ঢাকা    বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা    বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬
গণবার্তা

গাদ্দাফি পতনের ১৫ বছর: দুই সরকারে বিভক্ত লিবিয়া, তরুণদের স্বপ্ন চুরমার

গাদ্দাফি পতনের ১৫ বছর: দুই সরকারে বিভক্ত লিবিয়া, তরুণদের স্বপ্ন চুরমার

টানা ৪২ বছর লিবিয়ায় শাসনক্ষমতায় ছিলেন মুয়াম্মার গাদ্দাফি। ২০১১ সালে আরব বসন্তে পতন হয় তাঁর। ১৫ বছর পরে লিবিয়া এখন বলতে গেলে দুই ভাগে বিভক্ত। বলা ভালো, দুই সরকার লিবিয়া শাসন করছে। দেশটির পশ্চিমে ত্রিপোলিভিত্তিক সরকার এবং পূর্বে বেনগাজিভিত্তিক সরকার। দুই প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি লিবিয়াকে কার্যত অচল করে রেখেছে। তবে সম্প্রতি কিছুটা আশার আলো জাগছে।

চলতি বছরের এপ্রিলে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো লিবিয়ার রাজনীতির প্রধান দুই প্রতিপক্ষ ১৯০ বিলিয়ন দিনার (প্রায় ৩ লাখ ৬৬ হাজার কোটি টাকা) বাজেট ভাগ করে দেশ পরিচালনায় একমত হয়। যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত এই বাজেট বিভক্ত লিবিয়াকে এক কাতারে আনতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। যদিও ঐক্যের উদাহরণ খুব একটা নেই।

গাদ্দাফির পতনের পর সৃষ্ট শূন্যতায় গড়ে উঠেছিল একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষ, বারবার দেখা দিয়েছে সংঘাত এবং বিলম্বিত হয়েছে নির্বাচন। তবে এখন দেশটির রাজনৈতিক প্রতিপক্ষগুলো একসঙ্গে কাজ করার পথ খুঁজছে। ২০১১ সাল থেকে বারবার ব্যাহত হয়েছে তেলের উৎপাদন। বিভিন্ন উপদল তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির জন্য দেশের বন্দর ও তেলক্ষেত্রগুলো বন্ধ করে দেওয়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়। ২০১৭ সালে লিবিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, পরপর তিন বছর তেলের অবকাঠামো বন্ধ থাকার কারণে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ১৬০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ক্ষতি হয়েছে। ২০২০ সালে খলিফা হাফতারের তেলক্ষেত্র ও টার্মিনাল অবরুদ্ধ করার পদক্ষেপে দেশটির আর্থিক ক্ষতি আরও প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার যোগ করে। ২০২২ এবং ২০২৪ সালেও নতুন করে তেলক্ষেত্র বন্ধের ঘটনা ঘটে। তবে এই ধরনের আত্মঘাতী অর্থনৈতিক যুদ্ধ পরিচালনার প্রবণতা সম্প্রতি অনেকটাই কমে এসেছে।

আবুধাবিতে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনীতিক ও সামরিক কমান্ডারদের মধ্যে হওয়া সমঝোতায় ‘আর্কেনু’ নামের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান প্রথম লিবিয়ার অপরিশোধিত তেল রপ্তানির সুযোগ পায়। যদিও পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘের তদন্তকারীরা এই চুক্তির মালিকানা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং চলতি বছর সমঝোতাটি বাতিল করা হয়। তবুও এই ঘটনা স্পষ্ট করেছে—দুই শিবিরই যৌথ স্বার্থ বিবেচনায় তেলের উৎপাদন ও সরবরাহ সচল রাখতে পারে। আর এই অর্থনৈতিক বোঝাপড়া শেষ পর্যন্ত স্থায়ী রাজনৈতিক চুক্তির পথও সুগম করতে পারে।

নির্বাচন ব্যর্থ, তরুণদের দেশত্যাগ

২০১১ সালের আগস্টে সশস্ত্র অভ্যুত্থানে গাদ্দাফি সরকারের পতন হয়। এরপর থেকে লিবিয়া প্রায় ধারাবাহিক সংঘাতের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ‘ন্যাশনাল ট্রানজিশনাল কাউন্সিল’ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল জাতীয় নির্বাচনের আগ পর্যন্ত দেশ শাসন করবে। দীর্ঘ ৪৮ বছর পর ২০১২ সালের জুলাইয়ের জাতীয় নির্বাচনে প্রায় ১৭ লাখ ৬০ হাজার মানুষ ভোট দেন। ভোটে বিজয়ীদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়। এর কিছুদিন পরই কাউন্সিল বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। তবে লিবিয়ায় শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরে ২০১২ সালের ওই নির্বাচনই ছিল প্রথম এবং শেষ নির্বাচন।

২০১৪ সালের মে মাসে গাদ্দাফি আমলের সাবেক জেনারেল খলিফা হাফতার বেনগাজির সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে তথাকথিত 'সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান’ শুরু করেন। অন্যদিকে হাফতারের অনুগত বাহিনী ত্রিপোলির পার্লামেন্টে হামলা চালায়। টালমাটাল পরিস্থিতিতেই ২০১৪ সালের জুনে নির্বাচন হয়। ভোটার উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে ২০১২ সালের সংসদ নির্বাচনে বিজয়ীরা এই নির্বাচনের ফলাফল মানতে অস্বীকৃতি জানান। দুই পক্ষের দ্বন্দ্ব নিরসনে ২০১৫ সালে জাতিসংঘের উদ্যোগে ‘গভর্নমেন্ট অব ন্যাশনাল অ্যাকর্ড (জিএনএ)’ গঠিত হয়। জিএনএ-কে জাতিসংঘ লিবিয়ার একমাত্র কর্তৃপক্ষ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু এতে সংঘাত থামেনি। ২০১৯ সালে হাফতারের অনুগত বাহিনী জিএনএ-র নিয়ন্ত্রণে থাকা ত্রিপোলিতে সামরিক অভিযান চালায়।

এরপর ২০২১ সালে জাতীয় সংহতি স্থাপনে জাতিসংঘের উদ্যোগে গভর্নমেন্ট অব ন্যাশনাল ইউনিটি (জিএনইউ) গঠন করে অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আবদুল হামিদ দবেইবাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। শর্ত ছিল তিনি প্রধানমন্ত্রী পদে লড়তে পারবেন না। তাঁকে বসানো হয়েছিল ওই বছরের ডিসেম্বর নাগাদ নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের আশায়। কিন্তু ভোটের মাত্র দুই দিন আগে দেশের প্রধান নির্বাচন কমিশনার নির্বাচন বাতিল করে দেন। শর্ত ভঙ্গ করে দবেইবা নিজেই প্রধানমন্ত্রী পদে লড়তে চান এবং নির্বাচন বাতিল হলেও পদত্যাগ করতে অস্বীকৃতি জানান। ফলে লিবিয়ায় অচলাবস্থা আরও প্রকট হয়।

গাদ্দাফির পতনের পর লিবিয়ার তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ ও হতাশার কথা উঠে এসেছে বিদেশে পাড়ি জমানো লিবীয় তরুণদের কণ্ঠে। ত্রিপোলি যখন বিদ্রোহীদের দখলে যায়, সারা মিজরান তখন কিশোরী। আট বছর হলো তিনি ত্রিপোলি ছেড়ে যুক্তরাজ্যে এসেছেন। ৩২ বছর বয়সী এই স্থপতি বলেন, ‘তরুণ পেশাজীবীরা যখন দেশ ছাড়েন, তখন লিবিয়া কেবল তাদের দক্ষতাই হারায় না, বরং সম্ভাবনার নতুন দুয়ারও বন্ধ হয়ে যায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে তাদের দেশ ছাড়তেই হবে— এমন ভাবনা নিয়ে একটি প্রজন্ম বড় হয়েছে। এমন বাস্তবতা দেশের প্রতি তরুণদের আস্থা পুরোপুরি শেষ করে দেয়।’

গাদ্দাফির পতনের পর লিবিয়ার গৃহযুদ্ধ সারা মিজরানের মতো অসংখ্য তরুণের দেশত্যাগের যে সূচনা করেছিল, ১৫ বছর পরও তা চলছে। সারা ভেবেছিলেন, যুক্তরাজ্যে উচ্চতর পড়াশোনা ও অর্জিত অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশে ফিরে সেগুলো কাজে লাগাবেন। কিন্তু লিবিয়ার বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশে ফেরা ও সেখানে কাজ করা নিয়ে তাঁর যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের ফেলো তারেক মেগেরেসির কথায় উঠে এসেছে লিবিয়ার এমন আরেক বাস্তবতা। তিনি বলেন, ‘গাদ্দাফির পতনের পর কয়েক হাজার দক্ষ তরুণ লিবিয়াকে নতুনভাবে গড়ার আশায় বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছিলেন। কিন্তু অভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রশাসনের জ্যেষ্ঠরা এই তরুণদের কাজ করতে দেননি। তথাকথিত জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা নিজেদের নিয়ে বেশ বাগাড়ম্বর করেছিলেন। বলেছিলেন, তাঁরা দেশে গণতন্ত্র সুসংহত করবেন। যদিও তাঁরা মূলত গাদ্দাফি সরকারের মতোই আচরণ করেছেন।’

তিনি জানান, নানা মন্ত্রণালয়ে ছড়িয়ে পড়া দুর্নীতি এমন এক স্থবির পরিবেশ তৈরি করেছে, যা ২০১১-পরবর্তী প্রজন্মের তরুণদের দেশত্যাগে বাধ্য করেছে। মেগেরেসির মতে, ‘গাদ্দাফি আমলের শেষ দিকে লিবিয়া তুলনামূলকভাবে কিছুটা উন্মুক্ত হচ্ছিল। তখন কিছু তরুণ পেশাজীবী উচ্চতর যোগ্যতা ও কাজের প্রাথমিক অভিজ্ঞতা থাকায় বেশ আশাবাদী ছিলেন। তাঁরা ভেবেছিলেন, অভ্যুত্থান তাঁদের ক্যারিয়ারকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, সেই সব স্বপ্ন ও সম্ভাবনা শেষ পর্যন্ত অনিশ্চয়তা আর স্থবিরতার কাদায় আটকে গেছে।’ তবে আশা হারাচ্ছেন না মেগেরেসি। তিনি বলেন, লিবিয়ার মেধাবী তরুণেরা দেশে ফেরার জন্য এখনো প্রস্তুত। তাঁর মতে, ‘সত্যিকারের, গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য কোনো সুযোগ তৈরি হলে এই মেধাবীরা এক মুহূর্তেই দেশে ফিরে আসবেন।’ লিবিয়ার শাসনব্যবস্থার অবস্থা বোঝাতে তিনি কবি কাহলিল জিবরানের ‘পিটি দ্যা নেশন’ কবিতার একটি পঙ্‌ক্তি উদ্ধৃত করে বলেন, ‘সেই দেশটির জন্য করুণা, যার দুটি সরকার আছে, কিন্তু শাসন করার বিষয়ে কারও আগ্রহ নেই।’

আপনার মতামত লিখুন

গণবার্তা

বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬


গাদ্দাফি পতনের ১৫ বছর: দুই সরকারে বিভক্ত লিবিয়া, তরুণদের স্বপ্ন চুরমার

প্রকাশের তারিখ : ২৩ আগস্ট ২০২৬

featured Image
টানা ৪২ বছর লিবিয়ায় শাসনক্ষমতায় ছিলেন মুয়াম্মার গাদ্দাফি। ২০১১ সালে আরব বসন্তে পতন হয় তাঁর। ১৫ বছর পরে লিবিয়া এখন বলতে গেলে দুই ভাগে বিভক্ত। বলা ভালো, দুই সরকার লিবিয়া শাসন করছে। দেশটির পশ্চিমে ত্রিপোলিভিত্তিক সরকার এবং পূর্বে বেনগাজিভিত্তিক সরকার। দুই প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি লিবিয়াকে কার্যত অচল করে রেখেছে। তবে সম্প্রতি কিছুটা আশার আলো জাগছে।চলতি বছরের এপ্রিলে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো লিবিয়ার রাজনীতির প্রধান দুই প্রতিপক্ষ ১৯০ বিলিয়ন দিনার (প্রায় ৩ লাখ ৬৬ হাজার কোটি টাকা) বাজেট ভাগ করে দেশ পরিচালনায় একমত হয়। যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত এই বাজেট বিভক্ত লিবিয়াকে এক কাতারে আনতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। যদিও ঐক্যের উদাহরণ খুব একটা নেই।গাদ্দাফির পতনের পর সৃষ্ট শূন্যতায় গড়ে উঠেছিল একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষ, বারবার দেখা দিয়েছে সংঘাত এবং বিলম্বিত হয়েছে নির্বাচন। তবে এখন দেশটির রাজনৈতিক প্রতিপক্ষগুলো একসঙ্গে কাজ করার পথ খুঁজছে। ২০১১ সাল থেকে বারবার ব্যাহত হয়েছে তেলের উৎপাদন। বিভিন্ন উপদল তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির জন্য দেশের বন্দর ও তেলক্ষেত্রগুলো বন্ধ করে দেওয়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়। ২০১৭ সালে লিবিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, পরপর তিন বছর তেলের অবকাঠামো বন্ধ থাকার কারণে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ১৬০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ক্ষতি হয়েছে। ২০২০ সালে খলিফা হাফতারের তেলক্ষেত্র ও টার্মিনাল অবরুদ্ধ করার পদক্ষেপে দেশটির আর্থিক ক্ষতি আরও প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার যোগ করে। ২০২২ এবং ২০২৪ সালেও নতুন করে তেলক্ষেত্র বন্ধের ঘটনা ঘটে। তবে এই ধরনের আত্মঘাতী অর্থনৈতিক যুদ্ধ পরিচালনার প্রবণতা সম্প্রতি অনেকটাই কমে এসেছে।আবুধাবিতে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনীতিক ও সামরিক কমান্ডারদের মধ্যে হওয়া সমঝোতায় ‘আর্কেনু’ নামের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান প্রথম লিবিয়ার অপরিশোধিত তেল রপ্তানির সুযোগ পায়। যদিও পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘের তদন্তকারীরা এই চুক্তির মালিকানা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং চলতি বছর সমঝোতাটি বাতিল করা হয়। তবুও এই ঘটনা স্পষ্ট করেছে—দুই শিবিরই যৌথ স্বার্থ বিবেচনায় তেলের উৎপাদন ও সরবরাহ সচল রাখতে পারে। আর এই অর্থনৈতিক বোঝাপড়া শেষ পর্যন্ত স্থায়ী রাজনৈতিক চুক্তির পথও সুগম করতে পারে।নির্বাচন ব্যর্থ, তরুণদের দেশত্যাগ২০১১ সালের আগস্টে সশস্ত্র অভ্যুত্থানে গাদ্দাফি সরকারের পতন হয়। এরপর থেকে লিবিয়া প্রায় ধারাবাহিক সংঘাতের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ‘ন্যাশনাল ট্রানজিশনাল কাউন্সিল’ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল জাতীয় নির্বাচনের আগ পর্যন্ত দেশ শাসন করবে। দীর্ঘ ৪৮ বছর পর ২০১২ সালের জুলাইয়ের জাতীয় নির্বাচনে প্রায় ১৭ লাখ ৬০ হাজার মানুষ ভোট দেন। ভোটে বিজয়ীদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়। এর কিছুদিন পরই কাউন্সিল বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। তবে লিবিয়ায় শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরে ২০১২ সালের ওই নির্বাচনই ছিল প্রথম এবং শেষ নির্বাচন।২০১৪ সালের মে মাসে গাদ্দাফি আমলের সাবেক জেনারেল খলিফা হাফতার বেনগাজির সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে তথাকথিত 'সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান’ শুরু করেন। অন্যদিকে হাফতারের অনুগত বাহিনী ত্রিপোলির পার্লামেন্টে হামলা চালায়। টালমাটাল পরিস্থিতিতেই ২০১৪ সালের জুনে নির্বাচন হয়। ভোটার উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে ২০১২ সালের সংসদ নির্বাচনে বিজয়ীরা এই নির্বাচনের ফলাফল মানতে অস্বীকৃতি জানান। দুই পক্ষের দ্বন্দ্ব নিরসনে ২০১৫ সালে জাতিসংঘের উদ্যোগে ‘গভর্নমেন্ট অব ন্যাশনাল অ্যাকর্ড (জিএনএ)’ গঠিত হয়। জিএনএ-কে জাতিসংঘ লিবিয়ার একমাত্র কর্তৃপক্ষ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু এতে সংঘাত থামেনি। ২০১৯ সালে হাফতারের অনুগত বাহিনী জিএনএ-র নিয়ন্ত্রণে থাকা ত্রিপোলিতে সামরিক অভিযান চালায়।এরপর ২০২১ সালে জাতীয় সংহতি স্থাপনে জাতিসংঘের উদ্যোগে গভর্নমেন্ট অব ন্যাশনাল ইউনিটি (জিএনইউ) গঠন করে অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আবদুল হামিদ দবেইবাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। শর্ত ছিল তিনি প্রধানমন্ত্রী পদে লড়তে পারবেন না। তাঁকে বসানো হয়েছিল ওই বছরের ডিসেম্বর নাগাদ নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের আশায়। কিন্তু ভোটের মাত্র দুই দিন আগে দেশের প্রধান নির্বাচন কমিশনার নির্বাচন বাতিল করে দেন। শর্ত ভঙ্গ করে দবেইবা নিজেই প্রধানমন্ত্রী পদে লড়তে চান এবং নির্বাচন বাতিল হলেও পদত্যাগ করতে অস্বীকৃতি জানান। ফলে লিবিয়ায় অচলাবস্থা আরও প্রকট হয়।গাদ্দাফির পতনের পর লিবিয়ার তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ ও হতাশার কথা উঠে এসেছে বিদেশে পাড়ি জমানো লিবীয় তরুণদের কণ্ঠে। ত্রিপোলি যখন বিদ্রোহীদের দখলে যায়, সারা মিজরান তখন কিশোরী। আট বছর হলো তিনি ত্রিপোলি ছেড়ে যুক্তরাজ্যে এসেছেন। ৩২ বছর বয়সী এই স্থপতি বলেন, ‘তরুণ পেশাজীবীরা যখন দেশ ছাড়েন, তখন লিবিয়া কেবল তাদের দক্ষতাই হারায় না, বরং সম্ভাবনার নতুন দুয়ারও বন্ধ হয়ে যায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে তাদের দেশ ছাড়তেই হবে— এমন ভাবনা নিয়ে একটি প্রজন্ম বড় হয়েছে। এমন বাস্তবতা দেশের প্রতি তরুণদের আস্থা পুরোপুরি শেষ করে দেয়।’গাদ্দাফির পতনের পর লিবিয়ার গৃহযুদ্ধ সারা মিজরানের মতো অসংখ্য তরুণের দেশত্যাগের যে সূচনা করেছিল, ১৫ বছর পরও তা চলছে। সারা ভেবেছিলেন, যুক্তরাজ্যে উচ্চতর পড়াশোনা ও অর্জিত অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশে ফিরে সেগুলো কাজে লাগাবেন। কিন্তু লিবিয়ার বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশে ফেরা ও সেখানে কাজ করা নিয়ে তাঁর যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের ফেলো তারেক মেগেরেসির কথায় উঠে এসেছে লিবিয়ার এমন আরেক বাস্তবতা। তিনি বলেন, ‘গাদ্দাফির পতনের পর কয়েক হাজার দক্ষ তরুণ লিবিয়াকে নতুনভাবে গড়ার আশায় বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছিলেন। কিন্তু অভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রশাসনের জ্যেষ্ঠরা এই তরুণদের কাজ করতে দেননি। তথাকথিত জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা নিজেদের নিয়ে বেশ বাগাড়ম্বর করেছিলেন। বলেছিলেন, তাঁরা দেশে গণতন্ত্র সুসংহত করবেন। যদিও তাঁরা মূলত গাদ্দাফি সরকারের মতোই আচরণ করেছেন।’তিনি জানান, নানা মন্ত্রণালয়ে ছড়িয়ে পড়া দুর্নীতি এমন এক স্থবির পরিবেশ তৈরি করেছে, যা ২০১১-পরবর্তী প্রজন্মের তরুণদের দেশত্যাগে বাধ্য করেছে। মেগেরেসির মতে, ‘গাদ্দাফি আমলের শেষ দিকে লিবিয়া তুলনামূলকভাবে কিছুটা উন্মুক্ত হচ্ছিল। তখন কিছু তরুণ পেশাজীবী উচ্চতর যোগ্যতা ও কাজের প্রাথমিক অভিজ্ঞতা থাকায় বেশ আশাবাদী ছিলেন। তাঁরা ভেবেছিলেন, অভ্যুত্থান তাঁদের ক্যারিয়ারকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, সেই সব স্বপ্ন ও সম্ভাবনা শেষ পর্যন্ত অনিশ্চয়তা আর স্থবিরতার কাদায় আটকে গেছে।’ তবে আশা হারাচ্ছেন না মেগেরেসি। তিনি বলেন, লিবিয়ার মেধাবী তরুণেরা দেশে ফেরার জন্য এখনো প্রস্তুত। তাঁর মতে, ‘সত্যিকারের, গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য কোনো সুযোগ তৈরি হলে এই মেধাবীরা এক মুহূর্তেই দেশে ফিরে আসবেন।’ লিবিয়ার শাসনব্যবস্থার অবস্থা বোঝাতে তিনি কবি কাহলিল জিবরানের ‘পিটি দ্যা নেশন’ কবিতার একটি পঙ্‌ক্তি উদ্ধৃত করে বলেন, ‘সেই দেশটির জন্য করুণা, যার দুটি সরকার আছে, কিন্তু শাসন করার বিষয়ে কারও আগ্রহ নেই।’

গণবার্তা

সম্পাদকঃ নূর মোহাম্মদ
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্ব সংরক্ষিত গণবার্তা