গণবার্তা

লাইফ স্টাইল

পহেলা বৈশাখ ও মিষ্টি মুখের আখ্যান: ঐতিহ্য, স্বাদ ও ব্যস্ততার গল্প

বাংলা বছরের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ। নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়ার এই উৎসব শুধু হালখাতা আর মেলা-পার্বণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মিষ্টিমুখ করানোর এক পুরনো রীতি। ব্যবসায়ী-ক্রেতার মেলবন্ধন দৃঢ় করতে, শুভ কামনা বিনিময় করতে আর মুখ মিষ্টি করতে বৈশাখ এলেই বাড়ে মিষ্টির চাহিদা। আর সেই মিষ্টির জোগান দিতে গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই ব্যস্ত সময় পার করছেন বাংলাদেশের আনাচে-কানাছে ছড়িয়ে থাকা ঘোষ সম্প্রদায়ের মিষ্টি কারিগর ও ব্যবসায়ীরা। প্রাচীন কাল থেকেই এই অঞ্চলের মিষ্টির সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বজুড়ে। টাঙ্গাইল, রাজবাড়ী, মুন্সিগঞ্জ, নেত্রকোনা, নওগাঁ, বগুড়াসহ প্রায় প্রতিটি জেলাতেই একেক ধরনের মিষ্টি বিখ্যাত। আর বৈশাখ এলেই যেন এদের কদর বেড়ে যায় কয়েকগুণ। জিআই স্বীকৃত মিষ্টি: বাংলার গর্ব বাংলাদেশের নিম্নলিখিত মিষ্টান্নগুলো ইতিমধ্যেই জিআই (জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এগুলো শুধু স্বাদেই অনন্য নয়, বরং নিজ নিজ অঞ্চলের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতীক। নিচে সেগুলোর একটি সম্পূর্ণ তালিকা দেওয়া হলো: মিষ্টির নাম জেলা/অঞ্চল বিশেষত্ব পোড়াবাড়ির চমচম টাঙ্গাইল ঘন দুধ ও খয়েরি রঙের জন্য বিখ্যাত গোপালগঞ্জের রসগোল্লা গোপালগঞ্জ নরম, স্পঞ্জি গঠন ও স্বাদে অনন্য মুক্তাগাছার মণ্ডা ময়মনসিংহ আখের গুড় ও বিশেষ প্রস্তুত প্রণালী কুমিল্লার রসমালাই কুমিল্লা দুধে ভেজানো নরম পনির বল বগুড়ার দই বগুড়া ঘন, মিষ্টি ও টক-মিষ্টি স্বাদের জন্য জনপ্রিয় কুষ্টিয়ার তিলের খাজা কুষ্টিয়া তিল ও চিনি দিয়ে তৈরি খাস্তা মিষ্টি নেত্রকোণার বালিশ মিষ্টি নেত্রকোণা বালিশ আকৃতির বড় মিষ্টি, আকার ও স্বাদের জন্য বিখ্যাত মেহেরপুরের সাবিত্রী মিষ্টি মেহেরপুর স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয়, জিআই তালিকায় যুক্ত হয়েছে জামুর্কির সন্দেশ টাঙ্গাইলের মির্জাপুর হাতের কারুকাজ ও ঘন দুধের তৈরি, সন্দেশের অনন্য সংস্করণ ছানামুখী মিষ্টি ব্রাহ্মণবাড়িয়া ছানার তৈরি, মুখরোচক ও নরম গঠন ছানার পায়েস শেরপুর ছানার সাথে দুধ ও চিনির মিষ্টি পায়েস, উৎসবের বিশেষ পদ অষ্টগ্রামের পনির কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম দুধের ছানা থেকে তৈরি নরম পনির, মিষ্টি ও নোনতা উভয় রকমের হয় মহিষের দুধের কাঁচা দই ভোলা মহিষের দুধের তৈরি ঘন ও টক-মিষ্টি দই, স্বাদে বগুড়ার দইয়ের বিকল্প এই মিষ্টিগুলো শুধু দেশে নয়, বিদেশেও সমাদৃত। আর পহেলা বৈশাখ এলে এদের চাহিদা আরও বেড়ে যায়। বৈশাখ এলেই বেড়ে যায় চাহিদা  বাংলা নববর্ষকে সামনে রেখে দূরদূরান্ত থেকে পাইকারি ক্রেতাদের আগমন ঘটে  দেশের বিভিন্ন মিষ্টির আড়তে। চালের আড়ত থেকে শুরু করে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও বৈশাখের আমেজ। ব্যবসায়ীরা বৈশাখী আমন্ত্রণপত্রে ক্রেতাদের মিষ্টিমুখ করার আমন্ত্রণ জানান। সনাতনী এই প্রথা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে।  একাধিক মিষ্টির আড়ত ও কারখানা ঘুরে দেখা গেছে, বাহারি রঙ ও ডিজাইনের বিভিন্ন স্বাদের  তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগররা। হরেক পদের মিষ্টি তৈরি হচ্ছে শুধু পহেলা বৈশাখকে ঘিরে। টাঙ্গাইলের চমচম, বগুড়ার দই ও নাটোরের কাচাগোল্লা: তিন অমর মিষ্টান্ন বাংলার মিষ্টির ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে টাঙ্গাইলের চমচম, বগুড়ার দই এবং নাটোরের কাচাগোল্লা। টাঙ্গাইলের পোড়াবাড়ির চমচম ঘন দুধ ও খয়েরি রঙের জন্য দূরদূরান্তে বিখ্যাত। একবার মুখে দিলেই এর রসে মিশে যায় শতবর্ষের ঐতিহ্য। অন্যদিকে বগুড়ার দই—ঘন, মিষ্টি আর টক-মিষ্টি স্বাদের অনন্য সমন্বয়—দেশের আর কোথাও মেলে না। পহেলা বৈশাখে বগুড়ার দই খাওয়ার জন্য ভিড় জমে হাজারো মানুষের। আর নাটোরের কাচাগোল্লা দেখতে ছোট ছোট গোল বলের মতো, তৈরি হয় খাঁটি ছানা ও চিনি দিয়ে। এর গঠন এত নরম যে মুখে দিলেই গলে যায়, আর সাথে ছড়িয়ে পড়ে হালকা মিষ্টি ঘ্রাণ। নাটোর অঞ্চলের এই কাচাগোল্লা এখন ধীরে ধীরে দেশব্যাপী জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। তিনটি মিষ্টিই বাংলার নববর্ষের আয়োজনকে করে তোলে আরও মধুর। লালমোহন, খিলমোহন ও সাদা রসগোল্লা – তিন বন্ধু লালমোহন আর খিলমোহন – আকৃতিতে প্রায় একই, তবে রঙ ও স্বাদে ভিন্নতা। লালমোহন তৈরি হয় খাঁটি দুধের ছানা ও চিনি দিয়ে। খুব ঘন করে চিনি জ্বাল দিয়ে তাতে ভেজানো হয় ভাজা ছানা। ফলে এর রং হয় লালচে-খয়েরি, আর স্বাদ হয় ঘন ও মিষ্টি। খিলমোহন সাদা রঙের, আকারে ছোট, আর এর ভেতরে থাকে খাঁটি দুধের ক্ষিরার মাওয়া। এটি তুলনামূলক হালকা মিষ্টি। আর সাদা রসগোল্লা? এটি বাংলার অন্যতম প্রাচীন ও জনপ্রিয় মিষ্টি। পাতলা চিনির শিরায় ভেজানো এই মিষ্টি দেখলেই জিভে জল আসে। এটি খাঁটি গরুর দুধের ছানা ও চিনি দিয়ে তৈরি। অতিথি আপ্যায়নে সাদা রসগোল্লা দেওয়া পুরনো রীতি। বৈশাখের আয়োজন মানেই সাদা রসগোল্লা থাকবেই – তা যত ছোটই হোক অনুষ্ঠান। চিনির বালুসা ও নিমকি – বৈশাখী মেলার আকর্ষণ বৈশাখী মেলায় গেলে চোখে পড়ে নানা রঙের চিনির বালুসা। হাতি, ঘোড়া, মটক, পাখি ও নৌকার আদলের এই মিষ্টি দেখতে যেমন চমৎকার, তেমনি স্বাদেও অতুলনীয়। একশ বছরেরও বেশি সময়ের ঐতিহ্য এই বালুসা তৈরি হয় খাঁটি দুধের ছানা ও চিনি দিয়ে। চিনির সিরা গরম অবস্থায় কাঠের ফ্রেমে ঢেলে ছোট ছানা গোলাকৃতি করে তৈরি করা হয় দানাদার বালুসা। শিশু থেকে বুড়ো – সবাই এতে মুগ্ধ। অন্যদিকে, মিষ্টিপ্রেমীদের পাশাপাশি যারা কম মিষ্টি পছন্দ করেন, তাদের জন্য বৈশাখী মেলায় থাকে নোনতা নিমকি। ময়দা, কালিজিরা, জোয়ান ও লবণ দিয়ে তৈরি এই পদ ফুটিয়ে তেলে ভেজে তৈরি করা হয়। চায়ের সঙ্গে নিমকির জুড়ি মেলা ভার। বৈশাখের সকালে হালকা নাস্তা হিসেবে নিমকির চাহিদাও কম নয়। কারিগরদের অক্লান্ত পরিশ্রম – যাঁদের হাতে তৈরি হয় স্বাদ বৈশাখের আগমনে দিন-রাত ব্যস্ত থাকে মিষ্টি কারিগররা। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত খাঁটি গরুর দুধের ছানা ও চিনি দিয়ে নানা পদের মিষ্টি তৈরি করছেন তারা। তাদের হাতের ছোঁয়ায় তৈরি মিষ্টিগুলো ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। ঘোষ সম্প্রদায়ের এই কারিগররা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই পেশার সাথে জড়িত। তাঁদের হাতের কারুকাজ আর সময়ানুবর্তিতা ছাড়া এত বিপুল পরিমাণ মিষ্টি বৈশাখের সময় জোগান দেওয়া সম্ভব হতো না। চুলার আঁচ, ছানার ঘনত্ব, শিরার তাপমাত্রা – সবকিছুর ওপর তাঁদের চোখ থাকে কড়া নজর। একটু এদিক-ওদিক হলেই মিষ্টির স্বাদ নষ্ট। শুধু মিষ্টি নয়, বন্ধনের প্রতীক পহেলা বৈশাখের এই মিষ্টিমুখের রীতি শুধু খাবারের বিলাসিতা নয়, বরং ব্যবসায়ী ও ক্রেতার মধ্যে আস্থা ও বন্ধনের প্রতীক। ব্যবসায়ীরা হালখাতায় মিষ্টি দিয়ে ক্রেতাদের মন জয় করেন। পুরনো বছরের হিসাব চুকিয়ে নতুন বছর শুরু করেন মিষ্টি বিনিময়ের মাধ্যমে। এটি সনাতন এক প্রথা যা বহু শতাব্দী ধরে চলে আসছে। টাঙ্গাইলের পোড়াবাড়ির চমচম হোক বা কুমিল্লার রসমালাই – বৈশাখের প্রথম প্রহরে এগুলো পৌঁছে যায় লাখো মানুষের বাড়িতে। আর কারিগরদের হাত ধরে সৃষ্টি হয় সেই আনন্দের উপকরণ। শেষ কথা: স্বাদে, গন্ধে, ঐতিহ্যে অমলিন পহেলা বৈশাখ মানেই নতুন পোশাক, পান্তা-ইলিশ, হালখাতা আর মেলা। কিন্তু এর মাঝে মিষ্টির ভূমিকা অনস্বীকার্য। এটি শুধু মুখের স্বাদ নয়; বরং আবহমান বাংলার সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যাঁরা দিনরাত পরিশ্রম করে এই মিষ্টি তৈরি করেন, তাঁদের প্রতি রইল অসংখ্য কৃতজ্ঞতা। তাঁদের হাতের স্পর্শেই টিকে থাকে বাংলার মিষ্টির ঐতিহ্য। আর আমরা প্রতিবছর পহেলা বৈশাখে মিষ্টিমুখ করে বরণ করে নিই নতুন বছর – পুরনো স্মৃতি আর নতুন আশা বুনে। তাই এই বৈশাখে একটু বেশি করে মিষ্টি খান, অন্যকে খাওয়ান। আর মনে রাখবেন, প্রতিটি মিষ্টির ভেতরে লুকিয়ে আছে এক কারিগরের অক্লান্ত পরিশ্রম আর বাংলার শত বছরের গর্বিত ঐতিহ্য। শুভ নববর্ষ। মিষ্টিমুখ হোক সবার।

পহেলা বৈশাখ ও মিষ্টি মুখের আখ্যান: ঐতিহ্য, স্বাদ ও ব্যস্ততার গল্প