বিশ্বের সবচেয়ে বড় পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার ২৫০তম বার্ষিকী পালন করবে। ৪ জুলাই দিবসটি উপলক্ষ্যে নতুন সাজে সেজেছে দেশটি। ঐতিহাসিক মুহূর্তে দেশটি যেমন তার ব্রিটিশদের কাছ থেকে তার স্বাধীনতা উদ্যাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তেমনি অতীতের তাদের অর্জন এবং ভুলত্রুটি তথা ভবিষ্যতের আত্মজিজ্ঞাসাও গুরুত্ব পাচ্ছে। এমন প্রশ্নও আসছে, গত ২৫০ বছরে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকে কী দিয়েছে এবং কী নিয়েছে। স্থানীয় সময় শুক্রবার দেশটির ঐতিহাসিক স্থান মাউন্ট রাশমোরে সফরের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকীর উদ্যাপন শুরু করার কথা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের। মাউন্ট রাশমোরে আমেরিকার কিংবদন্তি চার জন প্রেসিডেন্টের মুখমণ্ডল খোদাই করা রয়েছে। আজ ৪ জুলাই স্বাধীনতা দিবসের আগের দিন ট্রাম্প দক্ষিণ ডাকোটার জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভ মাউন্ট রাশমোরে গ্রানাইট পাথরে খোদাই করা তার চার কিংবদন্তি পূর্বসূরি প্রেসিডেন্টের বিশাল ভাস্কর্যের নিচে ভাষণ দেন। নিজেকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম সেরা প্রেসিডেন্ট মনে করা ট্রাম্পের জন্য এ আয়োজনকে প্রতীকী বলেই মনে করা হচ্ছে। শুরু থেকেই তিনি যুক্তরাষ্ট্রের এ বার্ষিকীকে নিজের মতো করে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করে আসছেন। রিপাবলিকান নেতা ট্রাম্পের সমর্থকেরা তার মুখাবয়বও জর্জ ওয়াশিংটন, টমাস জেফারসন, আব্রাহাম লিংকন ও থিওডোর রুজভেল্টের ভাস্কর্যের পাশে খোদাই করার প্রস্তাব দিয়ে আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছেন। স্বাধীনতা দিবসে রাজধানী ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল মলে নির্বাচনি প্রচারণার আদলে একটি বড় রাজনৈতিক সমাবেশ করবেন ট্রাম্প। এ সময় সামরিক যুদ্ধবিমানের উড্ডয়ন প্রদর্শনী এবং তার ভাষায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় আতশবাজির আয়োজনও থাকবে।
স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র জাতীয় পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচিত হয়। বিভিন্ন জরিপ ও জনমত বিশ্লেষণে দেখা যায়, আমেরিকানরা তাদের দেশের সবচেয়ে বড় অবদান হিসেবে সবচেয়ে বেশি উল্লেখ করছে স্বাধীনতা, গণতন্ত্র এবং সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থাকে। ১৭৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই মূল্যবোধগুলো শুধু যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামোকেই গড়ে তোলেনি, বরং বিশ্ব জুড়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলনেও গভীর প্রভাব ফেলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, মতপার্থক্য ও রাজনৈতিক বিভাজনের মধ্যেও ‘স্বাধীনতা’ ধারণাটি এখনো আমেরিকার সবচেয়ে শক্তিশালী ঐক্যের প্রতীক। রাজনৈতিক দর্শনের পাশাপাশি প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা বিশ্ব ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় তৈরি করেছে। গত ২৫০ বছরে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ অবদানগুলোর মধ্যে রয়েছে—দাস প্রথার উচ্ছেদ, ইন্টারনেট প্রযুক্তির বিকাশ ও বিশ্বব্যাপী বিস্তার, বিমান ও মহাকাশ গবেষণায় অগ্রগতি, অটোমোবাইল শিল্পের বিপ্লব, টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও কম্পিউটার, সফটওয়্যার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশসহ প্রভৃতি।
ভবিষ্যৎ নিয়ে জরিপ কী বলছে—গত ১২ থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত অনলাইনে সারা দেশে পরিচালিত এই জরিপে ১ হাজার ৫৩৭ জন প্রাপ্তবয়স্ক মার্কিনি অংশ নেন। রয়টার্সের পরিচালিত এ জরিপ অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারীদের ৮০ শতাংশ এবারের স্বাধীনতা দিবস উদ্যাপনের পরিকল্পনা করেছেন। এর মধ্যে ডেমোক্র্যাট সমর্থকদের ৭৬ শতাংশ, স্বতন্ত্র ভোটারদের ৭৪ শতাংশ এবং রিপাবলিকান সমর্থকদের ৯১ শতাংশ উদ্যাপনে অংশ নেবেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক বিভাজনের চিত্রও উঠে এসেছে জরিপে। এতে ৩৮ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, আগামী ২৫০ বছর পর যুক্তরাষ্ট্র একক রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকবে এমন সম্ভাবনা কম। উল্লেখ্য, ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই আমেরিকার ১৩টি উপনিবেশ গ্রেট ব্রিটেনের শাসন থেকে নিজেদের মুক্ত করতে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র গ্রহণ করে। ১৭৭৬ সালে স্বাধীনতা ঘোষণা করা হলেও যুক্তরাষ্ট্রের কাঙ্ক্ষিত সেই স্বাধীনতা কিন্তু রাতারাতি আসেনি। ১৭৮৩ সালে প্যারিস চুক্তির মাধ্যমে ব্রিটেন আমেরিকার স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেওয়ার আগে সাত বছর কেটেছিল যুদ্ধে; জীবন দিতে হয়েছিল ২৫ হাজার বিপ্লবী আমেরিকান এবং ২৭ হাজার ব্রিটিশ ও জার্মান সেনা।
যুক্তরাষ্ট্রের এই ২৫০তম বার্ষিকী শুধু উদযাপনের নয়, বরং আত্মপর্যালোচনারও একটি সুযোগ। দেশটি তার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, মানবাধিকার ও বৈশ্বিক নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে পুনর্বিবেচনা করছে। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনৈতিক বৈষম্য, অভিবাসন ও রাজনৈতিক মেরুকরণের মতো চ্যালেঞ্জের মুখে দেশটির ভবিষ্যৎ পথনির্ধারণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বার্ষিকী আমেরিকানদের জন্য তাদের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। অনেকেই আশা করছেন, এই উদযাপন জাতীয় ঐক্যকে শক্তিশালী করবে এবং দেশটির গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে আরও মজবুত করবে। তবে রাজনৈতিক বিভাজন ও সামাজিক অস্থিরতার মধ্যেও এই বার্ষিকী একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। বিশ্বের অন্যান্য দেশও এই ঐতিহাসিক মুহূর্তকে গুরুত্ব সহকারে দেখছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা দিবস শুধু তাদের জন্য নয়, সারা বিশ্বের জন্য একটি স্মরণীয় ঘটনা। এখন দেখার বিষয়, এই বার্ষিকী উদযাপনের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র তার ভবিষ্যৎ পথ কীভাবে নির্ধারণ করে এবং বিশ্বের কাছে কী বার্তা দেয়। আপাতত সবাই এই দিনটি উদযাপন ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনায় মগ্ন।

শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৪ জুলাই ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন