১৯৭৮ সালে জন্ম নেওয়া বিএনপি কীভাবে মুক্তিযুদ্ধের দল হতে পারে, সে প্রশ্ন তুলেছেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য ও দলের নায়েবে আমির এ টি এম আজহারুল ইসলাম। বুধবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ প্রশ্ন তোলেন।
আজহারুল ইসলাম বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কথা বলা হয়। বিএনপি দাবি করে মুক্তিযুদ্ধের দল। অথচ বিএনপি প্রতিষ্ঠা হয়েছে ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর, আর মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে ১৯৭১ সালে। মুক্তিযুদ্ধের দল কীভাবে বিএনপি হতে পারে? তাহলে এটা কীভাবে আমি মূল্যায়ন করব? বিএনপিতে মুক্তিযোদ্ধা আছে, এটা আপনি বলতে পারেন। তদ্রুপ জামায়াতে ইসলামীতেও মুক্তিযোদ্ধা আছে।’
আজহার একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত ছিলেন। বক্তব্যের শুরুতে তিনি বিষয়টির উল্লেখ করেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ফলে তাঁর মুক্তির পথ সুগম হয়েছে উল্লেখ করে তিনি এ জন্য জুলাই যোদ্ধা ও যাঁরা শহীদ হয়েছেন, তাঁদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গে আজহার বলেন, ‘জুলাই আন্দোলন হঠাৎ করে হয়েছে, এটা যেমন ঠিক নয়—তেমনি একটা সরকার যাবে, আরেকটা সরকার আসবে, সে জন্যও এ আন্দোলন ছিল না। একটা পরিবর্তনের আন্দোলন ছিল। এটি ছিল বলেই আমাদের ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে আমরা সুপারিশ দাঁড় করিয়েছিলাম, যার মাধ্যমে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং গণভোটের পক্ষে ৭০ শতাংশ রায় দিয়েছে।’
সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে স্মরণ করে আজহার বলেন, প্রেসিডেন্ট জিয়া অমর হয়ে থাকবেন তিনটি কারণে—বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, ঐক্যের রাজনীতি এবং আধিপত্যবাদবিরোধী আন্দোলন। তাঁর ৭ নভেম্বরের বিপ্লবের মাধ্যমে বাংলাদেশ আধিপত্যবাদমুক্ত হয়। বেগম খালেদা জিয়া অমর হয়ে থাকবেন সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও আপসহীন নেত্রীর খেতাব পাওয়ার কারণে। তিনিও ঐক্যের রাজনীতি করেছেন।
আজহার দাবি করেন, ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে, বিশেষ করে ১৬ বছরে দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর চেয়ে বেশি কেউ নির্যাতনের শিকার হয়নি। আর কোনো দলের প্রধান নেতা থেকে শুরু করে সেক্রেটারি জেনারেলসহ ১১ জন নেতাকে জেলখানায় ফাঁসি দিয়ে এবং বিনা চিকিৎসায় হত্যা করা হয়নি।’
তিনি বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামী প্রমাণ করেছে, তারা বাংলাদেশের জনগণকে ভালোবাসে। তারা ভয় পেয়ে জীবন রক্ষা করার জন্য, সুন্দর জীবন যাপন করার জন্য কোনো সময় দেশ থেকে পালিয়ে যায়নি। ফাঁসির মঞ্চে গিয়েছেন, শহীদ হয়েছেন, দেশ তো ছাড়েননি। এ দেশের জনগণ জানেন কারা ত্যাগ বেশি স্বীকার করেছে।’
আজহার রাষ্ট্রপতির উদ্দেশে বলেন, ‘আমি প্রেসিডেন্টকে ধন্যবাদ দেব কীভাবে? এই প্রেসিডেন্ট কে? তিনি আওয়ামী লীগের দোসর। আওয়ামী লীগকে আমরা ফ্যাসিস্ট বলছি। আওয়ামী লীগ ফ্যাসিস্ট হওয়ার সুযোগ পেয়েছে আমাদের দেশের আইন আর ভারতের সরাসরি সহযোগিতায়। আজকে সে আওয়ামী লীগ ভারতেই পালিয়ে গেছে। কিন্তু সেই আওয়ামী লীগের তৈরি করা ফ্যাসিস্টের প্রেসিডেন্টকে আমি কীভাবে সমর্থন করতে পারি?’
আজহার বিএনপির উদ্দেশে বলেন, ‘আমি অত্যন্ত বেদনার সঙ্গে বলতে চাই, বিএনপি একটি বড় রাজনৈতিক দল। কিন্তু আশ্চর্য হয়ে দেখলাম যে তাঁদের সংরক্ষিত নারী আসনে গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী থানার মহিলা আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদককে মনোনয়ন দিয়েছেন। কেন? এটা কি আপনাদের দৈন্যের কারণে? নাকি আপনারা কোনো শক্তিকে খুশি করতে চান?’
বিভিন্ন স্থানে সরকারি দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ করে ‘নিরাপত্তা কার্ড’ প্রবর্তনের প্রস্তাব দেন আজহার। তিনি বলেন, ‘আমি আপনাদের হেয় করার জন্য কথা বলছি না। কিন্তু আজকে আমরা এমপিরা স্বাধীনভাবে চলতে পারছি না। আমার এলাকার সরকারি কাজে সহযোগিতা করতে গিয়ে বিএনপির কর্মীদের দ্বারা লাঞ্ছিত হয়েছেন, এখনো ভয় দেখানো হচ্ছে। এ জন্য অনেকে হাসতে হাসতে বলেন, এত কার্ড পাইলাম, এখন নিরাপত্তা কার্ডের ব্যবস্থা করেন।’
প্রসঙ্গত, গতকাল মঙ্গলবার সংসদে বিএনপির সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান বলেছিলেন, কোনো মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের কেউ জামায়াতে ইসলামী করতে পারে না। তাঁর এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সংসদে উত্তেজনা ছড়ায়।
জামায়াত নেতা আজহারুল ইসলামের বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধ, বিএনপির প্রতিষ্ঠাকাল ও রাষ্ট্রপতি প্রসঙ্গে তীব্র মন্তব্য সংসদে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে, ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি দল কীভাবে মুক্তিযুদ্ধের দল হতে পারে – এই প্রশ্নটি বিএনপির জন্য অস্বস্তির কারণ হতে পারে। অন্যদিকে প্রেসিডেন্টকে ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ আখ্যা দেওয়ায় ক্ষোভ তৈরি হয়েছে সরকার সমর্থকদের মধ্যে। আগামী অধিবেশনগুলিতে এই বিতর্ক আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৯ এপ্রিল ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন