গণবার্তা

নেপালে নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথে 'র‍্যাপার থেকে রাজনীতিবিদ' বালেন্দ্র শাহ

নেপালে নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথে 'র‍্যাপার থেকে রাজনীতিবিদ' বালেন্দ্র শাহ
ফাইল ফটো

নেপালের সাধারণ নির্বাচনে ব্যাপক এগিয়ে আছেন র্যাপার থেকে রাজনীতিতে আসা বালেন্দ্র শাহ। ভোট গণনা এখনও চলছে, তবে প্রাথমিক ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, তার নেতৃত্বাধীন রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি) ১৬৫টি সরাসরি নির্বাচিত আসনের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি জায়গায় এগিয়ে আছে। শনিবার (৭ মার্চ) সকাল পর্যন্ত পাওয়া ফলাফলে এই চিত্র দেখা গেছে।
বৃহস্পতিবারের নির্বাচনে বালেন্দ্র শাহ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপালের (ইউএমএল) সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি এবং নেপালি কংগ্রেসের গগন থাপার মতো প্রবীণ নেতাদের সঙ্গে। শনিবার সকাল পর্যন্ত ফলাফলে নেপালি কংগ্রেস দ্বিতীয় অবস্থানে অনেক পিছিয়ে এবং ইউএমএল তৃতীয় স্থানে রয়েছে।

বালেন্দ্র শাহ কে?

বালেন্দ্র শাহ নাম হলেও স্থানীয়ভাবে 'বালেন' নামে পরিচিত ৩৫ বছর বয়সী এই নেতা অবকাঠামো প্রকৌশলী হিসেবে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তিনি কয়েক বছর ধরে নেপালের হিপ হপ অঙ্গন ‘নেফপ’-এর সক্রিয় সদস্য ছিলেন। তার গানের বেশিরভাগই সামাজিক বার্তাধর্মী। এর মধ্যে অন্যতম পরিচিত গান ‘বালিদান’ ইউটিউবে মিলিয়ন ভিউ পেয়েছে।

গত বছর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞাকে কেন্দ্র করে নেপালে যে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল, পরে তা দুর্নীতি, বেকারত্ব এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতার ক্ষোভে পরিণত হয়। সে সময় দেশের তরুণদের মধ্যে শাহের জনপ্রিয়তা আরও বেড়ে যায়। ওই বিক্ষোভে ৭৭ জন নিহত হয়েছিলেন, যাদের মধ্যে অনেকেই পুলিশের গুলিতে নিহত হন। এরপর নেপালের তৎকালীন নেতা কেপি ওলিকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়।

বালেন্দ্র শাহ প্রকাশ্যে বিক্ষোভকারীদের সমর্থন দিয়েছিলেন এবং একপর্যায়ে কেপি ওলিকে ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিয়ে বলেন, তিনি দেশের সঙ্গে বেইমানি করেছেন।

মেয়র হিসেবে পরিচিতি

জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। মেয়র হিসেবে রাজধানীর সড়কগুলো পরিষ্কার রাখতে এবং অবৈধ ব্যবসা দমনে তিনি রাস্তার হকার ও ভূমিহীন মানুষের বিরুদ্ধে কঠোরভাবে পুলিশ ব্যবহার করেছেন। এজন্য মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি।

কেপি ওলির বিরুদ্ধে লড়াই

বালেন্দ্র শাহ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন কেপি ওলির একই আসন ঝাপা-৫-এ, যা ঐতিহ্যগতভাবে ওলির শক্ত ঘাঁটি। এ পর্যন্ত ভোট গণনায় দেখা যাচ্ছে, বালেন্দ্র শাহ উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে এগিয়ে আছেন।

তবে প্রচারণার সময় তিনি গণমাধ্যমকে সাক্ষাৎকার দেওয়া এড়িয়ে গেছেন এবং নির্বাচনের দিন সাংবাদিকদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান। সেদিন তিনি তার স্বভাবসুলভ কালো সানগ্লাস পরে সাংবাদিকদের ভিড় পেরিয়ে দ্রুত চলে যান। নেপালের গণমাধ্যম আশঙ্কা করছে, তিনি ক্ষমতায় গেলে এই প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে।

তরুণদের মধ্যে ব্যাপক সমর্থন

বিবিসির সঙ্গে কথা বলা বহু তরুণ ভোটার বলেছেন, তারুণ্য ও উদ্যমই এখন দেশের প্রয়োজন এবং শাহ নেপালের ভবিষ্যতের নতুন অধ্যায়ের প্রতীক। গত বছরের বিক্ষোভের পর এই নির্বাচনকে পুরোনো এবং নতুনের লড়াই হিসেবে দেখা হচ্ছে। বর্তমানে এগিয়ে থাকা আরএসপি ২০২২ সালের সর্বশেষ সাধারণ নির্বাচনে চতুর্থ স্থানে ছিল।

দেশের তরুণ ভোটারদের মধ্যে ৮ লাখ প্রথমবারের ভোটার ছিলেন, যাদের আকৃষ্ট করতে রাজনৈতিক দলগুলো চাকরির সুযোগ সৃষ্টি, দুর্নীতি মোকাবিলা এবং সুশাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

কেন এই নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ

গত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে নেপাল বারবার জোট সরকার পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে, যার নেতৃত্বে ছিল প্রধানত তিনটি দল, যার দুটি ছিল কমিউনিস্ট দল। কিন্তু এবার কোনো দলই বড় ধরনের জাতীয় জোট করেনি, ফলে ভোটারদের কাছে দল ও প্রার্থীদের অবস্থান আরও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হবে।

এছাড়া এই নির্বাচনে নতুন অনেক দল ও নতুন মুখ দেখা গেছে এবং এক-তৃতীয়াংশ প্রার্থীই স্বতন্ত্রভাবে দাঁড়িয়েছেন। এসবই ইঙ্গিত করে যে বহু নেপালি নতুন ধারণা ও নতুন নেতৃত্বের সন্ধান করছেন।

যদি বালেন্দ্র শাহ নির্বাচিত হন, তবে তা নেপালের রাজনীতিতে এক ভূমিকম্পসদৃশ পরিবর্তন হবে। দশকের পর দশক ধরে একই পুরোনো নেতৃত্বের অধীনে অস্থিতিশীল জোট সরকারের পর এটি হবে এক ভিন্নধর্মী মুহূর্ত।

চূড়ান্ত ফলাফল আগামী সপ্তাহের আগে নাও আসতে পারে। পাহাড়ি দেশ নেপালে ভোট গণনা ঐতিহ্যগতভাবে ধীরগতির এবং দূরবর্তী অঞ্চলগুলো থেকে ব্যালট আনার জন্য হেলিকপ্টার ব্যবহার করতে হয়। ফলে চূড়ান্ত ফল জানতে কয়েক দিন লেগে যেতে পারে। ২০২২ সালের সর্বশেষ নির্বাচনে চূড়ান্ত ফল প্রকাশ হতে দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় লেগেছিল।

বিষয় : নেপাল

আপনার মতামত লিখুন

গণবার্তা

শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬


নেপালে নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথে 'র‍্যাপার থেকে রাজনীতিবিদ' বালেন্দ্র শাহ

প্রকাশের তারিখ : ০৭ মার্চ ২০২৬

featured Image
নেপালের সাধারণ নির্বাচনে ব্যাপক এগিয়ে আছেন র্যাপার থেকে রাজনীতিতে আসা বালেন্দ্র শাহ। ভোট গণনা এখনও চলছে, তবে প্রাথমিক ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, তার নেতৃত্বাধীন রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি) ১৬৫টি সরাসরি নির্বাচিত আসনের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি জায়গায় এগিয়ে আছে। শনিবার (৭ মার্চ) সকাল পর্যন্ত পাওয়া ফলাফলে এই চিত্র দেখা গেছে।বৃহস্পতিবারের নির্বাচনে বালেন্দ্র শাহ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপালের (ইউএমএল) সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি এবং নেপালি কংগ্রেসের গগন থাপার মতো প্রবীণ নেতাদের সঙ্গে। শনিবার সকাল পর্যন্ত ফলাফলে নেপালি কংগ্রেস দ্বিতীয় অবস্থানে অনেক পিছিয়ে এবং ইউএমএল তৃতীয় স্থানে রয়েছে।বালেন্দ্র শাহ কে?বালেন্দ্র শাহ নাম হলেও স্থানীয়ভাবে 'বালেন' নামে পরিচিত ৩৫ বছর বয়সী এই নেতা অবকাঠামো প্রকৌশলী হিসেবে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তিনি কয়েক বছর ধরে নেপালের হিপ হপ অঙ্গন ‘নেফপ’-এর সক্রিয় সদস্য ছিলেন। তার গানের বেশিরভাগই সামাজিক বার্তাধর্মী। এর মধ্যে অন্যতম পরিচিত গান ‘বালিদান’ ইউটিউবে মিলিয়ন ভিউ পেয়েছে।গত বছর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞাকে কেন্দ্র করে নেপালে যে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল, পরে তা দুর্নীতি, বেকারত্ব এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতার ক্ষোভে পরিণত হয়। সে সময় দেশের তরুণদের মধ্যে শাহের জনপ্রিয়তা আরও বেড়ে যায়। ওই বিক্ষোভে ৭৭ জন নিহত হয়েছিলেন, যাদের মধ্যে অনেকেই পুলিশের গুলিতে নিহত হন। এরপর নেপালের তৎকালীন নেতা কেপি ওলিকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়।বালেন্দ্র শাহ প্রকাশ্যে বিক্ষোভকারীদের সমর্থন দিয়েছিলেন এবং একপর্যায়ে কেপি ওলিকে ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিয়ে বলেন, তিনি দেশের সঙ্গে বেইমানি করেছেন।মেয়র হিসেবে পরিচিতিজানুয়ারি পর্যন্ত তিনি নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। মেয়র হিসেবে রাজধানীর সড়কগুলো পরিষ্কার রাখতে এবং অবৈধ ব্যবসা দমনে তিনি রাস্তার হকার ও ভূমিহীন মানুষের বিরুদ্ধে কঠোরভাবে পুলিশ ব্যবহার করেছেন। এজন্য মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি।কেপি ওলির বিরুদ্ধে লড়াইবালেন্দ্র শাহ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন কেপি ওলির একই আসন ঝাপা-৫-এ, যা ঐতিহ্যগতভাবে ওলির শক্ত ঘাঁটি। এ পর্যন্ত ভোট গণনায় দেখা যাচ্ছে, বালেন্দ্র শাহ উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে এগিয়ে আছেন।তবে প্রচারণার সময় তিনি গণমাধ্যমকে সাক্ষাৎকার দেওয়া এড়িয়ে গেছেন এবং নির্বাচনের দিন সাংবাদিকদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান। সেদিন তিনি তার স্বভাবসুলভ কালো সানগ্লাস পরে সাংবাদিকদের ভিড় পেরিয়ে দ্রুত চলে যান। নেপালের গণমাধ্যম আশঙ্কা করছে, তিনি ক্ষমতায় গেলে এই প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে।তরুণদের মধ্যে ব্যাপক সমর্থনবিবিসির সঙ্গে কথা বলা বহু তরুণ ভোটার বলেছেন, তারুণ্য ও উদ্যমই এখন দেশের প্রয়োজন এবং শাহ নেপালের ভবিষ্যতের নতুন অধ্যায়ের প্রতীক। গত বছরের বিক্ষোভের পর এই নির্বাচনকে পুরোনো এবং নতুনের লড়াই হিসেবে দেখা হচ্ছে। বর্তমানে এগিয়ে থাকা আরএসপি ২০২২ সালের সর্বশেষ সাধারণ নির্বাচনে চতুর্থ স্থানে ছিল।দেশের তরুণ ভোটারদের মধ্যে ৮ লাখ প্রথমবারের ভোটার ছিলেন, যাদের আকৃষ্ট করতে রাজনৈতিক দলগুলো চাকরির সুযোগ সৃষ্টি, দুর্নীতি মোকাবিলা এবং সুশাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।কেন এই নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণগত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে নেপাল বারবার জোট সরকার পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে, যার নেতৃত্বে ছিল প্রধানত তিনটি দল, যার দুটি ছিল কমিউনিস্ট দল। কিন্তু এবার কোনো দলই বড় ধরনের জাতীয় জোট করেনি, ফলে ভোটারদের কাছে দল ও প্রার্থীদের অবস্থান আরও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হবে।এছাড়া এই নির্বাচনে নতুন অনেক দল ও নতুন মুখ দেখা গেছে এবং এক-তৃতীয়াংশ প্রার্থীই স্বতন্ত্রভাবে দাঁড়িয়েছেন। এসবই ইঙ্গিত করে যে বহু নেপালি নতুন ধারণা ও নতুন নেতৃত্বের সন্ধান করছেন।যদি বালেন্দ্র শাহ নির্বাচিত হন, তবে তা নেপালের রাজনীতিতে এক ভূমিকম্পসদৃশ পরিবর্তন হবে। দশকের পর দশক ধরে একই পুরোনো নেতৃত্বের অধীনে অস্থিতিশীল জোট সরকারের পর এটি হবে এক ভিন্নধর্মী মুহূর্ত।চূড়ান্ত ফলাফল আগামী সপ্তাহের আগে নাও আসতে পারে। পাহাড়ি দেশ নেপালে ভোট গণনা ঐতিহ্যগতভাবে ধীরগতির এবং দূরবর্তী অঞ্চলগুলো থেকে ব্যালট আনার জন্য হেলিকপ্টার ব্যবহার করতে হয়। ফলে চূড়ান্ত ফল জানতে কয়েক দিন লেগে যেতে পারে। ২০২২ সালের সর্বশেষ নির্বাচনে চূড়ান্ত ফল প্রকাশ হতে দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় লেগেছিল।

গণবার্তা

সম্পাদকঃ নূর মোহাম্মদ
কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্ব সংরক্ষিত গণবার্তা