মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এক সম্ভাব্য যুগান্তকারী পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে সিরিয়ার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা ইসরায়েলের সঙ্গে একটি যৌথ নিরাপত্তা চুক্তির আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। রোববার (২৬ জুলাই) কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার ‘আল মুকাবালা’ অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এই তথ্য জানান। তার এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো যখন দক্ষিণ সিরিয়ায় ইসরায়েলি বিমান ও স্থল হামলা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে, আবার একইসঙ্গে বেশ কয়েকটি দেশ দামেস্কের এই নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগে মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করছে। এই পরস্পরবিরোধী পরিস্থিতি একইসাথে গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী সিরিয়ার দুর্বলতা এবং একটি নতুন আঞ্চলিক শান্তি স্থাপনের উচ্চাকাঙ্ক্ষার চিত্র তুলে ধরে।
প্রেসিডেন্ট শারা তার সাক্ষাৎকারে ইসরায়েলের সঙ্গে এই প্রস্তাবিত চুক্তিকে শুধু দ্বিপাক্ষিক নিরাপত্তা সহযোগিতার মাধ্যম হিসেবে দেখছেন না, বরং এটিকে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে একটি সুসংহত ও সমন্বিত শান্তি প্রক্রিয়ার সূচনা হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার দৃষ্টিতে, বছরের পর বছর ধরে চলা সংঘাত, গৃহযুদ্ধ, এবং বহিরাগত শক্তির হস্তক্ষেপের অবসান ঘটাতে গোটা অঞ্চল জুড়েই একটি বৃহত্তর সমঝোতার প্রয়োজন, এবং ইসরায়েলের সঙ্গে এই চুক্তি সেই পথ খুলে দিতে পারে। তবে এই আশাবাদের পাশাপাশি তিনি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অনমনীয় অবস্থান পরিষ্কার করে দিয়েছেন: গোলান মালভূমির প্রশ্নে কোনো প্রকার আপস হবে না। ১৯৬৭ সালে ছয় দিনের যুদ্ধের পর থেকে ইসরায়েল এই অঞ্চল দখল করে আছে এবং ১৯৮১ সালে একতরফাভাবে একে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে ঘোষণা করে, যা আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের একাধিক প্রস্তাবনার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। শারা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, এই দখলকৃত ভূমির ওপর সিরিয়ার সার্বভৌম অধিকার অটুট থাকবে এবং কোনো ধরণের নিরাপত্তা চুক্তি এই দাবিকে ক্ষুণ্ণ করতে পারবে না।
সিরিয়ার এই কূটনৈতিক পদক্ষেপের প্রেক্ষাপট অত্যন্ত জটিল। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দক্ষিণ সিরিয়ায় ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। শুধু চলতি মাসেই ইসরায়েলি বাহিনী সিরিয়ার সীমান্তে ২০ বারেরও বেশি অনুপ্রবেশ করেছে এবং একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। ইসরায়েল দাবি করে যে, তাদের এই অভিযানগুলোর লক্ষ্য হলো ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়া গোষ্ঠী ও হিজবুল্লাহর সামরিক অবকাঠামো, যারা সিরিয়ার ভূখণ্ড ব্যবহার করে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে হুমকি তৈরি করছে। এই চলমান আগ্রাসনের মুখেও যে দামেস্ক সরাসরি সামরিক প্রতিক্রিয়ার পথে না গিয়ে একটি নিয়ন্ত্রিত নিরাপত্তা চুক্তির মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে, তা একটি গণনামূলক ও কৌশলগত ধৈর্যের পরিচয় বহন করে। এটি নতুন নেতৃত্বের বাস্তববাদী মনোভাবের প্রমাণ, যেখানে যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি দেশ তার সীমিত সম্পদ ও সামর্থ্যের কথা মাথায় রেখে কূটনীতিকে প্রাধান্য দিচ্ছে।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদিও নির্দিষ্ট কোন দেশগুলো মধ্যস্থতা করছে তা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি, বিশ্লেষকদের ধারণা, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, রাশিয়া এবং সম্ভবত ওমান এই কূটনৈতিক তৎপরতার সঙ্গে জড়িত। রাশিয়া সিরিয়ার ঐতিহাসিক মিত্র হিসেবে দামেস্ক ও তেল আবিবের মধ্যে একটি নিরাপত্তা বার্তা আদান-প্রদানের চ্যানেল হিসেবে কাজ করতে পারে। কাতার ও ওমানের মতো মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর উভয় পক্ষের সঙ্গে সুসম্পর্ক রয়েছে, যা এই জটিল আলোচনা এগিয়ে নিতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট শারা লেবানন ও ইরাকের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সিরিয়ার সম্পর্ক নিয়েও বিস্তারিত কথা বলেন এবং একটি সুস্পষ্ট আঞ্চলিক নীতির রূপরেখা তুলে ধরেন। লেবানন প্রসঙ্গে তিনি সব ধরনের সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে দেশটির সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডগত অখণ্ডতার প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানান। সাম্প্রতিক সময়ে লেবাননে সামরিক হস্তক্ষেপের যে গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল, তা তিনি কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, লেবাননে সমস্ত অস্ত্রের একক নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্র ও সেনাবাহিনীর হাতেই থাকা উচিত এবং যুদ্ধ বা শান্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার একচ্ছত্র এখতিয়ারও তাদেরই থাকতে হবে। এই বক্তব্য পরোক্ষভাবে হিজবুল্লাহর স্বতন্ত্র সামরিক কাঠামোর বিরুদ্ধে অবস্থান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। লেবাননের যেকোনো অস্থিতিশীলতা সরাসরি সিরিয়ার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে মর্মে তিনি সতর্ক করে দিয়ে দুই দেশের ভাগ্যনির্ভরতার কথাও স্বীকার করেন। ইরাকের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে তিনি আশাবাদী এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ক্রমান্বয়ে ইতিবাচক দিকে অগ্রসর হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত ও উত্তেজনা পরিস্থিতি নিয়ে শারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি পরিষ্কার করে বলেন যে, বর্তমান যে আঞ্চলিক সংঘাত চলছে, তা যেকোনো মূল্যে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি, কারণ এটি ছড়িয়ে পড়লে একটি বড় ধরনের আঞ্চলিক বিপর্যয় অনিবার্য হয়ে উঠবে। তার সরকার খণ্ডিত দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীতে একটি সামগ্রিক আঞ্চলিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে, যে সমাধান উত্তেজনা প্রশমিত করবে এবং সামগ্রিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করবে।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর বিদ্রোহী নেতা থেকে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া আহমেদ আল-শারা এক জটিল সময়ে সিরিয়ার নেতৃত্বে এসেছেন। গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত অর্থনীতি, ভেঙে পড়া অবকাঠামো, এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিচ্ছিন্নতা থেকে উত্তরণের পথ খুঁজছে দেশটি। এই প্রেক্ষাপটে তার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা একদিকে যেমন সিরিয়ার জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় অনড়, তেমনই বাস্তববাদী ও কৌশলী। ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথ নিরাপত্তা চুক্তির এই প্রস্তাব তার সেই বৃহত্তর দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন, যেখানে যুদ্ধক্লান্ত জাতির জন্য শান্তি ও পুনর্গঠনের পথ প্রশস্ত করাই মূল লক্ষ্য।

সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৭ জুলাই ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন