আজ ২৬ মার্চ, মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে বাংলার মাটিতে প্রথমবারের মতো স্বাধীনতার সূর্য উদিত হয়েছিল। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে শৃঙ্খলমুক্ত হয় বাঙালি জাতি। ৫৫ বছর পর এসে আজ স্বাধীন বাংলাদেশ পথচলার নতুন এক অধ্যায়ে পা রাখল।
দিবসটি উপলক্ষে সারা দেশে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে সরকার। রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণীতে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। বাণীগুলো আজকের দৈনিক পত্রিকা, ইলেকট্রনিক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর বাণীতে বলেন, ‘স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য ছিল বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক, শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ একটি বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। জাতীয় ঐক্য, পারস্পরিক সহিষ্ণুতা ও দেশপ্রেমের চেতনাকে হৃদয়ে ধারণ করে আমাদের দেশের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে হবে’।
আজ ভোরবেলা ঢাকাসহ সকল জেলা ও উপজেলায় ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে দিবসটির সূচনা হয়। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়।
দিবসের প্রথম কর্মসূচি হিসেবে ভোর ৬টায় সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পমাল্য অর্পণ করেন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। পরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সেখানে উপস্থিত হয়ে শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
এ সময় বীরশ্রেষ্ঠ পরিবারের সদস্যবৃন্দ, যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা ও অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধারা পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। পরে রাজধানীতে অবস্থিত বিদেশি কূটনীতিকরাও স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানান।
বেলা ১১টায় বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি বীরশ্রেষ্ঠ পরিবার ও খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা প্রদান করেন।
দীর্ঘ দেড় যুগ পর জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে অনুষ্ঠিত হলো ঐতিহ্যবাহী কুচকাওয়াজ। সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর সদস্যদের অংশগ্রহণে স্থল ও আকাশে প্রদর্শিত হয় দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা।
প্যারেডে সালাম গ্রহণ করেন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। প্যারেড কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল আসাদুল হক।
কুচকাওয়াজে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমান বাহিনীর পাশাপাশি বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অংশ নেন। ঘোড়ায় চড়ে প্যারেড কমান্ডারের প্রবেশের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মূল কুচকাওয়াজ। সাজোয়া, আর্টিলারি, সিগনালস, ইস্ট বেঙ্গল, এয়ার ডিফেন্স, প্যারা কমান্ডো, নৌবাহিনী ও আধুনিকায়িত ইনফ্যান্ট্রি কন্টিনজেন্ট অংশ নেয়।
আকাশপথে প্যারাট্রুপাররা জাতীয় পতাকা নিয়ে অবতরণ করেন। বিমান বাহিনীর বিভিন্ন কৌশলগত প্রদর্শনীর শেষে মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান রাষ্ট্রপতিকে সালাম জানিয়ে প্রদর্শনীর সমাপ্তি ঘটায়।
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি দিবসটি উপলক্ষে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। সকাল ৮টায় জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে দিনের কর্মসূচি শুরু হয়। বিকেল ৬টায় জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। অনুষ্ঠানে ৩০ মিনিটের প্রামাণ্যচিত্র ‘দ্য পিপলস প্রেসিডেন্ট’ প্রদর্শন করা হয়।
দিবসটি উপলক্ষে স্মারক ডাকটিকিট উন্মোচন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুধবার (২৫ মার্চ) সচিবালয়ে এক সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠানে তিনি এই ডাকটিকিট অবমুক্ত করেন।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম, ডাক সচিব আব্দুন নাসের খান এবং ডাক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কাজী আসাদুল ইসলাম।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে দুই দিনের বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। কর্মসূচির অংশ হিসেবে গতকাল ২৫ মার্চ বিকেল ২টা ৩০ মিনিটে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বক্তব্য রাখেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ শীর্ষ নেতারা।
আজ দিবসটির সকাল ৬টায় দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় নয়াপল্টনে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রীরা। পরে সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদনের পর বিএনপির নেতাকর্মীরা শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
স্মৃতিসৌধ থেকে নেতাকর্মীরা শেরেবাংলা নগরে গিয়ে দলটির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানের সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। পরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কবরেও পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। জাতীয়তাবাদী ওলামা দলের উদ্যোগে কবর প্রাঙ্গণে দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।
বিকেলে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। সারা দেশে বিএনপির সব ইউনিট একই কর্মসূচি পালন করছে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে দুই দিনের কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। কর্মসূচির অংশ হিসেবে গতকাল ২৫ মার্চ বিকেল ৩টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন দলটির আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। সভায় জামায়াতের শীর্ষ নেতারা স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য রাখেন।
আজ দিবসটির সকালে ডা. শফিকুর রহমান রাষ্ট্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। সকালে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। দলের সব স্তরে আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে।
এছাড়া জামায়াতের নেতাকর্মীরা বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসৌধ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন এবং দেশের শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনায় দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।
স্বাধীনতা দিবসের আগে বুধবার (২৫ মার্চ) জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান সরকারকে সংসদের বাইরে সব রাজনৈতিক দলকে নিয়ে জাতীয় সংলাপের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমাদের জাতীয় জীবনে একটি কঠিন সময় এসেছে। উদারতা দেখিয়ে সংসদে না থাকলেও সবাইকে নিয়ে বসুন। সবার সঙ্গে খোলা মনে বসুন।” তিনি জ্বালানি সংকট ও সহিংসতা বন্ধেও সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ঢাকাসহ সারা দেশে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর হামলা চালায়। ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে এই হত্যাযজ্ঞে শহীদ হন অসংখ্য নিরীহ মানুষ। এই গণহত্যার মধ্যেই বাঙালি জাতির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা চূড়ান্ত রূপ পায়।
সেই রাতের স্মৃতিচারণ করে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান পরবর্তীকালে লিখেছিলেন, “সেই অন্ধকার রাতেই আমরা সঠিক সিদ্ধান্ত নিলাম।” তিনি তার প্রতিফলনমূলক প্রবন্ধে বাঙালি জাতির স্বাধীনতার সংগ্রামের পথচলার বিবরণ তুলে ধরেন।
মার্চের প্রথম থেকেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ বাঙালির স্বাধীনতার সংগ্রামের ‘সবুজ সংকেত’ হিসেবে কাজ করেছিল। সেই ধারাবাহিকতায় ২৫ মার্চ গণহত্যার প্রতিরোধ গড়ে তোলেন জিয়া। ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে চট্টগ্রামের কালুরঘাটে অবস্থিত স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র থেকে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।
স্বাধীনতার ঘোষণায় বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়। দীর্ঘ নয় মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ শেষে ১৬ ডিসেম্বর বিশ্বের মানচিত্রে আত্মপ্রকাশ করে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর বাণীতে বলেন, ‘স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য ছিল বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক, শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা। এই লক্ষ্য সামনে রেখে আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে’।
তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বীর মুক্তিযোদ্ধা, নির্যাতনের শিকার মা-বোন ও স্বাধীনতা সংগ্রামে আত্মনিয়োগকারী সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান এবং শহীদদের রূহের মাগফিরাত কামনা করেন।
এদিন সন্ধ্যায় দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রামাণ্যচিত্র ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত হচ্ছে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে।
নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের জাহাজ চট্টগ্রাম, খুলনা, মোংলা, পায়রা ও ঢাকার সদরঘাটে সাধারণ মানুষের জন্য খোলা রাখা হয়েছে।
সিনেমা হলে বিনামূল্যে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র প্রদর্শন করা হচ্ছে। দেশের সব জাদুঘর বিনামূল্যে উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।
দেশের সব মসজিদে বিশেষ মোনাজাত এবং মন্দির, গির্জা, প্যাগোডাসহ সব উপাসনালয়ে মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের আত্মার শান্তি ও দেশের শান্তি-সমৃদ্ধি কামনায় বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছে।
স্বাধীনতার ৫৫তম বছরে এসে দেশ আজ উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে বলা হয়েছে, ‘জাতীয় ঐক্য, পারস্পরিক সহিষ্ণুতা ও দেশপ্রেমের চেতনাকে হৃদয়ে ধারণ করে আমাদের দেশের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে হবে’।

রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৬ মার্চ ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন