স্বাস্থ্য ডেস্ক: পায়ের বুড়ো আঙুলের গোড়ায় হাড় বের হয়ে আসা বা মাংসপিণ্ডের মতো ফুলে ওঠাকে সাধারণ ভাষায় ‘বুনিয়ন’ বলা হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিভাষায় যাকে বলে হ্যালাক্স ভালগাস (Hallux Valgus)। এটি শুধু দেখতে খারাপ নয়, দীর্ঘমেয়াদে হাঁটতে কষ্ট, জুতো পরতে অসুবিধা এবং পায়ের অন্যান্য অংশে ব্যথাও ডেকে আনে।
গবেষণা বলছে, বিশ্বের প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার প্রায় ১৯ শতাংশ (প্রায় পাঁচজনে একজন) এই সমস্যায় ভোগেন। নারীদের মধ্যে এই হার আরও বেশি—প্রায় ২৪ শতাংশ। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সমস্যা প্রকট হয়।
কী কারণে এই সমস্যা হয়?
এটি মূলত ত্রিমাত্রিক বিকৃতি। পায়ের বুড়ো আঙুল ধীরে ধীরে বাইরের দিকে বেঁকে যায়, আর প্রথম মেটাটারসাল হাড়টি ভেতরের দিকে ঠেলে বেরিয়ে আসে। এর ফলে একটি হাড়ের মত ‘গাঁট’ তৈরি হয়, যা জুতোর সঙ্গে ঘষে লাল হয়ে যায় এবং ব্যথা করে।
কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে—
জিনগত কারণ (পারিবারিক ইতিহাস)
সরু ও টিপটো জুতো (হাই হিল) দীর্ঘদিন পরা
পায়ের গঠনগত সমস্যা (চ্যাপটা পা)
লিগামেন্টের নমনীয়তা
লক্ষণগুলো কী কী?
সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ হলো বুড়ো আঙুলের গোড়ায় ব্যথা ও ফোলাভাব। এছাড়াও থাকতে পারে—
জুতো পরলে ঘর্ষণে জ্বালাপোড়া ও লালচে ভাব
দ্বিতীয় বা তৃতীয় আঙুলের নিচে কর্ন (ক্যালাস) পড়া ও ব্যথা
বুড়ো আঙুলটি ধীরে ধীরে অন্য আঙুলের ওপর চলে আসা
পায়ের খিলানে চাপ অনুভব করা
চিকিৎসা কী? একেবারেই কি অস্ত্রোপচার করতে হবে?
একদমই না। চিকিৎসকদের মতে, বেশিরভাগ রোগীর ক্ষেত্রেই অস্ত্রোপচার ছাড়াই সমস্যা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। প্রথম ধাপে কিছু ‘যান্ত্রিক’ পরিবর্তন করলেই ব্যথা অনেকটা কমে যায়।
প্রাথমিক করণীয় (কনজারভেটিভ চিকিৎসা):
১. জুতো বদলান: চওড়া ও নরম তলার জুতো ব্যবহার করুন। সামনের অংশ যেন যথেষ্ট উঁচু ও চওড়া হয়, যাতে বুড়ো আঙুলের ‘হাড়ের’ ওপর চাপ না পড়ে। টিপটো জুতা ও হাই হিল পরিহার করুন।
২. প্যাড ও স্পেসার ব্যবহার: সিলিকনের নরম প্যাড ‘বুনিয়ন’-এর ওপর ঘর্ষণ কমায়। আর পায়ের প্রথম ও দ্বিতীয় আঙুলের মাঝে স্পেসার (সিলিকনের পাতলা ফাঁকা) ব্যবহার করলে চাপ কমে এবং আঙুল ধীরে ধীরে সোজা হতে সহায়তা করে।
৩. ইনসোল (পায়ের পাতার কাঠামো): খিলানের নিচে চাপ বণ্টনকারী ইনসোল ব্যবহার করলে বুড়ো আঙুলের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে না।
৪. ব্যায়াম: পায়ের ছোট ছোট মাংসপেশি মজবুত করার ব্যায়াম (যেমন- পায়ের আঙুল ছড়ানো, তোয়ালে জড়ো করা, পায়ের খিলান বসানো) ব্যথা কমাতে ও পায়ের গঠন ঠিক রাখতে সাহায্য করে।
৫. ওজন ও চলাফেরার ধরণ নিয়ন্ত্রণ: অতিরিক্ত ওজন এবং দীর্ঘক্ষণ শক্ত মেঝেতে দাঁড়িয়ে থাকা এ সমস্যা বাড়ায়।
কখন অস্ত্রোপচারের কথা ভাববেন?
চিকিৎসকরা বলেন, যদি উপরের উপায়গুলো সঠিকভাবে ব্যবহার করেও ৩-৬ মাস পর ব্যথা না কমে, হাঁটাচলা ও দৈনন্দিন কাজে ব্যাঘাত ঘটে, এবং আঙুলের বিকৃতি বাড়তেই থাকে, তবেই অস্ত্রোপচারের কথা ভাবা উচিত।
আধুনিক চিকিৎসায় ন্যূনতম আক্রমণাত্মক কৌশলে (MIS) ছোট ছিদ্র করে খুব দ্রুত সেরে ওঠা যায়। তবে অস্ত্রোপচার সব সময় শেষ কথা নয়। এটি করানোর আগে একাধিকবার বিশেষজ্ঞের মতামত নেওয়া জরুরি।
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ
এই প্রতিবেদনের জন্য পরামর্শ প্রদানকারী অর্থোপেডিক সার্জনেরা জানিয়েছেন, “আমরা সাধারণত রোগীকে বুঝিয়ে বলি, এক্স-রেতে কোণ যতই বাড়ুক না কেন, রোগী যতক্ষণ ব্যথাহীনভাবে হাঁটতে পারেন, ততক্ষণ অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন নেই। শুধু জুতোর ধরণ বদলে ফেললেই অর্ধেক রোগীর সমস্যার সমাধান হয়ে যায়।”
প্রসঙ্গত, সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রবীণ এবং ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে ‘বুনিয়ন’ সমস্যাটি নজরদারিতে রাখা জরুরি, কারণ সামান্য ঘর্ষণে আলসার হতে পারে। সেক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শে বিশেষ জুতা ও ইনসোল ব্যবহার করতে হবে।
সতর্কীকরণ: কোনো অবস্থাতেই ‘বুনিয়ন’ গলানোর জন্য আয়োডিন, এ্যাসপিরিন বা ভেষজ উপাদানের তৈরি মলম ব্যবহার করবেন না। এতে ত্বকে পোড়া, অ্যালার্জি বা সংক্রমণ হতে পারে। জুতো পরিবর্তন, ইনসোল ও ব্যায়ামই এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর উপায়।
বিষয় : Hallux Valgus পায়ের পাতার সমস্যা

মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৬ জুন ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন