গণবার্তা – সর্বশেষ বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক সংবাদ, বিশ্লেষণ ও রিয়েল টাইম আপডেট

বাগেরহাটে ১৪ মৃত্যু: বউ বরণ নয়, ৯ মরদেহ দাফনের অপেক্ষায় স্বজনেরা

বাগেরহাটে ১৪ মৃত্যু: বউ বরণ নয়, ৯ মরদেহ দাফনের অপেক্ষায় স্বজনেরা

পুত্রবধূকে নিয়ে মোংলা উপজেলার শেলাবুনিয়ায় নিজ বাড়িতে পৌঁছনোর কথা ছিল বিএনপি নেতা আব্দুর রাজ্জাক ও তার স্বজনদের। আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীরা অপেক্ষা করছিলেন বর-বউকে বরণের জন্য। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনা কেড়ে নিয়েছে এই বাড়ির হাসি-আনন্দ। এখন বাড়ির সামনে একে একে খাটিয়ায় রাখা আছে ৯ মরদেহ। তাদের দাফনের অপেক্ষায় সবাই।

বাগেরহাটের মোংলা উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন শেহলা বুনিয়ায় আব্দুর রাজ্জাকের বাড়িতে অসংখ্য মানুষের ভিড়। সবাই শোকে স্তব্দ। কারো মুখে কোনো শব্দ নেই। শুধু ভেসে আসছে কান্নার শব্দ।

নিহত রাজ্জাকের প্রতিবেশী শরীফ হাবিবুর রহমান বলেন, “একসঙ্গে এতগুলো লাশ আগে দেখিনি। এটা সহ্য করার মতো না। এই বাড়িতে হাসি আনন্দে গমগম করার কথা ছিল, সেখানে কান্নার রোল পড়েছে।”

দুর্ঘটনার বিবরণ

গতকাল বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) বিকেলে খুলনা-মোংলা মহাসড়কে বেলাই ব্রিজ নামক স্থানে নৌবাহিনীর স্টাফ বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয় নববধূকে বহনকারী মাইক্রোবাসটির। মুহূর্তেই সকল স্বপ্ন শেষ হয়ে যায়। বৃহস্পতিবার রাত ১০টা পর্যন্ত মাইক্রোবাস চালকসহ দুই পরিবারের ১৪ জন নিহত হন।

আব্দুর রাজ্জাক তার ছোট ছেলে আহাদুর রহমান সাব্বিরকে কয়রা উপজেলার নাকশা এলাকার আবদুস সালাম মোড়লের মেয়ে মার্জিয়া আক্তারের (মিতু) সঙ্গে বিয়ে দেন। বৃহস্পতিবার সকালে পরিবারের সাতজনসহ কয়েকজন আত্মীয়কে নিয়ে একটি মাইক্রোবাসে করে সেখানে যান রাজ্জাক। দুপুরে বিয়ের পর নববধূকে নিয়ে মোংলায় বাড়ি ফিরছিলেন বরের পরিবারের সদস্যরা। তাদের বহনকারী মাইক্রোবাসটি মোংলার কাছাকাছি রামপাল উপজেলার বেলাইব্রিজ এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা নৌ-বাহিনীর একটি স্টাফ বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনায় মোংলার এই বর ও কনের আর বাড়ি ফেরা হল না।

নিহতদের পরিচয়

বরের পক্ষের নিহতরা হলেন—

  • বর আহাদুর রহমান সাব্বির

  • তার বাবা আব্দুর রাজ্জাক (মোংলা পৌরসভার ৮নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি)

  • ভাই আব্দুল্লাহ সানি

  • বোন উম্মে সুমাইয়া ঐশী

  • ঐশীর ছেলে সামিউল ইসলাম ফাহিম

  • বড় ভাই আশরাফুল আলম জনির স্ত্রী ফারহানা সিদ্দিকা পুতুল

  • তাদের ছেলে আলিফ

  • আরফা

  • ইরাম

কনের পক্ষের নিহতরা হলেন—

  • কনে মার্জিয়া আক্তার (মিতু) (কয়রার নাকসা আলিম মাদ্রাসার আলিম প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী)

  • তার ছোট বোন লামিয়া আক্তার

  • দাদি রাশিদা বেগম

  • নানি আনোয়ারা বেগম

এছাড়া নিহতদের মধ্যে আরেকজন হলেন মাইক্রোবাস চালক নাইম। তার বাড়ি বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার পেড়িখালি ইউনিয়নের সিংগেরবুনিয়া গ্রামে।

স্বজনের বিলাপ

আব্দুর রাজ্জাকের লাশের পাশে দাঁড়িয়ে অঝোরে কাঁছিলেন তার ছোট ভাই মো. সাজ্জাদ সরদার। তিনি বলেন, “আমাদের বেড়ে ওঠা মোংলাতেই। তবে গ্রামের বাড়ি খুলনার কয়রায়। রাজ্জাক ভাই তার মেয়ের বিয়ে দিয়েছে কয়রায়। এই ছেলেরও সেখানে বিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু একটি দুর্ঘটনা সব ওলটপালট করে দিল।”

নিহত বরের ভাই জনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার সব শেষ হয়ে গেছে। স্ত্রীর সন্তান ভাই-বোন সবই হারালাম, আমি একা হয়ে গেলাম।”

বরের বোন নিহত ঐশীর শ্বশুর মো. আব্দুল আলীম বলেন, “আমার বেয়াই রাজ্জাক ভাইয়ের আদি বাড়িও কয়রাতে। বিয়ের অনুষ্ঠানে আমিও ছিলাম। তারা ১২টার পর মাইক্রোবাসে করে মেয়ের বাড়ি থেকে রওনা দেন। আমার পুত্রবধূ একমাত্র নাতিও দুর্ঘটনায় মারা গেছেন।”

নয়টি মসজিদ থেকে খাটিয়া

নিহত আব্দুর রাজ্জাকের ছোট ভাই সাজ্জাদ জানান, শুক্রবার ভোরে তাদের মরদেহ বাগেরহাটের মোংলার শেহালাবুনিয়ায় পৌঁছায়। “আশপাশের নয়টা মসজিদ থেকে খাটিয়া আনা হয়েছে। গোসল শেষ একে একে নয় স্বজনকে রাখা হয়েছে খাটিয়াতে।”

কনে, তার বোন, দাদি ও নানির লাশ নেওয়া হয় খুলনার কয়রা উপজেলায়। আহত অবস্থায় একজন খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

জানাজার প্রস্তুতি

শুক্রবার দুপুরে জুমার নামাজের পর উপজেলা পরিষদ চত্বরে তাদের জানাজা শেষে পৌর কবরস্থানে দাফন করা হবে বলে জানান সাজ্জাদ। বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম জানাজায় অংশগ্রহণের কথা রয়েছে।

কাটাখালি হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাফর আহমেদ বলেন, পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই নিহতদের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

এলাকায় শোকের ছায়া

মোংলা উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মো. নুর আলম শেখ বলেন, “বিএনপি নেতা আব্দুর রাজ্জাকের পরিবারের এতোগুলো মানুষ মারা যাওয়ায় এলাকার সব মানুষ হতবিহ্বল হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন এলাকার মানুষ তার বাড়িতে ভিড় করছেন। কারও মুখে কোনো কথা নেই, সবার চোখ অশ্রুসিক্ত।”

কথা বলতে গিয়ে নুর আলমেরও চোখ কান্নায় ভিজে ওঠে। ধীরগলায় তিনি প্রশ্ন করেন, “কে কাকে শান্ত্বনা দেবে? এমন মৃত্যুর দায় কার? স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা কি?”

আপনার মতামত লিখুন

গণবার্তা – সর্বশেষ বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক সংবাদ, বিশ্লেষণ ও রিয়েল টাইম আপডেট

রোববার, ১৫ মার্চ ২০২৬


বাগেরহাটে ১৪ মৃত্যু: বউ বরণ নয়, ৯ মরদেহ দাফনের অপেক্ষায় স্বজনেরা

প্রকাশের তারিখ : ১৩ মার্চ ২০২৬

featured Image
পুত্রবধূকে নিয়ে মোংলা উপজেলার শেলাবুনিয়ায় নিজ বাড়িতে পৌঁছনোর কথা ছিল বিএনপি নেতা আব্দুর রাজ্জাক ও তার স্বজনদের। আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীরা অপেক্ষা করছিলেন বর-বউকে বরণের জন্য। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনা কেড়ে নিয়েছে এই বাড়ির হাসি-আনন্দ। এখন বাড়ির সামনে একে একে খাটিয়ায় রাখা আছে ৯ মরদেহ। তাদের দাফনের অপেক্ষায় সবাই।বাগেরহাটের মোংলা উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন শেহলা বুনিয়ায় আব্দুর রাজ্জাকের বাড়িতে অসংখ্য মানুষের ভিড়। সবাই শোকে স্তব্দ। কারো মুখে কোনো শব্দ নেই। শুধু ভেসে আসছে কান্নার শব্দ।নিহত রাজ্জাকের প্রতিবেশী শরীফ হাবিবুর রহমান বলেন, “একসঙ্গে এতগুলো লাশ আগে দেখিনি। এটা সহ্য করার মতো না। এই বাড়িতে হাসি আনন্দে গমগম করার কথা ছিল, সেখানে কান্নার রোল পড়েছে।”দুর্ঘটনার বিবরণগতকাল বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) বিকেলে খুলনা-মোংলা মহাসড়কে বেলাই ব্রিজ নামক স্থানে নৌবাহিনীর স্টাফ বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয় নববধূকে বহনকারী মাইক্রোবাসটির। মুহূর্তেই সকল স্বপ্ন শেষ হয়ে যায়। বৃহস্পতিবার রাত ১০টা পর্যন্ত মাইক্রোবাস চালকসহ দুই পরিবারের ১৪ জন নিহত হন।আব্দুর রাজ্জাক তার ছোট ছেলে আহাদুর রহমান সাব্বিরকে কয়রা উপজেলার নাকশা এলাকার আবদুস সালাম মোড়লের মেয়ে মার্জিয়া আক্তারের (মিতু) সঙ্গে বিয়ে দেন। বৃহস্পতিবার সকালে পরিবারের সাতজনসহ কয়েকজন আত্মীয়কে নিয়ে একটি মাইক্রোবাসে করে সেখানে যান রাজ্জাক। দুপুরে বিয়ের পর নববধূকে নিয়ে মোংলায় বাড়ি ফিরছিলেন বরের পরিবারের সদস্যরা। তাদের বহনকারী মাইক্রোবাসটি মোংলার কাছাকাছি রামপাল উপজেলার বেলাইব্রিজ এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা নৌ-বাহিনীর একটি স্টাফ বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনায় মোংলার এই বর ও কনের আর বাড়ি ফেরা হল না।নিহতদের পরিচয়বরের পক্ষের নিহতরা হলেন—বর আহাদুর রহমান সাব্বিরতার বাবা আব্দুর রাজ্জাক (মোংলা পৌরসভার ৮নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি)ভাই আব্দুল্লাহ সানিবোন উম্মে সুমাইয়া ঐশীঐশীর ছেলে সামিউল ইসলাম ফাহিমবড় ভাই আশরাফুল আলম জনির স্ত্রী ফারহানা সিদ্দিকা পুতুলতাদের ছেলে আলিফআরফাইরামকনের পক্ষের নিহতরা হলেন—কনে মার্জিয়া আক্তার (মিতু) (কয়রার নাকসা আলিম মাদ্রাসার আলিম প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী)তার ছোট বোন লামিয়া আক্তারদাদি রাশিদা বেগমনানি আনোয়ারা বেগমএছাড়া নিহতদের মধ্যে আরেকজন হলেন মাইক্রোবাস চালক নাইম। তার বাড়ি বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার পেড়িখালি ইউনিয়নের সিংগেরবুনিয়া গ্রামে।স্বজনের বিলাপআব্দুর রাজ্জাকের লাশের পাশে দাঁড়িয়ে অঝোরে কাঁছিলেন তার ছোট ভাই মো. সাজ্জাদ সরদার। তিনি বলেন, “আমাদের বেড়ে ওঠা মোংলাতেই। তবে গ্রামের বাড়ি খুলনার কয়রায়। রাজ্জাক ভাই তার মেয়ের বিয়ে দিয়েছে কয়রায়। এই ছেলেরও সেখানে বিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু একটি দুর্ঘটনা সব ওলটপালট করে দিল।”নিহত বরের ভাই জনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার সব শেষ হয়ে গেছে। স্ত্রীর সন্তান ভাই-বোন সবই হারালাম, আমি একা হয়ে গেলাম।”বরের বোন নিহত ঐশীর শ্বশুর মো. আব্দুল আলীম বলেন, “আমার বেয়াই রাজ্জাক ভাইয়ের আদি বাড়িও কয়রাতে। বিয়ের অনুষ্ঠানে আমিও ছিলাম। তারা ১২টার পর মাইক্রোবাসে করে মেয়ের বাড়ি থেকে রওনা দেন। আমার পুত্রবধূ একমাত্র নাতিও দুর্ঘটনায় মারা গেছেন।”নয়টি মসজিদ থেকে খাটিয়ানিহত আব্দুর রাজ্জাকের ছোট ভাই সাজ্জাদ জানান, শুক্রবার ভোরে তাদের মরদেহ বাগেরহাটের মোংলার শেহালাবুনিয়ায় পৌঁছায়। “আশপাশের নয়টা মসজিদ থেকে খাটিয়া আনা হয়েছে। গোসল শেষ একে একে নয় স্বজনকে রাখা হয়েছে খাটিয়াতে।”কনে, তার বোন, দাদি ও নানির লাশ নেওয়া হয় খুলনার কয়রা উপজেলায়। আহত অবস্থায় একজন খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।জানাজার প্রস্তুতিশুক্রবার দুপুরে জুমার নামাজের পর উপজেলা পরিষদ চত্বরে তাদের জানাজা শেষে পৌর কবরস্থানে দাফন করা হবে বলে জানান সাজ্জাদ। বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম জানাজায় অংশগ্রহণের কথা রয়েছে।কাটাখালি হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাফর আহমেদ বলেন, পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই নিহতদের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।এলাকায় শোকের ছায়ামোংলা উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মো. নুর আলম শেখ বলেন, “বিএনপি নেতা আব্দুর রাজ্জাকের পরিবারের এতোগুলো মানুষ মারা যাওয়ায় এলাকার সব মানুষ হতবিহ্বল হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন এলাকার মানুষ তার বাড়িতে ভিড় করছেন। কারও মুখে কোনো কথা নেই, সবার চোখ অশ্রুসিক্ত।”কথা বলতে গিয়ে নুর আলমেরও চোখ কান্নায় ভিজে ওঠে। ধীরগলায় তিনি প্রশ্ন করেন, “কে কাকে শান্ত্বনা দেবে? এমন মৃত্যুর দায় কার? স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা কি?”

গণবার্তা – সর্বশেষ বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক সংবাদ, বিশ্লেষণ ও রিয়েল টাইম আপডেট

সম্পাদকঃ নূর মোহাম্মদ 
প্রকাশকঃ ফিরোজ আল-মামুন 

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্ব সংরক্ষিত গণবার্তা