বিসিবির ‘সাকিব কার্ড’
কোথাও, কোনো এক সময়ে সাকিব আল হাসান নিজেই মজা করে বলেছিলেন—
“যেভাবেই হোক, আমাকে ক্রিকেটে রাখেন। নইলে আপনাদের লাইফ বোরিং হয়ে যাবে।”
সেই কথাটিই যেন হুবহু অনুসরণ করছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। নইলে ‘কোথাও কেউ নেই’-এর মতো করে কেন আবার হঠাৎ করে সাকিবের নাম উঠে আসে বোর্ড পরিচালকদের বৈঠকে?সাকিব নিজ থেকে কিছু বলেননি। এমন কোনো কিছুও করেননি, যার জন্য বাধ্য হয়ে তাকে সামনে আনতেই হবে। কদিন আগেও যিনি ছিলেন ‘যন্ত্রণার নাম’, তিনিই হঠাৎ হয়ে উঠলেন বিসিবির প্রাণভোমরা।গতকাল বিসিবির এক বৈঠকে সাকিব প্রসঙ্গ তোলেন এমন এক পরিচালক, যিনি নির্বাচনের সময় দেশের বাইরে ছিলেন। তিনিই প্রথম জাতীয় দলে সাকিবকে ফেরানোর বার্তা বোর্ডে উত্থাপন করেন এবং নিজের পরিকল্পনাও ব্যাখ্যা করেন। যদিও তাতে খুব বেশি পরিচালকের সমর্থন পাওয়া যায়নি। তবে ওই পরিচালকের বক্তব্যের ইঙ্গিত ছিল স্পষ্ট—
“বোর্ডের সময়টা ভালো যাচ্ছে না, একটা ভালো খবর দরকার।”বোর্ড সভা শেষে সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি স্পষ্ট করেন মিডিয়া কমিটির চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেন। তিনি বলেন,
“যদি সাকিব আল হাসানের এভেইলেবিলিটি, ফিটনেস ও অ্যাকসেসিবিলিটি থাকে এবং যে ভেন্যুতে খেলা হবে সেখানে উপস্থিত থাকার সক্ষমতা থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে বোর্ড বা নির্বাচক প্যানেল তাকে দলে বিবেচনা করবে।”ক্রিকেটের পাশাপাশি রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া সাকিব ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তবে সরকার পরিবর্তনের পর ছয় মাসও রাজনীতি করতে পারেননি তিনি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়, যার মধ্যে হত্যা মামলা এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলাও রয়েছে। এসব কারণেই তার দেশে ফেরা কঠিন। চাইলেও এখনই দেশের মাটিতে খেলা সম্ভব নয়।বিসিবি যখন নতুন করে তাকে ফেরানোর উদ্যোগের কথা বলছে, তখন অনেকেরই ধারণা ছিল—মাঠের বাইরের বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাবে। কিন্তু আমজাদ হোসেন সে সম্ভাবনায় জল ঢেলে দেন। তিনি বলেন,
“সাকিবের ব্যক্তিগত ইস্যু সরকার দেখবে। সরকার যেভাবে দেখবে, সেটা তাদের বিষয়। বোর্ডের পক্ষ থেকে আমরা সাকিবকে চেয়েছি—এটাই মূল কথা।”এই ‘খারাপ সময়’ বলতে বিসিবির সামনে সমস্যার শেষ নেই। বাংলাদেশ দল টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়েছে। একজন পরিচালক পদত্যাগ করেছেন। আরেক পরিচালকের বিরুদ্ধে উঠেছে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের গুরুতর অভিযোগ। আরও পদত্যাগের গুঞ্জন রয়েছে। এর আগে ক্রিকেটারদের নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করায় আন্দোলনের মুখে পরিচালক নাজমুল ইসলামকেও পদ ছাড়তে হয়েছে। ঢাকার ক্লাব ক্রিকেট অচলাবস্থায়, ঘরোয়া ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ সূচি নিয়েও স্পষ্টতা নেই।এমন পরিস্থিতিতে অনেকের মতে, আলোচনার মোড় ঘোরাতে বিসিবি খেলছে ‘সাকিব কার্ড’।সাবেক এক বোর্ড পরিচালক রাইজিংবিডিকে বলেন,
“সাকিব আল হাসান বাংলাদেশ ক্রিকেটের বড় নাম—তা নিয়ে আলোচনা হতেই পারে। কিন্তু রাজনীতির কারণে দেশের বাইরে থাকা একজন ক্রিকেটারকে নিয়ে যখন-তখন আলোচনা হওয়াটা স্বাভাবিক নয়। সাকিব কেন দেশে নেই, সেটা সবার জানা।”তার মতে,
“এই আলোচনার উদ্দেশ্য দুইটা—এক, অন্য ইস্যু থেকে দৃষ্টি সরানো। দুই, দায়সারা একটা বার্তা দেওয়া। এই বোর্ডের ভবিষ্যৎই অনিশ্চিত। একজন পরিচালক চলে গেছেন, একজন ফিক্সিংয়ে অভিযুক্ত, আরেকজন দেশের বাইরে। এমন অস্থির বোর্ড হঠাৎ করে সাকিবের নাম তুলে স্রেফ স্ট্যান্টবাজি করেছে।”তবে বিসিবি পরিচালক আসিফ আকবর ভিন্ন মত পোষণ করেন। তিনি বলেন,
“সাকিবের ব্যক্তিগত বিষয় সরকার দেখবে। তবে বোর্ডের পক্ষ থেকে আমরা তাকে চাই। সংসদ সদস্য হওয়ার আগেও তিনি বাংলাদেশের ক্রিকেটার ছিলেন এবং বহু জয়ের অংশীদার।”তবুও হঠাৎ করে সাকিবকে ঘিরে বোর্ডের এই দরদ অনেকের কাছেই অস্বাভাবিক ঠেকছে। ঢাকার ক্লাব ক্রিকেটের এক জনপ্রিয় দলের ম্যানেজার বলেন,
“এটা এমন—আপনি জানেন আপনার সময় শেষ, তখন বিতর্কিত কিছু সামনে এনে নিজে চুপ করে সরে পড়লেন। যদি সাকিব এতটাই প্রয়োজন হতো, তাহলে বিশ্বকাপের দলেই তাকে নেওয়া যেত। ভারত বা শ্রীলঙ্কায় গিয়ে খেলতে তো সমস্যা নেই। বিশ্বকাপ বাদ পড়ার দিনেই এটা জানাতে হলো কেন?”সংবাদ সম্মেলন শেষে যখন আসিফ আকবর ও আমজাদ হোসেনকে উদ্দেশ করে প্রশ্ন ছোড়া হয়—
“বিশ্বকাপ ইস্যুর মধ্যে সাকিবকে সামনে এনে ভালোই খেললেন!”
তারা কোনো জবাব না দিয়ে শুধু হেসে যান।
খেলাটার নামই বোধহয়—
বিসিবির ‘সাকিব কার্ড’।