খুন করেই শেষ নয়, পরিচয় মুছে ফেলতে মরদেহ টুকরো করে গুমের চেষ্টা। রাজধানী থেকে মফস্বল—কখনো ড্রামে, কখনো বস্তা, কার্টন, পলিথিন কিংবা ব্যাগে ভরে ফেলা হচ্ছে মরদেহের খণ্ডিত অংশ। আবার দেহের অংশ ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে খাল-পুকুর কিংবা সড়কের পাশে। প্রকাশিত সংবাদ ও পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে এমন অন্তত এক ডজন ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধারের কোনো সমন্বিত জাতীয় হিসাব পুলিশের প্রকাশ্য প্রতিবেদনে নেই।
সর্বশেষ শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর আদাবরের হাক্কার মোড় এলাকার খাল থেকে এক নারীর খণ্ডিত মরদেহ এবং একই দিনে ফরিদপুরের মধুখালীতে তিনটি কার্টন থেকে অজ্ঞাত এক ব্যক্তির ছয় টুকরা মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। দুটি ঘটনাতেই নিহতের পরিচয় তাত্ক্ষণিকভাবে শনাক্ত করা যায়নি।
রাজধানীতে ড্রামে ২৬, খালে ১০ টুকরা
রাজধানীর শাহবাগে রংপুরের ব্যবসায়ী আশরাফুল হকের মরদেহ দুটি ড্রাম থেকে উদ্ধার করা হয়। তদন্তে উঠে আসে, তাকে হত্যার পর মরদেহ ২৬ টুকরা করা হয়েছিল। মুগদায় সৌদিপ্রবাসী মোকাররম মিয়াকে হত্যার পর মরদেহ খণ্ডিত করার অভিযোগ ওঠে। পল্টন-মতিঝিল এলাকায় ওবায়দুল্লাহ হত্যার পর তার শরীরের বিভিন্ন অংশ রাজধানীর কয়েকটি স্থানে ফেলে দেওয়া হয়। সবুজবাগে একটি সেতুর নিচ থেকে অজ্ঞাত নারীর মাথা ও দুই হাত উদ্ধার করা হয়। শরীরের বাকি অংশ তখনো নিখোঁজ ছিল। আর ডেমরায় আলী হোসেনকে হত্যার পর মরদেহ ১০ টুকরা করে ডিএনডি খালে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। নিখোঁজের জিডির সূত্র ধরে তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ হত্যার তথ্য পায়।
আদাবরে ব্যাগে নারী, মধুখালীতে কার্টনে পুরুষ
আদাবর থানার ওসি জাহিদুল ইসলাম জানান, স্থানীয়দের খবরের ভিত্তিতে গতকাল শনিবার হাক্কার মোড় এলাকার খাল থেকে বস্তাবন্দি অবস্থায় নারীর খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তার পরনে ছিল মেরুন রঙের জামা ও জলপাই রঙের পায়জামা। বিচ্ছিন্ন দুই হাত, মাথা ও দেহের অন্যান্য অংশ একটি কালো ব্যাগে ভরে খালে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। তবে পা এখনো উদ্ধার হয়নি। নিহতের পরিচয় ও হত্যার কারণ তাত্ক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। জড়িতদের শনাক্ত ও হত্যার রহস্য উদঘাটনে তদন্ত চলছে বলে জানান ওসি।
অন্যদিকে মধুখালীর রায়পুর ইউনিয়নের বোয়ালিয়া এলাকায় ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের পাশে তিনটি কার্টন পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয়দের সন্দেহ হয়। দুর্গন্ধ বের হলে খবর দেওয়া হয় পুলিশকে। পরে কার্টন খুলে আনুমানিক ৪৫ থেকে ৫০ বছর বয়সি এক ব্যক্তির ছয় টুকরা মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
মধুখালী থানার ওসি সুকদেব রায় বলেন, নিহতের পরিচয় শনাক্তে পিবিআইসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক দল কাজ করছে। এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
১৫ টুকরা মরদেহ, ৯ প্যাকেটে নারীর দেহ
ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় নিখোঁজ কাস্টমস কর্মী রাকিব রায়হানের মরদেহ তিনটি ব্যাগ ও একটি কাপড়ের পোটলা থেকে উদ্ধার করা হয়। প্রকাশিত প্রতিবেদনে মরদেহটি ১৫ টুকরা করার কথা বলা হয়েছে।
কুমিল্লার দেবীদ্বারে ফরিদা ইয়াসমিনের খণ্ডিত মরদেহ পাওয়া যায় ৯টি পলিথিনের প্যাকেটে। মাথা ও পায়ের অংশ তখনো উদ্ধার হয়নি।
গত ২৫ জুন ফরিদপুরের সালথায় পান্নু ফকির ওরফে জামু ফকিরের হাত-পা বিচ্ছিন্ন মরদেহ সড়ক থেকে উদ্ধার করা হয়। আগের রাতে জমিজমাসংক্রান্ত সালিশে অংশ নেওয়ার পর বাড়ি ফেরার পথে তিনি হামলার শিকার হন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়।
পুলিশের বক্তব্য
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, মরদেহ খণ্ডিত করার প্রধান উদ্দেশ্য হলো—পরিচয় গোপন, আলামত নষ্ট এবং তদন্তকে বিভ্রান্ত করা। তবে ফিঙ্গারপ্রিন্ট, ডিএনএ, সিসিটিভি, মোবাইল ফোনের তথ্য ও অন্যান্য ফরেনসিক আলামত এখন তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
অপরাধীরা মনে করছে, মরদেহ টুকরা করলেই পরিচয় মুছে যাবে। কিন্তু তদন্তকারীদের কাছে একটি আঙুলের ছাপ, এক টুকরো ডিএনএ কিংবা কয়েক সেকেন্ডের সিসিটিভি ফুটেজই হয়ে উঠতে পারে পুরো হত্যা-রহস্যের চাবিকাঠি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মরদেহ খণ্ডিতকরণের ঘটনা বাড়ছে, যা উদ্বেগজনক। অপরাধীরা আরও সহিংস ও পরিকল্পিতভাবে অপরাধ করছে। এই প্রবণতা রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আরও কার্যকর ভূমিকা এবং ফরেনসিক তদন্তে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন