যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন ইরানে যৌথ অভিযান শুরু করে, তখন তাদের মূল লক্ষ্য ছিল তেহরানের শাসনব্যবস্থায় দ্রুত পরিবর্তন আনা। কিন্তু পঞ্চম দিনে গিয়ে সেই লক্ষ্য এখন কঠিন বাস্তবতার মুখে। ইরানের শাসনব্যবস্থা ধসে পড়ার বদলে উল্টো যুদ্ধ নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে এবং ইরান পাল্টা আঘাত হেনেই চলেছে। এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে তাদের আগের সব হিসাব-নিকাশ নতুন করে মেলাতে বাধ্য করছে।
স্বপ্ন বনাম বাস্তবতা
কাগজে-কলমে ইরানের শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার লক্ষ্য হয়তো এখনো আছে। তবে মাঠের পরিস্থিতি বলছে, এই অভিযান ইরানের শাসনব্যবস্থায় ধস নামানোর জন্য যে ধরনের জনরোষ বা অস্থিরতা তৈরি করবে বলে ধারণা করা হয়েছিল, বাস্তবে তা ঘটেনি। উল্টো চার দিনের মাথায় যুদ্ধ নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। ভেঙে পড়ার বদলে ইরানের ইসলামি শাসনব্যবস্থাও বেশ স্থিতিশীলই আছে। শুধু তা–ই নয়, শত্রুপক্ষের বিভিন্ন অবস্থানে পাল্টা আঘাতও হেনে যাচ্ছে দেশটি।
বিশেষ করে ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন এবং তেহরানের আলোচনার প্রস্তাব মানার সম্ভাবনা নিয়ে তাদের আগের সব অনুমান এখন প্রশ্নের মুখে। আর সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর তেহরানও আলোচনার কোনো সম্ভাবনা দেখছে না।
মার্কিন স্বীকৃতি
দুটি বাস্তবমুখী পরিস্থিতি এই উদ্বেগকে আরও জোরালো করেছে। প্রথমত, খোদ মার্কিন প্রশাসনই স্বীকার করেছে যে এই যুদ্ধ স্বল্পস্থায়ী বা সীমিত না-ও হতে পারে। পেন্টাগনে মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন বলেছেন, 'অতিরিক্ত প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে।'
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ অবশ্য শঙ্কা দূর করার চেষ্টা করে বলেছেন, 'এটি ইরাক নয়, এটি অন্তহীন কোনো যুদ্ধও নয়।' তবে একটি 'অন্তহীন' পরিস্থিতির সম্ভাবনা অস্বীকার করার এ প্রবণতাই প্রমাণ করে, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের বিষয়টি এখন জন-আলোচনার অংশে পরিণত হয়েছে।
লক্ষ্য পরিবর্তন
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা সম্পূর্ণ নির্মূল করতে চায়। তিনি বলেন, 'আমাদের নির্দিষ্ট লক্ষ্য রয়েছে এবং সেই লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে যতটুকু সময় প্রয়োজন, আমরা ঠিক ততটুকুই করব।'
ইরানে 'রাষ্ট্র পুনর্গঠন' বা শাসন পরিবর্তনের কোনো পরিকল্পনা নেই বলে হেগসেথ যে মন্তব্য করেছিলেন, রুবিওর ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর নতুন করে গুরুত্বারোপ সেই একই বিষয়কে সামনে আনছে। এটি স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের প্রাথমিক কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনের পথ থেকে এখনো অনেক দূরে রয়েছে।
ইরানের নতুন যুদ্ধকৌশল
ইরানের কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। তেহরান সম্ভবত এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সরাসরি সমর্থন থাকায় কেবল ইসরায়েলের ওপর ক্ষয়ক্ষতি চালিয়ে কোনো চূড়ান্ত রাজনৈতিক ফাটল ধরানো সম্ভব নয়। এর পরিবর্তে, তারা এখন এমন এক কৌশল বেছে নিয়েছে, যার লক্ষ্য হলো পুরো অঞ্চলে যুদ্ধের ব্যয় ও ঝুঁকি বাড়িয়ে দেওয়া।
একজন ইরানি সামরিক কর্মকর্তা বর্তমান পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বলেন, 'হামলার প্রথম ধাক্কার পর নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। আঞ্চলিক সামরিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে মূল কেন্দ্রের সংযোগ তখন ভেঙে পড়েছিল। বিকল্প পরিকল্পনা নিয়ে আগে থেকে ব্রিফিং পাওয়া ইউনিটগুলো নিজ নিজ এলাকায় নিজস্ব উদ্যোগে কাজ শুরু করেছিল। দ্বিতীয় দিন সকালের মধ্যে আবার সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয় এবং আমরা তার ফল পেতে শুরু করি।'
ওই কর্মকর্তা আরও যোগ করেন, 'বহুস্তরীয় পরিকল্পনার মাধ্যমে আমরা সবকিছু আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে এনেছি। আমাদের যে সক্ষমতা রয়েছে, তাতে এই অঞ্চলে কয়েক মাস যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব। আমরা আমাদের নেতাকে হারিয়ে সবচেয়ে বড় মূল্যটি চুকিয়েছি; কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের এই যুদ্ধের মূল্য দিতে হবে আরও অনেক বেশি।'
উপসাগরীয় দেশগুলো চাপে
এই সহ্যক্ষমতার পরীক্ষার প্রাথমিক লক্ষণগুলো ইতিমধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অন্তত ছয়টি মার্কিন সামরিক স্থাপনায় ইরানের উপর্যুপরি হামলা ওই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে যেসব উপসাগরীয় দেশ মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও ঘাঁটি পরিচালনা করছে, তারা এখন নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে।
ধারণা করা হচ্ছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতার তাদের প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের কিছু নির্দিষ্ট মজুত দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে এবং তারা জরুরি সহায়তা চেয়েছে।
জ্বালানি খাত লক্ষ্য
ইরানের 'যুদ্ধব্যয় চাপিয়ে দেওয়া' কৌশলের সবচেয়ে বিপজ্জনক হাতিয়ার হিসেবে রয়ে গেছে জ্বালানি খাত এবং সামুদ্রিক বাণিজ্য। হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোতে হামলা চালানো হতে পারে—ইরানের এমন হুমকিতে বিশ্ববাজার ও বিমা কোম্পানিগুলোর মধ্যে চরম অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে। এর ফলে তেল ও গ্যাসের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। এরই মধ্যে সৌদি আরব তাদের বৃহত্তম তেল শোধনাগার এবং কাতার বিশ্বের বৃহত্তম তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদন কেন্দ্রটি বন্ধ করে দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে জ্বালানি তেলের দাম নাগালের মধ্যে রাখা একটি বড় অগ্রাধিকার। কিন্তু উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের এই ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এখন ওয়াশিংটনের সেই অগ্রাধিকারের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে লিপ্ত হয়েছে।
অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতার চেষ্টা
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর বারবার জনরোষ তৈরির আহ্বান সত্ত্বেও ইরানের ভেতরে সরকারবিরোধী কোনো বড় ধরনের গণ-অভ্যুত্থান এখনো দৃশ্যমান হয়নি। তবে এর মধ্যেই একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে—মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কুর্দি নেতাদের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত এখন সেই বিকল্প পথেই হাঁটতে শুরু করেছে, যা ইসরায়েলি মহলে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত ছিল। তা হলো 'অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা' তৈরি।
ইরানি নিরাপত্তা কর্মকর্তারা অবশ্য এই কৌশলকে 'দিবাস্বপ্ন' বলে উড়িয়ে দিয়েছেন এবং জানিয়েছেন, তারা এরই মধ্যে প্রতিরোধমূলক হামলা চালিয়েছেন।
বৈশ্বিক প্রভাব
মূল প্রশ্নটি এখন আর কেবল ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এই সংঘাতের ফলে ওয়াশিংটনের যে সামরিক সক্ষমতা প্রকাশ পেয়েছে এবং যেসব দুর্বলতা উন্মোচিত হয়েছে, তা চীনের বিরুদ্ধে তাদের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সময়সূচিকে কতটা প্রভাবিত করবে? এর চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো—চীন যদি আরও বড় পরিসরে একই ধরনের 'কস্ট-ডিস্ট্রিবিউশন' বা যুদ্ধব্যয় চাপিয়ে দেওয়ার কৌশল গ্রহণ করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র তার মোকাবিলা করবে কীভাবে?
ইরান সংকটের পঞ্চম দিনে এসে স্পষ্ট হয়ে গেছে, এটি কোনো স্বল্পমেয়াদি সামরিক অভিযান নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের প্রাথমিক লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে এবং এখন নতুন করে কৌশল নির্ধারণ করছে। অন্যদিকে ইরান সুপরিকল্পিতভাবে 'যুদ্ধব্যয় চাপিয়ে দেওয়ার' কৌশল নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। এই অর্থে, ইরান সংকট কেবল একটি আঞ্চলিক পরীক্ষাই নয়, বরং তা যুক্তরাষ্ট্রের সহ্যক্ষমতার সীমারও একটি পরীক্ষা। আমরা এই বিষয়ে নিয়মিত খবর ও বিশ্লেষণ রাখছি।

শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৪ মার্চ ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন