ঢাকা    শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬
ঢাকা    শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬
গণবার্তা

লক্ষ্মীপুরে নৃশংস হত্যাযজ্ঞ: ঘরে ঢুকে মা ও তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যা, গণপিটুনিতে নিহত হামলাকারী।

লক্ষ্মীপুরে নৃশংস হত্যাযজ্ঞ: ঘরে ঢুকে মা ও তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যা, গণপিটুনিতে নিহত হামলাকারী।

লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে হৃদয়বিদারক ও মর্মান্তিক এক হত্যাকাণ্ডে স্তব্ধ হয়ে গেছে পুরো এলাকা। পাওনা টাকা নিয়ে বিরোধের জেরে এক যুবক দিনের আলোয় বাসায় ঢুকে একে একে কুপিয়ে হত্যা করেছে এক মা ও তার তিন মেয়েকে। পরে পালিয়ে যাওয়ার সময় স্থানীয় জনতার হাতে আটক হয়ে গণপিটুনিতে নিহত হয় অভিযুক্ত যুবক।

বৃহস্পতিবার (২৬ জুন) সকালে রায়পুর পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের গোডাউন রোড এলাকার ধানহাটায় এ ভয়াবহ ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন—শাহিনুর বেগম (৩৮), তার বড় মেয়ে সায়মা আক্তার (২১), মেজ মেয়ে ইকরা আক্তার (১৭) এবং ছোট মেয়ে শিফা আক্তার (৯)।

জানা গেছে, সায়মা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন এবং ইকরা রায়পুর কাজী ফারুকী কলেজের দ্বাদশ শ্রেণিতে অধ্যয়নরত ছিলেন। ঘটনার সময় বাড়িতে না থাকায় একমাত্র ছেলে কলেজছাত্র জুনায়েদ ইসলাম শিফাত প্রাণে বেঁচে যান।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় পাঁচ থেকে ছয় বছর আগে একই ভবনের অন্য একটি বাসায় ভাড়া থাকতেন অন্তর মজুমদার নামে ওই যুবক। পেশায় তিনি ফল ব্যবসায়ী ছিলেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন কারণে বাড়িওয়ালা তাকে বাসা ছেড়ে দিতে বাধ্য করেন। শাহিনুর বেগমের কাছেও তার কিছু টাকা পাওনা ছিল বলে জানা যায়।

বৃহস্পতিবার সকালে পাওনা টাকা আদায়ের উদ্দেশ্যে শাহিনুর বেগমের বাসায় যান অন্তর। একপর্যায়ে টাকা-পয়সা নিয়ে দুজনের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে সঙ্গে থাকা ধারালো দা দিয়ে শাহিনুর বেগমের ওপর এলোপাতাড়ি হামলা চালায় সে।

মায়ের আর্তচিৎকার শুনে তিন মেয়ে ছুটে এসে তাকে রক্ষার চেষ্টা করলে হামলাকারী তাদের ওপরও নির্মমভাবে কোপাতে থাকে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই পুরো বাসা রক্তাক্ত হয়ে ওঠে।

হাসপাতালে নেওয়ার আগেই নিভে যায় চারটি প্রাণ

প্রতিবেশীরা গুরুতর আহত অবস্থায় চারজনকে উদ্ধার করে রায়পুর সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসক শাহিনুর বেগম, সায়মা ও ছোট মেয়ে শিফাকে মৃত ঘোষণা করেন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় ইকরাকে ঢাকায় নেওয়ার পথে তারও মৃত্যু হয়।

হত্যাকাণ্ডের পর ভবনের পেছনের দরজা দিয়ে পালানোর চেষ্টা করে অন্তর মজুমদার। এ সময় স্থানীয় লোকজন তাকে ধাওয়া করে আটক করেন। ক্ষুব্ধ জনতা তাকে গণপিটুনি দিলে গুরুতর আহত অবস্থায় লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সেখানেই তার মৃত্যু হয়।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, অভিযুক্ত অন্তর প্রায় দেড় বছর ওই এলাকায় স্ত্রীকে নিয়ে ভাড়া থাকতেন। সাত থেকে আট মাস আগে তিনি বাসা ছেড়ে চলে গেলেও পূর্বপরিচয়ের সূত্র ধরে প্রায়ই এলাকায় আসা-যাওয়া করতেন।

লক্ষ্মীপুর জেলা পুলিশ সুপার মো. আবু তারেক জানান, ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত চলছে। হত্যাকাণ্ডের সময় ও পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে পুলিশের সাত সদস্য আহত হয়েছেন। উত্তেজিত জনতার ছোড়া ইট-পাটকেলে তারা আহত হন।

স্বামীকে হারানোর সাত বছর পর শেষ হয়ে গেল পুরো পরিবার

নিহত শাহিনুর বেগমের স্বামী কামাল হোসেন ২০১৯ সালে রাস্তায় পড়ে থাকা বৈদ্যুতিক তারে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান। এরপর থেকে একাই তিন মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে সংগ্রাম করে সংসার চালিয়ে আসছিলেন শাহিনুর।

পরিবারের সদস্যরা জানান, সন্তানদের উচ্চশিক্ষিত করে প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্ন ছিল তার। বড় মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন, মেজ মেয়ে উচ্চমাধ্যমিকে এবং ছোট মেয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছিল।

একমাত্র ছেলে শিফাতের আহাজারি , ঘটনার সময় সংসারের খরচ জোগাতে কাজে ছিলেন শাহিনুরের একমাত্র ছেলে জুনায়েদ ইসলাম শিফাত। ফিরে এসে একসঙ্গে মা ও তিন বোনের রক্তাক্ত মরদেহ দেখে ভেঙে পড়েন তিনি।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে শিফাত বলেন,

“বাবা আমাদের বলেছিলেন, তোমরা লেখাপড়া করে মানুষের মতো মানুষ হবে। বাবা নেই, এখন মা আর তিন বোনকেও হারালাম। আমি এখন কার জন্য বাঁচব? আমার তো আর কেউ রইল না। মুহূর্তেই আমার পুরো পৃথিবী শেষ হয়ে গেছে।”

তার এই হৃদয়বিদারক আহাজারিতে উপস্থিত সবাই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।

এক পরিবারের চার সদস্যের মর্মান্তিক মৃত্যুতে রায়পুরজুড়ে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। স্থানীয়দের দাবি, ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে এবং ভবিষ্যতে এমন নৃশংস ঘটনা যেন আর না ঘটে, সে বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটির সব দিক গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। হত্যার পেছনে ব্যক্তিগত বিরোধ, আর্থিক লেনদেন কিংবা অন্য কোনো কারণ জড়িত ছিল কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

আপনার মতামত লিখুন

গণবার্তা

শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬


লক্ষ্মীপুরে নৃশংস হত্যাযজ্ঞ: ঘরে ঢুকে মা ও তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যা, গণপিটুনিতে নিহত হামলাকারী।

প্রকাশের তারিখ : ২৬ জুন ২০২৬

featured Image
লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে হৃদয়বিদারক ও মর্মান্তিক এক হত্যাকাণ্ডে স্তব্ধ হয়ে গেছে পুরো এলাকা। পাওনা টাকা নিয়ে বিরোধের জেরে এক যুবক দিনের আলোয় বাসায় ঢুকে একে একে কুপিয়ে হত্যা করেছে এক মা ও তার তিন মেয়েকে। পরে পালিয়ে যাওয়ার সময় স্থানীয় জনতার হাতে আটক হয়ে গণপিটুনিতে নিহত হয় অভিযুক্ত যুবক।বৃহস্পতিবার (২৬ জুন) সকালে রায়পুর পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের গোডাউন রোড এলাকার ধানহাটায় এ ভয়াবহ ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন—শাহিনুর বেগম (৩৮), তার বড় মেয়ে সায়মা আক্তার (২১), মেজ মেয়ে ইকরা আক্তার (১৭) এবং ছোট মেয়ে শিফা আক্তার (৯)।জানা গেছে, সায়মা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন এবং ইকরা রায়পুর কাজী ফারুকী কলেজের দ্বাদশ শ্রেণিতে অধ্যয়নরত ছিলেন। ঘটনার সময় বাড়িতে না থাকায় একমাত্র ছেলে কলেজছাত্র জুনায়েদ ইসলাম শিফাত প্রাণে বেঁচে যান।স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় পাঁচ থেকে ছয় বছর আগে একই ভবনের অন্য একটি বাসায় ভাড়া থাকতেন অন্তর মজুমদার নামে ওই যুবক। পেশায় তিনি ফল ব্যবসায়ী ছিলেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন কারণে বাড়িওয়ালা তাকে বাসা ছেড়ে দিতে বাধ্য করেন। শাহিনুর বেগমের কাছেও তার কিছু টাকা পাওনা ছিল বলে জানা যায়।বৃহস্পতিবার সকালে পাওনা টাকা আদায়ের উদ্দেশ্যে শাহিনুর বেগমের বাসায় যান অন্তর। একপর্যায়ে টাকা-পয়সা নিয়ে দুজনের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে সঙ্গে থাকা ধারালো দা দিয়ে শাহিনুর বেগমের ওপর এলোপাতাড়ি হামলা চালায় সে।মায়ের আর্তচিৎকার শুনে তিন মেয়ে ছুটে এসে তাকে রক্ষার চেষ্টা করলে হামলাকারী তাদের ওপরও নির্মমভাবে কোপাতে থাকে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই পুরো বাসা রক্তাক্ত হয়ে ওঠে।হাসপাতালে নেওয়ার আগেই নিভে যায় চারটি প্রাণপ্রতিবেশীরা গুরুতর আহত অবস্থায় চারজনকে উদ্ধার করে রায়পুর সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসক শাহিনুর বেগম, সায়মা ও ছোট মেয়ে শিফাকে মৃত ঘোষণা করেন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় ইকরাকে ঢাকায় নেওয়ার পথে তারও মৃত্যু হয়।হত্যাকাণ্ডের পর ভবনের পেছনের দরজা দিয়ে পালানোর চেষ্টা করে অন্তর মজুমদার। এ সময় স্থানীয় লোকজন তাকে ধাওয়া করে আটক করেন। ক্ষুব্ধ জনতা তাকে গণপিটুনি দিলে গুরুতর আহত অবস্থায় লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সেখানেই তার মৃত্যু হয়।পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, অভিযুক্ত অন্তর প্রায় দেড় বছর ওই এলাকায় স্ত্রীকে নিয়ে ভাড়া থাকতেন। সাত থেকে আট মাস আগে তিনি বাসা ছেড়ে চলে গেলেও পূর্বপরিচয়ের সূত্র ধরে প্রায়ই এলাকায় আসা-যাওয়া করতেন।লক্ষ্মীপুর জেলা পুলিশ সুপার মো. আবু তারেক জানান, ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত চলছে। হত্যাকাণ্ডের সময় ও পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে পুলিশের সাত সদস্য আহত হয়েছেন। উত্তেজিত জনতার ছোড়া ইট-পাটকেলে তারা আহত হন।স্বামীকে হারানোর সাত বছর পর শেষ হয়ে গেল পুরো পরিবারনিহত শাহিনুর বেগমের স্বামী কামাল হোসেন ২০১৯ সালে রাস্তায় পড়ে থাকা বৈদ্যুতিক তারে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান। এরপর থেকে একাই তিন মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে সংগ্রাম করে সংসার চালিয়ে আসছিলেন শাহিনুর।পরিবারের সদস্যরা জানান, সন্তানদের উচ্চশিক্ষিত করে প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্ন ছিল তার। বড় মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন, মেজ মেয়ে উচ্চমাধ্যমিকে এবং ছোট মেয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছিল।একমাত্র ছেলে শিফাতের আহাজারি , ঘটনার সময় সংসারের খরচ জোগাতে কাজে ছিলেন শাহিনুরের একমাত্র ছেলে জুনায়েদ ইসলাম শিফাত। ফিরে এসে একসঙ্গে মা ও তিন বোনের রক্তাক্ত মরদেহ দেখে ভেঙে পড়েন তিনি।কান্নাজড়িত কণ্ঠে শিফাত বলেন,“বাবা আমাদের বলেছিলেন, তোমরা লেখাপড়া করে মানুষের মতো মানুষ হবে। বাবা নেই, এখন মা আর তিন বোনকেও হারালাম। আমি এখন কার জন্য বাঁচব? আমার তো আর কেউ রইল না। মুহূর্তেই আমার পুরো পৃথিবী শেষ হয়ে গেছে।”তার এই হৃদয়বিদারক আহাজারিতে উপস্থিত সবাই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।এক পরিবারের চার সদস্যের মর্মান্তিক মৃত্যুতে রায়পুরজুড়ে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। স্থানীয়দের দাবি, ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে এবং ভবিষ্যতে এমন নৃশংস ঘটনা যেন আর না ঘটে, সে বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটির সব দিক গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। হত্যার পেছনে ব্যক্তিগত বিরোধ, আর্থিক লেনদেন কিংবা অন্য কোনো কারণ জড়িত ছিল কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

গণবার্তা

সম্পাদকঃ নূর মোহাম্মদ
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্ব সংরক্ষিত গণবার্তা