কুমিল্লা সেনানিবাসে ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হওয়া ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী সোহাগী জাহান ওরফে তনু হত্যা মামলায় নতুন মোড় এসেছে। তিন সন্দেহভাজনের ডিএনএ নমুনা ম্যাচিং (মেলানো) করতে আদালত সম্মতি দিয়েছেন। আজ সোমবার কুমিল্লার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম ১ নম্বর আমলি আদালতের বিচারক মো. মমিনুল হকের আদালতে তদন্ত কর্মকর্তা উপস্থিত হয়ে এ সংক্রান্ত আবেদন করলে আদালত তা মঞ্জুর করেন।
২০১৬ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় টিউশনির কথা বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আর ফেরেননি তনু। পরদিন সেনানিবাসের পাওয়ার হাউসের কাছে ঝোপ থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। দীর্ঘ এক দশকেও এই মামলার তদন্তে কূলকিনারা করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ অবস্থায় মামলার অগ্রগতি জানাতে তদন্ত কর্মকর্তাকে তলব করেছিলেন আদালত।
সোমবার বেলা ১১টার দিকে মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলাম আদালতে হাজির হন। তিনি আদালতকে মামলার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানান এবং তিন সন্দেহভাজনের ডিএনএ নমুনা ম্যাচিংয়ের আবেদন জানান।
তদন্ত কর্মকর্তা আদালতকে জানান, ২০১৭ সালের মে মাসে তনুর পোশাকে তিনজন পুরুষের শুক্রাণুর উপস্থিতি শনাক্ত করে সিআইডি। ওই তিনটি শুক্রাণুর নমুনা থেকে ডিএনএ প্রোফাইল তৈরি করা হয়। কিন্তু সন্দেহভাজনদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা নমুনার সঙ্গে সেগুলোর ম্যাচিং করা হয়নি। আদালত তাঁর আবেদনে সম্মতি দিয়েছেন।
সন্দেহভাজন তিনজন হলেন:
সার্জেন্ট জাহিদ
ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমান
সৈনিক জাহাঙ্গীর ওরফে জাহিদ
ঘটনার সময় এ তিনজন কুমিল্লা সেনানিবাসে কর্মরত ছিলেন।
তনুর বাবা ইয়ার হোসেন আদালতে উপস্থিত ছিলেন। তিনি গণবার্তাকে বলেন, “শুধু এই তিনজন নয়, আরও অনেকে জড়িত। আমি সব খুনির বিচার চাই। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে একটিবার দেখা করতে চাই। বয়স হয়েছে, মেয়ের বিচার না দেখে মরতে চাই না।”
তনুর মা আনোয়ারা বেগম বলেন, “এই জীবনে আর কিছু চাই না, শুধু মাইয়াড়ার খুনিদের বিচার দেখতে চাই। নতুন সরকার যদি বিচার না করে, তাহলে বুইজ্জাম গরিবের বিচার নাই।”
ঘটনার শুরু থেকে এ মামলার তদন্তে বারবার পরিবর্তন এসেছে। প্রথমে থানা-পুলিশ, পরে জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি), তারপর সিআইডি এবং সর্বশেষ পিবিআই তদন্ত করেছে। এ পর্যন্ত ছয়বার তদন্ত কর্মকর্তা বদলানো হয়েছে।
বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলাম ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে দায়িত্ব পান। সাত মাস পর গত বছর এপ্রিলে তিনি কুমিল্লায় এসেছিলেন। প্রায় এক বছর পর আজ আদালতে এলেন তিনি। এই দীর্ঘ সময়ে পরিবারের সঙ্গে তাঁর কোনো যোগাযোগ ছিল না বলে জানিয়েছেন তনুর বাবা।
আদালতের কাজ শেষে নেমে যাওয়ার সময় পিবিআই কর্মকর্তা চলে যান এবং তনুর বাবার সঙ্গে কোনো কথা বলেননি বলে অভিযোগ করেছেন ইয়ার হোসেন।
আদালত থেকে বেরিয়ে পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, “আমরা আদালতের তলবেই এসেছি। মামলার অগ্রগতি জানিয়েছি। ডিএনএ ম্যাচিংয়ের বিষয়ে আদালতে কথা হয়েছে। তবে এখনই বিস্তারিত বলতে চাই না। আশা করি, তদন্তের মাধ্যমে সব বেরিয়ে আসবে।”
আদালত ডিএনএ নমুনা ম্যাচিংয়ের অনুমতি দেওয়ায় এখন পিবিআই সন্দেহভাজন তিনজনের কাছ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে তনুর পোশাকে পাওয়া ডিএনএ প্রোফাইলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখবে। যদি মিল পাওয়া যায়, তাহলে দীর্ঘ এক দশক পর এই মামলায় বড় অগ্রগতি হতে পারে।
তবে পরিবারের অভিযোগ, সঠিক তদন্ত ও আন্তরিকতার অভাবে বারবার ব্যর্থ হয়েছে এই মামলা। এখন প্রত্যাশা, নতুন উদ্যোগে ন্যায়বিচার মিলবে তনুর পরিবারে।

শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৭ এপ্রিল ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন