আজ ১৮ এপ্রিল ২০২৬। ঠিক পঁচিশ বছর আগে, ২০০১ সালের এই দিনে কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্তের বড়াইবাড়ি গ্রামে সংঘটিত হয়েছিল বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষার ইতিহাসে এক স্মরণীয় অধ্যায়। দিনটি আজ ‘ঐতিহাসিক বড়াইবাড়ি দিবস’ নামে পরিচিত—যা জাতির সাহস, আত্মত্যাগ ও অটুট সার্বভৌমত্বের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।
২০০১ সালের ১৮ এপ্রিল ভোররাতে, কয়েকশ সশস্ত্র সদস্য ও বিশেষ কমান্ডোসহ ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার বড়াইবাড়ি এলাকার ১০৬৭/৩ সীমান্ত পিলার অতিক্রম করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে।
তাদের লক্ষ্য ছিল স্থানীয় বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) ক্যাম্পের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। ভোর প্রায় পাঁচটা থেকে শুরু হওয়া তীব্র গোলাগুলিতে বড়াইবাড়ি গ্রাম ও আশপাশের এলাকা প্রকম্পিত হয়ে ওঠে।
সংখ্যায় অনেক বড় বাহিনীর মুখোমুখি হয়ে অল্পসংখ্যক বিডিআর সদস্য এবং স্থানীয় গ্রামবাসীরা সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। লাঠি-সোঁটা ও সীমিত অস্ত্রশস্ত্র নিয়েও তারা অসাধারণ সাহসিকতার পরিচয় দেন। প্রায় ছয় ঘণ্টাব্যাপী এই সংঘর্ষে কৌশলগত প্রতিরোধের মুখে বিএসএফ বাহিনী শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হয়।
এই সংঘর্ষে ভারতের ১৬ জন বিএসএফ সদস্য নিহত হয় এবং তাদের মরদেহ সীমান্ত এলাকায় পড়ে থাকে। এছাড়া ২ জন সদস্যকে আটক করা হয়, যাদের পরবর্তীতে ফেরত দেওয়া হয়।
এই প্রতিরোধ যুদ্ধ শুধু সাহসের নয়, বেদনাময় আত্মত্যাগের ইতিহাসও বহন করে।
বাংলাদেশের পক্ষে মাতৃভূমি রক্ষায় শহীদ হন তিনজন বীর বিডিআর সদস্য:
এছাড়া আহত হন আরও কয়েকজন বিডিআর সদস্য এবং অসংখ্য স্থানীয় বাসিন্দা।
সংঘর্ষ চলাকালে মর্টার শেল ও অগ্নিসংযোগে বড়াইবাড়ি গ্রামের প্রায় ৬০–৭০টি ঘরবাড়ি পুড়ে যায় এবং বিপুল পরিমাণ সম্পদের ক্ষতি হয়।
এই ঘটনার পর থেকে প্রতিবছর ১৮ এপ্রিল দিনটি স্থানীয়ভাবে ‘বড়াইবাড়ি দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও স্থানীয় জনগণের উদ্যোগে দিনটি যথাযোগ্য মর্যাদায় স্মরণ করা হয়।
প্রধান কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে:
এই দিনটি নতুন প্রজন্মের কাছে দেশপ্রেম, সাহস ও আত্মত্যাগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত।
পঁচিশ বছর পেরিয়ে গেলেও ‘ঐতিহাসিক বড়াইবাড়ি দিবস’ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পায়নি। ফলে এর উদযাপন প্রধানত স্থানীয় পর্যায়েই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
স্থানীয় জনগণ, বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে দিনটিকে জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছেন। তাদের মতে, এই দিনের যথাযথ মর্যাদা প্রদান করলে তা দেশের ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সীমান্তরক্ষার চেতনাকে আরও শক্তিশালী করবে।
বড়াইবাড়ির এই ঘটনা কেবল একটি সীমান্ত সংঘর্ষ নয়; এটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সাহস ও আত্মত্যাগের এক অনন্য প্রতীক। জাতির ইতিহাসে এই দিনের গুরুত্ব ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা এবং যথাযথ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।

শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ এপ্রিল ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন