ঢাকা    বুধবার, ২০ মে ২০২৬
ঢাকা    বুধবার, ২০ মে ২০২৬
গণবার্তা

আট বছরের শিশু রামিসার লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড

আট বছরের শিশু রামিসার লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড

আট বছরের ফুটফুটে শিশু রামিসা (কিছু প্রতিবেদনে লামিসা)। মায়াবি চেহারার এই শিশুটিকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। হত্যার পর দেহ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলে ঘাতক। লোমহর্ষক এই ঘটনাটি ঘটেছে রাজধানীর পল্লবীতে। মঙ্গলবার (১৯ মে) সকালে পল্লবীর ১১ নম্বর সেকশনের বি ব্লকের একটি ভবনের তৃতীয় তলার পাশের ফ্লাট থেকে রামিসার দুই টুকরো দেহ উদ্ধার করা হয়। দেহ পাওয়া যায় খাটের নিচে, আর বিচ্ছিন্ন মাথা বাসার শৌচাগারে। পুলিশ পরে জানায়, ধর্ষণের পরেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে।

ঘটনার শুরু ও নিখোঁজ

রামিসা আক্তার স্থানীয় একটি স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়তো। তার বাবার নাম আবদুল হান্নান মোল্লা। তিনি একটি রিক্রুটিং এজেন্সিতে চাকরি করেন। মায়ের নাম পারভীন আক্তার। তাদের দুই মেয়ের মধ্যে রামিসা ছোট। বড় মেয়ে রাইসা আক্তার নবম শ্রেণিতে পড়ে। পরিবারটি প্রায় ১৭ বছর ধরে পল্লবীর ওই ফ্ল্যাটে বসবাস করছে।

মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বড় বোন রাইসার সঙ্গে রামিসার স্কুলে যাওয়ার কথা ছিল। হঠাৎ করেই রামিসাকে পাওয়া যাচ্ছিল না। তাঁর মা পারভীন ফ্ল্যাটের দরজার বাইরে দেখেন, রামিসার পায়ের একটি জুতা পড়ে আছে। তখন তিনি পাশের ফ্ল্যাটের দরজায় নক করেন। ভেতর থেকে বন্ধ দরজাটি খোলা হচ্ছিল না। অনেক সময় নক করেও দরজা না খোলায় সন্দেহ বাড়ে। পরে বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয়।

লাশ উদ্ধার

পুলিশ এসে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। ভেতরে গিয়ে তারা রামিসার মরদেহ পায়। লাশটি ছিল দুই টুকরো— শরীর খাটের নিচে এবং মাথা শৌচাগারে। পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাসান বাসির বলেন, শিশুটির মাথা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছে। পল্লবী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) এমদাদুল হক বলেন, আমরা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন পেয়ে ঘটনাস্থলে যাই।

গ্রেপ্তার ও আটক

এ ঘটনায় ঘাতক সোহেল রানা (৩৪)-কে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এছাড়া তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার (২৬) কে আটক করে পুলিশ। ঘাতক সোহেল পেশায় রিকশার মেকানিক। পুলিশ জানায়, সোহেল রানা ওই কক্ষে দুই মাস আগে স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস শুরু করেন। ঘটনার পর তিনি শৌচাগারের গ্রিল ভেঙে পালিয়ে যান। তবে স্ত্রীকে ঘটনাস্থলেই আটক করা হয়। প্রতিবেশী হওয়ায় রামিসার সঙ্গে সোহেলদের পরিবারের পরিচয় ছিল।

পুলিশের সংবাদ সম্মেলন ও ধর্ষণের ধারণা

মঙ্গলবার রাতে পল্লবী থানায় সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) এস এন নজরুল ইসলাম ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘সম্ভবত বাথরুমে শিশুটির সঙ্গে মূল আসামির অবৈধ ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। আলামত সংগ্রহ করে সিআইডিতে পাঠানো হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে আমাদের ধারণা, ধর্ষণের কারণে শিশুটির রক্তপাত শুরু হলে তাকে হত্যা করে মরদেহ গুম করার পরিকল্পনা করেন অভিযুক্ত ব্যক্তি।’

মরদেহ টুকরো করার পরিকল্পনা

মরদেহ টুকরো করার পরিকল্পনা প্রসঙ্গে এস এন নজরুল ইসলাম জানান, ‘মরদেহ লুকানোর জন্যই সম্ভবত মাথা বিচ্ছিন্ন করা হয়। হাত কেটে টুকরো করার চেষ্টাও করা হয়। কিন্তু শিশুটির মা দরজায় ধাক্কাধাক্কি শুরু করলে মূল আসামি জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যান। পুরো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেননি তিনি।’

অর্থাৎ, রামিসাকে ৮ টুকরো করার পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু মায়ের সন্দেহ ও সময়মতো দরজায় ধাক্কা দেওয়ায় তা ব্যর্থ হয়।

সোহেলের অপরাধী চরিত্র ও সন্ত্রাস মামলা

পুলিশ জানায়, সোহেল রানার বিরুদ্ধে নাটোরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি মামলা রয়েছে। তার স্ত্রীর বক্তব্য উদ্ধৃত করে ডিএমপির এই কর্মকর্তা বলেন, ‘তিনি সম্ভবত বিকৃত যৌনরুচিসম্পন্ন একটা লোক। তিনি তার স্ত্রীকেও বিভিন্নভাবে টর্চার করেছেন।’

তদন্ত ও পরবর্তী পদক্ষেপ

ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করে সিআইডিতে পাঠানো হয়েছে। শিশুটির সঙ্গে যৌন ক্রিয়া হয়েছিল কি না, তা পরীক্ষার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে। খবর পেয়ে পল্লবী থানা পুলিশ, সিআইডি ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে তদন্ত শুরু করেন। মিরপুর বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মোস্তাক সরকার জানান, আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে বিস্তারিত জানানো হবে।

পল্লবীর এই লোমহর্ষক ঘটনা সারা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে। আট বছরের একটি শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা, মাথা বিচ্ছিন্ন, হাত টুকরো করার চেষ্টা— একেকটি তথ্যই যেন পৈশাচিকতার চরম নিদর্শন। পুলিশের দ্রুত গ্রেপ্তার ও সংবাদ সম্মেলনে তথ্য প্রকাশ প্রশংসনীয়। তবে সোহেলের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস মামলার তথ্য ও বিকৃত যৌনরুচির বিষয়টি গভীর উদ্বেগের। রামিসার মা যদি সময়মতো সন্দেহ না করতেন, তাহলে হয়তো মরদেহ আরও বিকৃত করা হতো বা গুম হয়ে যেত। সিআইডির প্রতিবেদন ও দ্রুত বিচার এখন সময়ের দাবি। শিশু নিরাপত্তায় আরও কঠোর আইন ও সামাজিক সচেতনতা জরুরি।


আপনার মতামত লিখুন

গণবার্তা

বুধবার, ২০ মে ২০২৬


আট বছরের শিশু রামিসার লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড

প্রকাশের তারিখ : ২০ মে ২০২৬

featured Image
আট বছরের ফুটফুটে শিশু রামিসা (কিছু প্রতিবেদনে লামিসা)। মায়াবি চেহারার এই শিশুটিকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। হত্যার পর দেহ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলে ঘাতক। লোমহর্ষক এই ঘটনাটি ঘটেছে রাজধানীর পল্লবীতে। মঙ্গলবার (১৯ মে) সকালে পল্লবীর ১১ নম্বর সেকশনের বি ব্লকের একটি ভবনের তৃতীয় তলার পাশের ফ্লাট থেকে রামিসার দুই টুকরো দেহ উদ্ধার করা হয়। দেহ পাওয়া যায় খাটের নিচে, আর বিচ্ছিন্ন মাথা বাসার শৌচাগারে। পুলিশ পরে জানায়, ধর্ষণের পরেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে।ঘটনার শুরু ও নিখোঁজরামিসা আক্তার স্থানীয় একটি স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়তো। তার বাবার নাম আবদুল হান্নান মোল্লা। তিনি একটি রিক্রুটিং এজেন্সিতে চাকরি করেন। মায়ের নাম পারভীন আক্তার। তাদের দুই মেয়ের মধ্যে রামিসা ছোট। বড় মেয়ে রাইসা আক্তার নবম শ্রেণিতে পড়ে। পরিবারটি প্রায় ১৭ বছর ধরে পল্লবীর ওই ফ্ল্যাটে বসবাস করছে।মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বড় বোন রাইসার সঙ্গে রামিসার স্কুলে যাওয়ার কথা ছিল। হঠাৎ করেই রামিসাকে পাওয়া যাচ্ছিল না। তাঁর মা পারভীন ফ্ল্যাটের দরজার বাইরে দেখেন, রামিসার পায়ের একটি জুতা পড়ে আছে। তখন তিনি পাশের ফ্ল্যাটের দরজায় নক করেন। ভেতর থেকে বন্ধ দরজাটি খোলা হচ্ছিল না। অনেক সময় নক করেও দরজা না খোলায় সন্দেহ বাড়ে। পরে বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয়।লাশ উদ্ধারপুলিশ এসে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। ভেতরে গিয়ে তারা রামিসার মরদেহ পায়। লাশটি ছিল দুই টুকরো— শরীর খাটের নিচে এবং মাথা শৌচাগারে। পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাসান বাসির বলেন, শিশুটির মাথা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছে। পল্লবী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) এমদাদুল হক বলেন, আমরা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন পেয়ে ঘটনাস্থলে যাই।গ্রেপ্তার ও আটকএ ঘটনায় ঘাতক সোহেল রানা (৩৪)-কে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এছাড়া তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার (২৬) কে আটক করে পুলিশ। ঘাতক সোহেল পেশায় রিকশার মেকানিক। পুলিশ জানায়, সোহেল রানা ওই কক্ষে দুই মাস আগে স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস শুরু করেন। ঘটনার পর তিনি শৌচাগারের গ্রিল ভেঙে পালিয়ে যান। তবে স্ত্রীকে ঘটনাস্থলেই আটক করা হয়। প্রতিবেশী হওয়ায় রামিসার সঙ্গে সোহেলদের পরিবারের পরিচয় ছিল।পুলিশের সংবাদ সম্মেলন ও ধর্ষণের ধারণামঙ্গলবার রাতে পল্লবী থানায় সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) এস এন নজরুল ইসলাম ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘সম্ভবত বাথরুমে শিশুটির সঙ্গে মূল আসামির অবৈধ ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। আলামত সংগ্রহ করে সিআইডিতে পাঠানো হয়েছে।’তিনি আরও বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে আমাদের ধারণা, ধর্ষণের কারণে শিশুটির রক্তপাত শুরু হলে তাকে হত্যা করে মরদেহ গুম করার পরিকল্পনা করেন অভিযুক্ত ব্যক্তি।’মরদেহ টুকরো করার পরিকল্পনামরদেহ টুকরো করার পরিকল্পনা প্রসঙ্গে এস এন নজরুল ইসলাম জানান, ‘মরদেহ লুকানোর জন্যই সম্ভবত মাথা বিচ্ছিন্ন করা হয়। হাত কেটে টুকরো করার চেষ্টাও করা হয়। কিন্তু শিশুটির মা দরজায় ধাক্কাধাক্কি শুরু করলে মূল আসামি জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যান। পুরো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেননি তিনি।’অর্থাৎ, রামিসাকে ৮ টুকরো করার পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু মায়ের সন্দেহ ও সময়মতো দরজায় ধাক্কা দেওয়ায় তা ব্যর্থ হয়।সোহেলের অপরাধী চরিত্র ও সন্ত্রাস মামলাপুলিশ জানায়, সোহেল রানার বিরুদ্ধে নাটোরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি মামলা রয়েছে। তার স্ত্রীর বক্তব্য উদ্ধৃত করে ডিএমপির এই কর্মকর্তা বলেন, ‘তিনি সম্ভবত বিকৃত যৌনরুচিসম্পন্ন একটা লোক। তিনি তার স্ত্রীকেও বিভিন্নভাবে টর্চার করেছেন।’তদন্ত ও পরবর্তী পদক্ষেপঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করে সিআইডিতে পাঠানো হয়েছে। শিশুটির সঙ্গে যৌন ক্রিয়া হয়েছিল কি না, তা পরীক্ষার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে। খবর পেয়ে পল্লবী থানা পুলিশ, সিআইডি ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে তদন্ত শুরু করেন। মিরপুর বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মোস্তাক সরকার জানান, আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে বিস্তারিত জানানো হবে।পল্লবীর এই লোমহর্ষক ঘটনা সারা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে। আট বছরের একটি শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা, মাথা বিচ্ছিন্ন, হাত টুকরো করার চেষ্টা— একেকটি তথ্যই যেন পৈশাচিকতার চরম নিদর্শন। পুলিশের দ্রুত গ্রেপ্তার ও সংবাদ সম্মেলনে তথ্য প্রকাশ প্রশংসনীয়। তবে সোহেলের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস মামলার তথ্য ও বিকৃত যৌনরুচির বিষয়টি গভীর উদ্বেগের। রামিসার মা যদি সময়মতো সন্দেহ না করতেন, তাহলে হয়তো মরদেহ আরও বিকৃত করা হতো বা গুম হয়ে যেত। সিআইডির প্রতিবেদন ও দ্রুত বিচার এখন সময়ের দাবি। শিশু নিরাপত্তায় আরও কঠোর আইন ও সামাজিক সচেতনতা জরুরি।

গণবার্তা

সম্পাদকঃ নূর মোহাম্মদ
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্ব সংরক্ষিত গণবার্তা