অধিকৃত পশ্চিম তীরের এক ফিলিস্তিনি পরিবারের স্বপ্নের বাড়ি নির্মাণ শেষ হওয়ার আগেই সেটি দখল করে নিয়েছে একদল ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী (সেটলার)। বাড়িটি ছিল মোহাম্মদ সালামেহর পরিবারের জন্য নির্মাণাধীন, যেখানে সম্প্রতি বাগদান হওয়া তার ছেলে বিয়ের পর নতুন জীবন শুরু করার কথা ছিল। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের যাচাই করা ভিডিওতে দেখা গেছে, অন্তত ছয়জন ইসরায়েলি সেটলার দুই তলা নির্মাণাধীন বাড়িটির ছাদে ঘোরাফেরা করছেন। বাড়িটি একটি পাহাড়ের নিচে অবস্থিত। মোহাম্মদ সালামেহ জানান, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ও পুলিশের কাছে একাধিকবার অভিযোগ করলেও কোনো সহায়তা পাননি। এখন তার আশঙ্কা, পরিবারের বাড়িটি আর কখনও ফিরে পাওয়া যাবে না। একই পরিণতি আশপাশের অন্যান্য ফিলিস্তিনি বাড়িরও হতে পারে। তিনি বলেন, শুধু আল্লাহই জানেন কী হবে। যদি সত্যিই আইন-শৃঙ্খলা বলে কিছু থাকে, তাহলে তারা চলে যাবে। কিন্তু যদি তারা একটি বাড়ি দখলে সফল হয়, তাহলে একের পর এক অন্য বাড়িগুলোও দখল করবে। রয়টার্স দখলকারী সেটলারদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি। বৃহস্পতিবারও তাদের একজনকে বাড়িটির ছাদে হাঁটাহাঁটি করতে দেখা গেছে। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানায়, তারা বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। তবে প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেয়নি। ইসরায়েলি পুলিশও মন্তব্যের অনুরোধে তাৎক্ষণিক সাড়া দেয়নি।
পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের জমি দখল নতুন কোনো ঘটনা নয়। বর্তমানে সেখানে প্রায় পাঁচ লাখ ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী প্রায় ৩০ লাখ ফিলিস্তিনির পাশাপাশি বসবাস করছেন। বহু বছর ধরে ফিলিস্তিনিরা অভিযোগ করে আসছেন, বসতি সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে তাদের কৃষিজমি নষ্ট করা, বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর এবং গাছপালা উপড়ে ফেলার ঘটনা নিয়মিত ঘটছে। জাতিসংঘের এক তদন্ত প্রতিবেদনে গত মাসে জানানো হয়, ২০২৩ সালের পর থেকে ফিলিস্তিনি গ্রাম ও কৃষিজমিতে ইসরায়েলি সেটলারদের হামলা ১৩০ শতাংশ বেড়েছে। সালামেহর গ্রামের নাম জালুদ। গ্রামের কাউন্সিল প্রধান রায়েদ আল-হাজ মোহাম্মদ বলেন, এবারের ঘটনাটি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক, কারণ এবার প্রথমবারের মতো নির্মাণাধীন একটি বাড়িই দখল করে নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, সেটলাররা এখন জালুদের শেষ বাড়ি থেকে মাত্র ১০০ মিটার দূরে নেমে এসেছে। ওই বাড়িটিও গ্রামের এক বাসিন্দার নির্মাণাধীন বাড়ি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, জালুদ গ্রাম ইতোমধ্যে অন্তত পাঁচটি বড় ধরনের সেটলার হামলার শিকার হয়েছে। এসব হামলায় বাড়িঘরে আগুন দেয়া, যানবাহন ভাঙচুর এবং শত শত গাছ উপড়ে ফেলার ঘটনা ঘটেছে।
জাতিসংঘ এবং বিশ্বের অধিকাংশ দেশ পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করে। তাদের মতে, চতুর্থ জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী দখলকৃত ভূখণ্ডে দখলদার রাষ্ট্রের বেসামরিক জনগণকে স্থানান্তর করা নিষিদ্ধ। তবে ইসরাইল এই অবস্থান প্রত্যাখ্যান করে। দেশটির দাবি, পশ্চিম তীর একটি “বিতর্কিত ভূখণ্ড” এবং সেখানে হাজার হাজার বছর ধরে ইহুদিদের ঐতিহাসিক উপস্থিতি রয়েছে। অন্যদিকে ফিলিস্তিনিরা পশ্চিম তীর, গাজা উপত্যকা এবং পূর্ব জেরুজালেমকে ভবিষ্যৎ স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের অংশ হিসেবে দাবি করে। বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ এবং সেটলারদের সহিংসতা দীর্ঘদিন ধরেই ইসরাইল-ফিলিস্তিন শান্তি প্রচেষ্টার অন্যতম প্রধান বাধা। যুক্তরাষ্ট্রসহ ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ মিত্ররাও বহুবার সেটলারদের সহিংস কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেছে। তবুও প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর বসতি সম্প্রসারণের গতি আরও বেড়েছে। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে সরকারটি বসতিপন্থী কট্টরপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর নির্ভরশীল।
মোহাম্মদ সালামেহ জানান, ২০২৩ সালে গাজা যুদ্ধ শুরুর পর তার ছেলে কাজ হারিয়ে ফেলেন। এতে পরিবারের আর্থিক সংকট তৈরি হয় এবং বাড়ির নির্মাণকাজও থেমে যায়। তিনি বলেন, আমাদের পাশের প্রতিবেশীও দুইতলা একটি বাড়ি নির্মাণ করেছেন। যদি আমরা এই বাড়িটি হারাই, তাহলে সম্ভবত তাদের বাড়িটিও তারা দখল করে নেবে। সালামেহর পরিবারের এই ঘটনা পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের জন্য একটি নতুন উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। তারা আশঙ্কা করছেন, এভাবে একের পর এক বাড়ি দখল করা হলে তারা তাদের এলাকা থেকে বিতাড়িত হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তারা দ্রুত হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন। ইসরায়েলের এই পদক্ষেপের ফলে পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে মামলা করার হুমকি দিয়েছে। তবে ইসরায়েলি সরকার তাদের অবস্থানে অনড়। তারা বলেছে, বসতি স্থাপন তাদের অধিকার এবং তারা তা অব্যাহত রাখবে। এই সংঘাতের কোনো সহজ সমাধান নেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। আপাতত সালামেহর পরিবারের মতো আরও কত পরিবার তাদের স্বপ্নের বাড়ি হারায়, সেদিকে তাকিয়ে আছে বিশ্ব। ফিলিস্তিনিরা তাদের অধিকার ও জমি রক্ষায় আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। অন্যদিকে, ইসরায়েলি সরকারও তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এগিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে আরও একটি বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত এই সমস্যার সমাধানে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করা। অন্যথায় এই অঞ্চলে সহিংসতা আরও বাড়তে পারে এবং আরও বেশি ফিলিস্তিনি তাদের বাড়ি-জমি হারাবে। সালামেহর পরিবারের করুণ কাহিনী এই সংঘাতের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। তাদের মতো আরও কত পরিবার প্রতিদিন এই সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। এই সমস্যার সমাধান না হলে ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগ বাড়তেই থাকবে। তাই এখন সময় এসেছে বিশ্ব নেতাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার এবং এই সংকটের স্থায়ী সমাধান খোঁজার। অন্যথায় ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে। সবাই আশা করে, শান্তি ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে এই সংকটের সমাধান হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই পথটি অত্যন্ত কঠিন এবং দীর্ঘ। তবুও আশা ছাড়া উপায় নেই। সালামেহর পরিবারের মতো মানুষরা তাদের বাড়ি ফিরে পাওয়ার আশায় রয়েছে। হয়তো একদিন সেই দিন আসবে। ততদিন পর্যন্ত তারা সংগ্রাম চালিয়ে যাবে এবং বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের গল্প নয়, এটি পুরো ফিলিস্তিনি জনগণের সংগ্রামের প্রতীক। তাদের অধিকার ও মর্যাদার জন্য এই লড়াই অব্যাহত থাকবে। আশা করি, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই বিষয়ে সচেতন হবে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। ফিলিস্তিনিদের স্বপ্নের বাড়ি যেন আর কেউ দখল করতে না পারে, সেজন্য সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। তবেই একটি শান্তিপূর্ণ ও ন্যায়পূর্ণ সমাধান সম্ভব।

শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ জুলাই ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন