গণবার্তা

ব্যাংকঋণ বেড়ে পৌনে দুই লাখ কোটি টাকা, অর্থনীতির জন্য ঝুঁকির সংকেত

ব্যাংকঋণ বেড়ে পৌনে দুই লাখ কোটি টাকা, অর্থনীতির জন্য ঝুঁকির সংকেত

অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান সরকারের আমলে ব্যাংক খাত থেকে সরকারি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় পৌনে দুই লাখ কোটি টাকায়। গত ১৮ মাসে এই ঋণ নেওয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসেই ব্যাংকঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের ঋণবৃদ্ধির প্রবণতা দেশের অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর একটি ভঙ্গুর অবস্থায় দেশের দায়িত্ব নেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। মানুষের প্রত্যাশা ছিল নাজেহাল অর্থনীতি থেকে দেশকে শক্ত ভিত্তিতে দাঁড় করাবেন তিনি। কিন্তু নানা কারণে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। ঋণে জর্জরিত অবস্থা থেকেই বিদায় নেয় ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার।

এরপর বহুল আকাঙ্ক্ষিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসে বিএনপি। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারও ঋণনির্ভরতার সেই পথেই হাঁটছে। ক্ষমতায় আসার মাত্র দেড় মাস বা ৪৩ দিনের মধ্যেই নতুন সরকার ব্যাংক খাত থেকে নিয়েছে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা। ড. ইউনূসের শেষের কিছু সময় আর নতুন সরকারের সময় মিলিয়ে সর্বশেষ তিন মাসে এই ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকায়।

মূলত রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের ঘাটতির কারণেই সরকারের পরিচালন ব্যয় মেটাতে এমন ঋণনির্ভরতা দেখা যাচ্ছে। চলতি (২০২৫-২৬) অর্থবছরের নির্ধারিত ব্যাংকঋণের লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করেছে মাত্র ৯ মাসেই। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গত ১৮ মাসে ব্যাংকঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় পৌনে ২ লাখ কোটি টাকায়।

উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাবে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় কেনাকাটার প্রবণতা কমেছে। বিনিয়োগের ঘাটতির কারণে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। ফলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি কমে গেছে। এসবের সম্মিলিত প্রভাবে রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে, যা চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে প্রায় সাড়ে ৭১ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল জাগো নিউজকে বলেন, ‘বেসরকারি খাত প্রাধান্য দিয়ে এগোনো উচিত। বর্তমানে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ভালো যাচ্ছে না। সরকার একটি কঠিন অবস্থায় ক্ষমতায় এসেছে। অপ্রত্যাশিতভাবে জ্বালানি সংকটে পড়তে হয়েছে।’

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, ‘ব্যাংকঋণের দ্রুত বৃদ্ধি একদিকে অর্থনীতিতে তারল্য জোগালেও অন্যদিকে এটি মুদ্রাস্ফীতি, সুদের হার বৃদ্ধি এবং খেলাপি ঋণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশেষ করে স্বল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ ঋণ গ্রহণ অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগজনক।’

গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো ও অর্থনীতিবিদ হেলাল আহমেদ জনি বলেন, ‘নেওয়া ঋণ অবশ্যই পরিশোধ করতে হবে। দেশের অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ বাড়াতে পারলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং বৈশ্বিক চাপ মোকাবিলা সহজ হবে। কোনভাবেই যেন দেশ ঋণের ফাঁদে না পড়ে, সেটাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।’

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার প্রভাব বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে পড়েছে। সরকার তেলের দাম বাড়াতে না পারায় ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। এতে ব্যয় আরও বেড়েছে। রাজস্ব আদায় কমার সঙ্গে সঙ্গে ব্যয় না কমানয় ঋণ গ্রহণ বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং কার্যকর মনিটরিং জরুরি। ঋণ যদি উৎপাদনশীল খাতে যেমন শিল্প, অবকাঠামো ও রপ্তানিমুখী খাতে সঠিকভাবে ব্যবহার করা হয়, তাহলে প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে। অন্যথায় দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য চাপ সৃষ্টি করবে। সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে নিজস্ব সম্পদ আহরণে, বিশেষ করে রাজস্ব বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

আপনার মতামত লিখুন

গণবার্তা

শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬


ব্যাংকঋণ বেড়ে পৌনে দুই লাখ কোটি টাকা, অর্থনীতির জন্য ঝুঁকির সংকেত

প্রকাশের তারিখ : ১২ এপ্রিল ২০২৬

featured Image
অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান সরকারের আমলে ব্যাংক খাত থেকে সরকারি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় পৌনে দুই লাখ কোটি টাকায়। গত ১৮ মাসে এই ঋণ নেওয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসেই ব্যাংকঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের ঋণবৃদ্ধির প্রবণতা দেশের অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর একটি ভঙ্গুর অবস্থায় দেশের দায়িত্ব নেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। মানুষের প্রত্যাশা ছিল নাজেহাল অর্থনীতি থেকে দেশকে শক্ত ভিত্তিতে দাঁড় করাবেন তিনি। কিন্তু নানা কারণে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। ঋণে জর্জরিত অবস্থা থেকেই বিদায় নেয় ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার।এরপর বহুল আকাঙ্ক্ষিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসে বিএনপি। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারও ঋণনির্ভরতার সেই পথেই হাঁটছে। ক্ষমতায় আসার মাত্র দেড় মাস বা ৪৩ দিনের মধ্যেই নতুন সরকার ব্যাংক খাত থেকে নিয়েছে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা। ড. ইউনূসের শেষের কিছু সময় আর নতুন সরকারের সময় মিলিয়ে সর্বশেষ তিন মাসে এই ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকায়।মূলত রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের ঘাটতির কারণেই সরকারের পরিচালন ব্যয় মেটাতে এমন ঋণনির্ভরতা দেখা যাচ্ছে। চলতি (২০২৫-২৬) অর্থবছরের নির্ধারিত ব্যাংকঋণের লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করেছে মাত্র ৯ মাসেই। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গত ১৮ মাসে ব্যাংকঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় পৌনে ২ লাখ কোটি টাকায়।উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাবে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় কেনাকাটার প্রবণতা কমেছে। বিনিয়োগের ঘাটতির কারণে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। ফলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি কমে গেছে। এসবের সম্মিলিত প্রভাবে রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে, যা চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে প্রায় সাড়ে ৭১ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে।বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল জাগো নিউজকে বলেন, ‘বেসরকারি খাত প্রাধান্য দিয়ে এগোনো উচিত। বর্তমানে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ভালো যাচ্ছে না। সরকার একটি কঠিন অবস্থায় ক্ষমতায় এসেছে। অপ্রত্যাশিতভাবে জ্বালানি সংকটে পড়তে হয়েছে।’ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, ‘ব্যাংকঋণের দ্রুত বৃদ্ধি একদিকে অর্থনীতিতে তারল্য জোগালেও অন্যদিকে এটি মুদ্রাস্ফীতি, সুদের হার বৃদ্ধি এবং খেলাপি ঋণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশেষ করে স্বল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ ঋণ গ্রহণ অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগজনক।’গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো ও অর্থনীতিবিদ হেলাল আহমেদ জনি বলেন, ‘নেওয়া ঋণ অবশ্যই পরিশোধ করতে হবে। দেশের অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ বাড়াতে পারলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং বৈশ্বিক চাপ মোকাবিলা সহজ হবে। কোনভাবেই যেন দেশ ঋণের ফাঁদে না পড়ে, সেটাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।’মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার প্রভাব বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে পড়েছে। সরকার তেলের দাম বাড়াতে না পারায় ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। এতে ব্যয় আরও বেড়েছে। রাজস্ব আদায় কমার সঙ্গে সঙ্গে ব্যয় না কমানয় ঋণ গ্রহণ বাড়ছে।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং কার্যকর মনিটরিং জরুরি। ঋণ যদি উৎপাদনশীল খাতে যেমন শিল্প, অবকাঠামো ও রপ্তানিমুখী খাতে সঠিকভাবে ব্যবহার করা হয়, তাহলে প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে। অন্যথায় দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য চাপ সৃষ্টি করবে। সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে নিজস্ব সম্পদ আহরণে, বিশেষ করে রাজস্ব বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

গণবার্তা

সম্পাদকঃ নূর মোহাম্মদ
কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্ব সংরক্ষিত গণবার্তা