রোববার (৫ এপ্রিল) জাতীয় সংসদের অধিবেশন ছিল ব্যস্ত। একদিকে ১৩৩টি অধ্যাদেশ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার দাবি জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। অন্যদিকে মাত্র আট মিনিটে কণ্ঠভোটে পাস হয়েছে সরকারি চাকরির বয়সসীমা ও শৃঙ্খলা সংক্রান্ত দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিল। বিল দুটি নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি, বিরোধী দলের সদস্যরাও ভোটে অংশ নেননি।
সংসদ অধিবেশন শুরুর আগে স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সম্পূরক কার্যসূচিতে আনা বিলগুলো অধ্যাদেশকে কেন্দ্র করেই আনা হয়েছে। তিনি জানান, ১৩৩টি অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাইয়ের জন্য গঠিত বিশেষ কমিটির রিপোর্ট স্পিকার অনুমোদন করেছেন। সেখানে কিছু অধ্যাদেশ বিলুপ্তির প্রস্তাব আছে।
বিরোধীদলীয় নেতা দাবি করেন, যেসব অধ্যাদেশ বিলুপ্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, সেগুলো জুলাই স্পিরিটের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি এসব বিষয়ে সংসদে আলোচনার সুযোগ চান।
জবাবে আইনমন্ত্রী জানান, বিরোধীদলীয় নেতা যে দুটি বিলের কথা বলেছেন, সেগুলো ১৩৩টি অধ্যাদেশের অন্তর্ভুক্ত নয়। বরং মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো সম্পূর্ণ নতুন বিল। তিনি বলেন, কিছু অধ্যাদেশ বিলুপ্ত করা হয়েছে, কিছু হেফাজত করা হচ্ছে। সেগুলো পরবর্তীতে বিল আকারে সংসদে আনা হবে।
অপর ঘটনায়, বগুড়া-৬ আসনের উপনির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর ইশতেহার ঘোষণা সভায় দলটির সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বিরোধিতা করে বিএনপি ফ্যাসিবাদী শাসনের দিকে এগোচ্ছে।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ৩৩টি দলের আলোচনায় জুলাই সনদ প্রণয়ন করা হয়। রাষ্ট্রপতির আদেশে সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন করা হয়। কিন্তু বিএনপি সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নিয়ে এখন গণভোট অস্বীকার করছে, যা জাতির সঙ্গে প্রতারণা।
প্রায় পাঁচ কোটি ভোটার গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিএনপি ফল মেনে নিতে না পেরে সংস্কার বাধাগ্রস্ত করছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি হুবহু পাসের সুপারিশ করে সংসদীয় কমিটি। তার ধারাবাহিকতায় রোববার দুটি বিল কণ্ঠভোটে পাস হয়। রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পেলেই এগুলো আইনে পরিণত হবে।
এই বিলে ২০১৮ সালের সরকারি চাকরি আইনে নতুন ধারা (৩৭ক) যুক্ত করে তিন ধরনের শাস্তিমূলক বিধান আনা হয়েছে। বিল অনুযায়ী, নিম্নোক্ত আচরণ শাস্তিযোগ্য বলে গণ্য হবে:
ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বৈধ আদেশ অমান্য করা
আইনসংগত কারণ ছাড়া সরকারের আদেশ, পরিপত্র ও নির্দেশ অমান্য করা
ছুটি ছাড়া অন্যান্য কর্মচারীদের সঙ্গে সমবেতভাবে কাজ থেকে অনুপস্থিত থাকা
কোনো কর্মচারীকে কাজে উপস্থিত হতে বাধাগ্রস্ত করা
শাস্তির ধরন:
নিম্নপদ বা নিম্ন বেতন গ্রেডে অবনমন
বাধ্যতামূলক অবসর
চাকরি থেকে বরখাস্ত
তদন্ত প্রক্রিয়া:
অভিযোগ গঠনের পর সাত কার্যদিবসের মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিস
শুনানির পর অভিযোগের ভিত্তি পেলে তিন কার্যদিবসের মধ্যে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি
নারী অভিযুক্ত থাকলে কমিটিতে নারী সদস্য বাধ্যতামূলক
কমিটিকে ১৪ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে হবে
নির্ধারিত সময়ে তদন্ত না হলে নতুন কমিটি গঠন
দণ্ডপ্রাপ্ত কর্মচারী ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে আপিল করতে পারবেন
উল্লেখ্য, এই অধ্যাদেশ জারির পর সচিবালয়সহ বিভিন্ন জায়গায় সরকারি কর্মচারীরা বিক্ষোভ করেছিলেন। পরে গত বছরের ২৩ জুলাই দ্বিতীয় সংশোধনী অধ্যাদেশ জারি করা হয়।
এই বিলে সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থাগুলোতে সরাসরি নিয়োগের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩২ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে যেসব পদে আগে থেকেই ৩২ বছরের বেশি বয়সসীমা ছিল (যেমন ৩৫, ৪০, ৪৫ বছর) সেগুলো অপরিবর্তিত থাকবে। প্রতিরক্ষা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিজস্ব বিধিমালাও বহাল থাকবে।
বিলের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, চাকরিপ্রার্থীদের দাবির প্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের অধ্যাদেশে বয়সসীমা ৩২ বছর করা হয়। কিন্তু বিদ্যমান নিয়োগবিধিতে উচ্চতর বয়সসীমা থাকায় জটিলতা তৈরি হয়। পরবর্তীতে সংশোধনী এনে সেই জটিলতা দূর করা হয়েছে।
দুটি বিলেই কোনো আলোচনা না হওয়া এবং বিরোধী দলের অংশ না নেওয়ার ঘটনা সংসদীয় ইতিহাসে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তবে সংসদ সচিবালয় জানিয়েছে, প্রক্রিয়াগতভাবে বিল পাস হয়েছে। এখন রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর এগুলো আইনে পরিণত হবে।

শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ এপ্রিল ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন