ঢাকা: নিখোঁজ হওয়ার এক দিন পর তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির (২৮) নিথর দেহ। মঙ্গলবার রাত থেকে নিখোঁজ থাকার পর বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেলে গাজীপুরের টঙ্গী নৌপুলিশ ফাঁড়ির একটি দল নদী থেকে তার লাশ উদ্ধার করে। তবে এটিকে কোনো স্বাভাবিক মৃত্যু বা সাধারণ দুর্ঘটনা মানতে নারাজ নিহতের পরিবার; ঘটনাটিকে একটি ‘পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড’ বলে দাবি করেছেন তার স্বজনেরা।
নৌপুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বুধবার বিকেল ৪টার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে স্থানীয়দের মাধ্যমে খবর পেয়ে গাজীপুরের টঙ্গী নৌপুলিশ ফাঁড়ির একটি দল তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে অজ্ঞাত এক ব্যক্তির ভাসমান লাশ উদ্ধার করে।
লাশ উদ্ধারের সময় তার পরনে ছিল সাদা পায়জামা ও কালো পাঞ্জাবি। হাতে থাকা হাতঘড়ি এবং পকেটে থাকা আইফোনের সূত্র ধরে দ্রুতই তার পরিচয় নিশ্চিত করে পুলিশ। পরবর্তীতে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ণয়ে মরদেহ রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
ঢাকা জেলা নৌ পুলিশের পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন সাংবাদিকদের বলেন, মরদেহের শরীরে বাইরে থেকে দৃশ্যমান কোনো আঘাত বা জখমের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পরই মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যাবে। স্বজনদের অভিযোগ অনুযায়ী পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পরিবারের দাবি: পরিকল্পিত হত্যা
তাহসিফের মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি আবেগঘন ও বিস্ফোরক পোস্ট দেন তার খালাতো বোন মোশফেকা জাহান। সেখানে তিনি সরাসরি অভিযোগ তোলেন, শেখ হাসিনার দেশত্যাগের গোপন ভিডিও শেয়ার করার কারণেই তাহসিফকে নির্মম পরিণতির শিকার হতে হয়েছে।
ফেসবুক পোস্টে মোশফেকা জাহান লেখেন, “আমার ভাইকে মার্ডার করা হয়েছে। কী দোষ ছিল তার? হাসিনার পালানোর ভিডিও শেয়ার করা? যেটি তিনি নিজেও ধারণ করেননি, একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে শুধু শেয়ার করেছিলেন; হয়তো তার সহকর্মীদের কেউ তা ধারণ করেছিলেন। তাকে অন্যায়ভাবে অবসরে পাঠানো হলো, দিনের পর দিন মানসিক নির্যাতন চালানো হলো, তবুও তাদের শান্তি হলো না। শেষ পর্যন্ত মেরেই ফেলতে হলো তাকে?”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, চাকরি থেকে অব্যাহতির পরও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন নিয়মিত তাহসিফকে অনুসরণ করত বলে তাহসিফ নিজেই তাকে জানিয়েছিলেন। একজন সুস্থ মানুষকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে গিয়ে সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে দাবি করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, দেশপ্রেমিক হওয়া এবং পরিবারের সদস্যদের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজপথে সক্রিয় থাকার কারণেই কি এমন চরম মূল্য দিতে হলো?
পুরোনো বিতর্ক নতুন করে ভাইরাল
তাহসিফের মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পুরোনো বিতর্ক নতুন করে ভাইরাল হয়েছে। নেটিজেনদের একটি অংশ দাবি করছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের গোপন ভিডিও ধারণ বা ছড়িয়ে দেওয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। তবে মৃত্যুর প্রায় সোয়া তিন মাস আগে একটি পডকাস্টে তিনি নিজেই এই দাবিকে ‘প্রমাণহীন অভিযোগ’ বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন।
গত ২১ জুলাই ইউটিউবের ‘স্পিক উইথ রশীদ’ চ্যানেলে প্রকাশিত এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে তাহসিফ তার চাকরিচ্যুতি, বিমানবাহিনীর অভ্যন্তরীণ অভিজ্ঞতা এবং একটি জাতীয় দৈনিকে তাকে নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনটিকে তিনি ‘প্রোপাগান্ডা’ বলে দাবি করেন।
সাক্ষাৎকারে উপস্থাপক শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ফাঁসে তাহসিফের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন তুললে তিনি বলেন, “ওখানে তারা লিখেছে ভিডিওটি আমি ছড়িয়েছি। আমি যে শুট করেছি, সেটাও তারা বলেনি। বলা হয়েছে, রিফাত আশরাফী ভিডিওটি করেছে আর আমি নাকি ছড়িয়ে দিয়েছি। আমি যদি ভিডিওটি ছড়িয়েও থাকি, তাদের কাছে কী প্রমাণ আছে? এমনও হতে পারে, এই অভিযোগ তোলার কারণেই আজকে আমি বিমানবাহিনীতে নেই।”
চাকরিচ্যুতির কারণ হিসেবেও তিনি ঘটনাটিকে সরাসরি স্বীকার না করে কেবল একটি ‘অজুহাত ও অভিযোগ’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
সহপাঠীর ফেসবুক পোস্ট
তাহসিফ জীবদ্দশায় ভিডিও ফাঁসের বিষয়টি সরাসরি স্বীকার না করলেও তার মৃত্যুর পর ঘটনাটি নতুন মোড় নিয়েছে তার এক সহপাঠীর ফেসবুক পোস্টে। নৌবাহিনীতে কর্মরত এবং তাহসিফের আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ ও বিএমএ ৭৯তম কোর্সের বন্ধু কেএসএম ইনতিসার ইনজিমাম ফেসবুকে এক পোস্টে দাবি করেছেন, তাহসিফই শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ফাঁসের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।
ইনজিমাম তার পোস্টে লেখেন, “হাসিনার ভিডিও ভাইরাল করার সঙ্গে জড়িত এই ছেলেটার লাশ আজকে তুরাগ নদে ভেসে উঠেছে। গত পরশু রাতে সে বাইরে যায়, এরপর এই ঘটনা। তার লাশের ছবিতে হাতে কাদা মাখা, বাকি সব পরিষ্কার—এটি কিসের লক্ষণ আমি এখনই বলতে চাই না। তবে এটি ব্যক্তিগত কোনো কোন্দল বা দুর্ঘটনা হিসেবে প্রমাণিত না হলে আমি ধরে নেব এটি পলিটিক্যাল (রাজনৈতিক)।”
তিনি আরও দাবি করেন, ৫ আগস্টের পর তাহসিফকে নানাভাবে হেনস্তা করা হলেও তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা করা যায়নি। তাই তার মৃত্যুর পেছনে হেলিকপ্টারের সেই ভিডিও ফাঁসের কোনো যোগসূত্র থাকতে পারে বলে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন।
আইএসপিআরের বক্তব্য
প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ঐতিহাসিক দৃশ্যটি জনসমক্ষে ফাঁসের পেছনে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরির নাম দীর্ঘদিন ধরে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়ে আসছিল। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টি কখনোই আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। অন্যদিকে, আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) গত বছরের ৪ আগস্ট জানিয়েছিল, কোনো সুনির্দিষ্ট শাস্তিমূলক অভিযোগ ছাড়াই সম্পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক ও নিয়মিত প্রক্রিয়ায় তাহসিফকে অবসরে পাঠানো হয়েছিল।
রহস্যজনক এই মৃত্যুর পেছনে কোনো নাশকতা বা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থাগুলো কাজ শুরু করেছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পরই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৯ অক্টোবর ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন