ঢাকা    বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
ঢাকা    বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
গণবার্তা

ডিজিটাল বিশ্বের বন্দি চোখ: স্ক্রিনের নীরব বিপদ ও সমাধান

ডিজিটাল বিশ্বের বন্দি চোখ: স্ক্রিনের নীরব বিপদ ও সমাধান

আজকের পৃথিবী যেন একটি স্ক্রিনের ভেতর বন্দি। ঘুম থেকে ওঠার পর প্রথমেই মোবাইল, সারাদিন অনলাইন ক্লাস বা কাজ, আর দিনের শেষে বিনোদন সবই যেন স্ক্রিনে সীমাবদ্ধ। প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করেছে ঠিকই, কিন্তু এর অতি ব্যবহারের ফলে যে নীরব ক্ষতি হচ্ছে, তা আমরা অনেকেই গুরুত্ব দিচ্ছি না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে মোবাইল বা কম্পিউটারের দিকে তাকিয়ে থাকলে ‘ডিজিটাল আই স্ট্রেইন’ বা কম্পিউটার ভিশন সিনড্রোম দেখা দেয়। এর লক্ষণ হিসেবে চোখে জ্বালাপোড়া, শুষ্কতা, ঝাপসা দেখা, এমনকি মাথাব্যথাও হতে পারে। সমস্যাটি এতটাই সাধারণ হয়ে উঠেছে যে অনেকেই এটিকে আর অসুখ বলে মনে করেন না, বরং দৈনন্দিন জীবনের অংশ হিসেবে মেনে নিচ্ছেন।

কেন চোখের ক্ষতি হয়

স্ক্রিন ব্যবহারের সময় আমরা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম চোখের পলক ফেলি। ফলে চোখে প্রাকৃতিক আর্দ্রতা কমে যায় এবং ড্রাই আই সমস্যা তৈরি হয়। স্বাভাবিক অবস্থায় আমরা প্রতি মিনিটে ১৫ থেকে ২০ বার চোখের পলক ফেলি, কিন্তু স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে তা কমে দাঁড়ায় মাত্র ৫ থেকে ৭ বার।

এর পাশাপাশি স্ক্রিন থেকে নির্গত নীল আলো চোখের ক্লান্তি বাড়ায় এবং ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দকে ব্যাহত করে। বিশেষ করে রাত জেগে মোবাইল ব্যবহারের অভ্যাস তরুণ প্রজন্মের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হয়ে উঠছে। নীল আলো মেলাটোনিন হরমোনের উৎপাদনে বাধা দেয়, ফলে রাতে ঘুম আসতে দেরি হয় এবং ঘুমের মানও খারাপ হয়।

শিক্ষার্থীদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি

শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। পড়াশোনা, অনলাইন ক্লাস, সামাজিক যোগাযোগ সবকিছুতেই স্ক্রিনের ব্যবহার বেড়েছে। ফলে চোখের বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ কমে গেছে। অনেক শিক্ষার্থী ইতিমধ্যে চোখের সমস্যায় ভুগছে, যা ভবিষ্যতে আরও জটিল রূপ নিতে পারে।

করোনা মহামারির পর থেকে অনলাইন শিক্ষার প্রসারের ফলে শিশু-কিশোরদের গড় স্ক্রিন টাইম কয়েকগুণ বেড়েছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই সমস্যা আরও গুরুতর আকার ধারণ করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন চক্ষু বিশেষজ্ঞরা।

চোখ বাঁচাতে সহজ অভ্যাস

এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে সচেতনতার বিকল্প নেই। খুব সহজ কিছু অভ্যাস আমাদের চোখকে রক্ষা করতে পারে—

  • ২০-২০-২০ নিয়ম: প্রতি ২০ মিনিট পর ২০ সেকেন্ডের জন্য ২০ ফুট দূরে তাকিয়ে থাকুন

  • পরিবেশের আলো ও স্ক্রিনের উজ্জ্বলতা সমান করে নিন

  • অপ্রয়োজনীয় স্ক্রিন টাইম কমানোর চেষ্টা করুন

  • নিয়মিত চোখের যত্ন নিন এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন

  • স্ক্রিন দেখার সময় চোখের পলক ফেলার অভ্যাস করুন

প্রযুক্তিগত সমাধান আর অভ্যাস的改变

বর্তমানে অনেক স্মার্টফোনে ‘আই কম্ফোর্ট’ বা ‘ব্লু লাইট ফিল্টার’ অপশন যুক্ত করা হয়েছে, যা স্ক্রিন থেকে নির্গত ক্ষতিকর নীল আলো কিছুটা কমাতে সাহায্য করে। তবে এটিকে সম্পূর্ণ সমাধান হিসেবে দেখা উচিত নয়। দীর্ঘ সময় স্ক্রিন ব্যবহারের অভ্যাস পরিবর্তন না করলে এই ধরনের ফিচার একা চোখের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে না।

অনেক কম্পিউটার ও ল্যাপটপে ‘নাইট লাইট’ বা ‘নাইট শিফট’ মোডও থাকে, যা সন্ধ্যার পর স্ক্রিনের আলোকে উষ্ণ আভায় পরিবর্তন করে। এই ফিচারগুলো ব্যবহার করলে চোখের ওপর চাপ কিছুটা কমতে পারে।

কখন ডাক্তার দেখাবেন

যদি নিচের কোনো সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে থাকে, তাহলে দেরি না করে চক্ষু বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি—

  • চোখে ঘন ঘন জ্বালাপোড়া বা ব্যথা

  • ঝাপসা দেখা বা ডাবল ভিশন

  • মাথাব্যথা বিশেষ করে সামনের অংশে

  • চোখ শুকিয়ে যাওয়া বা বেশি পানি পড়া

  • রাতে গাড়ি চালাতে বা অন্ধকারে দেখতে কষ্ট হওয়া

প্রযুক্তি আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে প্রযুক্তির ব্যবহার যেন আমাদের স্বাস্থ্যের ক্ষতি না করে, সেদিকে খেয়াল রাখা সবচেয়ে বেশি জরুরি। অন্যথায় এই নীরব বিপদ একসময় বড় সমস্যায় পরিণত হবে, যার প্রভাব পড়বে পুরো প্রজন্মের ওপর।

একটু সচেতনতা আর দৈনন্দিন অভ্যাসে কিছু ছোট পরিবর্তন এনে আমরা আমাদের চোখকে স্ক্রিনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করতে পারি। প্রযুক্তি ব্যবহার করবেন, কিন্তু প্রযুক্তিকে আপনার নিয়ন্ত্রণ করতে দেবেন না।

আপনার মতামত লিখুন

গণবার্তা

বুধবার, ১০ জুন ২০২৬


ডিজিটাল বিশ্বের বন্দি চোখ: স্ক্রিনের নীরব বিপদ ও সমাধান

প্রকাশের তারিখ : ১০ জুন ২০২৬

featured Image
আজকের পৃথিবী যেন একটি স্ক্রিনের ভেতর বন্দি। ঘুম থেকে ওঠার পর প্রথমেই মোবাইল, সারাদিন অনলাইন ক্লাস বা কাজ, আর দিনের শেষে বিনোদন সবই যেন স্ক্রিনে সীমাবদ্ধ। প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করেছে ঠিকই, কিন্তু এর অতি ব্যবহারের ফলে যে নীরব ক্ষতি হচ্ছে, তা আমরা অনেকেই গুরুত্ব দিচ্ছি না।বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে মোবাইল বা কম্পিউটারের দিকে তাকিয়ে থাকলে ‘ডিজিটাল আই স্ট্রেইন’ বা কম্পিউটার ভিশন সিনড্রোম দেখা দেয়। এর লক্ষণ হিসেবে চোখে জ্বালাপোড়া, শুষ্কতা, ঝাপসা দেখা, এমনকি মাথাব্যথাও হতে পারে। সমস্যাটি এতটাই সাধারণ হয়ে উঠেছে যে অনেকেই এটিকে আর অসুখ বলে মনে করেন না, বরং দৈনন্দিন জীবনের অংশ হিসেবে মেনে নিচ্ছেন।কেন চোখের ক্ষতি হয়স্ক্রিন ব্যবহারের সময় আমরা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম চোখের পলক ফেলি। ফলে চোখে প্রাকৃতিক আর্দ্রতা কমে যায় এবং ড্রাই আই সমস্যা তৈরি হয়। স্বাভাবিক অবস্থায় আমরা প্রতি মিনিটে ১৫ থেকে ২০ বার চোখের পলক ফেলি, কিন্তু স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে তা কমে দাঁড়ায় মাত্র ৫ থেকে ৭ বার।এর পাশাপাশি স্ক্রিন থেকে নির্গত নীল আলো চোখের ক্লান্তি বাড়ায় এবং ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দকে ব্যাহত করে। বিশেষ করে রাত জেগে মোবাইল ব্যবহারের অভ্যাস তরুণ প্রজন্মের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হয়ে উঠছে। নীল আলো মেলাটোনিন হরমোনের উৎপাদনে বাধা দেয়, ফলে রাতে ঘুম আসতে দেরি হয় এবং ঘুমের মানও খারাপ হয়।শিক্ষার্থীদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশিশিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। পড়াশোনা, অনলাইন ক্লাস, সামাজিক যোগাযোগ সবকিছুতেই স্ক্রিনের ব্যবহার বেড়েছে। ফলে চোখের বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ কমে গেছে। অনেক শিক্ষার্থী ইতিমধ্যে চোখের সমস্যায় ভুগছে, যা ভবিষ্যতে আরও জটিল রূপ নিতে পারে।করোনা মহামারির পর থেকে অনলাইন শিক্ষার প্রসারের ফলে শিশু-কিশোরদের গড় স্ক্রিন টাইম কয়েকগুণ বেড়েছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই সমস্যা আরও গুরুতর আকার ধারণ করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন চক্ষু বিশেষজ্ঞরা।চোখ বাঁচাতে সহজ অভ্যাসএই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে সচেতনতার বিকল্প নেই। খুব সহজ কিছু অভ্যাস আমাদের চোখকে রক্ষা করতে পারে—২০-২০-২০ নিয়ম: প্রতি ২০ মিনিট পর ২০ সেকেন্ডের জন্য ২০ ফুট দূরে তাকিয়ে থাকুনপরিবেশের আলো ও স্ক্রিনের উজ্জ্বলতা সমান করে নিনঅপ্রয়োজনীয় স্ক্রিন টাইম কমানোর চেষ্টা করুননিয়মিত চোখের যত্ন নিন এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিনস্ক্রিন দেখার সময় চোখের পলক ফেলার অভ্যাস করুনপ্রযুক্তিগত সমাধান আর অভ্যাস的改变বর্তমানে অনেক স্মার্টফোনে ‘আই কম্ফোর্ট’ বা ‘ব্লু লাইট ফিল্টার’ অপশন যুক্ত করা হয়েছে, যা স্ক্রিন থেকে নির্গত ক্ষতিকর নীল আলো কিছুটা কমাতে সাহায্য করে। তবে এটিকে সম্পূর্ণ সমাধান হিসেবে দেখা উচিত নয়। দীর্ঘ সময় স্ক্রিন ব্যবহারের অভ্যাস পরিবর্তন না করলে এই ধরনের ফিচার একা চোখের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে না।অনেক কম্পিউটার ও ল্যাপটপে ‘নাইট লাইট’ বা ‘নাইট শিফট’ মোডও থাকে, যা সন্ধ্যার পর স্ক্রিনের আলোকে উষ্ণ আভায় পরিবর্তন করে। এই ফিচারগুলো ব্যবহার করলে চোখের ওপর চাপ কিছুটা কমতে পারে।কখন ডাক্তার দেখাবেনযদি নিচের কোনো সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে থাকে, তাহলে দেরি না করে চক্ষু বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি—চোখে ঘন ঘন জ্বালাপোড়া বা ব্যথাঝাপসা দেখা বা ডাবল ভিশনমাথাব্যথা বিশেষ করে সামনের অংশেচোখ শুকিয়ে যাওয়া বা বেশি পানি পড়ারাতে গাড়ি চালাতে বা অন্ধকারে দেখতে কষ্ট হওয়াপ্রযুক্তি আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে প্রযুক্তির ব্যবহার যেন আমাদের স্বাস্থ্যের ক্ষতি না করে, সেদিকে খেয়াল রাখা সবচেয়ে বেশি জরুরি। অন্যথায় এই নীরব বিপদ একসময় বড় সমস্যায় পরিণত হবে, যার প্রভাব পড়বে পুরো প্রজন্মের ওপর।একটু সচেতনতা আর দৈনন্দিন অভ্যাসে কিছু ছোট পরিবর্তন এনে আমরা আমাদের চোখকে স্ক্রিনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করতে পারি। প্রযুক্তি ব্যবহার করবেন, কিন্তু প্রযুক্তিকে আপনার নিয়ন্ত্রণ করতে দেবেন না।

গণবার্তা

সম্পাদকঃ নূর মোহাম্মদ
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্ব সংরক্ষিত গণবার্তা