সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক স্বাধীন সচিবালয় করার নির্দেশ দিয়ে হাইকোর্টের দেওয়া পূর্ণাঙ্গ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। বৃহস্পতিবার (২১ মে) বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল। গত ৭ এপ্রিল ১৮৫ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেন হাইকোর্ট।
হাইকোর্টের রায়ের সারাংশ
গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ রায়টি দেন। রায়ে সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের সেই বিধান বাতিল ঘোষণা করা হয়, যেখানে অধস্তন আদালতের ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ, পদায়ন, পদোন্নতি, ছুটি ও শৃঙ্খলা বিধানের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত রয়েছে। একই সঙ্গে এসব বিষয়ে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের হাতে ন্যস্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি ২০১৭ সালের জুডিশিয়াল সার্ভিস (শৃঙ্খলা) বিধিমালাও বাতিল ঘোষণা করা হয়।
আপিলের বিষয়
অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল জানান, হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করেছে। তিনি আপিলের বিস্তারিত কারণ এখনই জানাননি। রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের পরিপ্রেক্ষিতে এ বিষয়ে পরবর্তী শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।
রিট আবেদনের পটভূমি
২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের সাতজন আইনজীবী সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ ও ২০১৭ সালের জুডিশিয়াল সার্ভিস (শৃঙ্খলা) বিধিমালার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট আবেদন করেন। একই সঙ্গে বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশনা চাওয়া হয়। পরে একই বছরের ২৭ অক্টোবর এ বিষয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট।
সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের ইতিহাস
বর্তমান সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বিচার বিভাগে নিয়োজিত ব্যক্তি ও বিচারিক দায়িত্ব পালনরত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ, পদায়ন, পদোন্নতি, ছুটি ও শৃঙ্খলা বিধানের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত। তবে রাষ্ট্রপতি এ ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে প্রয়োগ করেন।
রিটকারীদের দাবি, এ ব্যবস্থায় নির্বাহী বিভাগের প্রভাব থেকে যায়, যা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পরিপন্থী। তাদের মতে, ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে এসব ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত ছিল।
সংশোধনীর ইতিহাস
১৯৭৪ সালের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে এসব ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত করা হয়। পরবর্তী সময়ে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে ‘সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক তা প্রযুক্ত হইবে’ বাক্যাংশ যুক্ত করা হয়। আপিল বিভাগ পঞ্চম সংশোধনী অসাংবিধানিক ঘোষণা করলে ২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ১১৬ অনুচ্ছেদের বর্তমান বিধান প্রতিস্থাপন করা হয়, যা এখনো কার্যকর রয়েছে।
আদালতে উপস্থিত আইনজীবী
আদালতে রিটকারীদের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে শুনানিতে অংশ নেন সিনিয়র আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও পৃথক সচিবালয়ের প্রশ্নে হাইকোর্টের রায় ঐতিহাসিক। তবে রাষ্ট্রপক্ষের আপিল এই প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করবে। সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ ও সংশোধনীর ইতিহাস বলছে, নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ থেকে বিচার বিভাগকে বের করে আনার সংগ্রাম দীর্ঘদিনের। আপিল বিভাগ এখন এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক সচিবালয়ের দাবি পেশাদার আইনজীবী মহলে দীর্ঘদিনের। এখন দেখার বিষয়, আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বহাল রাখে কি না।

বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২১ মে ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন