ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও জ্বালানি অবকাঠামোতে সামরিক হামলা স্থগিত করার বিষয়ে ট্রাম্পের ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ১৩ শতাংশেরও বেশি কমেছে। সোমবার (২৩ মার্চ) আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১৭ ডলার বা ১৫ শতাংশ কমে ৯৬ ডলারে নেমেছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৩ ডলার বা ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ কমে ৮৫ দশমিক ২৮ ডলারে নেমে এসেছে। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও এলএনজি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালানোর পর থেকে প্রণালিটি তারা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছিল। ফলে যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলে ১০০ ডলার ছাড়িয়েছিল।
ইরানের সঙ্গে চলমান আলোচনায় বড় ধরনের অগ্রগতির দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি জানিয়েছেন, দুই দেশের মধ্যে অন্তত ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা নিরসনের পথ খুলে যেতে পারে।
সোমবার (২৩ মার্চ) যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট পাম বিচ বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প এসব তথ্য জানান। এর আগে রবিবার গভীর রাত পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের দুই শীর্ষ দূতের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি।
ট্রাম্পের দাবি, আলোচনার উদ্যোগ ইরানের পক্ষ থেকেই এসেছে এবং পুরো প্রক্রিয়া ইতিবাচকভাবে এগিয়েছে। তিনি বলেন, এই আলোচনা সফল হলে দীর্ঘদিনের সংঘাতের একটি বড় সমাধান সম্ভব।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প জানান, সমঝোতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত হিসেবে ট্রাম্প বলেন, ইরানকে তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। তার ভাষ্য, এ বিষয়ে ইতোমধ্যে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে।
সম্ভাব্য সমঝোতা বাস্তবায়নের জন্য পাঁচ দিনের সময়সীমা বেঁধে দিয়ে ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অগ্রগতি না হলে পুনরায় সামরিক অভিযান শুরু করা হতে পারে।
তিনি আরও জানান, সোমবার আরও কয়েকটি টেলিফোন আলাপ হওয়ার কথা রয়েছে এবং শিগগিরই সরাসরি বৈঠকের সম্ভাবনাও রয়েছে।
অন্যদিকে, তেহরানের পক্ষ থেকে এ ধরনের কোনো শর্ত মেনে নেওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। এমনকি, আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো আলোচনা শুরু হয়েছে কি না, সে বিষয়েও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এই ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগেই যুক্তরাষ্ট্রের আগের এক আলটিমেটামের জবাবে নতুন করে কঠোর হুমকি দেয় ইরান। সোমবার (২৩ মার্চ) ইরানি কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেন, তাদের ভূখণ্ডে নতুন করে হামলা হলে উপসাগরীয় অঞ্চলে ভাসমান নৌ-মাইন স্থাপন করে দেওয়া হবে ও বিভিন্ন দেশে বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা চালানো হবে।
এ সময় সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর মানচিত্রও প্রকাশ করে তেহরান, যেখানে ইসরায়েলের দুটি বৃহৎ বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও কুয়েতের বিভিন্ন স্থাপনা চিহ্নিত করা হয়। প্রকাশিত এক গ্রাফিকে স্পষ্টভাবে লেখা ছিল, ‘বিদ্যুৎকে বিদায় বলুন।’
যুদ্ধ চতুর্থ সপ্তাহে প্রবেশের পর প্রথমবারের মতো উত্তেজনা কমার সম্ভাবনার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে। তবে ট্রাম্পের ঘোষণার জবাবে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম দাবি করেছে, সম্ভাব্য পাল্টা হামলার আশঙ্কায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট পিছু হটেছেন।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক বিবৃতিতে ট্রাম্প লিখেছেন, “আমি আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, গত দুই দিনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান মধ্যপ্রাচ্যে চলমান শত্রুতা সম্পূর্ণভাবে শেষ করার লক্ষ্যে খুব ভালো ও ফলপ্রসূ আলোচনা করেছে। এই গভীর, বিস্তারিত ও গঠনমূলক আলোচনা চলমান থাকবে। এর ভিত্তিতে আমি প্রতিরক্ষা বিভাগকে চলমান বৈঠকের অগ্রগতির ওপর নির্ভর করে পাঁচ দিনের জন্য ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর সব ধরনের সামরিক হামলা স্থগিত রাখতে নির্দেশ দিয়েছি।”
তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এই স্থগিতাদেশ সাময়িক ও পুরোপুরি নির্ভর করছে আলোচনার অগ্রগতির ওপর।

শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৩ মার্চ ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন