারির সংকলন শেষ হওয়ার আগেই ইমাম বুখারি (রহ.)-এর খ্যাতি সমগ্র মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল। তাঁর দরসে অংশ নেওয়ার জন্য মক্কা, মদিনা, বসরা, কুফা, বাগদাদ, নিশাপুর, মারভ ও সমরখন্দসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ছাত্ররা ছুটে আসতেন।ইতিহাসবিদদের বর্ণনায় জানা যায়, তাঁর কোনো কোনো হাদিসের মজলিসে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী উপস্থিত থাকতেন। তাঁদের মধ্যে অনেকে সরাসরি তাঁর কাছ থেকে হাদিস লিখতেন, আবার কেউ কেউ প্রথম সারির ছাত্রদের কাছ থেকে শুনে লিপিবদ্ধ করতেন।প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম মুসলিম (রহ.), ইমাম তিরমিজি (রহ.), ইমাম নাসায়ি (রহ.)-সহ অসংখ্য আলেম তাঁর জ্ঞান, গবেষণা ও হাদিস বিশ্লেষণ থেকে উপকৃত হয়েছেন। যদিও ইমাম নাসায়ি (রহ.)-এর সঙ্গে প্রত্যক্ষ সাক্ষাৎ নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে, তবে তাঁর প্রজন্ম ইমাম বুখারির গবেষণার দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিল।নিশাপুরে অভূতপূর্ব অভ্যর্থনাহিজরি তৃতীয় শতাব্দীতে নিশাপুর ছিল ইসলামী জ্ঞানচর্চার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। ইমাম বুখারি (রহ.) যখন সেখানে পৌঁছান, তখন পুরো শহরে উৎসবের আবহ তৈরি হয়।ঐতিহাসিক সূত্রে বর্ণিত আছে, হাজার হাজার মানুষ শহরের বাইরে গিয়ে তাঁকে অভ্যর্থনা জানায়। অনেক আলেম তাঁর আগমনকে ইসলামী জ্ঞানচর্চার জন্য এক মহাসৌভাগ্য বলে আখ্যায়িত করেন।অল্পদিনের মধ্যেই তাঁর দরসে মানুষের ঢল নামে। জ্ঞান, স্মৃতিশক্তি ও হাদিস বিশ্লেষণের অসাধারণ দক্ষতা তাঁকে নিশাপুরের সবচেয়ে জনপ্রিয় মুহাদ্দিসে পরিণত করে।'লাফয বিল-কুরআন' বিতর্ক: একটি ভুল বোঝাবুঝির ইতিহাসইমাম বুখারির জীবনের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ছিল তথাকথিত 'লাফয বিল-কুরআন' বিতর্ক।তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন—মানুষের কণ্ঠস্বর, উচ্চারণ ও কর্ম সৃষ্ট; কিন্তু আল্লাহর কালাম—আল-কুরআন—অসৃষ্ট (গায়রে মাখলুক)।এই সূক্ষ্ম বিষয়টি অনেকেই সঠিকভাবে বুঝতে পারেননি, আবার কেউ কেউ ইচ্ছাকৃতভাবেও ভুলভাবে প্রচার করেন।নিশাপুরের প্রখ্যাত আলেম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াহইয়া আয-যুহলি (রহ.)-এর সঙ্গে এই বিষয়কে কেন্দ্র করে মতভেদ সৃষ্টি হয়। ঐতিহাসিক সূত্রে দেখা যায়, এই মতভেদ শুধু আকিদাগত আলোচনার ফল ছিল না; বরং তৎকালীন সামাজিক, রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত প্রভাবও এতে ভূমিকা রেখেছিল।পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, আয-যুহলি ঘোষণা দেন—যারা ইমাম বুখারির কাছে যাবে, তারা তাঁর মজলিসে উপস্থিত হতে পারবে না।এই ঘটনায় অনেক ছাত্র ভীত হয়ে সরে গেলেও কিছু বিশ্বস্ত ছাত্র শেষ পর্যন্ত তাঁর সঙ্গ ত্যাগ করেননি। তাঁদের অন্যতম ছিলেন ইমাম মুসলিম (রহ.)। ইতিহাসে উল্লেখ আছে, তিনি প্রকাশ্যেই তাঁর শিক্ষক ইমাম বুখারির প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন।বুখারায় প্রত্যাবর্তন এবং নতুন পরীক্ষানিশাপুর ত্যাগ করে ইমাম বুখারি (রহ.) নিজ জন্মভূমি বুখারায় ফিরে আসেন। কিন্তু সেখানেও তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল আরেক কঠিন পরীক্ষা।বুখারার গভর্নর খালিদ ইবনে আহমদ আয-যুহলি (কিছু ঐতিহাসিক সূত্রে নামের সামান্য ভিন্নতা পাওয়া যায়) তাঁর কাছে অনুরোধ পাঠান যে, তিনি যেন রাজপ্রাসাদে এসে গভর্নর ও তাঁর সন্তানদের ব্যক্তিগতভাবে সহিহ বুখারি ও অন্যান্য হাদিস পাঠ করান।ইলমের মর্যাদায় আপসহীন এক ইমামইমাম বুখারি (রহ.) গভর্নরের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন—"আমি জ্ঞানকে অপমান করতে পারি না। ইলমকে মানুষের ঘরে ঘরে নিয়ে বেড়ানো আমার কাজ নয়। যে ইলম চায়, সে সাধারণ মানুষের মতো মজলিসে এসে বসবে।"আরও একটি বর্ণনায় তাঁর বক্তব্য এভাবে এসেছে—"আমি ইলমকে সুলতানদের দরজায় নিয়ে যাব না। যদি আপনার সন্তানদের ইলমের প্রয়োজন হয়, তারা অন্য সবার মতো মজলিসে আসুক।"এই বক্তব্য ইসলামী জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে স্বাধীন আলেমদের মর্যাদার এক অনন্য দলিল হয়ে আছে।নির্বাসনের বেদনাময় অধ্যায়গভর্নর তাঁর এই অবস্থান ভালোভাবে নেননি। পরিণতিতে ইমাম বুখারিকে বুখারা ত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়।নিজ জন্মভূমি, প্রিয় শহর, ছাত্র, বন্ধু—সবকিছু ছেড়ে তাঁকে চলে যেতে হয় সমরখন্দের নিকটবর্তী ছোট্ট গ্রাম খরতঙ্ক-এ।জীবনের শেষ অধ্যায়টি তিনি সেখানেই কাটিয়েছেন।শেষ রাতের দোয়ানির্বাসিত জীবনে শারীরিক ক্লান্তি, মানসিক বেদনা এবং দীর্ঘ সফরের পরিশ্রম তাঁর শরীরকে দুর্বল করে দেয়।জীবনীকারদের বর্ণনায় এসেছে, এক রাতে তাহাজ্জুদের সালাত শেষে তিনি অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে আল্লাহর কাছে দোয়া করেন—"হে আল্লাহ! এই বিশাল পৃথিবী আজ আমার জন্য সংকীর্ণ হয়ে গেছে। আপনি আমাকে আপনার সান্নিধ্যে নিয়ে নিন।"অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর সেই দোয়া কবুল হয়।ইন্তিকাল২৫৬ হিজরির ৩০ রমজান (অনেক সূত্রে ঈদুল ফিতরের রাত) তিনি ইন্তিকাল করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় ৬২ বছর।তাঁর মৃত্যুর সংবাদ দ্রুত সমগ্র মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। অসংখ্য আলেম, ছাত্র ও সাধারণ মানুষ গভীর শোক প্রকাশ করেন।দাফন ও ঐতিহ্যগত বর্ণনাখরতঙ্ক গ্রামেই তাঁকে দাফন করা হয়।প্রাচীন জীবনীগ্রন্থে কয়েকটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে, যেমন—তাঁর কবর থেকে দীর্ঘ সময় সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়া।অনেক মানুষ সেই সুগন্ধ অনুভব করেছেন বলে বর্ণনা করা।তাঁর বিরোধীদের কেউ কেউ পরে অনুতপ্ত হওয়ার কথা উল্লেখ করা।তবে গবেষণাগত সততার স্বার্থে উল্লেখ করা প্রয়োজন, এসব ঘটনা ঐতিহাসিক জীবনীগ্রন্থে বর্ণিত ঐতিহ্যগত বিবরণ। এগুলো সহিহ হাদিস নয় এবং সবগুলোর সনদ সমান শক্তিশালী নয়। তাই এগুলোকে অলৌকিক ঘটনা হিসেবে নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত না করে ঐতিহাসিক বর্ণনা হিসেবেই দেখা অধিক সতর্কতার পরিচায়ক।সহিহ বুখারি: এক হাজার বছরেরও বেশি সময়ের আস্থার প্রতীকইমাম বুখারি (রহ.) শুধু একটি গ্রন্থ রচনা করেননি; তিনি হাদিস যাচাইয়ের এমন এক বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করেছেন, যা আজও ইসলামী গবেষণার অন্যতম ভিত্তি।তাঁর গ্রন্থের ওপর শত শত ব্যাখ্যাগ্রন্থ রচিত হয়েছে। এর মধ্যে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ—ফাতহুল বারি — হাফিজ ইবনে হাজার আল-আসকালানি (রহ.)উমদাতুল কারি — বদরুদ্দীন আইনি (রহ.)ইরশাদুস সারি — কাস্তাল্লানি (রহ.)আজ বিশ্বের অসংখ্য বিশ্ববিদ্যালয়, মাদরাসা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে সহিহ বুখারি পাঠ্য হিসেবে অধ্যয়ন করা হয়।ইমাম বুখারির অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থঅনেকেই মনে করেন, তিনি শুধু সহিহ বুখারিই লিখেছেন। বাস্তবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত বহুমুখী গবেষক। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে—আত-তারীখুল কাবীরআত-তারীখুল আওসাতআত-তারীখুস সাগীরআল-আদাবুল মুফরাদখালকু আফ'আলিল ইবাদজুযউ রাফইল ইয়াদাইনআত-তাফসীরুল কাবীর (অসম্পূর্ণ)আদ-দু'আফাউস সাগীরএসব গ্রন্থ প্রমাণ করে, তিনি কেবল একজন মুহাদ্দিসই নন; বরং ইতিহাসবিদ, জীবনীকার, আকিদা-বিশারদ এবং গবেষণাপদ্ধতিরও এক অগ্রদূত ছিলেন।আজকের মুসলিম সমাজের জন্য শিক্ষাইমাম বুখারি (রহ.)-এর জীবন আমাদের শেখায়—সত্যের জন্য জনপ্রিয়তা বিসর্জন দেওয়া যায়।জ্ঞান কখনো ক্ষমতার কাছে নতজানু হয় না।গবেষণায় সততা আপসহীন হতে হবে।একজন মায়ের দোয়া সন্তানের ভাগ্য বদলে দিতে পারে।খ্যাতি নয়, আল্লাহর সন্তুষ্টিই একজন আলেমের প্রকৃত লক্ষ্য।উপসংহারসম্রাটদের প্রাসাদ ধ্বংস হয়েছে, সাম্রাজ্য বিলীন হয়েছে, কিন্তু একজন মুহাদ্দিসের কলমে সংরক্ষিত রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর বাণী আজও কোটি কোটি মানুষের ঈমান, ইবাদত ও জীবন পরিচালনার পথপ্রদর্শক।ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল আল-বুখারি (রহ.)-এর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানুষের প্রকৃত মর্যাদা সম্পদে নয়, ক্ষমতায় নয়; বরং সত্যের প্রতি নিষ্ঠা, জ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার সন্তুষ্টির জন্য নিবেদিত জীবনে।যতদিন পৃথিবীতে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ অধ্যয়ন করা হবে, যতদিন সহিহ বুখারির পৃষ্ঠা উল্টে মানুষ সত্যের সন্ধান করবে, ততদিন ইতিহাসের আকাশে ইমাম বুখারি (রহ.)-এর নাম এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বল করতে থাকবে।তথ্যসূত্র (নির্বাচিত):সিয়ার আ'লাম আন-নুবালা — ইমাম শামসুদ্দীন আয-যাহাবিহাদিউস সারি ও ফাতহুল বারি — হাফিজ ইবনে হাজার আল-আসকালানিতারীখ বাগদাদ — আল-খতীব আল-বাগদাদিতাযকিরাতুল হুফফায — ইমাম আয-যাহাবিআত-তারীখুল কাবীর — ইমাম আল-বুখারিমুকাদ্দিমা — ইবন খালদুন
ফিরোজ আল মামুন