দীর্ঘ ২৩ বছরের সেবামূলক কর্মজীবনের ইতি টেনে এক ব্যতিক্রমী ও আবেগঘন বিদায়ের সাক্ষী হলো সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর। পৌরশহরের উত্তর জগন্নাথপুর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের মুয়াজ্জিন গোলাম কবিরকে তাঁর নিষ্ঠা, সততা ও আন্তরিক সেবার স্বীকৃতিস্বরূপ রাজকীয় সংবর্ধনা দিয়েছে স্থানীয় যুবসমাজ। শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে মসজিদ প্রাঙ্গণে এ বিদায়ী সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে মসজিদের মুসল্লি, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। বিদায়ী আয়োজনকে ঘিরে পুরো এলাকায় আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
সংবর্ধনা শেষে গোলাম কবিরকে সুসজ্জিত মাইক্রোবাসে করে তাঁর বাড়িতে পৌঁছে দেন স্থানীয় যুবসমাজ। এ সময় শতাধিক মোটরসাইকেলের একটি শোভাযাত্রা তাঁর গাড়িকে বহর দিয়ে নিয়ে যায়। পুরো পথজুড়ে স্থানীয় বাসিন্দারা শুভেচ্ছা জানিয়ে তাঁকে বিদায় জানান। ব্যতিক্রমী এ আয়োজন এলাকাজুড়ে ব্যাপক সাড়া ফেলে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মসজিদ কমিটির মোতাওয়াল্লি আকামত আলী, সদস্য ফারুক আহমদ, আনর মিয়া, মইন উদ্দিন ও আজিজুল মিয়া। সাংবাদিক আলী হোসেন খানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে গ্রামের যুবসমাজের পক্ষ থেকে গোলাম কবিরের হাতে নগদ অর্থ, সম্মাননা স্মারক ও বিভিন্ন উপহারসামগ্রী তুলে দেওয়া হয়।
এ সময় বক্তব্য দেন ফারুক মিয়া, আনর মিয়া এবং আলী হোসেন রাজ। বক্তারা বলেন, গোলাম কবির দীর্ঘ ২৩ বছর অত্যন্ত নিষ্ঠা, সততা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে আল্লাহর ঘরের সেবা করে গেছেন। তাঁর আন্তরিকতা, শৃঙ্খলা ও মানবিক আচরণ এলাকাবাসীর কাছে সবসময় স্মরণীয় হয়ে থাকবে। বক্তারা আরও বলেন, একজন মুয়াজ্জিন হিসেবে তিনি শুধু আজান ও ধর্মীয় দায়িত্বই পালন করেননি, বরং এলাকার মানুষের সুখ-দুঃখের সঙ্গী হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাঁর এই অবদান ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও অনুকরণীয় হয়ে থাকবে। অনুষ্ঠানের শেষে গোলাম কবিরের দীর্ঘায়ু, সুস্বাস্থ্য ও শান্তিময় ভবিষ্যৎ জীবন কামনা করে বিশেষ দোয়া অনুষ্ঠিত হয়। ব্যতিক্রমী এ বিদায়ী অনুষ্ঠানে গ্রামের সর্বস্তরের যুবক, মুসল্লি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি অনুষ্ঠানকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
গোলাম কবিরের বিদায়ী এই আয়োজন শুধু একটি সংবর্ধনা নয়, বরং একজন সাধারণ মানুষের প্রতি একটি সমাজের অকৃত্রিম ভালোবাসার প্রকাশ। তিনি তাঁর নিষ্ঠা ও সততার মাধ্যমে একটি সমগ্র জনপদের হৃদয় জয় করে নিয়েছেন, যা সত্যিই অনন্য। স্থানীয় যুবসমাজের এই উদ্যোগ এখন এলাকায় ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। অনেকে এটিকে একটি ‘আদর্শ বিদায়’ হিসেবে অভিহিত করছেন, যা আগামী দিনে অন্যদের জন্যও অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। গোলাম কবিরের মতো একজন সাধারণ মানুষও যদি তাঁর কর্মের মাধ্যমে সমাজে এত গভীর প্রভাব ফেলতে পারেন, তাহলে এটি প্রমাণ করে যে সততা ও নিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গোলাম কবিরের মতো একজন মুয়াজ্জিনের জন্য এ ধরনের আয়োজন সত্যিই বিরল। তাঁর প্রতি এই সম্মান প্রদর্শন সমাজের একটি ইতিবাচক দিক তুলে ধরে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত অনেকেই বলেন, গোলাম কবিরের বিদায়ে তারা এক যুগের অবসান দেখছেন। তাঁর স্মৃতি চিরকাল তাদের হৃদয়ে থাকবে। গোলাম কবিরও তাঁর প্রতি এত ভালোবাসা দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, তিনি কখনো ভাবেননি যে তার এত ছোট একটি জীবনের জন্য মানুষ তাকে এত ভালোবাসবে। তিনি সবাইকে ধন্যবাদ জানান এবং সবার জন্য দোয়া করেন। এই বিদায়ী আয়োজন প্রমাণ করে, সৎ কর্ম ও নিষ্ঠার মাধ্যমে যেকোনো মানুষ সমাজে স্থায়ী আসন তৈরি করতে পারে। গোলাম কবিরের মতো মানুষই সমাজের আসল সম্পদ। তাঁর এই জীবনের শিক্ষা আমাদের সবার জন্য অমূল্য। তাঁর প্রতি এই সম্মান প্রদর্শন সত্যিই প্রশংসনীয় এবং আগামী দিনে অন্যান্য ধর্মীয় কর্মীদের জন্যও এটি একটি অনুপ্রেরণা হবে। সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে এই অনন্য উদ্যোগ এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ জুলাই ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন