ইসলামের ইতিহাসে এমন কিছু মনীষীর আবির্ভাব ঘটেছে, যাঁদের অবদান কোনো নির্দিষ্ট যুগ, ভূখণ্ড কিংবা জাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁদের কর্ম মানবসভ্যতার ইতিহাসে স্থায়ী প্রভাব রেখে গেছে। সেই বিরল ব্যক্তিত্বদের অন্যতম হলেন ইমাম আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল আল-বুখারি (রহ.)—যাঁর নাম উচ্চারিত হলেই মনে ভেসে ওঠে 'সহিহ বুখারি', হাদিসশাস্ত্রের সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য সংকলন।
আজ পৃথিবীর যে প্রান্তেই মুসলমান বসবাস করুক না কেন, কুরআনুল কারিমের পর যে গ্রন্থটি সবচেয়ে বেশি সম্মান, গ্রহণযোগ্যতা ও নির্ভরযোগ্যতার মর্যাদা লাভ করেছে, সেটি হলো সহিহ আল-বুখারি। এটি শুধু একটি হাদিসগ্রন্থ নয়; বরং রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর জীবন, বাণী, কর্ম ও সুন্নাহকে বিশুদ্ধভাবে সংরক্ষণের এক অসাধারণ বৈজ্ঞানিক প্রচেষ্টা।
কিন্তু এই বিস্ময়কর কীর্তির পেছনে ছিল এক শিশুর অশ্রুসিক্ত শৈশব, একজন মায়ের অবিচল ঈমান, সীমাহীন ত্যাগ, হাজার হাজার মাইল দীর্ঘ সফর, অক্লান্ত গবেষণা এবং সত্যের প্রতি আপসহীন নিষ্ঠা।
বর্তমান উজবেকিস্তানের অন্তর্গত প্রাচীন নগরী বুখারা একসময় ছিল মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্ঞানকেন্দ্র। মধ্য এশিয়ার এই শহরটি ছিল সিল্ক রোডের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। এখানে যেমন বণিকদের আনাগোনা ছিল, তেমনি ছিল কুরআন, হাদিস, ফিকহ, ভাষাতত্ত্ব, দর্শন ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের খ্যাতিমান পণ্ডিতদের সমাবেশ।
অষ্টম ও নবম শতাব্দীতে বুখারা শুধু রাজনৈতিকভাবেই নয়, জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রেও খ্যাতির শীর্ষে অবস্থান করছিল। দূর-দূরান্ত থেকে ছাত্ররা এখানে আসতেন ইসলামী জ্ঞান অর্জনের জন্য।
এই জ্ঞানময় পরিবেশেই জন্ম নেন সেই মহান ব্যক্তিত্ব, যিনি পরবর্তীকালে মানবজাতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ গবেষক হিসেবে ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবেন।
ইমাম বুখারির পূর্ণ নাম—
আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল ইবনে ইবরাহিম ইবনে আল-মুগিরাহ ইবনে বারদিযবাহ আল-জুফি আল-বুখারি (রহ.)।
তিনি ১৩ শাওয়াল, ১৯৪ হিজরি (৮১০ খ্রিস্টাব্দ) বুখারা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন।
তাঁর পরিবার মূলত পারস্য বংশোদ্ভূত ছিল। তাঁর প্রপিতামহ আল-মুগিরাহ ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করেন এবং জুফি গোত্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেন। সেই সূত্রেই তাঁদের বংশের সঙ্গে "আল-জুফি" উপাধি যুক্ত হয়।
যদিও বংশগতভাবে তিনি আরব ছিলেন না, কিন্তু ইসলামী জ্ঞান, চরিত্র, গবেষণা ও অবদানের কারণে তিনি মুসলিম বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইমাম হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন।
ইমাম বুখারির পিতা ইসমাইল ইবনে ইবরাহিম ছিলেন একজন সম্মানিত মুহাদ্দিস ও অত্যন্ত পরহেজগার ব্যক্তি।
তিনি বিখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম মালিক ইবনে আনাস (রহ.), হাম্মাদ ইবনে যায়েদ (রহ.) প্রমুখ আলেমের নিকট হাদিস অধ্যয়ন করেছিলেন।
তাঁর সম্পর্কে জীবনীকাররা উল্লেখ করেছেন, মৃত্যুর আগে তিনি বলেছিলেন—
"আমার সম্পদের মধ্যে এমন একটি দিরহামও নেই, যা হারাম উপার্জন থেকে এসেছে কিংবা যার মধ্যে সন্দেহ রয়েছে।"
এই বক্তব্য শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সততার পরিচয় দেয় না; বরং বোঝায়, ইমাম বুখারির জীবনের ভিত্তি নির্মিত হয়েছিল হালাল রিজিক, তাকওয়া ও সততার ওপর।
দুঃখজনকভাবে ইমাম বুখারি খুব অল্প বয়সেই তাঁর পিতাকে হারান। ফলে তাঁর লালন-পালনের সম্পূর্ণ দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর মায়ের ওপর।
ইমাম বুখারির শৈশবের সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী ঘটনাগুলোর একটি হলো তাঁর দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলা।
শৈশবে এক দুরারোগ্য ব্যাধির কারণে তিনি সম্পূর্ণ অন্ধ হয়ে যান। চিকিৎসকরা আশাহত হয়ে পড়েন। পরিবারের লোকজনও প্রায় আশা ছেড়ে দেন।
কিন্তু একজন মানুষ আশা হারাননি।
তিনি ছিলেন তাঁর মা।
দিনের পর দিন, রাতের পর রাত তিনি আল্লাহর দরবারে কেঁদে কেঁদে দোয়া করতে থাকেন।
ইতিহাসবিদদের একটি প্রসিদ্ধ বর্ণনায় এসেছে, এক রাতে তিনি স্বপ্নে আল্লাহর নবী ইবরাহিম (আ.)-কে দেখেন। তিনি বলেন—
"তোমার অধিক দোয়া ও কান্নার কারণে আল্লাহ তোমার সন্তানের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন।"
পরদিন ঘুম থেকে উঠে তিনি বিস্ময়ের সঙ্গে দেখলেন—ছেলের চোখে আবার আলো ফিরে এসেছে।
এই ঘটনাটি প্রাচীন জীবনীগ্রন্থে উল্লেখিত একটি প্রসিদ্ধ ঐতিহ্যগত বর্ণনা। ইতিহাসবিদরা এটি উদ্ধৃত করলেও এর সনদ হাদিসের মানদণ্ডে সহিহ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত নয়। তবে মুসলিম ঐতিহাসিক সাহিত্যে ঘটনাটি ব্যাপকভাবে বর্ণিত হয়েছে এবং একজন মায়ের দোয়ার শক্তির অনন্য উদাহরণ হিসেবে আলোচিত।
চোখের আলো ফিরে পাওয়ার পর যেন তাঁর মেধারও নতুন দ্বার উন্মুক্ত হয়ে গেল।
অন্য শিশুরা যখন খেলাধুলায় ব্যস্ত থাকত, তখন ছোট্ট মুহাম্মদের সবচেয়ে প্রিয় কাজ ছিল আলেমদের দরসে বসা।
তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনতেন।
বারবার শুনতেন।
একবার শুনলেই মনে গেঁথে যেত।
তাঁর স্মৃতিশক্তি এতটাই প্রখর ছিল যে, শৈশবেই শিক্ষকরা তাঁর অসাধারণ মেধায় বিস্মিত হয়ে পড়েন।
ইমাম বুখারির জীবনীকারদের বর্ণনা অনুযায়ী, মাত্র দশ বছর বয়সেই তিনি হাদিস অধ্যয়নে এমন দক্ষতা অর্জন করেন যে, কোনো শিক্ষক হাদিস বর্ণনার সময় ভুল করলে তিনি বিনয়ের সঙ্গে তা সংশোধন করে দিতেন।
প্রথম দিকে শিক্ষকরা তাঁর আপত্তি গ্রহণ করতেন না।
কিন্তু যখন মূল গ্রন্থ বের করে মিলিয়ে দেখা হতো, তখন দেখা যেত—ছোট্ট মুহাম্মদই সঠিক ছিলেন।
এই ঘটনাগুলো খুব দ্রুত পুরো বুখারায় ছড়িয়ে পড়ে।
একদিন তাঁর শিক্ষক একটি সনদ (ইসনাদ) পাঠ করছিলেন।
তিনি ভুলবশত একজন রাবির নাম অন্যজনের সঙ্গে পরিবর্তন করে ফেলেন।
ইমাম বুখারি বিনয়ের সঙ্গে বলেন—
"হে উস্তাদ, এখানে সম্ভবত নামটি ভিন্ন হবে।"
শিক্ষক প্রথমে বিষয়টি গুরুত্ব দেননি।
কিন্তু পরে মূল কপি বের করে দেখেন, কিশোর ছাত্রটির বক্তব্যই সঠিক।
সেদিন থেকেই আলেমরা বুঝতে পারেন—এই শিশুর স্মৃতি ও বিশ্লেষণক্ষমতা সাধারণ মানুষের মতো নয়।
মাত্র ষোলো বছর বয়সে তিনি হাদিসশাস্ত্রের বহু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ অধ্যয়ন শেষ করেন।
এর মধ্যে ছিল—
আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক (রহ.)-এর সংকলন
ওয়াকী ইবনে জাররাহ (রহ.)-এর রেওয়ায়েত
তৎকালীন বহু মুহাদ্দিসের মৌলিক হাদিসগ্রন্থ
এই সময়েই তাঁর মা ও ভাই আহমদের সঙ্গে তিনি হজ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কায় যান।
হজ শেষে তাঁর মা ও ভাই বুখারায় ফিরে এলেও মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল থেকে যান।
কারণ তাঁর সামনে তখন আরেকটি স্বপ্ন।
রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতিটি সহিহ হাদিস খুঁজে বের করা।
সংগ্রহ করা।
যাচাই করা।
সংরক্ষণ করা।
তিনি তখনও জানতেন না—এই স্বপ্নই একদিন তাঁকে ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিসে পরিণত করবে।
মাত্র ষোলো বছর বয়সে হজ পালন শেষে ইমাম বুখারি (রহ.) একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর মা ও বড় ভাই আহমদ বুখারায় ফিরে গেলেও তিনি মক্কায় থেকে যান। কারণ তাঁর হৃদয়ে তখন একটি মাত্র স্বপ্ন—রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সহিহ হাদিসগুলোকে পৃথিবীর জন্য সংরক্ষণ করা।
এই সিদ্ধান্তই তাঁর পুরো জীবনকে বদলে দেয়।
হজের পর ইমাম বুখারি (রহ.) দীর্ঘ সময় মক্কায় অবস্থান করেন। তিনি মসজিদুল হারামে বসে হাদিস, ফিকহ, আরবি ভাষা ও রিজালশাস্ত্র অধ্যয়ন করতে থাকেন। পরে তিনি মদিনায় চলে যান। রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর রওজা মোবারকের সান্নিধ্যে কাটানো সময় তাঁর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে ওঠে।
ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে, মদিনায় অবস্থানকালে রাতের নির্জনে, অনেক সময় চাঁদের আলোয় কিংবা মসজিদে নববীর নিকট বসেই তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আত-তারীখুল কাবীর’-এর রচনা শুরু করেন। তখন তাঁর বয়স মাত্র আঠারো বছর।
এই গ্রন্থটি পরবর্তীকালে রাবিদের জীবনীসংক্রান্ত (ইলমুর রিজাল) অন্যতম মৌলিক গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।
ইমাম বুখারি (রহ.) বিশ্বাস করতেন—ইলম ঘরে বসে অর্জন করা যায় না; এর জন্য ত্যাগ, ধৈর্য ও দীর্ঘ সফর প্রয়োজন।
তিনি জীবনের প্রায় চার দশক ধরে মুসলিম বিশ্বের প্রধান প্রধান জ্ঞানকেন্দ্র সফর করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
মক্কা
মদিনা
বসরা
কুফা
বাগদাদ
ওয়াসিত
মিশর
দামেস্ক
হিমস
নিশাপুর
মারভ
বালখ
রায়
সমরখন্দসহ বহু নগরী।
জীবনীকারদের মতে, তিনি কিছু শহরে একাধিকবার সফর করেছিলেন। উদাহরণস্বরূপ, বসরায় তিনি চারবার, বাগদাদে বহুবার এবং কুফায়ও একাধিকবার গিয়েছিলেন, যাতে কোনো নির্ভরযোগ্য মুহাদ্দিসের কাছ থেকে হাদিস গ্রহণ বাদ না পড়ে।
ইমাম বুখারি (রহ.) নিজেই বলেছেন—
"আমি এক হাজারেরও বেশি শায়খের নিকট থেকে হাদিস লিখেছি।"
প্রত্যেক শায়খের কাছ থেকে তিনি শুধু হাদিস শুনেই সন্তুষ্ট হতেন না। তিনি তাদের ব্যক্তিগত চরিত্র, তাকওয়া, স্মৃতিশক্তি এবং নির্ভরযোগ্যতা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন।
তাঁর শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন—
ইমাম আলী ইবনে আল-মাদিনী (রহ.)
ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ (রহ.)
ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন (রহ.)
আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)
মাক্কী ইবনে ইবরাহিম (রহ.)
আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর আল-হুমায়দী (রহ.)
কুতাইবা ইবনে সাঈদ (রহ.)-সহ বহু প্রখ্যাত মুহাদ্দিস।
বিশেষত ইমাম আলী ইবনে আল-মাদিনী (রহ.)-কে তিনি নিজের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
ইমাম বুখারির (রহ.) স্মৃতিশক্তি নিয়ে মুসলিম বিশ্বের ইতিহাসে অসংখ্য ঘটনা সংরক্ষিত রয়েছে।
তিনি একবার বলেছিলেন—
"আমার এক লাখ সহিহ হাদিস এবং দুই লাখ অ-সহিহ হাদিস মুখস্থ রয়েছে।"
এটি কেবল হাদিসের মূল বক্তব্য নয়; বরং প্রতিটি হাদিসের পূর্ণ সনদ, বর্ণনাকারীদের নাম, তাদের শিক্ষক, ছাত্র এবং বর্ণনার পার্থক্যসহ মুখস্থ থাকার ইঙ্গিত বহন করে।
শিক্ষাজীবনের একটি ঘটনা তাঁর অসাধারণ স্মৃতিশক্তির প্রমাণ হিসেবে যুগে যুগে আলোচিত হয়েছে।
সহপাঠীরা প্রতিদিন শিক্ষকদের বক্তব্য লিখে রাখতেন। কিন্তু ইমাম বুখারি (রহ.) শুধু মনোযোগ দিয়ে শুনতেন, কিছুই লিখতেন না।
একদিন সহপাঠীরা প্রশ্ন করলেন—
"তুমি কিছুই লেখ না। তাহলে এতদিন এখানে এসে কী শিখলে?"
তিনি শান্তভাবে বললেন—
"তোমাদের লিখে রাখা খাতাগুলো নিয়ে এসো।"
তারা প্রায় ১৬ দিনের নোট নিয়ে এলো, যাতে ১৫ হাজারেরও বেশি হাদিস লেখা ছিল।
ইমাম বুখারি (রহ.) খাতা না দেখেই একের পর এক সব হাদিস মুখস্থ শুনিয়ে দিলেন। শুধু তাই নয়, কোথায় কোথায় ভুল লেখা হয়েছে তাও সংশোধন করে দিলেন।
সহপাঠীরা বিস্মিত হয়ে নিজেদের নোট তাঁর মুখস্থ পাঠ থেকে সংশোধন করতে লাগলেন।
ইমাম বুখারির জীবনের সবচেয়ে বিখ্যাত ঘটনাগুলোর একটি ঘটেছিল বাগদাদে।
তাঁর অসাধারণ খ্যাতির কথা শুনে বাগদাদের একদল মুহাদ্দিস তাঁর স্মৃতিশক্তি পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন।
তারা ১০০টি হাদিস নির্বাচন করেন।
প্রতিটি হাদিসের সনদ (ইসনাদ) অন্য হাদিসের সঙ্গে ইচ্ছাকৃতভাবে অদলবদল করে দেওয়া হয়।
এরপর দশজন আলেমকে দশটি করে ভুল সনদযুক্ত হাদিস মুখস্থ করিয়ে জনসম্মুখে ইমাম বুখারির সামনে উপস্থাপন করা হয়।
প্রথম ব্যক্তি একটি হাদিস পড়ে শোনালে ইমাম বুখারি (রহ.) বললেন—
"আমি এভাবে জানি না।"
একই উত্তর দিলেন দ্বিতীয়, তৃতীয়—এভাবে একশোটি হাদিসের ক্ষেত্রেই।
অনেক সাধারণ মানুষ ভাবলেন, হয়তো তিনি উত্তর জানেন না।
কিন্তু সবশেষে তিনি প্রথম ব্যক্তি থেকে শুরু করে একে একে সব ১০০টি হাদিস পুনরায় পাঠ করেন।
প্রথমে ভুল সনদটি উল্লেখ করেন, তারপর সঙ্গে সঙ্গে সঠিক সনদ ও সঠিক হাদিস বলে দেন।
এভাবে একশোটির একটিতেও তিনি ভুল করেননি।
সভায় উপস্থিত সকল মুহাদ্দিস তাঁর অসাধারণ হিফজ, স্মৃতিশক্তি ও গবেষণার সামনে অভিভূত হয়ে যান।
এই ঘটনার পর তাঁর খ্যাতি সমগ্র মুসলিম বিশ্বে আরও ছড়িয়ে পড়ে।
তাঁর সমসাময়িক অনেক মহান আলেম তাঁকে "আমীরুল মুমিনীন ফিল হাদিস"—অর্থাৎ হাদিসশাস্ত্রের মুমিনদের নেতা—উপাধিতে ভূষিত করেন।
এটি ছিল হাদিসশাস্ত্রে সর্বোচ্চ সম্মানজনক উপাধিগুলোর একটি।
প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ (রহ.) একদিন তাঁর ছাত্রদের বলেছিলেন—
"ইশ! যদি এমন একজন মানুষ থাকতেন, যিনি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর শুধু সহিহ হাদিসগুলো একত্রিত করে একটি গ্রন্থ সংকলন করতেন।"
এই কথাটি তরুণ ইমাম বুখারির হৃদয়ে গভীরভাবে দাগ কাটে।
পরে তিনি নিজেই বলেছেন—
"শায়খ ইসহাকের এই কথাই আমাকে সহিহ হাদিস সংকলনের কাজে উদ্বুদ্ধ করেছিল।"
এই একটি বাক্যই ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেয়। কারণ এর ফলশ্রুতিতেই রচিত হয় বিশ্বের সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য হাদিসগ্রন্থ সহিহ আল-বুখারি।
তখনও কেউ কল্পনা করতে পারেনি—এই তরুণ মুহাদ্দিস এমন একটি গ্রন্থ রচনা করবেন, যা এক হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে মুসলিম বিশ্বের সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্যতা লাভ করবে।
তাঁর সামনে তখন অপেক্ষা করছিল আরও কঠিন পরীক্ষা—ছয় লাখ হাদিসের মধ্য থেকে সহিহ হাদিস নির্বাচন, বর্ণনাকারীদের যাচাই, বছরের পর বছর গবেষণা এবং মানব ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জ্ঞানভান্ডার সংকলনের বিশাল দায়িত্ব।
এই অধ্যায়ই তাঁকে চিরদিনের জন্য ইতিহাসে অমর করে রাখবে।
পৃথিবীর ইতিহাসে বহু গ্রন্থ রচিত হয়েছে। কোনোটি দর্শনের, কোনোটি বিজ্ঞানের, কোনোটি আইন বা সাহিত্যের। কিন্তু এমন একটি গ্রন্থ, যার প্রতিটি বাক্য লেখার আগে একজন গবেষক বছরের পর বছর ভ্রমণ করেছেন, হাজারো মানুষের চরিত্র যাচাই করেছেন, অসংখ্য বর্ণনা তুলনা করেছেন এবং সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে সত্য-মিথ্যা পৃথক করেছেন—এমন উদাহরণ ইতিহাসে খুব কমই রয়েছে।
ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল আল-বুখারি (রহ.)-এর ‘আল-জামি‘ আস-সহিহ’, যা আজ ‘সহিহ বুখারি’ নামে সমগ্র মুসলিম বিশ্বের কাছে পরিচিত, ঠিক এমনই এক বিস্ময়কর গবেষণার ফসল।
ইমাম বুখারি (রহ.)-এর শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ (রহ.) একদিন তাঁর ছাত্রদের উদ্দেশে বলেছিলেন—
"যদি এমন কেউ থাকত, যে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কেবল বিশুদ্ধ (সহিহ) হাদিসগুলো একত্র করে একটি সংকলন তৈরি করত!"
এই কথাটি তরুণ ইমাম বুখারির হৃদয়ে গভীরভাবে দাগ কাটে। পরে তিনি নিজেই বলেন, এই আহ্বানই তাঁকে এমন একটি গ্রন্থ রচনায় উদ্বুদ্ধ করেছিল, যেখানে কেবল সর্বোচ্চ মানদণ্ডে যাচাইকৃত হাদিস স্থান পাবে।
আরেকটি প্রসিদ্ধ বর্ণনায় এসেছে, তিনি স্বপ্নে দেখেন—তিনি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সামনে দাঁড়িয়ে একটি পাখা দিয়ে তাঁকে রক্ষা করছেন। স্বপ্নের ব্যাখ্যাকারীরা বলেন, তিনি মিথ্যা বর্ণনা থেকে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর হাদিসকে রক্ষা করবেন। এই স্বপ্নও তাঁর মনোবল আরও দৃঢ় করে। (এটি জীবনীগ্রন্থে বর্ণিত একটি ঐতিহ্যগত ঘটনা; সহিহ হাদিস নয়।)
অনেকেই মনে করেন, ইমাম বুখারি (রহ.) ছয় লাখ হাদিস সংগ্রহ করেছিলেন। এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি।
জীবনীকারদের ভাষ্যমতে, তিনি প্রায় ছয় লাখ রেওয়ায়েত (বর্ণনা) অধ্যয়ন করেছিলেন। এর মধ্যে একই হাদিসের বহু ভিন্ন সনদ ও বর্ণনা অন্তর্ভুক্ত ছিল। অর্থাৎ এটি ছয় লাখ সম্পূর্ণ ভিন্ন বক্তব্য নয়, বরং বিভিন্ন সূত্রে প্রচলিত হাদিসের বিপুল ভাণ্ডার।
এই বিশাল সংগ্রহ থেকে তিনি কঠোর যাচাই-বাছাই করে তাঁর গ্রন্থে স্থান দেন মাত্র ৭,২৭৫টি রেওয়ায়েত (পুনরাবৃত্তিসহ)। পুনরাবৃত্তি বাদ দিলে সংখ্যা প্রায় ২,৬০০-এর কিছু বেশি।
এই পরিসংখ্যানই তাঁর গবেষণার গভীরতা ও সতর্কতার পরিচয় বহন করে।
ইমাম বুখারির (রহ.) আগে অনেক মুহাদ্দিস হাদিস সংকলন করেছেন। কিন্তু তিনি যাচাইয়ের ক্ষেত্রে এমন কঠোর মানদণ্ড গ্রহণ করেন, যা তাঁকে অন্যদের থেকে স্বতন্ত্র মর্যাদা দেয়।
তিনি সাধারণভাবে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো নিশ্চিত না হলে কোনো হাদিস গ্রহণ করতেন না—
প্রত্যেক বর্ণনাকারী তাঁর পূর্ববর্তী বর্ণনাকারীর কাছ থেকে সরাসরি হাদিস শুনেছেন—এ বিষয়ে শক্ত প্রমাণ থাকতে হবে।
শুধু একই যুগে জীবিত থাকাই যথেষ্ট নয়; তাঁদের সাক্ষাৎ বা সাক্ষাতের বাস্তব সম্ভাবনাও প্রতিষ্ঠিত হতে হবে।
হাদিস বর্ণনাকারীকে হতে হবে—
রাবির মুখস্থশক্তি দুর্বল হলে অথবা বয়সের কারণে স্মৃতি নষ্ট হয়ে গেলে তাঁর বর্ণনা গ্রহণে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করা হতো।
কখনো কখনো একটি হাদিস বাহ্যিকভাবে সহিহ মনে হলেও গভীর গবেষণায় সূক্ষ্ম ত্রুটি ধরা পড়ত। ইমাম বুখারি (রহ.) এই ধরনের গোপন ত্রুটি শনাক্ত করার ক্ষেত্রে ছিলেন অসাধারণ পারদর্শী।
যদি কোনো বর্ণনা অধিক নির্ভরযোগ্য রাবিদের বর্ণনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতো, তবে তিনি তা গ্রহণ করতেন না।
ইমাম বুখারি (রহ.) শুধু হাদিস শুনেই সন্তুষ্ট থাকতেন না। তিনি বর্ণনাকারীদের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কেও গভীর অনুসন্ধান করতেন।
একজন রাবির সম্পর্কে জানার জন্য তিনি কখনো শত শত কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছেন।
ঐতিহাসিক সূত্রে একটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে—এক ব্যক্তি ঘোড়াকে খালি থলি দেখিয়ে কাছে ডাকছিলেন, যেন থলিতে খাবার আছে। ঘোড়া কাছে এলে কিছুই পেল না।
ইমাম বুখারি (রহ.) এ দৃশ্য দেখে বলেন, যে ব্যক্তি একটি প্রাণীকেও প্রতারণা করতে পারে, তার কাছ থেকে আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর হাদিস গ্রহণ করব না।
যদিও এই ঘটনার বিভিন্ন বর্ণনা রয়েছে, তবুও এটি তাঁর সতর্কতার প্রতীক হিসেবে জীবনীগ্রন্থে সুপরিচিত।
ইমাম বুখারি (রহ.) প্রায় ষোলো বছর ধরে সহিহ বুখারি সংকলনের কাজ করেন।
তিনি বিভিন্ন শহরে অবস্থান করে হাদিস যাচাই করেন, সনদ মিলিয়ে দেখেন, রাবিদের জীবন অনুসন্ধান করেন এবং প্রতিটি অধ্যায় সুচিন্তিতভাবে সাজান।
এই দীর্ঘ সময়ে তিনি অসংখ্য আলেমের সঙ্গে আলোচনা করেছেন এবং প্রাপ্ত তথ্য বারবার যাচাই করেছেন।
জীবনীকারদের মধ্যে প্রসিদ্ধ একটি বর্ণনায় এসেছে—
ইমাম বুখারি (রহ.) সহিহ বুখারিতে কোনো হাদিস অন্তর্ভুক্ত করার আগে অজু করতেন, দুই রাকাত নফল সালাত আদায় করতেন এবং আল্লাহর কাছে ইস্তিখারা ও দোয়া করতেন।
এ বিষয়টি হাদিসের অংশ নয়; বরং জীবনীগ্রন্থে উল্লেখিত একটি ঐতিহ্যগত বর্ণনা। তবে এটি তাঁর গভীর খোদাভীতি ও দায়িত্ববোধের পরিচয় বহন করে।
সহিহ বুখারি শুধু হাদিসের সংকলন নয়; এটি একাধারে—
এর অধ্যায়গুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে একটি অধ্যায়ের শিরোনাম থেকেই অনেক সময় ইমাম বুখারির ফিকহি মতামত বোঝা যায়।
এই বিশেষ পদ্ধতিকে আলেমরা "ফিকহুল বুখারি ফি তারাজিমিহি" নামে উল্লেখ করেছেন—অর্থাৎ, অধ্যায়ের শিরোনামেই ইমাম বুখারির ফিকহ ফুটে ওঠে।
অনেক পাঠকের প্রশ্ন—সহিহ বুখারিতে একই হাদিস বারবার কেন এসেছে?
এর উত্তর হলো, ইমাম বুখারি (রহ.) একই হাদিসকে বিভিন্ন অধ্যায়ে ভিন্ন ভিন্ন ফিকহি শিক্ষা প্রমাণের জন্য ব্যবহার করেছেন।
একটি হাদিস থেকে যদি পাঁচটি ভিন্ন মাসআলার দলিল পাওয়া যায়, তবে তিনি প্রয়োজন অনুযায়ী সেটিকে বিভিন্ন অধ্যায়ে উল্লেখ করেছেন।
এটি তাঁর সংকলনশৈলীর একটি বৈজ্ঞানিক বৈশিষ্ট্য।
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.), আলী ইবনে আল-মাদিনী (রহ.), ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন (রহ.) এবং ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ (রহ.)-এর মতো শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিসরা তাঁর মেধা ও গবেষণার উচ্চ প্রশংসা করেছেন।
বিশেষভাবে ইমাম মুসলিম (রহ.), যিনি পরবর্তীতে সহিহ মুসলিম সংকলন করেন, তিনি ইমাম বুখারিকে গভীর শ্রদ্ধা করতেন। ঐতিহাসিক সূত্রে বর্ণিত আছে, তিনি একবার ইমাম বুখারির কপালে চুম্বন করে বলেন—
"হে উস্তাদদের উস্তাদ! আমাকে অনুমতি দিন, আমি আপনার পা চুম্বন করি।"
এই উক্তির সনদ নিয়ে গবেষকদের মধ্যে আলোচনা থাকলেও এটি তাঁদের পারস্পরিক শ্রদ্ধার একটি প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক বর্ণনা হিসেবে উল্লেখিত।
মুসলিম উম্মাহর সংখ্যাগরিষ্ঠ মুহাদ্দিস, ফকিহ ও আলেমের ঐকমত্য হলো—
আল্লাহর কিতাব আল-কুরআনের পর সবচেয়ে বিশুদ্ধ গ্রন্থ হলো ‘সহিহ আল-বুখারি’।
এই মর্যাদা কোনো আবেগের কারণে নয়; বরং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে হাদিসবিশারদদের নিরবচ্ছিন্ন গবেষণা, সমালোচনা ও পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
"জ্ঞানকে আমি কখনো শাসকের দরজায় নিয়ে যাব না; যে ইলম চায়, সে ইলমের মজলিসে আসবে।"
— ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল আল-বুখারি (রহ.)
সহিহ বুখারির সংকলন শেষ হওয়ার আগেই ইমাম বুখারি (রহ.)-এর খ্যাতি সমগ্র মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল। তাঁর দরসে অংশ নেওয়ার জন্য মক্কা, মদিনা, বসরা, কুফা, বাগদাদ, নিশাপুর, মারভ ও সমরখন্দসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ছাত্ররা ছুটে আসতেন।
ইতিহাসবিদদের বর্ণনায় জানা যায়, তাঁর কোনো কোনো হাদিসের মজলিসে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী উপস্থিত থাকতেন। তাঁদের মধ্যে অনেকে সরাসরি তাঁর কাছ থেকে হাদিস লিখতেন, আবার কেউ কেউ প্রথম সারির ছাত্রদের কাছ থেকে শুনে লিপিবদ্ধ করতেন।
প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম মুসলিম (রহ.), ইমাম তিরমিজি (রহ.), ইমাম নাসায়ি (রহ.)-সহ অসংখ্য আলেম তাঁর জ্ঞান, গবেষণা ও হাদিস বিশ্লেষণ থেকে উপকৃত হয়েছেন। যদিও ইমাম নাসায়ি (রহ.)-এর সঙ্গে প্রত্যক্ষ সাক্ষাৎ নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে, তবে তাঁর প্রজন্ম ইমাম বুখারির গবেষণার দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিল।
হিজরি তৃতীয় শতাব্দীতে নিশাপুর ছিল ইসলামী জ্ঞানচর্চার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। ইমাম বুখারি (রহ.) যখন সেখানে পৌঁছান, তখন পুরো শহরে উৎসবের আবহ তৈরি হয়।
ঐতিহাসিক সূত্রে বর্ণিত আছে, হাজার হাজার মানুষ শহরের বাইরে গিয়ে তাঁকে অভ্যর্থনা জানায়। অনেক আলেম তাঁর আগমনকে ইসলামী জ্ঞানচর্চার জন্য এক মহাসৌভাগ্য বলে আখ্যায়িত করেন।
অল্পদিনের মধ্যেই তাঁর দরসে মানুষের ঢল নামে। জ্ঞান, স্মৃতিশক্তি ও হাদিস বিশ্লেষণের অসাধারণ দক্ষতা তাঁকে নিশাপুরের সবচেয়ে জনপ্রিয় মুহাদ্দিসে পরিণত করে।
ইমাম বুখারির জীবনের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ছিল তথাকথিত 'লাফয বিল-কুরআন' বিতর্ক।
তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন—
মানুষের কণ্ঠস্বর, উচ্চারণ ও কর্ম সৃষ্ট; কিন্তু আল্লাহর কালাম—আল-কুরআন—অসৃষ্ট (গায়রে মাখলুক)।
এই সূক্ষ্ম বিষয়টি অনেকেই সঠিকভাবে বুঝতে পারেননি, আবার কেউ কেউ ইচ্ছাকৃতভাবেও ভুলভাবে প্রচার করেন।
নিশাপুরের প্রখ্যাত আলেম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াহইয়া আয-যুহলি (রহ.)-এর সঙ্গে এই বিষয়কে কেন্দ্র করে মতভেদ সৃষ্টি হয়। ঐতিহাসিক সূত্রে দেখা যায়, এই মতভেদ শুধু আকিদাগত আলোচনার ফল ছিল না; বরং তৎকালীন সামাজিক, রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত প্রভাবও এতে ভূমিকা রেখেছিল।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, আয-যুহলি ঘোষণা দেন—যারা ইমাম বুখারির কাছে যাবে, তারা তাঁর মজলিসে উপস্থিত হতে পারবে না।
এই ঘটনায় অনেক ছাত্র ভীত হয়ে সরে গেলেও কিছু বিশ্বস্ত ছাত্র শেষ পর্যন্ত তাঁর সঙ্গ ত্যাগ করেননি। তাঁদের অন্যতম ছিলেন ইমাম মুসলিম (রহ.)। ইতিহাসে উল্লেখ আছে, তিনি প্রকাশ্যেই তাঁর শিক্ষক ইমাম বুখারির প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন।
নিশাপুর ত্যাগ করে ইমাম বুখারি (রহ.) নিজ জন্মভূমি বুখারায় ফিরে আসেন। কিন্তু সেখানেও তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল আরেক কঠিন পরীক্ষা।
বুখারার গভর্নর খালিদ ইবনে আহমদ আয-যুহলি (কিছু ঐতিহাসিক সূত্রে নামের সামান্য ভিন্নতা পাওয়া যায়) তাঁর কাছে অনুরোধ পাঠান যে, তিনি যেন রাজপ্রাসাদে এসে গভর্নর ও তাঁর সন্তানদের ব্যক্তিগতভাবে সহিহ বুখারি ও অন্যান্য হাদিস পাঠ করান।
ইমাম বুখারি (রহ.) গভর্নরের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন—
"আমি জ্ঞানকে অপমান করতে পারি না। ইলমকে মানুষের ঘরে ঘরে নিয়ে বেড়ানো আমার কাজ নয়। যে ইলম চায়, সে সাধারণ মানুষের মতো মজলিসে এসে বসবে।"
আরও একটি বর্ণনায় তাঁর বক্তব্য এভাবে এসেছে—
"আমি ইলমকে সুলতানদের দরজায় নিয়ে যাব না। যদি আপনার সন্তানদের ইলমের প্রয়োজন হয়, তারা অন্য সবার মতো মজলিসে আসুক।"
এই বক্তব্য ইসলামী জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে স্বাধীন আলেমদের মর্যাদার এক অনন্য দলিল হয়ে আছে।
গভর্নর তাঁর এই অবস্থান ভালোভাবে নেননি। পরিণতিতে ইমাম বুখারিকে বুখারা ত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়।
নিজ জন্মভূমি, প্রিয় শহর, ছাত্র, বন্ধু—সবকিছু ছেড়ে তাঁকে চলে যেতে হয় সমরখন্দের নিকটবর্তী ছোট্ট গ্রাম খরতঙ্ক-এ।
জীবনের শেষ অধ্যায়টি তিনি সেখানেই কাটিয়েছেন।
নির্বাসিত জীবনে শারীরিক ক্লান্তি, মানসিক বেদনা এবং দীর্ঘ সফরের পরিশ্রম তাঁর শরীরকে দুর্বল করে দেয়।
জীবনীকারদের বর্ণনায় এসেছে, এক রাতে তাহাজ্জুদের সালাত শেষে তিনি অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে আল্লাহর কাছে দোয়া করেন—
"হে আল্লাহ! এই বিশাল পৃথিবী আজ আমার জন্য সংকীর্ণ হয়ে গেছে। আপনি আমাকে আপনার সান্নিধ্যে নিয়ে নিন।"
অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর সেই দোয়া কবুল হয়।
২৫৬ হিজরির ৩০ রমজান (অনেক সূত্রে ঈদুল ফিতরের রাত) তিনি ইন্তিকাল করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় ৬২ বছর।
তাঁর মৃত্যুর সংবাদ দ্রুত সমগ্র মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। অসংখ্য আলেম, ছাত্র ও সাধারণ মানুষ গভীর শোক প্রকাশ করেন।
খরতঙ্ক গ্রামেই তাঁকে দাফন করা হয়।
প্রাচীন জীবনীগ্রন্থে কয়েকটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে, যেমন—
তবে গবেষণাগত সততার স্বার্থে উল্লেখ করা প্রয়োজন, এসব ঘটনা ঐতিহাসিক জীবনীগ্রন্থে বর্ণিত ঐতিহ্যগত বিবরণ। এগুলো সহিহ হাদিস নয় এবং সবগুলোর সনদ সমান শক্তিশালী নয়। তাই এগুলোকে অলৌকিক ঘটনা হিসেবে নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত না করে ঐতিহাসিক বর্ণনা হিসেবেই দেখা অধিক সতর্কতার পরিচায়ক।
ইমাম বুখারি (রহ.) শুধু একটি গ্রন্থ রচনা করেননি; তিনি হাদিস যাচাইয়ের এমন এক বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করেছেন, যা আজও ইসলামী গবেষণার অন্যতম ভিত্তি।
তাঁর গ্রন্থের ওপর শত শত ব্যাখ্যাগ্রন্থ রচিত হয়েছে। এর মধ্যে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ—
আজ বিশ্বের অসংখ্য বিশ্ববিদ্যালয়, মাদরাসা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে সহিহ বুখারি পাঠ্য হিসেবে অধ্যয়ন করা হয়।
অনেকেই মনে করেন, তিনি শুধু সহিহ বুখারিই লিখেছেন। বাস্তবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত বহুমুখী গবেষক। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে—
এসব গ্রন্থ প্রমাণ করে, তিনি কেবল একজন মুহাদ্দিসই নন; বরং ইতিহাসবিদ, জীবনীকার, আকিদা-বিশারদ এবং গবেষণাপদ্ধতিরও এক অগ্রদূত ছিলেন।
ইমাম বুখারি (রহ.)-এর জীবন আমাদের শেখায়—
সম্রাটদের প্রাসাদ ধ্বংস হয়েছে, সাম্রাজ্য বিলীন হয়েছে, কিন্তু একজন মুহাদ্দিসের কলমে সংরক্ষিত রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর বাণী আজও কোটি কোটি মানুষের ঈমান, ইবাদত ও জীবন পরিচালনার পথপ্রদর্শক।
ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল আল-বুখারি (রহ.)-এর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানুষের প্রকৃত মর্যাদা সম্পদে নয়, ক্ষমতায় নয়; বরং সত্যের প্রতি নিষ্ঠা, জ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার সন্তুষ্টির জন্য নিবেদিত জীবনে।
যতদিন পৃথিবীতে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ অধ্যয়ন করা হবে, যতদিন সহিহ বুখারির পৃষ্ঠা উল্টে মানুষ সত্যের সন্ধান করবে, ততদিন ইতিহাসের আকাশে ইমাম বুখারি (রহ.)-এর নাম এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বল করতে থাকবে।
তথ্যসূত্র (নির্বাচিত):
বিষয় : ইমাম বুখারি সহিহ বুখারি

সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৯ জুন ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন