ঢাকা    শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬
ঢাকা    শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬
গণবার্তা

সুন্দরবনে তিন মাস প্রবেশ নিষিদ্ধ

সুন্দরবনে তিন মাস প্রবেশ নিষিদ্ধ

মাছ ও বন্যপ্রাণীর প্রজনন বৃদ্ধি এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের লক্ষ্যে পূর্ব সুন্দরবনের নদী-খাল ও বনাঞ্চলে ১ জুন থেকে আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত তিন মাসের জন্য মাছ ধরা ও পর্যটক প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে বন বিভাগ। এ সময় সুন্দরবনে প্রবেশের জন্য কোনো ধরনের পাস বা অনুমতিপত্র ইস্যু করা হবে না। ইন্টিগ্রেটেড রিসোর্সেস ম্যানেজমেন্ট প্ল্যানিং (আইআরএমপি)-এর সুপারিশ অনুযায়ী ২০১৯ সাল থেকে প্রতি বছর ১ জুলাই থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনে মাছ আহরণ বন্ধ রাখা হতো। তবে এবার মৎস্য বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে বন মন্ত্রণালয় নিষেধাজ্ঞার সময়সীমা এক মাস বাড়িয়ে ১ জুন থেকে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

জেলেদের আর্থিক সংকটের আশঙ্কা
বন বিভাগের এ সিদ্ধান্তে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল হাজারো জেলে পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সুন্দরবনসংলগ্ন শরণখোলা, বগী, খুড়িয়াখালী, সোনাতলা ও দক্ষিণ রাজাপুর এলাকায় জেলে পরিবারগুলোর মধ্যে হতাশা ও উদ্বেগ বিরাজ করছে। স্থানীয় জেলেরা জানান, মহাজনের কাছ থেকে দাদন নিয়ে সারা বছর সুন্দরবনের নদী-খালে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন তারা। তিন মাস মাছ ধরা বন্ধ থাকায় পরিবার-পরিজন নিয়ে কিভাবে চলবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। শরণখোলার জেলে রুস্তম বয়াতী, রুবেল হাওলাদার, জাহিদুল হাওলাদার ও মাহবুব হোসেনসহ অনেকে বলেন, দীর্ঘ সময় কর্মহীন হয়ে পড়লে সংসার চালানো কঠিন হয়ে যাবে। তারা সরকারের সহায়তার দাবি জানান।

মৎস্য ব্যবসায়ীদের ক্ষতির আশঙ্কা
মৎস্য ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির আশঙ্কা করছেন। শরণখোলা বাজারের মৎস্য আড়ৎদার জালাল মোল্লা ও আনোয়ার হোসেন বলেন, বঙ্গোপসাগরে চলমান ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই সুন্দরবনে নতুন করে তিন মাস মাছ ধরা বন্ধ হওয়ায় জেলে ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। তাদের দাবি, জেলেদের কাছে আড়ৎদারদের ১৫/২০ লাখ টাকা দাদন দেওয়া রয়েছে, যা আদায় অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।

জেলেরা এখনো কার্ড পাননি
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জ কর্মকর্তা (এসিএফ) মো. শরীফুল ইসলাম জানান, ২০২৫ সালের শুরুতে সুন্দরবনের জেলেদের তালিকা মৎস্য দপ্তরে পাঠানো হলেও এখনো অনেক জেলের নামে জেলে কার্ড ইস্যু করা হয়নি। শরণখোলা ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তা মো. খলিলুর রহমান জানান, জেলে, মৌয়ালী ও পর্যটকদের জন্য সুন্দরবনে প্রবেশের পাস ইস্যু ইতোমধ্যে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

সরকারি সহায়তা এখনো বরাদ্দ হয়নি
শরণখোলা উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা অঞ্জন বিশ্বাস বলেন, সুন্দরবনের জেলেদের জন্য এখনো কোনো বিশেষ খাদ্য সহায়তা বা প্রণোদনা বরাদ্দ পাওয়া যায়নি।

বন বিভাগের অবস্থান
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, মৎস্যসম্পদ ও বন্যপ্রাণীর প্রজনন বৃদ্ধির স্বার্থে এই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সুন্দরবনে কাউকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে না। তবে করমজল পর্যটন কেন্দ্রের ক্ষেত্রে কিছুটা শিথিলতার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।

পর্যটন খাতে প্রভাব
পর্যটন খাতেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। ট্যুর অপারেটরদের মতে, এমনিতেই পর্যটকের সংখ্যা তুলনামূলক কম। এর মধ্যে দীর্ঘ সময় সুন্দরবনে প্রবেশ বন্ধ থাকলে পর্যটন ব্যাবসা আরও ক্ষতির মুখে পড়বে এবং এ খাতের সঙ্গে জড়িত বহু পরিবার আর্থিক সংকটে পড়বে।

সুন্দরবনে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও মৎস্যসম্পদের প্রজনন বৃদ্ধির লক্ষ্যে তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা প্রশংসনীয় হলেও এতে জেলে ও পর্যটনখাতের মানুষ আর্থিক সংকটে পড়বেন। সরকারের উচিত জেলেদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান ও খাদ্য সহায়তার ব্যবস্থা করা। এছাড়া জেলে কার্ড ইস্যু ও দাদনের টাকা আদায়ের জটিলতা নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

আপনার মতামত লিখুন

গণবার্তা

শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬


সুন্দরবনে তিন মাস প্রবেশ নিষিদ্ধ

প্রকাশের তারিখ : ৩১ মে ২০২৬

featured Image
মাছ ও বন্যপ্রাণীর প্রজনন বৃদ্ধি এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের লক্ষ্যে পূর্ব সুন্দরবনের নদী-খাল ও বনাঞ্চলে ১ জুন থেকে আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত তিন মাসের জন্য মাছ ধরা ও পর্যটক প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে বন বিভাগ। এ সময় সুন্দরবনে প্রবেশের জন্য কোনো ধরনের পাস বা অনুমতিপত্র ইস্যু করা হবে না। ইন্টিগ্রেটেড রিসোর্সেস ম্যানেজমেন্ট প্ল্যানিং (আইআরএমপি)-এর সুপারিশ অনুযায়ী ২০১৯ সাল থেকে প্রতি বছর ১ জুলাই থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনে মাছ আহরণ বন্ধ রাখা হতো। তবে এবার মৎস্য বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে বন মন্ত্রণালয় নিষেধাজ্ঞার সময়সীমা এক মাস বাড়িয়ে ১ জুন থেকে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।জেলেদের আর্থিক সংকটের আশঙ্কাবন বিভাগের এ সিদ্ধান্তে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল হাজারো জেলে পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সুন্দরবনসংলগ্ন শরণখোলা, বগী, খুড়িয়াখালী, সোনাতলা ও দক্ষিণ রাজাপুর এলাকায় জেলে পরিবারগুলোর মধ্যে হতাশা ও উদ্বেগ বিরাজ করছে। স্থানীয় জেলেরা জানান, মহাজনের কাছ থেকে দাদন নিয়ে সারা বছর সুন্দরবনের নদী-খালে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন তারা। তিন মাস মাছ ধরা বন্ধ থাকায় পরিবার-পরিজন নিয়ে কিভাবে চলবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। শরণখোলার জেলে রুস্তম বয়াতী, রুবেল হাওলাদার, জাহিদুল হাওলাদার ও মাহবুব হোসেনসহ অনেকে বলেন, দীর্ঘ সময় কর্মহীন হয়ে পড়লে সংসার চালানো কঠিন হয়ে যাবে। তারা সরকারের সহায়তার দাবি জানান।মৎস্য ব্যবসায়ীদের ক্ষতির আশঙ্কামৎস্য ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির আশঙ্কা করছেন। শরণখোলা বাজারের মৎস্য আড়ৎদার জালাল মোল্লা ও আনোয়ার হোসেন বলেন, বঙ্গোপসাগরে চলমান ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই সুন্দরবনে নতুন করে তিন মাস মাছ ধরা বন্ধ হওয়ায় জেলে ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। তাদের দাবি, জেলেদের কাছে আড়ৎদারদের ১৫/২০ লাখ টাকা দাদন দেওয়া রয়েছে, যা আদায় অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।জেলেরা এখনো কার্ড পাননিসুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জ কর্মকর্তা (এসিএফ) মো. শরীফুল ইসলাম জানান, ২০২৫ সালের শুরুতে সুন্দরবনের জেলেদের তালিকা মৎস্য দপ্তরে পাঠানো হলেও এখনো অনেক জেলের নামে জেলে কার্ড ইস্যু করা হয়নি। শরণখোলা ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তা মো. খলিলুর রহমান জানান, জেলে, মৌয়ালী ও পর্যটকদের জন্য সুন্দরবনে প্রবেশের পাস ইস্যু ইতোমধ্যে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।সরকারি সহায়তা এখনো বরাদ্দ হয়নিশরণখোলা উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা অঞ্জন বিশ্বাস বলেন, সুন্দরবনের জেলেদের জন্য এখনো কোনো বিশেষ খাদ্য সহায়তা বা প্রণোদনা বরাদ্দ পাওয়া যায়নি।বন বিভাগের অবস্থানসুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, মৎস্যসম্পদ ও বন্যপ্রাণীর প্রজনন বৃদ্ধির স্বার্থে এই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সুন্দরবনে কাউকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে না। তবে করমজল পর্যটন কেন্দ্রের ক্ষেত্রে কিছুটা শিথিলতার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।পর্যটন খাতে প্রভাবপর্যটন খাতেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। ট্যুর অপারেটরদের মতে, এমনিতেই পর্যটকের সংখ্যা তুলনামূলক কম। এর মধ্যে দীর্ঘ সময় সুন্দরবনে প্রবেশ বন্ধ থাকলে পর্যটন ব্যাবসা আরও ক্ষতির মুখে পড়বে এবং এ খাতের সঙ্গে জড়িত বহু পরিবার আর্থিক সংকটে পড়বে।সুন্দরবনে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও মৎস্যসম্পদের প্রজনন বৃদ্ধির লক্ষ্যে তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা প্রশংসনীয় হলেও এতে জেলে ও পর্যটনখাতের মানুষ আর্থিক সংকটে পড়বেন। সরকারের উচিত জেলেদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান ও খাদ্য সহায়তার ব্যবস্থা করা। এছাড়া জেলে কার্ড ইস্যু ও দাদনের টাকা আদায়ের জটিলতা নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

গণবার্তা

সম্পাদকঃ নূর মোহাম্মদ
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্ব সংরক্ষিত গণবার্তা