জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) মহিলা ওয়াশরুমে নারী শিক্ষার্থীর গোপনে ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে আটক এক বহিরাগতকে পুলিশে সোপর্দ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। মঙ্গলবার দিবাগত রাত পৌনে দুইটার দিকে নারী শিক্ষার্থীদের হাতে আটক হন ঐ বহিরাগত। আটক বহিরাগত হলেন- কেরানীগঞ্জের বাসিন্দা রিয়াজ আহমেদ (রাজ)। তিনি আরএফএল ইলেকট্রনিক্স গ্রুপের ব্রাঞ্চ ম্যানেজার বলে জানান।
অভিযোগপত্র ও ভুক্তভোগীর সহপাঠীদের সূত্রে জানা যায়, অভিযুক্ত রিয়াজ বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে নারী শিক্ষার্থীদের ওয়াশরুমে প্রবেশ করেন। এ সময় এক নারী শিক্ষার্থী তাকে ওয়াশরুমের ভেতরে দেখতে পেয়ে তার পরিচয় ও সেখানে প্রবেশের কারণ জানতে চান। পরে তার আচরণ সন্দেহজনক হলে শিক্ষার্থীরা তার মোবাইল ফোন চেক করতে চাইলে অভিযুক্ত দিতে নারাজ হয়। এমন অবস্থায় শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে মোবাইল দিলে তার ফোনে গোপনে ওয়াশরুমের দরজার ফাঁকা দিয়ে ভিডিও ধারণ পাওয়া যায়। এছাড়া বিগত জানুয়ারি মাস থেকে নিয়মিত এই ওয়াশরুমে নারীদের গোপন ভিডিও পাওয়া যায় তার ফোন গ্যালারিতে। এসময় উপস্থিত শিক্ষার্থীরা তাকে উত্তম-মধ্যম দেন। পরে নিরাপত্তা কর্মকর্তারা তাকে প্রক্টরের সহযোগিতায় পুলিশে সোপর্দ করতে গেলে শিক্ষার্থীরা ভুক্তভোগীর লিখিত অভিযোগ নিয়ে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে মামলা করতে বলে।
এরপর ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের লিখিত অভিযোগ নিয়ে তাকে পুলিশে সোপর্দ করা হয়। এসময় তার মোবাইল ফোন জব্দ করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেন শিক্ষার্থীরা। তবে অভিযুক্ত এ বিষয়ে দোষ স্বীকার করেননি। তিনি জানান ক্যাম্পাসের এক শিক্ষার্থীর ফোনে টাকা না থাকায় তার ফোনটি নেন কথা বলার জন্য। পরে ঐ শিক্ষার্থী মেয়েদের ওয়াশরুমের দিকে গেলে তিনিও পিছু পিছু মেয়েদের ওয়াশরুমে যান বলে জানান তিনি। এ বিষয়ে উপপরিদর্শক আজিজুর রহমান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের অভিযোগে আমরা তাকে আটক করেছি। প্রাথমিক তদন্ত শেষে তার বিরুদ্ধে মামলা করা হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. রাশিদুল আলম বলেন, শিক্ষার্থীদের খবরে আমরা তাকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করি। তার মোবাইলে ভিডিও পাওয়া গেছে। এজন্য নিয়ম মেনে তাকে পুলিশে সোপর্দ করা হয়েছে। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে বাদী হয়ে মামলার প্রস্তুতি গ্রহণ করেছি। পরে, অভিযুক্তের সাথে ক্যাম্পাস থেকে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী সহ আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী যান এ বি থানায় এজহার দায়ের করতে।
এই ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। নারী শিক্ষার্থীরা নিরাপত্তাহীনতা প্রকাশ করে প্রশাসনের কাছে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, এই ঘটনা অত্যন্ত লজ্জাজনক এবং নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য প্রশাসনকে আরও সচেতন হতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, তারা এই ঘটনা অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখছে এবং অপরাধীর বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রক্টর অফিস থেকে জানানো হয়েছে, ক্যাম্পাসে এ ধরনের ঘটনা রোধে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হবে এবং ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। শিক্ষার্থীরা বলেছেন, এই ঘটনা প্রমাণ করে যে ক্যাম্পাসে নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এখনও যথেষ্ট নয়। তারা প্রশাসনের কাছে ক্যাম্পাসে আরও সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং নিরাপত্তা প্রহরী নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন। ইতিমধ্যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সংগঠন এ ঘটনার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। তারা অভিযুক্তের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন। পুলিশ জানিয়েছে, তারা ঘটনার তদন্ত করছে এবং প্রাথমিকভাবে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধ আইনে মামলা করার কথা বিবেচনা করছে। অভিযুক্তের ফোনে পাওয়া ভিডিওগুলো তদন্তের জন্য ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হবে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঘটনা সারাদেশে নারী নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। সমাজের বিভিন্ন মহল এই ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে এবং ক্যাম্পাসগুলোতে নারী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ধরনের ঘটনা রোধে আইন প্রয়োগ ও সামাজিক সচেতনতা উভয়ই জরুরি। অন্যথায় নারীরা নিরাপদ থাকতে পারবে না। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজনে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেবে। তারা নারী শিক্ষার্থীদের আশ্বস্ত করেছে যে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা সর্বাত্মক চেষ্টা করবে। এই ঘটনার পর শিক্ষার্থীরা প্রশাসনের ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনতে চান এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেখতে চান। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে এই মামলার অগ্রগতি জানা যাবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০১ জুলাই ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন