ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একসঙ্গে পাঁচ সন্তানের জন্ম দিয়েছেন এক প্রসূতি মা। জন্মের ১২ ঘণ্টার মধ্যে চারজনই মারা যায়। চিকিৎসকরা বলছেন, নির্ধারিত সময়ের আগে জন্ম ও ওজন কম থাকায় অনেক জটিলতা ছিল। এসব কারণে শিশুগুলোর মৃত্যু হয়েছে। ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লেবার ওয়ার্ডে অস্ত্রোপচার ছাড়াই গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টা ২০ মিনিট থেকে ৫টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত সময়ের মধ্যে শিশুগুলোর জন্ম হয়। তাদের মধ্যে তিনজন ছেলে ও দুজন মেয়ে। বর্তমানে একটি ছেলেসন্তান জীবিত আছে। তারা ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার ডাঙ্গী ইউনিয়নের ভবুকদিয়া গ্রামের মাহামুদুল হাসান (ডলার) ও চাঁদনী বেগম দম্পতির সন্তান।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, দেড় বছর আগে চাঁদনী বেগম ও মাহামুদুল হাসানের বিয়ে হয়। অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর জানতে পারে চাঁদনীর গর্ভে পাঁচ সন্তান আছে। নিয়মিত তারা চিকিৎসকের পরামর্শ নিতেন। হঠাৎ সমস্যা দেখা দেয়ায় চাঁদনীকে হাসপাতালে আনা হয়। নবজাতক ও শিশু ওয়ার্ডের দায়িত্বরত শিক্ষানবিশ (ইন্টার্ন) চিকিৎসক প্রীতিরাজ পাল চৌধুরী গণমাধ্যমকে জানান, জন্মের পর পাঁচটি বাচ্চাই জীবিত ছিল। ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রাম ওজনের নবজাতক অত্যন্ত কম ওজন নিয়ে জন্মগ্রহণকারী (এক্সট্রিমলি লো বার্থ ওয়েট) শিশুশ্রেণিতে পড়ে। এ ধরনের শিশু সাধারণত অনেক আগে (প্রায় ২৪ থেকে ২৬ সপ্তাহে) জন্মায় এবং তাদের নিবিড় নবজাতক পরিচর্যা (এনআইসিইউ) প্রয়োজন হয়। কিন্তু ফরিদপুর মেডিকেলে পর্যাপ্ত নিবিড় নবজাতক পরিচর্যা কেন্দ্র না থাকায় তাদের ঢাকায় নেওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছিল। তবে পরিবার সূত্রে জানা গেছে, দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে না পারায় এবং পরিবহনের ব্যবস্থা করতে দেরি হওয়ায় তাদের সময়মতো ঢাকায় নেওয়া সম্ভব হয়নি। এরই মধ্যে চারটি শিশু মারা যায়। বেঁচে থাকা শিশুটিকে এখনও নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। তার অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
নবজাতকের বাবা মাহামুদুল হাসান জানান, তারা অত্যন্ত দরিদ্র। এ ধরনের জটিল পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাদের মতো আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকা উচিত ছিল। তিনি সরকারি ও বেসরকারি সহায়তা কামনা করেছেন। ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, প্রিম্যাচিউর বেবিদের বাঁচাতে উন্নত নিওনেটাল ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটের বিকল্প নেই। তারা দীর্ঘদিন ধরে এনআইসিইউ স্থাপনের দাবি জানিয়ে আসছেন। এই ঘটনার পর ফরিদপুরের বিভিন্ন মহলে ক্ষোভ ও শোকের সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ মানুষ ও মানবাধিকার কর্মীরা হাসপাতালের অবকাঠামো উন্নয়নের দাবি জানিয়েছেন। তারা বলছেন, এ ধরনের ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সেজন্য সরকারকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। ইতিমধ্যে জেলা প্রশাসন এই ঘটনার বিষয়ে জানতে পেরেছে এবং পরিবারকে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো, ফরিদপুরের মতো জেলা হাসপাতালে পর্যাপ্ত নবজাতক পরিচর্যা কেন্দ্র না থাকায় এ ধরনের ঘটনা ঘটেই চলেছে। চিকিৎসকরা বলছেন, অন্তত একটি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র স্থাপন করা জরুরি, যাতে অকালে জন্ম নেওয়া শিশুরা সুস্থভাবে বাঁচতে পারে। প্রধানমন্ত্রী ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ফরিদপুরের এই ঘটনা আবারও স্বাস্থ্যখাতের অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও আর্থ-সামাজিক বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরল। এখন দেখার বিষয়, এই মর্মান্তিক ঘটনার পর সরকার কী ধরনের পদক্ষেপ নেয় এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। শিশুদের জীবন বাঁচাতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। অন্যথায় আরও অনেক পরিবার এই ধরনের বেদনাদায়ক পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে। দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। ফরিদপুরের এই ঘটনা যেন নিঃশব্দে হারিয়ে না যায়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমেই এ সংকট মোকাবিলা সম্ভব। সাধারণ মানুষেরও এগিয়ে আসা উচিত, যাতে কোনো নবজাতক অকালে প্রাণ না হারায়। জন্মের সময় পর্যাপ্ত পরিচর্যা পেলে এত শিশুর মৃত্যু রোধ করা যেত। এই ঘটনা সবাইকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে। এখন সময় এসেছে বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়ার। ফরিদপুরের মানুষ ও দেশবাসী এই বিষয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন এবং দ্রুত সমাধানের আশা করছেন।

শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ জুলাই ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন